রাজনীতি হোক দুর্বৃত্ত ও সুশীলমুক্ত

দুর্বৃত্তদের থেকে রাজনীতি মুক্ত হোক, এটি তো সহজেই বুঝতে পারি। সুশীলমুক্ত রাজনীতি বলতে আমি কী বলতে চাচ্ছি তা আপনার ঠিক বুঝে আসছে না, তাই তো? দেখেন, সুশীল হিসাবে পরিচিত সুবিধাবাদী ও ছুপা দলকানা বুদ্ধিজীবীদের মাত্রাতিরিক্ত প্রভাবের কারণে রাজনীতি যে কতটা পথভ্রষ্ট হতে পারে, তা আমরা সমকালীন বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী হিসাবে পরিচিত ব্যক্তিবর্গের কর্মকাণ্ড ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে সহজেই বুঝতে পারি।

ওয়ান্স এগেইন, তাহলে রাজনীতি নামক এই জিনিসটা আসলে কী, সেটা আমরা ভালো করে বুঝে নেই।

রাজনীতি হলো এমন ধরনের প্রায়োগিক ও সামাজিক নৈতিকতা যা প্রশাসনিক ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত। আমরা নিজেদের জন্য নিজেরা যা পছন্দ করি, তা যদি আমি সমাজের বাদবাকী সদস্যদের জন্যও পছন্দ করি, যদি আমরা চাই যে এমন এমন ভালো ভালো কাজগুলো সংশ্লিষ্ট সবাই করুক, সমর্থন করুক, অনুসরণ করুক, বাস্তবায়ন করুক, তাহলে আমার বা আমাদের এই চাওয়াটাই হলো রাজনীতি বা রাজনীতি সচেতনতা।

আমার এই রাজনৈতিক সচেতনতা যদি প্রবল হয়ে উঠে, আমি যদি আমার এই রাজনৈতিক চেতনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে সেটির বাস্তবায়নে মাঠে নেমে পড়ি, তাহলে আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী বা পলিটিক্যাল এক্টিভিস্ট হলাম। এই দৃষ্টিতে যারা কোনো না কোনো ধরনের রাজনৈতিক বোধ দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে প্র্যাকটিক্যালি রাজনীতি করেন, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের সেইফ-গার্ড, ভ্যানগার্ড বা ত্রাতা।

যারা রাজনীতি সরাসরি করেন না, কিন্তু রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তারা বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। তো, এই বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় নামক সুশীলদের কাজ হলো রাজনীতিবিদদের ও সাধারণ জনগণকে মোটাদাগে রাজনীতির ছক বা গতিধারা সম্পর্কে ধারণা দেয়া। তাই সুশীলদের কথাবার্তাগুলো হওয়া উচিত নিতান্তই উপদেশ বা পরামর্শমূলক।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো (যে জন্য এই লেখা), সুশীলরা মনে করেন, রাজনীতি তারাই ভালো বুঝেন। তাদের ভাবখানা এমন, রাজনীতি করলে যেন তারাই ভালো করতেন। অথবা, তাদের মনোভাব এমন হয়, যারা রাজনীতি করছেন তারা যেন তাদের সব কথাই সব সময়ে মেনে চলেন। নিজেদেরকে তারা ভাবেন স্বীয় রাজনৈতিক পক্ষের মূল চালিকাশক্তি।

যাত্রীরা যদি গাড়ির ড্রাইভারকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে তাহলে সেই গাড়ি ও ড্রাইভারের যে অবস্থা হবে, অ-রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে সে দেশের অবস্থাও তেমনই হবে। যেমনটি হয়েছে আমাদের দেশে।

রাজনীতি করার সাহস না থাকলে কিংবা বুদ্ধিজীবী হিসাবে কাজ করাকে নিজের জন্য অধিকতর উপযোগী মনে করলে কোনো ব্যক্তির উচিত জ্ঞান-গবেষণার কোনো এক বা একাধিক উপযুক্ত ফিল্ড বেছে নিয়ে কাজ করা। এবং উক্ত ফিল্ড বা ফিল্ডসমূহের মাধ্যমে সমাজের তাত্ত্বিক গাঁথুনিকে অধিকতর মজবুত করার কাজে অবদান রাখা।

যেমনটা দেখি, সবাই রাজনৈতিক বিশ্লেষক, এটি অনুচিত। এটি অসুস্থতা। কর্মবিমুখতা। সোজা স্ল্যাং বাংলা কথায়, ইঁচড়ে পাকামো। সোশ্যাল মিডিয়ার প্লাটফর্মের অপব্যবহার করে মানুষ এটি করছে। এ ধরনের textovert বা বকোয়াজদের দিয়ে কোনো আদর্শের পক্ষেই টেকসই কোনো ফিল্ডওয়ার্ক কখনো সম্ভবপর হবে না। দুয়ে দুয়ে চারের মতো এটি সত্য।

একজন ইসলামপন্থী হিসাবে আমি ব্যাপারটাকে ইসলামের দিক থেকে যদি দেখি, তাহলে পবিত্র কোরআনের সেই আয়াতকে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করবো, যাতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা সে কথা কেন বলো যা নিজেরা করো না? আল্লাহর কাছে এটি অত্যন্ত অপছন্দনীয় যে এ রকম কথা বলবে যা তোমরা করবে না।

তারমানে, একদল হলো বলৈন্না বা বলনেওয়ালা। তাদের কাজ হলো শুধু বলা আর ভুল ধরা। আর একদল হলো করৈন্না বা করনেওয়ালা। যারা বলনেওয়ালা সুশীলদের চাওয়া মোতাবেক চলবে। এমন সুশীল সামাজিক সেটআপ ইসলাম অনুমোদন করে না। একটি আদর্শ ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রত্যেকেই বিবেক-বুদ্ধি মোতাবেক বলবে। স্বীয় সাধ্য মোতাবেক, স্বীয় সামর্থ্যের পরিসরে যা সঠিক তা বাস্তবায়ন বা আমল করবে। অর্থাৎ প্রত্যেকেই একইসাথে বলনেওয়ালা ও করনেওয়ালা। যে যার মতো করে বলবে। যে যার মতো করে করবে। সত্যিকারের বিশ্বাসী হতে হলে প্রত্যেকেরই থাকতে হবে স্বাধীন চিন্তা ও উপযোগী কর্মগত উদ্যোগ বা এক্টিভিজম।

সে জন্যই চাই, রাজনীতি হোক দুর্বৃত্ত ও সুশীলমুক্ত। রাজনীতিবিদদেরকে রাজনীতি করতে দেন। স্বীয় অন্তর্গত ক্যাপাসিটি দিয়ে একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রের কল্যাণ করবেই। এমনকি তিনি ব্যক্তিজীবনে অনৈতিক হলেও। ব্যক্তি নৈতিকতা আর সামাজিক নৈতিকতা, দুটো ভিন্ন জিনিস। সফল রাজনীতির জন্য নেতৃত্বের যোগ্যতাই মূল শর্ত। ইতিবাচক ব্যক্তি নৈতিকতা একটি অতিরিক্ত শর্ত।

আমাদের দেশের রাজনীতি সংশ্লিষ্ট অন্যতম বড় সমস্যা হলো লোকদের অতিরিক্ত রাজনৈতিক সচেতনতা। অতিরিক্ত রাজনৈতিক সচেতনতা স্বয়ং কোনো সমস্যা নয়। অতিরিক্ত খাইলে যেমন অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। নচেৎ মেদ জমে মানুষ অচল হয়ে পড়ে। তেমন করে রাজনৈতিক সচেতনতার সাথে সাথে মানুষের কাণ্ডজ্ঞান, বুঝ, বুদ্ধি ও বিবেকও ন্যূনতম মাত্রায় সক্রিয় থাকতে হয়।

রাজনীতি না বুঝে রাজনীতি করলে ফ্যানাটিক পলিটিক্যাল জম্বি তৈরি হয়। যা আমাদের এখানে অলরেডি হয়েছে। এক একটা রাজনৈতিক দল যেন এক একটা ধর্ম হয়ে উঠেছে। সমসাময়িক চলমান বিষয় সংশ্লিষ্ট মন্তব্য করা হতে বিরত থাকার পলিসির কারণে কারা এর জন্য দায়ী, তা স্পেসিফিক্যালি বলা হতে আপাতত বিরত থাকলাম।

সমসাময়িক বা চলমান ইস্যুগুলোতে এনগেইজ না হওয়ার কারণ হলো আমি জীবন ও জগত সম্পর্কে মানুষের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও মানবিক মূল্যবোধ উন্নয়নের জন্য কাজ করছি। তাতে করে আমি চাই না, আমি সেক্টেরিয়ান পলিটিক্সে আটকে যাই।

এতক্ষণ আমি যা বললাম, তার মূলকথা হলো, মানুষ রাজনৈতিক প্রাণী। সুস্থ সমাজের জন্য রাজনীতি অপরিহার্য। কিন্তু সবাই একইভাবে রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট হবে না। মাঠে ময়দানে যারা রাজনীতি করবে তাদেরকে অন্যরা পরামর্শ দিবে। সময়ে সময়ে নানাভাবে সহযোগিতা করবে। কিন্তু কোনোক্রমেই তা যেন নিয়ন্ত্রণমূলক না হয়। অতএব, যারা মনে করছেন, শুধু পরামর্শ দিয়ে কাজ হচ্ছে না, তারা সম্ভাবনা, ঝুঁকি ও দায়দায়িত্বকে মেনে নিয়ে সরাসরি রাজনীতিতে নেমে পড়ুন।

শুদ্ধ রাজনীতি হলো ব্যক্তি ও সমাজ নৈতিকতার সর্বোচ্চ পর্যায়। যা সবচেয়ে ভালো, সেটি অনুপযুক্ত লোকের হাতে পড়ে বা অপপ্রয়োগের ফলে হয়ে পড়তে পারে সবচেয়ে খারাপ ও কলুষিত। ভালো মানুষেরা যদি রাজনীতি না করে তাহলে সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে দুর্বৃত্তরাই এগিয়ে আসবে। আলোর উপস্থিতিতে অন্ধকার যেভাবে হারিয়ে যায়, সেভাবে ভালোদের উপস্থিতির কারণে মন্দরা অপসৃত হবে। হবেই। নেতৃত্বের ন্যূনতম যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে। শুধু ভালোত্ব দিয়ে নেতৃত্ব হয় না। ভালোত্ব ও নেতৃত্ব সমার্থকও নয়, বিপরীতও নয়। অকেশনাল। প্রায়োরিটি পাবে যোগ্যতা।

নেতৃত্ব সংক্রান্ত এই লেখাটা পড়তে পারেন: সফল নেতৃত্ব গঠনে সুন্নাহসম্মত বাস্তব কর্মপন্থা – ড. তারেক আল সোয়াইদান

ফেইসবুক থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Afnan Hasan Imran: সামাজিক নৈতিকতা তো একটা বড় ফিল্টার। এইটা দিয়া আরো অনেক কিছু ডিফাইন করা যায়। এই ধরেন ‘বিবাহ’। বিবাহের জৈবিক, মানসিক দিকের আলাপ একপাশে রেখে এইটা যেভাবে আমাদের সোশ্যাল হারমোনিকে ধরে রাখছে সে আলাপ দেখলে ‘বিবাহ’ও একটা সামাজিক নৈতিকতা। এ রকম আরো বহু সামাজিক নৈতিকতা আছে। তাই রাজনীতির আলোচনায় রাজনীতির অধিকতর স্বতন্ত্র সংজ্ঞায়ন জরুরি।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: রাজনীতিকে বলা যায় উচ্চতর সামাজিক নৈতিকতার বিষয় যা ক্ষমতাচর্চা তথা প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট।

Fatema Mahfuz: লেখাটা বেশ ভালো হয়েছে। তবে একটা জায়গায় আটকে গেলাম। ব্যক্তি জীবনে অনৈতিক হলেও কেউ ভালো রাজনৈতিক কীভাবে হন? যেখানে আপনি ব্যক্তি ও সামাজিক নৈতিকতাকে ভিন্ন বলেছেন।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, এটাই তো ব্যাপার। ব্যক্তিজীবন এবং সামষ্টিক জীবন, দুইটা একই রকম হওয়ার কথা বলে আমরা মনে করি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, তা হয় না। এমনকি সাহাবীদের সমাজের মধ্যেও ব্যাপারটা এমনই ছিল। নেতৃত্ব সংক্রান্ত যেই আর্টিকেলটার লিংক দিয়েছি, সেটা পড়লে এটা বুঝা যাবে।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Leave a Reply