নারীদের প্রতি ও জামায়াতের প্রতি এত বিদ্বেষ কেন?

— নারী ও জামায়াতের ব্যাপারে চরমোনাই পীরের সাম্প্রতিক বক্তব্য।

 

নারীদের প্রতি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রতি কী পরিমাণ বিদ্বেষ থাকলে মানুষ এমন ধরনের কথাবার্তা বলতে পারে, তা ভেবে অবাক হচ্ছি।

আমি নারী অধিকারের পক্ষে কথা বলি। আমার কাজ হলো, নারীদের মানবিক অধিকারের বিপক্ষে থাকা সব অন্ধকারের শক্তিকে হঠানো; অন্তত কোণঠাসা করা। সমাজের মূলস্রোতে তাদেরকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা।

আমি জামায়াতের পক্ষে বলি না। কিন্তু, বৃহত্তর ফ্রেমওয়ার্কের প্রেক্ষাপট হতে বিবেচনা করলে আমার সকল কার্যক্রম ইন আ সেন্স জামায়াতের পক্ষে যায়।

দূরের যাত্রী যদি বুঝতে পারে, ভুলক্রমে সে লোকাল গাড়িতে উঠে পড়েছে, তখন সে যেমন গাড়ি চেঞ্জ করে, আমার জামায়াত ত্যাগ করাটাও সে রকম। জামায়াতের অবস্থা প্রাইমারি স্কুলের মতো। যা জরুরী কিন্তু তার মধ্যে কনফাইন্ড হয়ে থাকাটা ডেমেইজিং।

বাংলাদেশে ক্রেডিবল ইসলামপন্থার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত হলো জামায়াতে ইসলামী। যেমন করে বাংলাদেশে ডানপন্থী-ইসলামপন্থী রাজনীতি হলো আদতে মুসলিম লীগের রাজনীতি।

পয়সা দিয়ে একাডেমিক রিসার্চার পোষার সক্ষমতা থাকলে আমি একটা গবেষণা পরিচালনা করে দেখাতাম, বাংলাদেশে যারাই যুগোপযোগী করে ইসলামের কথা বলছে, লিখছে, ইসলামী সংগঠন করছে, তা হুবহু জামায়াতের অনুসরণ ছাড়া কিছু নয়।

জামায়াতের রেটরিক, ভোকাবুলারি, এমনকি সাংগঠনিক কাঠামো তারা অনুসরণ করছে। জামায়াত যা যা করেছে, অন্যরা তা সবই করছে। ভুল-শুদ্ধ সবই। they are following every footsteps of ‘big brother’ Jamaat-e-Islami.

গত কয়েকদিন আগে দশ-বারো জনের একটা গ্রুপ আমার সাথে সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য আমার চবি ক্যাম্পাসস্থ বাসায় এসেছিলেন। প্রফেসর (ইঞ্জিনিয়ার) আবদুল মান্নান স্যারের নেতৃত্বে। উনাদের মধ্যে একজন ছিলেন ঢাকায় অবস্থিত একটি কওমী মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যাল। তিনি ঐক্যের কথা বলছিলেন। আমি উনার কথার মাঝখানে বললাম,

আমি শিবিরের প্রোডাক্ট। সে হিসেবে আমিও তো জামায়াত। আপনাদের মাদ্রাসায় পড়ানো আকীদার বইয়ে তো লেখা আছে, জামায়াত একটা বাতিল ফির্কা। জামায়াত ছাড়া আপনারা চলবেন কীভাবে? চারিদিকে সব তো নানা কিসিমের জামায়াত; অথবা জামায়াত অফ-শুট …।

আমার কথা শুনে মুহতামিম সাহেব থতমত খেয়ে গেলেন।

২০১৬ সালের শুরুর দিকে লিখেছিলাম, ‘কেন আমি জামায়াতের সংস্কারবাদী নই।’ দীর্ঘ সে লেখার সমাপনী প্যারাটা উদ্ধৃত করছি,

“আর হ্যাঁ, যত দমন-পীড়নই চলুক না কেন, কোনো নিষেধাজ্ঞাই জামায়াতকে নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না। যে কারণে জামায়াতের ভিতরে সাবস্ট্যানশিয়াল পরিবর্তন সম্ভব নয়। সেই একই কারণে জামায়াতের এনিহিলেশানও সম্ভব নয়। উপরে এই বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। তা হলো জামায়াতের কনস্টিটিউয়েনসি। না, এটি পলিটিক্যাল কনস্টিটিউয়েনসি নয়। এটি এ দেশের মাটি ও মানুষের ধর্মচেতনায় জামায়াতের মতো কিছুটা রক্ষণশীল ও কিছুটা উদার ইসলামী চিন্তার প্রতি আস্থা ও সমর্থন।”

২০১৩ সালেও আমি লেখালেখির মাধ্যমে জামায়াতকে স্ট্রংলি সাপোর্ট করেছি। যদিও তার আগেই আমি জামায়াতের সাথে সাংগঠনিকভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। কাদের মোল্লার দণ্ড কার্যকরের আগের দিন প্রায় শ’খানেক শিক্ষক নিয়ে চবি’র ফ্যাকাল্টিগুলোতে একটা মৌন মিছিল ও চবি শহীদ মিনার এলাকায় মাইক লাগিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আমি ছিলাম সেটার মূল উদ্যোক্তা ও আয়োজক।

আমি জামায়াতের প্রতি বিদ্বিষ্ট নই। অন্তরের সংকীর্ণতা থেকে আল্লাহ তায়ালা আমাকে মুক্তি দান করেছেন, আলহামদুলিল্লাহ! আমি জামায়াতের সমালোচক। শিক্ষক আর শিক্ষার দ্বন্দ্বে আমি শিক্ষাকেই নিয়েছি বেছে।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে যারা একটা ইসলামী রাষ্ট্র বা অধিকতর ইসলামসম্মত রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চান, অথচ জামায়াত করেন না, বা কখনো করেননি, তারা আল্লাহর ওয়াস্তে মন থেকে জামায়াত-বিদ্বেষটুকু ঝেড়ে ফেলেন। আপনাদের বাদ দিয়ে জামায়াতের গতি নাই। সেটা বুঝা গেছে। জামায়াতকে বাদ দিয়েও যে আপনাদের গতি নাই, কোনো ভবিষ্যত নাই, সময় এসেছে, সেটা ভালো করে বুঝে নেয়ার।

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

নাদিম মাহমুদ: ‘যুগোপযোগী করে ইসলামের কথা বলা’ বলতে আপনি কি বুঝিয়েছেন? একটু ব্যাখ্যা করে বলবেন কি?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: এগুলো পড়লে কিছু জওয়াব পাবেন, আশা করি।

১। ইসলামী চিন্তার সংস্কার: কোথায়, কেন ও কীভাবে?

২। ইসলামী চিন্তার সংস্কার: বিচ্যুতি, প্রগতি, নাকি সময়ের দাবি?

Nazmul Hasan: কারো সাথে চিন্তা বা চর্চার কিছু মিলে গেলেই কি তাকে পূর্বোক্ত কারো অনুসারী/অনুরূপ বলা যায়? Its not what common amongst us make us who we are but what differentiates। এই নীতি অনুসারে আপনার বক্তব্যের সাথে একমত হওয়া যায় না। যদি এই নীতি আমরা না মানি তাহলে আপনার লেখা থেকেই বলা যায়-‘জামায়াত ইজ নাথিং বাট সিসলিয়া অফ মুসলিম লীগ।’ এই কি?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: কী জানি, কী বলবো বুঝতে পারছি না …!

Muhammad Ishrak: কমন ডিসকার্সিভ ট্রাডিশন, কমন আইডিওলজি এবং ফ্রেমিং এক্ষেত্রে লক্ষণীয়। জামাত আর ইআবা-এর মধ্যে কোন জায়গায় পার্থক্য করবেন? এমনকি রিফিউটেশনও একই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ওপর খাড়ানো। এটা কিছু মিলে যাওয়ার ব্যাপার নয়, সম্পূর্ণভাবে একই চিন্তার জায়গা থেকে কথা বলার ব্যাপার।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ, আমি এই কথাগুলোই বলবো ভাবছিলাম; কিন্তু হেসিটেন্ট ছিলাম।

Nazmul Hasan: বাঙালী মুসলমানের মধ্যে ট্রেডিশান মানার ক্ষেত্রে সেন্টার লেফট থেকে এক্সট্রিম রাইট সবার বৈশিষ্ট্য ও চর্চা প্রায় একই। এক্ষেত্রে বাঙালী মুসলমানের মধ্যে এক ধরনের ইউনিফর্মিটি আছে। কিন্তু পার্থক্য আইডিওলজিতে। আইডিওলজি ডিসকার্সিভ হয়নি? আইডিওলজির ব্যবচ্ছেদ করলে অন্তত তিনটা উপাদান পাওয়া যায়: (১) কগনিশান (চিন্তা, বিশ্বাস, ভ্যালুজ, মানসিক গড়ন এবং আত্মপরিচয় ইত্যাদি) (২) সোসাইটি (গ্রুপ ডাইনামিক্স, নেটওয়ার্কিং) এবং (৩) ডিসকোর্স (সাহিত্য)।

এই তিন উপাদানের সমন্বয়ে যে মতবাদ জামায়াত চর্চা করে, তার সাথে ইশা’র মিল খুব কমই। যেখানে দুই গ্রুপের মিলে যায় সেটা তাদের পরিচয়কে নির্ধারণ করে না, করে যেখানে মিলে না। কমন বা মিলের ভিত্তিতে ঐক্যের চিন্তা ইটসেল্ফ একটা প্র্যাগমাটিক মতাদর্শিক স্বপ্ন। ভাষার মিলের ভিত্তিতে তো ভিন্ন ধর্মের মধ্যেও ঐক্য তৈরি করেছে ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’। কিন্তু তাই বলে কি হিন্দু, বৌদ্ধ এবং মুসলমানের চর্চাকে একই ট্রেডিশন (ডিসকার্সিভ) বলা হবে?

Muhammad Ishrak: এটা বলা হয় নাই যে ঐক্য কখনো হবে। ঐটা মোজাম্মেল স্যার হয়তো ইমপ্লাই করে থাকতে পারেন। আমার পয়েন্ট ঐটা না। আইডেন্টিটি বিনির্মানে আপনার পয়েন্ট ঠিক আছে। কিন্তু ইশা আর জামাতের যে রাজনৈতিক বয়ান তাতে কোনো ভিন্নতা নাই। সবই জামাত থেকে টুকলিফাই করা। অথবা বলা যায় এই ধারার রাজনীতির পন্থাই ঐ একটাই। আইডেন্টিটি স্বতন্ত্র সেইটা ঠিক আছে। চিন্তা, বিশ্বাস, ভ্যালুজ সব এক হওয়া সত্ত্বেও আইডেন্টিটি ভিন্ন এবং ঐক্য একটা ইউটোপিয়া এইটা ঠিক। এইখানে প্রয়োজন হইলে জোর করে আদারাইজেশন করা হবে। কিন্তু আমার কথা ছিল ডিসকার্সিভ ট্রাডিশন সেইম। একই উৎস থেকে একই আইডিওলজি একই ফ্রেমে বর্ণিত হচ্ছে। স্রেফ আইডেন্টিটি আলাদা। ইন ফ্যাক্ট, এই মুফতি এখানে যা বলছে তার সাথে শফিকুল মাসুদের রিসেন্ট বক্তব্যগুলার কোনো পার্থক্যই নাই। এইটাই তাদের কমন ডিসকার্সিভ ট্রাডিশনকে নির্দেশ করে। এট লিস্ট রাজনৈতিক ক্ষেত্রে। আইডেন্টিটি ভিন্ন সেইটা ঠিক আছে।

Abdur Rahman Al Baktashi: স্যার, আপনার কথার সাথে কোনো দ্বিমত হইনি। আমিও শিক্ষক এবং শিক্ষা সম্পর্কে চিন্তার দাবি রাখি।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: মাঝে মাঝে এমন হয়, শিক্ষক যা শিক্ষা দিয়েছেন তিনি নিজেই তা ভংগ করছেন। এ পর্যায়ে শিক্ষকের অনুসরণ করতে গেলে শিক্ষাকে উপেক্ষা করা হয়। অন্যদিকে, শিক্ষার ওপর অটল থাকলে শিক্ষকের বিরোধিতা করতে হয়। দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও আমাদের জীবনে এমন ধরনের নাজুক সময় কখনো কখনো আসে। এমতাবস্থায় যে কোনো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিক্ষার্থী প্রয়োজনে শিক্ষকের বিরোধিতা করেও শিক্ষাকে আপহোল্ড করবে, যদি শিক্ষাটি সত্যিই যথার্থ হয়ে থাকে।

Abdur Rahman Al Baktashi: জ্বি স্যার। আপনার পেইজ বা নামের সাথে আমাকে যিনি পরিচয় করালেন, পরে দেখলাম তিনিই আপনার আত্মিক সমালোচক। কিন্ত আমি আপনার লেখনীতে কমেন্ট বা তার প্রতিউত্তর দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারি না বলে মনে হয়।

আক্কাস আলী: ইসলামপন্থার ভবিষৎ জামায়েত ইসলামী হলে সেটা হবে একটা দুঃখজনক ব্যাপার।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ‘ইসলামপন্থার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যতের চিত্রকল্প জামায়াতে ইসলামী’ হলো একটা অনিবার্য বাস্তবতা। অর্থাৎ যা কিছু হচ্ছে বা হতে পারে, সেটার মধ্যে জামায়াতের অবস্থান এবং কন্ট্রিবিউশন অনস্বীকার্য।

এর মানে এই নয়, যা কিছু হয়েছে, হচ্ছে বা হতে পারে তা সব একাই জামায়াতে ইসলামী করেছে।

মূল লেখার শেষের দিকে এই পয়েন্টে আমি যা লিখেছি তা আবার এখানে উদ্ধৃত করছি, “আপনাদের বাদ দিয়ে জামায়াতের গতি নাই। সেটা বুঝা গেছে। জামায়াতকে বাদ দিয়েও যে আপনাদের গতি নাই, কোনো ভবিষ্যত নাই, সময় এসেছে, সেটা ভালো করে বুঝে নেয়ার।”

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Leave a Reply