কত বছর থেকে ভেবেছি, এরকম একটা লেখা লিখবো, এই শিরোনামে। কিন্তু নিজের ভেতরে এক ধরনের অসহায় অভিমান অনুভব করি, কলম থেমে আসে, স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি যখনই শুনি অসহায় বন মোরগের ‘কান্না’! চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে সতেরশ’ (নোট: তখনকার হিসেবে) একর পাহাড়ি ভূমিতে আজ বিপন্ন পাহাড়ি বন্যপ্রাণী।
সেই ১৯৮৮/৮৯ সালের দিকে একবার কেন্দ্রীয় মসজিদে যাচ্ছিলাম। পথে দেখলাম, আমার সামনে দিয়ে একটা বনমুরগি রাস্তার একপাশ থেকে আরেক পাশে বাচ্চাগুলো নিয়ে পার হয়ে গেল। আমি ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটা বাচ্চা হাতে ধরে আবার রেখে দিয়েছিলাম।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত দুটি ডিপার্টমেন্টের নামের সাথে ‘এনভায়রনমেন্ট’ কথাটা আছে। প্রাণিবিদ্যা বিভাগ তো আছেই। এই ক্যাম্পাসে ওয়াইল্ড লাইফ রিজার্ভেশন এর দিক থেকে যদি বলি ….! থাক না বলাই ভালো। শিক্ষকদের মান মর্যাদার ব্যাপার ….!
সকাল বিকাল বনমোরগের দল পিছনের পাহাড় থেকে, সামনের পাহাড় থেকে, কাছে থেকে, দূরে থেকে, একটানা চিৎকার করে। আজকে এই একটু আগে রেকর্ড করা এই ভিডিও দেখে আপনারা ভাববেন, আমরা কত মহা সুখে আছি। বাসার পাশে গাছে এসে মন মোরগ ডাকে …!
ছাত্র জীবনে আমরা কলা ভবনের পশ্চিম দিকে পাহাড়ি ছড়া ধরে ভেতরের দিকে ঘুরতে যেতাম। তখন দেখতাম, বনমোরগ আর বনমুরগির দল দূরের ঝোপঝাড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। কাছে গেলেই তাদেরকে আর দেখা যেত না। কোথায় যেন তারা লুকিয়ে পড়তো।
এখন আর সেসব নেই। এগুলো সংরক্ষণ করার চিন্তাও কারো মধ্যে নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে বেড়ায় প্রচুর স্ট্রিট ডগ। এদেরকে ছেলেমেয়েরা খাবার দেয়। আহারে, সঙ্গবঞ্চিত ছাত্র-ছাত্রীরা, তোমাদেরকে ছোট বানিয়ে রাখলেও তোমরা তো ফুললি অ্যাডাল্ট। পেরেন্টাল ইন্সটিঙ্ক্টকে চাইলেও তোমরা অস্বীকার করতে পারো না। কুকুর বিড়াল নিয়ে বিশেষ করে ছাত্রীদের বাড়াবাড়ি ….!
কুকুরের দল দলবেঁধে পাহাড়ের ভিতর ঢুকে অবাধে শিকার করে নিরীহ বন্যপ্রাণী। আমাদের বাসার সব খরগোশ মারা গেছে। কিছু রোগে অধিকাংশ কুকুরের পেটে।
এক সময় দক্ষিণ ক্যাম্পাসের ডুপ্লেক্স বাসাগুলোর পিছনে হরিণ দেখা যেত ফ্রিকুয়েন্টলি। আমাদের বর্তমান বাসার পিছনে আমরা একবার দেখেছিলাম। কালেভদ্রে দুই একটা বানরও দেখা গিয়েছিল। রাস্তার কুকুরের সাথে পাল্লা দিয়ে এখন টিকে আছে শুধু বন্য শুকরের পাল।
ইউনুস স্যারের একটা বদনাম করা হয় যে তিনি জোবড়া গ্রামকে উন্নত করতে পারেননি। আল্লাহর ফেরেশতা নেমে আসলেও এদেরকে উন্নত করা যাবে কিনা আমার সন্দেহ। পুরো চট্টগ্রামে এরকম অনুন্নত মন মানসিকতার মানুষ আর আছে কিনা আমার জানা নেই। প্রদীপের নিচে অন্ধকার বলে কথা…!
বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ধ্বংসের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকজন নিয়মিতভাবে বন্যপ্রাণী শিকার করে ক্যাম্পাস সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকা থেকে। খবর পেয়ে একবার আমি জোবড়া থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে একটা হরিণের বাচ্চা কিনে এনেছিলাম। বাচ্চাটা বাঁচেনি। এটি বছর বিশেক আগের কথা।
অনেক বছর আগে কমার্স ফাইনালটির অডিটরিয়ামে একটা ভর্তি পরীক্ষার ডিউটি করছিলাম। পিছনের দিকে একটুখানি ফিশফাস শুনে অডিটরিয়ামের পিছনের দিকে গেলাম। তখন একজন কর্মচারী মহা উৎসাহে নিচু স্বরে বললো, ‘স্যার, দেখেন, দেখেন। ওই যে …’!
মানে, অডিটরিয়ামের পিছনে পাহাড়ের ঢালুতে একটুখানি দূরে একটা হরিণ চরে বেড়াচ্ছে। কর্মচারীটা চট্টগ্রামের ভাষায় আমাকে বললো, ‘স্যার, কমসেকম এত সের হবে।’ তার মানে, একটা পাহাড়ি হরিণ তার কাছে ১৫/২০ কেজি গোস্তের চেয়ে বেশি দামি কিছু নয়!
আফসোস, জীবনটা কাটালাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে! কিন্তু তেমন কিছু করতে পারলাম না। এমনকি এই সময়েও না। হয়তো বাকি জীবনে আর হবে না। নগরায়নের অশ্লীল আগ্রাসনে হারিয়ে যাবে এখনো প্রতি কোনমতে টিকে থাকা প্রতিটি বন্যপ্রাণী। এক সময় থেমে যাবে বনমোরগের ‘কান্না’, এবং আমার এই বুকফাটা কষ্টের রস ফুটো আর্তনাদ কিংবা এই ক্ষুদ্র প্রতিবাদ ….!
আমরা কি পারি না, অন্ততপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকার ভিতরে এই বন্যপ্রাণীগুলোকে বাঁচাতে?
মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য
Mustafiz Nadem: ছাত্র জীবনে শহীদ আব্দুর রব হলের পশ্চিম পাশে ফজরের সময় বন মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙতো। বিশেষ করে যখন ধান কাটার সময় হতো তখন বন মোরগের আনাগোনা বেশি ছিল। রাতে হঠাৎ হঠাৎ হরিণের ডাক শুনতাম। ক্যাম্পাসের ঐ দিকটায় বন মোরগ ও হরিণের বিচরণ খুব বেশি ছিল। বর্তমানে নতুন দুটি হল হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই সেখানকার জীববৈচিত্র্য আর আগের মতো থাকার কথা না।
ভ্যাকেশনে ক্যাম্পাসে যখন শুনশান নীরবতা থাকতো তখন মাঝেমধ্যে বন্য শুকরের পাল এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে চলাচলের দৃশ্য এখনো মনে পড়ে। একবার তো রাতে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলাম। শাহজালাল হলের পেছনের পাহাড় থেকে এক দল শুকর রাস্তা পার হতে গিয়ে আমার বাইকের সামনে পড়ে যায়। গভীর রাতে সেই দৃশ্য ছিল বেশ উপভোগ্য কিন্তু ভীতিকর। আরেকবার এমন পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম আপনার বাসার পাশে।
খুব সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য দেখতাম ক্যাম্পাস থেকে ১/২ কিলোমিটার দক্ষিণে। ঘন জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ে শুকর ও হরিণের বিচরণ ছিল চোখে পড়ার মতো। বেশ কয়েকবার ছড়ার আশেপাশে মেছো বাঘের পায়ের ছাপ দেখেছি। তার মানে ক্যাম্পাসের খুব কাছেই ছোট প্রজাতির বাঘের বসবাস রয়েছে। এইসব স্মৃতি ২০১৩/২০১৪ সালের। গত এক দশকে নিশ্চয় অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
Mohammad Mozammel Hoque: দক্ষিণ ক্যাম্পাসে ব্যাচেলর ডরমেটরি ফ্ল্যাটের পাশে আমি একবার এক বড়সড় মেছো বাঘের মুখোমুখি হয়েছিলাম। রাত তখন ৯টা। প্রায় দুই/তিন মিনিট আমি বাঘের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলাম। এরপর বাঘটা জঙ্গলের ভিতরে চলে গেল। আমি বাসায় চলে আসলাম। তখন আমি তিন নম্বর বিল্ডিং এ থাকি। এইটা ২০-২৫ বছর আগের কথা।
