আমার পাশে বসা মেয়েদের একজন। সনাতনী। অত্যন্ত ভদ্র। মেধাবী। আজ দুপুরে সেমিনার রুমের গ্রুপ ডিসকাসশানের একটা ব্যাপারে সন্ধ্যার পরে ও আমাকে ফোন করল। শুরু করল সালাম দিয়ে। তাকে বললাম, ‘নন-মুসলিম কেউ আমাকে সালাম দিলে আমার কোনো আপত্তি নাই। বিশেষ একটা কারণে আমার জানার আগ্রহ, কেন তুমি আমাকে সালাম দিয়েছো? অন্যকিছু কেন বললে না? তোমরা বড়দেরকে সাধারণত কীভাবে সম্বোধন করো?’

ও বললো, তারা আদাব অথবা নমষ্কার বলে। আমি বললাম, সেটা না বলে তুমি আমাকে সালাম দিলে কেন? এতে সে বললো,সালাম না দিয়ে আদাব বা নমষ্কার বললে টিচারদের মধ্যে তারা ইতস্তত ভাব লক্ষ করে। সে কারণে তারা সালাম দেয়।

আমি আরও নন-মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞাসা করেছি। তারাও আমাকে এ’রকম অভিজ্ঞতার কথাই বলেছে।

এই পর্যায়ে আমি তাকে মাইনরিটি-মেজরিটি পলিটিক্স, কালচারাল কনফ্লিক্ট এবং এথনো-রিলিজিয়াস আইডেন্টিটি মেনটেইন করা নিয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গীর কথা বললাম।

এক পর্যায়ে আমার কাছ হতে জানতে চাইলো, ওয়ালাইকুম মানে কী? কেউ কেউ নাকি সালামের উত্তরে ওয়ালাইকুম বলে। আমি হেসে বললাম, এর মানে হলো ‘তোমার ওপরেও ….’। অর্থাৎ তোমার ওপরেও শান্তি বর্ষিত হোক। এরপরে সে যা জানতে চাইলো সেইটা শুনে আমি তাজ্জব বনে গেলাম।

সে জানতে চাইলো, ‘স্যার, এইটা মনে কী? কোনোমতে সে কথাগুলো ভালভাবে উচ্চারণ করতে পারছিল না। কিছুক্ষণ ধরে ও ওর স্মরণ থেকে যেভাবে ল্যাঙ্গুইজটাকে আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করলো তাতে করে আমি বললাম, এটি কি এমন, ‘ফি না-রি জাহান্নাম খা-লিদিইনা ফিইহ’? সে বললো, হ্যাঁ স্যার। এই কথাটাই। কেউ কেউ নাকি তাকে সালামের উত্তরে এটি বলেছে।

বাধ্য হয়ে তাকে বললাম, এর মানে হলো, নরকের আগুণে চিরস্থায়ী হও।

২.

ইসলাম ধর্মে এমন কোনো ধর্মীয় বিধান নাই যাতে অমুসলিম কারো ব্যাপারে এমন বদদোয়া করতে বলা হয়েছে। বরং বলা হয়েছে, জাহেলদেরকে যখন তোমাদের সাক্ষাৎ ঘটে তখন বলো ‘সালাম’। অর্থাৎ এমনকিছু যাতে অনর্থক ফেৎনা-ফাসাদ তৈরী না হয়।

কোরআনের আয়াত, তোমরা মুশরিকদের দেবদেবীদেরকে গালমন্দ করো না। বলা হয়েছে, তোমরা লোকদেরকে উত্তমভাবে সম্ভাষণ করো। এখানে লোকদেরকে বলতে শুধু মুসলমানদেরকে বুঝানো হয়েছে, এমন তো নয়।

সুন্দর, ভদ্রজনোচিত সম্ভাষণ হলো উত্তম চরিত্রের লক্ষণ। গালিবাজ লোক, অভিশাপকারী ব্যক্তি কখনো ভাল মানুষ হতে পারে না। মুশরিকগণ নরকের আগুণে চিরস্থায়ী হবে, এটি আল্লাহ বলেছেন। তাদেরকে সাবধান করেছেন। ভয় দেখিয়েছেন। তোমাদেরকে বলতে বলেন নাই। don’t play GOD।

৩.

সমকালীন বাংলাদেশে ধর্মবাদী উগ্রবাদিতার খুব প্রসার ঘটেছে। এর অন্যতম কারণ হলো ধর্মনিরপেক্ষতার খোলসে ইসলামবিদ্বেষের প্রসার এবং অমুসলিমদেরকে রাজনৈতিক বিবেচনায় অতিরিক্ত প্রশাসনিক সুবিধা প্রদান।

যুগে যুগে ক্ষমতাসীন দল মাইনরিটি কার্ড খেলতে পছন্দ করে। প্লেয়ার বদলায়। খেলাটা একই।

একইভাবে এক সময়ে বিহারীদেরকে এ’দেশে অতিরিক্ত সুবিধা দেয়া হয়েছিল। যার ফলে তারা এ’দেশে সামাজিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। রাজনৈতিকভাবে বিপন্ন হয়ে পড়ে। একইরকমভাবে অমুসলিরা সমকালীন বাংলাদেশে সামাজিকভাবে কোণঠাসা বা মার্জিনালাইজড হয়ে পড়ছে। অসহিষ্নুতার শিকার হচ্ছে।

একটা অন্যায় আরেকটা অন্যায়ের জন্ম দেয়, কিন্তু বৈধতা দেয় না। কথাটা ভালমত বুঝতে হবে।

এসময়কার বাংলাদেশে সরকারী দল তো রীতিমতো উত্তর কোরিয়ার মতো এক ধরনের রাজনৈতিক বর্ণপ্রথা চালু করেছে। তাদের দলীয় আদর্শের যারা অনুগত নয় তারা অঘোষিতভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। হোক তারা মুসলিম অথবা অমুসলিম। তাদের দলীয় আদর্শকে যারা ধারণ করে না তারা কোনো সেক্টরে প্রথম শ্রেণীর কোনো নাগরিক সুবিধা পাওয়ার যেন হকদার নয়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ননমুসলিমরা দৃশ্যত এ ধরনের একটা পলিটিকাল গেইমের পার্ট হয়ে গেছে। এটি তাদেরকে একটা ডিলেমার মধ্যে ফেলে দিছে।

এখানে আরেকটা কথা না বললেই নয়। তা হলো, দেশে দেশে মাইনরিটি পিপলরা অনেক বেশি হার্ড লেবারার, মোর কমিটেড, কম্পিটেন্ট এবং ফোকাসড হয়ে থাকে। এটা তাদের সারভাইবাল ইস্যু।

৪.

মনে রাখতে হবে, অন্যায়ের মোকাবেলায় যে অন্যায় করে সে প্রথম অন্যায়কারীর তুলনায় নিকৃষ্ট লোক।

তারা কিছু সুযোগ বেশি পাচ্ছে, মানলাম। তাদেরকে এটি কারা দিচ্ছে? কেন দিচ্ছে? কীসের বিনিময়ে?

আপনাদের স্বধর্মের যেসব লোকেরা রাজনৈতিক স্বার্থে সংখ্যালঘুদেরকে নিয়ে খেলছে তাদের কেশাগ্র স্পর্শও তো করতে পারছেন না। অথচ, যার সাথে আপনার কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নাই, তাকে অনায়াসে জাহান্নামী বলে গালি দিচ্ছেন, এটি কেমন কথা? এ ধরনের অসভ্যতা কে শিখাইছে?

আমার কথাগুলো খানিকটা এগ্রেসিভ। যে লেভেলের ইনটলারেন্স এখানে তৈরী হয়েছে, এগ্রেসিভ রেসিস্টেন্স ছাড়া এর গতিরোধ করা অসম্ভব। লক্ষ করেছি, যারা যত বেশি ধার্মিক তারা তত বেশি সফট। এর বিপরীতে ধর্মীয় জ্ঞানে যারা যত বেশি অজ্ঞ, ধর্মচর্চার ব্যাপারে যারা যত বেশি উদাসীন তারা ধর্মীয় ব্যাপারে তত বেশি জজবাধারী উগ্রবাদী হয়ে থাকে।

৫.

বলা হয়, তুমি কোন ধরনের লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করো তার থেকে বুঝা যাবে তুমি কোন ধরনের লোক। আমি বলি, তুমি কোন ধরনের লোকদের মোকাবিলা করো তার থেকে বুঝা যাবে তুমি কোন ধরনের লোক।

অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এমনকি শত্রুকে পরাজিত করা সত্বেও মানুষ তার শত্রুর চরিত্র গ্রহণ করে।

শাহবাগের মোকাবেলা করতে গিয়ে ইসলামপন্থীরা মোটাদাগে শাহবাগী চরিত্র ধারণ করেছে। শাহবাগ-পূর্ববর্তী সময়ে ইসলামপন্থীদের চরিত্র এতটা খারাপ ছিল না। শাহবাগীদের মতো ‘নব্যইসলামী-শাহবাগীরা’ পারে না, এমন কোনা কিছু বোধকরি নাই।

প্রথমে চেয়েছিলাম, এই পোস্টে মেয়াটাকে ট্যাগ করবো। তাকে মেনশন করা থেকে বিরত থাকলাম এই আশংকায়, নিরীহ মেয়েটাকে গালিবাজরা অযথা মন্দ কথা বলতে পারে। তার আইডিতে গিয়ে বা ইনবক্সে ঝামেলা করতে পারে।

কী আর বলবো…! বিধর্মীদেরকে ইন-পারসন গালি দিয়ে, ব্যক্তিগতভাবে জাহান্নামী সম্বোধন করে যারা ইসলাম রক্ষা করতে চায়, হে আল্লাহ, তাদের হাত থেকে তুমি ইসলামকে হেফাজত করো। আ-মী-ন!

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

রোজ পিংক: আমার ৫০+ জীবনে এখন পর্যন্ত কাউকে হিন্দুদের সালাম বা আদাবের জবাবে ফী নারে জাহান্নাম বলতে শুনি নি। যদিও আমাদের হিন্দু প্রতিবেশী, শিক্ষক, সহপাঠী, ব্যবসায়িক লেনদেন, কলিগ ইত্যাদি নিয়ে আমরা চলেছি। আমাদের হিন্দু প্রতিবেশী দূরে বাড়ি করে চলে গিয়েছে, তারপরও দীর্ঘদিন পর পর আসে, বেড়াতে আসে,খোঁজ খবর নেয়। তথাকথিত সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, হিংসা আমরা কখনো দেখিনি।কারো অপছন্দ থাকলেও তা মনে মনে ছিল। কখনো সীমাতিক্রম করে নি। উল্লেখ্য যে আমাদের পরিবার অত্যন্ত প্র্যাকটিসিং মুসলিম পরিবার, কিন্তু আমাদের হিন্দু প্রতিবেশীরা কখনো আমাদের কে নিয়ে বিব্রত বা অস্বস্তি বোধ করে নি। আমাদের পুরো এলাকায়ই এরকম দেখেছি।

কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা কে ঢালাওভাবে নিয়ে মন্তব্য করা, এটা অন্তত আপনার কাছে আশা করি নি। হতে পারে আপনি আপনার সীমিত গন্ডিকে পুরো বাংলাদেশের চিত্র হিসেবে ভেবে নিয়েছেন।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হতে পারে, কিংবা এর উল্টোটাও হতে পারে। apparently either one of us is wrong. সে যাই হোক, আজকে এই লেখাটার ফলোআপ হিসেবে আরেকটা লেখা লিখেছি। কাইন্ডলি পড়বেন।

শাহনাজ ইয়াসমিন উম্মাল: অমুসলিমদের সালাম দিতে হয় এভাবে, আসসালামু আ’লা মানিত্তাবায়া’ল হুদা- অর্থ শান্তি বর্ষিত হোক ঐ ব্যাক্তির উপর যে সৎপথ অনুসরণ করে। মুসলিম হচ্ছে দাঈ জাতি, প্রত্যেক মানুষকে সৎ পথে দাওয়াত দেওয়া তার জন্য ফরজ। যে মুসলমান নিজের জিঘাংসক মনোভাব ব্যক্ত করে সাধারণ অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি, সে অবশ্যই বিপথগামী।

সজিব কবির: বাংলাদেশে এখন ধর্ম নিয়া রাজনীতি চলে। এগুলো করে শাসকগোষ্ঠী ননমুসলিমদের সাথে মুসলিমদের সংঘাত হওয়ার পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ এটি কারো কাম্য নয়। শ্লোগান হওয়া উচিত ছিল ধর্ম যার যার দেশ সবার।

আহমাদুল হাসান সাফয়ান: স্যার আমার অনেক মুসলিম বন্ধু হিন্দু টিচারকে ‘আদাব বা নমস্কার’ বলে। আমাদের গ্রামে একটা প্রাইমারি স্কুলে অনেক হিন্দু শিক্ষক ছিলেন। তাদেরকে সবাই ‘আদাব’ দিত। আমি যে মাদ্রাসাতে থ্রী পর্যন্ত পড়েছি ওখানে সবসময় একজন করে হিন্দু শিক্ষক থাকতেন। উনি ক্লাসে আসলে আমরা ‘আদাব’ দিতাম। অর্থাৎ মোটাদাগে বলতে গেলে আপনি যে ঘটনা বলেছেন উল্টা ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে।

তৌহিদুল হাসান: আসসালামু আলাইকুম — এই বাক্যটির মধ্যে মাত্র তিনটি শব্দ আছে। Peace on you অর্থাৎ তোমার /তোমাদের উপর শান্তি। এই বাক্যটি তো কোনো বিশেষ ধর্মের সংশ্লেষ বহন করে না। এ তো সবচেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ, উদারতাবাদী ও সার্বজনীন একটি সম্ভাষণ! এর উত্তরে অনুরূপ তোমার উপরেও অর্থাৎ Same to you তো বলাই যায়।এখানে মুসলিম -অমুসলিম,কাফির- মু’মিন বিবেচনার বিষয়টি নিতান্তই গৌণ। ইসলামের আহ্বান তো সব মানুষের জন্য —শুধু মু’মিনদের জন্য নয়। কুরআন মানব জাতির সবার জন্য হেদায়েত, বুরহান, বায়্যিনাহ ও ফুরকান—কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য নয়। হ্যাঁ! যিনি ইসলাম গ্রহণ করবেন, তিনি তো অবশ্যই প্রফেট মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায় অতি সুরুচিসম্মত, উদার, মানবিক ও মানবপ্রেমিক হবেন। দল- মত- ধর্ম – বর্ণ- স্থান – কাল -পরিবেশ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এনে সবাইকে নিয়ে চলাই হলো উসওয়াতুন হাসানাহর বৈশিষ্ট্য; কিন্তু,তথাকথিত অনেক ইসলামের ধারক-বাহকের মধ্যেই যা আজ প্রায়শঃই অনুপস্থিত। অভিনন্দন বড়াদা! দারুণ ও অসাধারণ একটি বিষয় উপস্থাপনের জন্য।

নূরে এলাহী শাফাত: ‘শাহবাগের মোকাবেলা করতে গিয়ে ইসলামপন্থীরা* মোটাদাগে শাহবাগী চরিত্র ধারণ করেছে। শাহবাগ-পূর্ববর্তী সময়ে ইসলামপন্থীদের চরিত্র* এতটা খারাপ ছিল না।’ এখানে জেনারালাইজেশন হইছে। আপনি নিজেকে ইসলামপন্থী পরিচয় দেন, অনেকেই দেয়, তাদের কারো কারো সাইকিতে নানা ইডিওলজির লোকেদের মতন প্রান্তিকতা- এক্সট্রিমিটি আছে বটে, কিন্তু সালামের জওয়াবে দোযখে পাঠায় এরকম পাবলিক মেজর না, মাইনর।

তাই পার্টিকুলার বিবেচনাগুলোকে এখতিয়ারে না নিলে ইসলামপন্থী, লিবারালসহ নানা মতবাদীর ভেতরে প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। সেই স্কৌপ ক্রিয়েট না হইলে ভাল।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *