জামায়াতের ভবিষ্যত রাজনীতি কিংবা রাজনীতির ভবিষ্যত

বাংলাদেশে দুইটা রাজনীতি: বাংলাদেশপন্থী রাজনীতি আর ভারতপন্থী রাজনীতি। দ্বিতীয়টার সোল এজেন্ট আওয়ামী লীগ। বামসংগঠনগুলো তাদের সহযোগী। ভারতবিরোধী রাজনীতির সোল এজেন্ট বিএনপি। জামায়াতে ইসলামী তাদের সহযোগী।

জামায়াত যখন বিএনপিকে হটিয়ে আওয়ামী লীগের এক নম্বর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবে, তখন জামায়াতের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম হবে। সেটি হতে পারে আগামী দু’এক টার্ম পরে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আদর্শবাদী দল যখন ক্ষমতাপন্থী দলের সাথে গাঁটছড়া বাঁধে তখন আদর্শবাদী দল তার চরিত্র হারিয়ে ক্ষমতাপন্থী হয়ে ওঠে। এই কারণে আমরা দেখি, বামদের একটা বিরাট অংশ এখন মনেপ্রাণে আওয়ামী লীগ। একইভাবে জামায়াতে ইসলামীর একটা বিরাট অংশ মনেপ্রাণে বিএনপি। আমার ভাষায় তারা যথাক্রমে বামলীগ এবং জাতীয়তাবাদী জামায়াতে ইসলামী।

জামায়াতের এখন উভয় সংকট। সে যদি মধ্যপন্থী অর্থাৎ সেন্টার-রাইট রাজনীতি সিরিয়াসলি করে তাহলে সে রাজনীতিতে অধিকতর সফল হবে। জামায়াতের জন্য এই বেনিফিটের কস্ট হলো সে আদর্শিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আদর্শনির্ভর ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন হিসেবে তার সেই সাংগঠনিক মেজাজকে সে আর ধরে রাখতে পারবে না। 

এক সময়ে রোকন ছাড়া কাউকে নমিনেশন দেয়া হতো না। এখন সেটি নাই। ভবিষ্যতে জামায়াতের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য কর্মীও হতে হবে না। রাজনীতিটা ক্রমান্বয়ে তাদের কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সাংগঠনিক নেতৃত্ব আর সামাজিক-রাজনৈতিক নেতৃত্ব অবধারিতভাবে মুখোমুখি হবে বহু জায়গায় এবং নানা মাত্রায়।

এরচেয়ে ভালো হতো তিউনিশিয়ার আন নাহদা মুভমেন্টের মতো নিজেদেরকে রাজনৈতিক দল হিসেবে ঘোষণা দেয়া। অথবা, ‘কামারুজ্জামান ফর্মূলা’ অনুসারে সহযোগী রাজনৈতিক দলকে মাঠে নামিয়ে নিজেরা অরাজনৈতিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও দাওয়াতী সংগঠন হিসেবে কাজ করা।

কথাগুলো এ’জন্য বলছি, ক্ষমতার রাজনীতি আর আদর্শের রাজনীতি, দুইটা দুই জিনিস। অনেকেই এটি বুঝেন না বা বুঝতে চান না। আদর্শ এবং ক্ষমতা দুইটারই দরকার আছে। যদিও দুইটা একসাথে হয় না। একটা হলে অপরটা অটোমেটিকেলি বাদ যায়। অথবা, দুর্বল হয়ে পড়ে।

জামায়াত কী করবে সেটি তাদের ব্যাপার। আমার ধারনা জামায়াত স্বনামেই ক্ষমতার রাজনীতি করবে। সেটি মন্দ নয়, যদি তারা সঠিক রাজনীতি অর্থাৎ রাজনীতির নিয়ম মেনে রাজনীতিটা করতে পারে। সেক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীকে আমরা খুব মিস করবো।

প্রকৃতি (আসলে, আল্লাহ তায়ালা) শূন্যস্থান পছন্দ করে না। মুসলিম লীগের শূন্যস্থান যেমন করে বিএনপি পূরণ করেছে, তেমন করে ট্রাডিশনাল ইসলামিক মুভমেন্ট হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর শূন্যস্থান তখন অন্য কেউ পূরণ করবে। তাদের জন্যও জমিন অনেক উর্বর।

নিকট ভবিষ্যতে এ’দেশে হাসিনাগিরি আর কেউ করবে না। করার সুযোগ পাবে না। চুরি-চামারি থাকবে। কিন্তু নিকট-অতীতের মতো সাগর-চুরি করার সুযোগ কেউ পাবে না। উপযোগ-প্রাচূর্যময় এই নতুন বাংলাদেশ হবে দ্রুত উন্নয়নশীল একটা দেশ। এই দেশে যারাই যোগ্যতা আর সততা নিয়ে কাজ করবে তারাই পাবে বিরাট সাফল্য। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সদ্য অর্জিত এই দ্বিতীয় স্বাধীনতা প্রত্যেক পক্ষকে দিয়েছে সুবর্ণ সুযোগ। নিজেদেরকে গুছিয়ে নেয়ার। দেশকে নেতৃত্ব দেয়ার। আমি শেষ পর্যন্ত আশাবাদী।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

One Comment

  1. চমৎকার বিশ্লেষণ। অনেক ধন‍্যবাদ। কামারুজ্জামান সাহেবের ফর্মুলাটি জামাত কেন গ্রহণ করেনি তা আমার কাছে বোধগম‍্য নয়।
    জামাত যদি একাত্তর প্রশ্ন মিটিয়ে ফেলতে পারতো তা হলে তরুণ প্রজন্ম জামাতের সাথে স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে যুক্ত হতো। কিন্তু তারা সেটা করেনি বা করতে পারেনি। অথচ সে সুযোগ তাদের কম পক্ষে দু বার এসেছে। জামাতে যদি আলিম সমাজ থেকে সামনের কাতারে নেতৃত্ব আসে তা হলে দেওবন্দ ঘরানার সাথেও জামাত একটা বন্দোবস্তে যেতে পারে। সত‍্যের মাপকাঠি প্রসঙ্গটি তারা গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ‍্যমে সুন্দর ভাবে সমাধান করেছে।

Leave a Reply to Farid A Reza Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *