‘কেবলমাত্র একটা নির্বাচন করার জন্য এ’সরকার আসেনি’, এই যে কথা বলা হচ্ছে, এটি মতলবি কথা। ভবনকেন্দ্রিক প্রাসাদবিপ্লবীদের প্রশ্ন, যে গণঅভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট (?) নিয়ে এ’সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা কি শুধু নির্বাচনের জন্য?
হ্যাঁ, ঠিক তাই। দেশের মানুষকে তাদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেয়ার জন্য।
একটা নির্বাচন হবে। সরকার পরিবর্তন হবে। কিন্তু জুলুমতন্ত্র পরিবর্তন হবে না। অন্যায় দুর্নীতিচর্চা বন্ধ হবে না। এটি আপনারাও চান না। আমার মতো রাজনীতি সচেতন মানুষেরাও চায় না।
তিনমাস আগে বিপ্লবের ট্রেনটা মিস করে এখন যারা বিপ্লবী হয়ে উঠতে চাচ্ছেন আপনাদের সমস্যা হলো, আপনারা যে জনগণের নির্বাচনী ম্যান্ডেটের ওপর পূর্ণ আস্থাশীল নন, এটি ঝেড়েকেশে আপনারা বলতে পারছেন না।
হ্যাঁ, নির্বাচন কথাটা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ।
নির্বাচন হাসিনাও করেছে। সে কাহিনী আমরা জানি। দেশের যে বারোটা হাসিনা বাজিয়ে দিয়ে গেছে, তাতে করে সেক্টরে সেক্টরে সংস্কার ছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা অসম্ভব।
তাই সংস্কার আমরাও চাই। সেটি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে। দেশের জনগণ চায় না, একটা অনির্বাচিত সরকার অনির্দিষ্ট কাল সরকার পরিচালনা করুক, হোক সে সরকার অন্তর্বর্তী, বিপ্লবী বা খেলাফত সরকার। গণতন্ত্র অনেক অনেক ত্রুটিযুক্ত সরকার ব্যবস্থা হলেও, এর তাত্ত্বিক সকল দুর্বলতা সত্বেও তুলনামূলকভাবে অপরাপর যে কোনো পদ্ধতির চেয়ে বিশেষ করে সমকালীন বাংলাদেশের জন্য, এটি অধিকতর উপযোগী এবং কম ক্ষতিকর।
হ্যাঁ/না ভোট দিয়ে তো সংবিধান রচনা হয় না। যদ্দুর বুঝি, সংবিধান লিখন, গ্রহণ, পুণর্লিখন বা পুণর্গ্রহন, যাই বলি না কেন, সে জন্য সংসদ লাগে। সেটি হতে পারে বিশেষ সংবিধান সভা কিংবা সংবিধান করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত একটা সাধারণ সংসদ।
যারা নির্বাচনের কথা শুনলেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠছেন, তারা আসলে কী চান, কতদিনের মধ্যে এবং কীভাবে চান, সেটি জনগণের সামনে স্পষ্ট করে বলতে অসুবিধা কী? একটা রোডম্যাপ দিতে তাদের এত অনীহা কেন? তাদের সংস্কার কাজগুলো যদি জরুরী ও জননন্দিত হয়, তাহলে সময় বাড়াতে কারো আপত্তি থাকবে না।
আমার অনুমান, ‘যাহাই আওয়ামী লীগ, তাহাই বিএনপি’ – এই তত্ত্বে যারা বিশ্বাসী, ‘বিকল্প কী?’ এই তত্ত্ব দিয়ে যারা হাসিনার ঘাড়ে সওয়ার হয়েছিল, হাসিনাকে রাজনৈতিক বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছিল, তাদেরই একাংশ এখন নির্বাচনবিরোধী অবস্থান নিয়েছে।
এটি স্বাভাবিক। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না, তারা কোনো না কোনো কায়দা করে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে চাইবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই।
সেন্টার-রাইট পলিটিক্স যারা করে তারা মনে করছেন, বিএনপি দুর্বল হলে তারা শক্তিশালী হবে, বিএনপি ক্ষমতায় না আসলে তাদের ক্ষমতায় আসা ত্বরান্বিত হবে। এই আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের কারণে তারা বিএনপি এবং ক্ষমতাশীল শক্তি-ক্লাব, উভয়পক্ষের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলছেন। আমার দৃষ্টিতে, তাদের এই আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভুল।
বাংলাদেশে সেন্টার-রাইট পলিটিক্সের ডিফেন্সলাইন হলো বিএনপি। যেমন করে ইসলামপন্থী রাজনীতির ফ্রন্টলাইন হলো জামায়াত। বিএনপি দুর্বল হলে জামায়তসহ ডানপন্থী দলগুলো শক্তিশালী হবে, এমন নয়। বরং বিএনপি দুর্বল হলে ডমিন্যান্ট হবে বামলীগ। বামের ছদ্মাবরণে আওয়ামী লীগ।
গণঅভ্যুত্থানে সর্বসম্মত ঐক্যমত হয়েছিল হাসিনাকে তাড়ানোর বিষয়ে। বাকী সব প্রত্যাশা নিছকই নির্দোষ প্রত্যাশা। কোনো পক্ষের কোনো ধরনের চেতনার বাণী শুনে মানুষ গুলির মুখে দাঁড়ায় নাই। তারা দাঁড়িয়েছিল স্বৈরাচারকে হঠাতে।
সবাই চায়, আমাদের জাতীয় প্রত্যাশাগুলো পূরণ হোক। হোক প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুণর্গঠন। এ’সব কিছু জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে হতে অসুবিধা কী? ‘নির্বাচন এক বছর পরে হবে। এই এক বছর আমরা এই এই জরুরী কাজগুলো রাজনৈতিক ঐক্যমতের ভিত্তিতে এ’ভাবে সম্পন্ন করতে চাই’ – এই কথা বলতে তাদের অসুবিধা কী?
অন্তরালের খেলাটা সম্পর্কে কারো আইডিয়া আছে?

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য
Md Ismail: নির্বাচনই যদি আন্দোনের মূল উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এই আন্দোলনই বৃথা। আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ দেশের সংস্কার। সংস্কারের বিকল্প চিন্তাও ফ্যাসিবাদী চিন্তা।
Mohammad Mozammel Hoque: দেশের সংস্কার কারা করবে? আমিও তো জীবন বাজি রেখে আন্দোলন করেছি। তাহলে আমি কেন দেশের সংস্কার কাজে নেতৃত্ব দিতে পারবো না? নির্বাচন ছাড়া আমি দেশের একজন নাগরিক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক অথবা আপনি মোহাম্মদ ইসমাইল আপনার পক্ষে বা এরকম নেতৃত্ব প্রত্যাশী যে কারো পক্ষে ক্ষমতায় যাওয়া কীভাবে সম্ভব? কী ধরনের সংস্কার দরকার সেটা বোঝার পদ্ধতি কী?
একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য যা যা করা দরকার তা করায় মনোযোগী হওয়া হলো অন্তবর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব। এরপর সংস্কারের এজেন্ডা নিয়ে আসুন সবাই নির্বাচনের ময়দানে।
জনগণ যে ধরনের সংস্কার চাইবে, সে ধরনের সংস্কারের কথা যারা বলবে, যাদেরকে তারা সেটা করার জন্য যোগ্য মনে করবে তাদেরকে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতায় পাঠাবে।
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ সংস্কার করবে। দেশ ও জাতির নেতৃত্ব দিবে। না পারলে জনগণ তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করবে, আগাম নির্বাচনের দাবি পূরণ করতে বাধ্য করবে এবং পরবর্তী নির্বাচনে তাদেরকে উচিত শিক্ষা দিবে।
এই ধরনের একটা ডেমোক্রেটিক সিস্টেমে আসতে কার কী অসুবিধা?
Md Ismail: নির্বাচিত সরকার কয়েকবার এসেছে। জনগণের অধিকারের প্রতি কেউ গুরুত্ব দেয়নি। ব্যক্তি বা দলের চিন্তাই করেছে। এই সরকার সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে যদি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে।
নির্বাচিত সরকার থেকে আশা করার মত কিছু দেখিনা। ক্ষমতায় আসার মতো যাদের দেখছি উনারা অলরেডি বুঝিয়ে দিয়েছেন আশা কতটুকু পূরণ করবেন।
Mohammad Mozammel Hoque: তাহলে আপনি আদৌ নির্বাচন চান না, নাকি নির্বাচনে বিএনপি বা এ ধরনের দল জিতে আসুক, সেটা চান না? উভয় ক্ষেত্রে, শাসন ব্যবস্থার জন্য আপনি আলটিমেটলি কোনো বেটার বিকল্প হাজির করতে পারলেন না। জনগণের পপুলার ভোট ছাড়া কিংবা পপুলার সাপোর্ট ছাড়া আপনি কীভাবে কাউকে ক্ষমতায় রাখবেন? আর, ক্ষমতাসীন কিংবা ক্ষমতায় যেতে চাই এমন কারো যথেষ্ট পপুলার সাপোর্ট আছে, এটা বুঝবেন কীভাবে? নির্বাচন ছাড়া?
Md Ismail: অবশ্যই নির্বাচন চাই, তবে প্রয়োজনীয় সংস্কার আগে। আর সংস্কার যতদ্রুত সম্ভব করতে হবে, এটাও চাই। নির্বাচিত সরকারের হাতে সংস্কারের কাজ দিলে উনাদের প্রয়োজন মত সংস্কার করবে, এটা চাইনা।
Mohammad Mozammel Hoque: নির্বাচিত সরকার যদি ‘প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলোকে’ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বলে বাতিল করে দেয় তখন? এরকম আশঙ্কার কারণে এমনকি হতে পারে, ইলেকশনটাকে ইঞ্জিনিয়ারিং করা হবে, যাতে করে তারা কোনোক্রমে ‘প্রয়োজনের সংস্কারগুলোকে’ বাতিল করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়?
Md Ismail: তারা যদি জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ভাবতো, তাহলে হয়তো দেশের এই পরিস্থিতি হতোনা। কখনো ভাবেনি, এখনো ভাবার সম্ভাবনা দেখিনা।
Mohammad Mozammel Hoque: তাদের বিরুদ্ধে আপনার কিংবা যাদের যত অভিযোগ সেগুলোর বিচার জনগণকে করতে দেন। এবং সেটার একমাত্র উপায় হলো অবাধ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ। আপনারা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক বিচারের ভার এবং শাস্তির দন্ড কাঁধে নিচ্ছেন কেন? কোন অধিকারে? কথাগুলো আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে টার্গেট করে বলছি, এমন নয়। বরং যারা আপনার মত মনমানসিকতা পোষণ করে তাদের জন্য …!
Rokibul Hasan·: জনগণ তো বিএনপিকে আস্থায় নিতে পারছে না। জনগণ মনে করে তারা হবে আ: লীগের পূনর্বাসনের সহযোগী।
Mohammad Mozammel Hoque: সেটা আপনি কিভাবে বুঝতে পারলেন? নির্বাচন ছাড়া জনমত যাচাইয়ের।
Navid Al Mahmud: আপনার লেখার মূল মেসেজ ধরতে পেরেছি। কিন্তু আপনি কি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে খিলাফত (এই মুহূর্তে আমাদের অঞ্চলে সম্ভব না) থেকে নীতিগতভাবে উত্তম মনে করেন?
Mohammad Mozammel Hoque: ‘খেলাফত, না গণতন্ত্র’ এটা একটা ট্রাপ। ফাঁদ। আমি এই ফাঁদে পা দিতে রাজি না। বরং যারা প্রচলিত গণতন্ত্রের পরিবর্তে খেলাফত চাইবেন/চাচ্ছেন, তাদের কাছ থেকে আমি জিজ্ঞাসা করি এবং আপনি চাইলে সময় সুযোগ পেলে আপনার কাছ থেকেও জানতে চাইবো, সেটার বুনিয়াদি রূপরেখা সম্পর্কে।
এই ইস্যুতে আমি প্রস্তাবক হিসেবে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। প্রশ্নকর্তা হিসেবে থাকতে চাই। আমি কেমন রাজনৈতিক ব্যবস্থা চাই, দ্বীন কায়েম বলতে কী বুঝাই, এসব নিয়ে আমার নিজস্ব স্বতন্ত্র আলাপ-আলোচনা আছে। সেগুলো পাবেন ‘সামাজিক আন্দোলন’ নামের ইউটিউব চ্যানেলে।
Md. Ashrafuzzaman Jony: আপনার ইউটিউবে বক্তব্য শুনে যতটুকু আমি বুঝতে পারি আপনি বলতে চাচ্ছেন ইসলামে রাজনীতি একটি ফিকহি বিষয়। খিলাফত একটি গ্লোবাল এবং সার্বিক ব্যবস্থা। সেই হিসেবে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে খিলাফা শাসন না বলে শারিয়াহ শাসন বলা চলে। আর শারিয়াহ এর ইমানের বিষয়গুলো বাদে বাকিগুলো ইজতিহাদি বিষয়। অর্থাৎ নতুন ইজতিহাদি মাসালা প্রয়োজন বর্তমানে খিলাফা এবং শারিয়াহ শাসন কেমন হবে তার জন্য।
সেই ক্ষেত্রে কি এটা বলা যায় যে গনতন্ত্রের বা অন্য কোনো মতবাদের অথবা নতুন কোনো মতবাদ তৈরি করে তা ইসলামের রাজনৈতিক কাঠামোর আলোকে সাজানো সম্ভব? যেটাকে ইজতিহাদি মাসালা বলা চলে। ইজতিহাদের বেলায় মতানৈক্যতারও সুযোগ রয়েছে পরিস্থিতিভেদে।
একটি ভিন্ন প্রশ্ন, আপনি কি কোনো স্কুল অব থট ধারণ করেন? নাকি আপনার নিজস্ব কোনো স্কুল অব থট রয়েছে? যেমন কয়েক বছর আগে ইমাম ফারাহি নামে একটা স্কুল অব থটের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম।
Mohammad Mozammel Hoque: আমি একজন সাধারণ মুসলিম। কোনো ইসলামিক এক্সপার্ট বা স্কলার নই। তাই কোনো বিষয়ে কথা বলার সময় আমি আমার এই সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বলতার বিষয়টাকে স্বীকার করি। তবে, কেউ জিজ্ঞেস করলে কোনো বিষয়ে আমার আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা কী, সেটা আমি অকপটে বলি।
ইসলামে রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে যারা কথা বলতে চান তাদের কথা আমি শুনতে আগ্রহী। আমার নিজেরও কিছু কথা আছে। সেগুলো আমার ইউটিউব চ্যানেলে আছে। তবে যারা যেটা চান এবং যেটার বিরোধিতা করেন, তারা তাদের প্রপোজিশন এবং অপজিশন সম্পর্কে কতটুকু জানেন, সেটা দেখার বিষয়।
এই পোস্ট খেলাফত বনাম গণতন্ত্র বিতর্কের জন্য নয়। আপাতত এতটুকু।
