ইবনে সিনা কাফের। মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক…?

একজন সৌদিপন্থী সালাফী আলেম ইবনে সিনাকে কাফের বলেছেন। এ ব্যাপারে একজন প্রাজ্ঞ শ্রদ্ধেয় আমার কাছে বলেছেন, “ইবনে সিনার দর্শন ও তাকে কাফের বলা নিয়ে বিস্তারিত কোথায় জানা যায়? আপনার এই বিষয়ে অধ্যয়ন আছে কি? আপনার সংগে একদিন এটা নিয়ে ডিটেইলস আলোচনা করার ইচ্ছা।”

উনাকে আমি যা বলেছি তার একটা অংশ হলো, ‘… ইবনে সিনাকে কাফের বলা নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নাই। ফালসাফা তথা ফিলোসফি চর্চাকেই যারা কুফুরী মনে করেন তাদের সাথে আমি কীভাবে এনগেইজ হবো?’

প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়লো, কিছুদিন আগে আমি একটা ভিডিও শেয়ার করেছিলাম: কীভাবে বুঝবো কোন ধর্ম সঠিক?

সেখানে একজন সরলমনা সালাফী মনোভাবাপন্ন পাঠক মন্তব্য করেছেন, “ইসলামে ফালসাফার চর্চা কড়াভাবে নিষিদ্ধ। স্যার যেসব ওয়ার্ড য়ুজ করেন এসব আলোচনায়, তা কুফুরির সামিল। যে কোনো ‘আলিমকে দেখালেই বলবে, ‘সালাফরা এসব আলোচনায় ভয়ংকরভাবে রাগ করতেন।’ স্যার, আপনি স্মার্ট হতে পারেন, বাট আপনি ভুল পথে আছেন।”

প্রসঙ্গক্রমে উক্ত পাঠক এক পর্যায়ে পরোক্ষভাবে আমাকে পরামর্শ দিয়েছেন, ঈমান বাঁচানোর জন্য আমি যেন ফিলোসফি পড়ানোর চাকরি ছেড়ে অন্য কোনো হালাল পেশায় নিয়োজিত হই। উক্ত পাঠকের মতে, “সুদী ব্যাংকে কেউ চাকুরী করলে ঈমানহারা হয় না, যদ্দুর জানি। তবে কবিরা গুনাহ হয়। … যারা ফালসাফা আর কালাম চর্চা নিয়ে ব্যস্ত ছিল তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। ঈমানহারা হয়েছে। … তাই আমার কথা, সুদী ব্যাংকে চাকরি করা আর ফিলোসফির শিক্ষক হওয়া, দু’টা সেম না।”

হ্যাঁ, এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে কথা তো ঠিকই আছে। ফিলোসফি পড়া ও পড়ানো যদি কুফরীর শামিল হয়, তাহলে ইবনে সিনা কাফের হবে না কেন? আমিও বা এই তাকফির থেকে কীভাবে বাঁচবো?

এ ব্যাপারে অতি সংক্ষেপে আমার কথা হলো:

মানুষকে আপন করে নেয়া, লোকদের কাজকর্মকে যথাসম্ভব অনুমোদন দেয়া ও সৃজনশীল ব্যক্তিবর্গকে নিজ পরিচয়গত বলয়ে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষের দলীল ও রেফারেন্সগুলোকে কিছু লোকেরা সহজে খুঁজে পায়। এবং সেগুলোকে ফোকাস করে তারা সিদ্ধান্ত নেয়। এরা প্রোএক্টিভ বা ইতিবাচক মন-মানসিকতার লোক।

এর বিপরীতে, রিএক্টিভ বা নেতিবাচক মন-মানসিকতার লোকেরা স্বভাবতই হয়ে থাকে শুদ্ধতাবাদী। মতাদর্শগত দিক থেকে এরা পিউরিটানিক ও সেক্লুশনিস্ট। তাই সওয়াবের নিয়তে এরা প্রতিনিয়ত বাতিলের অনুসন্ধানে নিয়োজিত থাকে। চান্স পাওয়া মাত্র চোখ বন্ধ করে যাকে তাকে খারিজ করে। টেকসই পদ্ধতিতে বাস্তব সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে নিজেদের কেতাবী জ্ঞানের ভিত্তিতে এরা উদ্যোক্তাদের ভুল ধরা ও মুসলমানদের কাফের সাব্যস্ত করার কাজে দৃশ্যত হয়ে থাকেন বেশি মনোযোগী। উৎসাহী।

সার্বিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আমার মনে হচ্ছে, গোড়ার যে জিনিস, অর্থাৎ মন-মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটিয়ে রেফারেন্সের পাল্টাপাল্টি দিয়ে নেগেটিভিটির এই রোগ সারানো যাবে না। মানুষ যত বেশি জীবনঘনিষ্ট ও বাস্তবনিষ্ঠ হবে, তত বেশি তার মধ্যে প্রোএক্টিভনেস ক্রিয়েট হবে।

বিষয়টা এতটাই অবভিয়াস যে এ নিয়ে এখানে হাদীস-কোরআনের রেফারেন্স টানার আর দরকার মনে করছি না।

‘চিন্তার স্বাধীনতা ও ইসলাম’ শিরোনামে শ’দেড়েক পৃষ্ঠার একটা বই বের করবো, ইনশাআল্লাহ। সেখানকার একটা আর্টিকেল হলো: যুক্তিবুদ্ধির পক্ষে আল্লাহ তায়ালা। ইতোমধ্যে না পড়ে থাকলে পড়ে নিতে পারেন।

আচ্ছা, ইবনে সীনার কাছ হতে আপনি কি আকীদা শিখবেন? তিনি কি আকীদার শায়খ ছিলেন?

ইসলামপন্থীরা প্রায়শই মেন্টর, টিচার ও ইন্সট্রাক্টরের মধ্যকার পার্থক্যকে গুলিয়ে ফেলেন। তাদের সার্বিক অবনতির এটি অন্যতম কারণ। গুরু, শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের পার্থক্য বুঝার জন্য এবং এ বিষয়ে ইসলামপন্থীদের ভুলের জায়গা চিহ্নিত করার জন্য এ সংক্রান্ত এই লেখাটাও পড়তে পারেন: প্রশিক্ষক, শিক্ষক ও গুরুর মধ্যে পার্থক্য করতে না পারার ব্যর্থতা ও এর পরিণতি

ফেসবুক থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Abdus Salam Azadi: ভাইজান, কী আর বলবো?

ইবনে সিনা, ফারাবী, আবু ফারিদ্ব– এরা ইসলামী সভ্যতায় কন্ট্রিবিউটার। কেউ মেডিসিনে, কেউ সংগীতে, কেউ দর্শন শাস্ত্রকে ইসলামীকরণে। তারা কেউ মুহাদ্দিস নন, মুফাসসির নন, ফুক্বাহা নন। তারা মুসলিম ছিলেন, মুসলিম ও ইসলামের উপকার করেছেন।

ব্যক্তি ইবনে সিনা কিভাবে মরেছেন, বা জান্নাতের কোন তলায় আছেন, অথবা জাহান্নামের দরকে আসফালে আছেন কিনা তা নিয়ে কথা বলার অধিকার আমাকে কেউ দেয়নি। তার চিন্তার সাথে মেইনস্ট্রিম ইসলামীচিন্তার যেমন মিল নেই, তার দর্শনচিন্তাও পরবর্তী মুসলিম দার্শনিকগণের হাতে হেনস্তা হয়েছে। সেখানে আমরা তার সফলতা ব্যার্থতা খুঁজি।

এই এখন এসে যিনি নিজেকে মুসলিম দাবি করেছেন, মুসলমানদের জন্য অবদান রেখেছেন, ইসলামী সভ্যতাকে সারা দুনিয়ার মাথায় নিয়ে গেছেন তাকে কাফির বলার মধ্যে কী ফজিলত আছে, আমার জানা নেই।

লেখাটির ফেসবুক লিংক

একটি মন্তব্য লিখুন

প্লিজ, আপনার মন্তব্য লিখুন!
প্লিজ, এখানে আপনার নাম লিখুন

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকhttps://mozammelhq.com
নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলসফি পড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। গ্রামের বাড়ি ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম। থাকি চবি ক্যাম্পাসে। নিশিদিন এক অনাবিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। তাই, স্বপ্নের ফেরি করে বেড়াই।বর্তমানে বেঁচে থাকা এক ভবিষ্যতের নাগরিক।

সম্প্রতি জনপ্রিয়

আরো পড়ুন

সময় এসেছে ধর্মজীবী আলেম সম্প্রদায় থেকে বুদ্ধিজীবী আলেম সমাজকে স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করার

Daily Star পত্রিকায় Cross Talks শিরোনামে প্রতি শুক্রবার একটা sub-editorial লিখতেন শ্রদ্ধেয় বদরুল আহসান। একটা পর্বের শিরোনাম ছিল (formal) “education is certified ignorance”। ফাঁকি দিয়ে...

নারীদের প্রতি ও জামায়াতের প্রতি এত বিদ্বেষ কেন?

https://www.facebook.com/MH.philosophy/videos/3231704773513302/ — নারী ও জামায়াতের ব্যাপারে চরমোনাই পীরের সাম্প্রতিক বক্তব্য।   নারীদের প্রতি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রতি কী পরিমাণ বিদ্বেষ থাকলে মানুষ এমন ধরনের কথাবার্তা বলতে পারে,...

একজন ডাক্তার জাকির নায়েক

তিনি বয়সে আমার মাত্র দশ মাসের বড়। অথচ জগৎবিখ্যাত! আর আমি? আফসোস লাগে! তাঁরা কত কিছু করলেন। আর আমরা? বসে বসে অনুর্বর এক ‘ইসলামী...