পুরান পুকুর পাড়ে

সাল ঊনিশ শ’ ছেষট্টি, আগস্ট আঠারো।
সেই থেকে ছিল এক নির্ভাবনার জীবন।
ছিলাম নিশ্চিন্তে পিতা-মাতার আশ্রয়ে,
জীবনের প্রথম দুই দশক।
অতঃপর, হলাম পিতৃহারা।
শেষ হলো অনাবিল সুখের সেই দিনগুলো।
অথচ, নিরাশ্রয়বোধ করিনি এতটুকু, তখনো‌।
রৌদ্র, বৃষ্টি, ঝড়, সব ঝঞ্চা থেকে বেঁচে ছিলাম
অগ্রজের নির্ভার ছায়াতল, আশ্রয়ে।
সেই প্রবলপুরুষ, পিতৃতুল্য বটবৃক্ষ হয়ে
আগলে রেখেছিলেন আমাকে।
আলম পরিবারের ছোট বড় সবাইকে,
ছত্রিশটি বছর ধরে।

আগস্ট বারো, দু’হাজার পঁচিশের সন্ধ্যা রাতে,
বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত
অকস্মাৎ এক প্রবল ঝড়ে ভুপাতিত হয়েছে
সেই বিশাল অগ্রজ-বটবৃক্ষের।

ছুটে গেলাম ঢাকায়।
দেখলাম, তিনি ঘুমিয়ে আছেন,
বারডেম হাসপাতালের নিচতলায়
হিমঘরের শীতল প্রকোষ্ঠে।
সতেজ আভা তখনো তাঁর মুখজুড়ে।
যেন যুদ্ধজয়ী এক সেনাপতি নিদ্রামগ্ন।
শুভ্র কাফনে মুড়িয়ে কাঁচের কফিনে করে
তাঁকে ফিরিয়ে এনেছি, ঘরে।
তাঁর প্রিয় মসজিদে অন্তিমপ্রার্থনা শেষে
নিজ হাতে তাঁকে শুইয়ে দিয়েছি
বাবার কবরের অদূরে।

বড় ভাই পিতার মত, লোকে বলে।
অথচ, তিনি ছিলেন যেন পিতার চেয়েও বেশিকিছু।
পিতৃশোকে মানুষ পাথর হয়, হতেই পারে।
কিন্তু, ভ্রাতৃশোকে মানুষ
পাথরের চেয়েও বেশি স্তব্ধ হয়, হতে পারে,
সেটি বুঝিনি আগে।
আমার পৃথিবী যেন থেমে গেছে
আগস্ট বারো দু’হাজার চব্বিশে।


কোনো প্রতিদান তিনি চাননি।
কিছু দেইনি তাঁকে কোনোদিন।
হারিয়ে ফেলার পরে এখন মনে হয়,
জীবনের সব অর্জনের বিনিময়ে হলেও
ফিরিয়ে আনি তাঁকে।
অথবা, ফিরে যাই তাঁর কাছে।
ঘুমাই পাশাপাশি শান্তিতে চিরতরে,
পৈত্রিক ঠিকানায়- পুরান পুকুর পাড়ে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *