ভদ্রলোক চাকরী করতেন পাকিস্তান নৌবাহিনীতে। পর পর তিন মেয়ের পরে তার পর পর তিন ছেলে। মেজো ছেলে জন্মের মাস দু’য়েকের ভেতরে মারা যায়। আকীকাতে সেজো ছেলের নাম রাখা হয় বড় ছেলের নামের সাথে মিল রেখে, ‘মোহাম্মদ মুজিবুল হক’। ডাকনাম রাখা হয় তৎকালীন যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতা মার্শাল টিটোর নামে।
১৯৬৬ সালে জন্ম, সে হিসেবে শিশু মোহাম্মদ মুজিবুল হক ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হওয়ার কথা ১৯৭১ সালে। তখনকার সময়ে বাচ্চা পাঁচ বছরে পড়লে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হতো। গ্রামাঞ্চলে নার্সারি কেজি এগুলো ছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে পার্শ্ববর্তী ডা: মাহমুদুল হক প্রাইমারি স্কুলে সে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হয় ১৯৭২ সালে। ইতোমধ্যে ওর বাবা নৌবাহিনী হতে অবসর নিয়ে পতেঙ্গাস্থ স্টীল মিলে কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেছেন।
গ্রামে লেখাপড়ার উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় বাচ্চাদের পড়ালেখার সুবিধার্থে সেই ভদ্রলোক ফটিকছড়ি থেকে হিজরত করেন চট্টগ্রাম শহরের নিকটবর্তী বিসিএসআইআর ল্যাবরেটরি সংলগ্ন (নতুনপাড়া) এলাকায়। সেটি ১৯৭৪ সালের কথা।
আজকের গল্পের সেই ছোট্ট মুজিবও পশ্চিম বাবুনগরে অবস্থিত প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস থ্রি’র বার্ষিক পরীক্ষা শেষে পরিবারের সাথে তখনকার শহরতলী নতুনপাড়া এলাকাতে চলে আসে। ভর্তি হয় ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড স্কুল নামে পরিচিত পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রাম সেনানিবাস উচ্চ বিদ্যালয়ে।
তখন ক্যান্টনমেন্ট এলাকাতে তেমন কড়াকড়ি ছিল না। মাঝে মাঝে এলাকার ছেলেপেলেরা ল্যাবরেটরির ভিতর দিয়ে হেঁটে রেললাইন পার হয়ে সোজা স্কুলে চলে যেত। তৎকালীন ইব্রাহিম কটনমিল সংলগ্ন বালুছড়া, নতুনপাড়া ও আমানবাজার এলাকার ছেলেমেয়েরা সাধারণত ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে পড়তো। আলম সাহেবের ষষ্ঠ সন্তান মোহাম্মদ মুজিবুল হকও একদিন নিজে নিজে গিয়ে ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে ভর্তি হয়ে যায়। ক্নাস ফোরে। ভর্তি হতে তার কোনো টিসি/মার্কশীট লাগেনি।
বহুদিন পরে ঘরের লোকজন জানতে পারে, স্কুলে ভর্তির সময়ে ও নিজেই নিজের নাম পাল্টে দিয়েছে।
জিজ্ঞাসা করার পরে সে ঘরের লোকদেরকে পরবর্তীতে যা বলেছিল তার সারমর্ম হলো, রাস্তাঘাটে লোকজন ছেঁড়া জুতার মালার সাথে কুকুরের গলায় ওর নামের এক জাতীয় নেতার ছবি লটকিয়ে দিচ্ছে। এই নাম বললে তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে লোকজন কথা বলে। সে এই ‘খারাপ’ নামে পরিচিত হতে চায় না। তাই নাম পরিবর্তন করে দিয়েছে।
অবিশ্বাস্য হলেও ঘটনাটি সত্য।
যে নাম সে তাৎক্ষণিকভাবে দিয়েছিল সেই নামটা তার পছন্দ ছিল, ব্যাপারটা এমনও নয়। শিশুটি চেয়েছিল তখনকার পরিবেশে একজন গণধিকৃত ব্যক্তির নামে তার নাম না থাকুক। পরবর্তীতে সে অনেক চেষ্টা করেছে স্কুলের খাতায় নিজে নিজে দেয়া সেই নাম পরিবর্তন করতে। পারেনি।
ফেলে আসা দিনগুলো তথা ইতিহাস সম্পর্কে নির্মোহ অধ্যয়ন ব্যতিরেকে ২০২৪ সাল থেকে এটি বোঝা খুব মুশকিল, কেমন ছিল ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই জাতীয় নেতার ‘ইমেজ ধ্বংসের’ জন্য তখনকার সময়ে যারা ‘ষড়যন্ত্র’ করেছিলেন তাদেরই একজন আজ দেশের এক নম্বর ব্যক্তি। প্রধান উপদেষ্টা। হ্যাঁ, আমি ড. ইউনুস স্যারের কথাই বলছি।
১৯৭৪ সালে কয়েকজন অধ্যাপক তখন বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন, সরকারের উচিত দেশে দুর্ভিক্ষ চলছে এটি অনতিবিলম্বে স্বীকার করে দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া। ইউনুস স্যার ছিলেন সেই বিবৃতির অন্যতম স্বাক্ষরদাতা।
সে যাই হোক, নানা ধরনের ঘাত-প্রতিঘাত উত্থান-পতন-ঋদ্ধ বর্ণাঢ্য-জীবন, আকীকার নাম পরিবর্তন করা সেই শিশুটির। আপনারা অনেকেই তাকে চেনেন। অফকোর্স, তার পরিবর্তিত নামে।
আজ আটান্ন বছর পূর্ণ হলো, সে হিসেবে আজ তার ঊনষাটতম জন্মদিন। এখনো সে ঘোরের মধ্যে থাকে, স্বপ্ন দেখে যেন সে মাস্টার বাড়ির এক মাটির ঘরে ছোট্ট একটা শিশু। মা আছে, বাবা আছে। আছে তার রিকশা-সাইকেলটা। অথচ …!
যে সময় যায় তা ফিরে আসে না আর। এ’জীবন যেন প্রিয়বঞ্চিত এক স্মৃতির কারাগার।

