’৭১-এর পরে জামায়াত কীভাবে ফিরেছে? আওয়ামীলীগ সেভাবেই ফিরবে …
না ফিরবে না। কেন বলছি?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী আর কেউ আছে কিনা জানি না, যে কিনা আমার মতো Stockholm syndrome-এ ভুগছে। ‘দিস ইজ দ্যা এন্ড অব শেখ ডাইন্যাস্টি ইন বাংলাদেশ’ বলার পরে আসলে খারাপই লাগছে। আমরা তো ওদের সাথে এডজাস্ট করে ছিলাম। ভালো ছাত্রদেরকে ছাত্রলীগ সাজিয়ে চাকরী দিতে হতো। কারণ, জবি উপাচার্য মিজানুর রহমান টিভিতে বলেছিলেন, ‘‘ ছাত্রলীগের ছেলেরাই তো চাকরী পাবে’’। শেখ হাসিনা স্লিপ অব টাং হিসেবে ‘মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিরা চাকরী পাবে…’ বলে ফেলেছিল, ব্যাপারটা এমন নয়। হাসিনা থেকে স্কুল কমিটির সহ-সভাপতি প্রত্যেক লীগার লিটর্যালি মনে করতো, দেশটা তাদেরই।
চবি সোহরাওয়ার্দী হলের ডেকচি-পাতিল, শাহজালাল হল হতে জানালার গ্রিল বের করে বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনায় ‘ঝামেলা’ হওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট ছাত্রলীগ নেতা আক্ষেপ করে বলেছিল, ‘‘দলের জন্য এতকিছু করলাম। অথচ একটা ছোট্ট বিষয়ে আমার সমালোচনা করা হচ্ছে’’।
কাহিনীর শেষ নাই। দেশটা উত্তর কোরিয়া হওয়ার আর বাকী ছিল না।
ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতো ওদেরকে টাকা দিয়ে। পার্টির পরিচয়ে আর হচ্ছে না, টাকার বস্তা লাগছে। টাকা দিলে পরে সব হচ্ছে, পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। তারা নিজেরাই তাদের পতনের ষোলকলা পূর্ণ করেছিল। আওয়ামী লীগকে আমরা এত খারাপ মনে করি নাই। তাই আমরা বিশ্বাস করেছিলাম তাদের এই দম্ভোক্তিতে, ‘২০৪১ সাল পর্যন্ত আমরা ক্ষমতায় থাকবো’। মনে করেছিলাম, হাসিনা বেঁচে থাকা অব্দি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানো সূঁচের ভিতর দিয়ে উট পার হওয়ার মতো অসম্ভব ঘটনা।
সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থলিপ্সা ও নৃশংসতা তাদের পতন ঘটিয়েছে। তারা কন্টিনিউ করলে ঘরে ঘরে মুজিবের আবক্ষ মূর্তিস্থাপনকে বাধ্যতামূলক করতো। আওয়ামী লীগ, দল থেকে এক রকমের ধর্মে পর্যবসিত হয়েছিল। সেই ধর্মের নাম বাঙালী ধর্ম। ঘটনাচক্রে ধর্ম-অনুষঙ্গ বাদ দিয়ে একটা সুস্থ মধ্য-বাম রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তারা পেয়েছে। আশা করি তাদের পরবর্তী নেতৃত্ব এই ঐতিহাসিক সুযোগকে কাজে লাগাবে।
তাদের উচিত আগামী নির্বাচনের পর থেকে নতুন নেতৃত্বে নতুনভাবে দল গোছানোর কাজ শুরু করা।
আর হ্যাঁ, নিষিদ্ধ করার পরে সিপিবি ব্যাক করেছে, জামায়াত ব্যাক করেছে। কারণ আদর্শবাদী রাজনীতি করার কারণে সিপিবি এবং জামায়াতের ছিল মজবুত আদর্শগত অবস্থান। ক্যাডারভিত্তিক মজবুত সাংগঠনিক কাঠামো। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সিপিবি’র এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে জামায়াতের ছিল জোরালো সমর্থন। নিষিদ্ধ হওয়ার পরেও হিজবুত তাহরির পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় আছে। কারণ তাদের আছে বৈশ্বিক সংগঠন-কাঠামো ও মজবুত তাত্ত্বিক ভিত্তি।
জয়বাংলার বয়ান আর মুজিববন্দনা ছাড়া ছাত্রলীগের নাই কোনো মতাদর্শগত ভিত্তি। তারা চাঁদাবাজি, মাস্তানি আর বামসংস্কৃতিকে ফেরি করে চলতো। প্রথম দু’টির অভাবে তারা ময়দান হতে হারিয়ে গিয়ে ফেইসবুকে আফসোসলীগ হয়ে টিকে থাকবে। গতকালকে লিখেছি, চাঁদাবাজ-মাস্তানরা ছাড়া যারা কিছুটা আদর্শবাদী ছাত্রলীগ তাদের সেরা এবং একমাত্র গন্তব্য হলো বামদলগুলোর বিচিত্র সব প্লাটফর্ম।
[ডিসক্লেইমার: তাত্ত্বিক হিসেবে আমরা কথা বলি আমাদের এক্সপেরিয়েন্স, ইনফারেন্স আর ফর্মূলার ভিত্তিতে। বাস্তব দুনিয়ায় ঘটনা ঘটে আল্লাহর পরিকল্পনা ও হুকুম অনুসারে।]
তাই দেখা যাক, কী হয়। আল্লাহ ভরসা…!
মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য
Masudul Alam: ইন্ডিয়া তার নিজের স্বার্থে লীগকে টিকিয়ে রাখতে চাইবে। বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ও মিডিয়া ব্যাকআপ, প্রচুর টাকা-পয়সা, বাঙ্গালীর গোল্ডফিশ মেমরি, সর্বোপরি সরকারের যথেষ্ট কঠোর পদক্ষেপ নিতে না পারা এবং ভুল পদক্ষেপ ইত্যাদি কারণে আমার ধারণা লীগ আবার ব্যাক করবে। তবে এখনই হয়তো নয়। কয়েক বছর পরে। অন্যান্য দলগুলোর হঠকারিতা ও ভুল পদক্ষেপও তাদেরকে ফিরতে সহযোগিতা করবে।
২০১৬ সালে তুরস্কে ব্যর্থ ক্যু-এর পর এরদোয়ান কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। প্রায় চার লাখ লোককে গ্রেফতার করেছিলেন। আর্মি অফিসার, আইনজীবী, বিচারক, শিক্ষক, সরকারী কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য- কেউ বাদ যায়নি। এর মধ্যে লাখখানেক লোকের শাস্তি হয়েছে। এরা এখনো জেল খাটছে।
তখন এগুলো আমার কাছে বাড়াবাড়ি মনে হয়েছিলো। এখনো মনে হয়। কিন্তু ক্ষমতা এমন এক জিনিস, আপনাকে টিকে থাকতে হলে এটি করতেই হবে। লীগের ব্যাপারে এ ধরনের শক্ত পদক্ষেপ নেয়ার সময় ইতোমধ্যে অনেকখানি ফুরিয়েছে। তবে এখনো সময় কিছু বাকি আছে। কিন্তু সরকার তা করবে বলে মনে হয় না।
দল হিসেবে লীগকে নিষিদ্ধ না করে গত ১৫ বছরে যারা লীগের নির্বাচনে পার্টিসিপেট করেছে, তাদেরকে আজীবন রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করতে হবে। তারপর দুর্নীতি, গুম, খুন, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাষ্ট্রদ্রোহ কার্যকলাপে এদেরকে বিচার করতে হবে। দ্রুততম সময়ে এটি সম্পন্ন করতে পারলে আমার ধারণা, তারা আর ব্যাক করতে পারবে না।
Mohammad Mozammel Hoque: আমরা যেগুলো বলি সেগুলো হচ্ছে আমাদের ধারণা, অনুমান এবং পূর্বনির্ধারিত সূত্র অনুসারে একটা প্রেডিকশন। বাস্তবে কি করবে তা ভবিষ্যতেই জানা যাবে। আমার অনুমান, সেন্টার-লেফট পলিটিক্স করার জন্য নতুন সেটআপ আসবে, সেটা আওয়ামী লীগের নামে কিংবা অন্য কোনো নামে।
কোনো ফরমেটেই শেখ ডাইনেস্টি বাংলাদেশে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। আওয়ামী লীগ যেমন জামায়াতকে নিয়ে খেলেছে তেমনি করে বিএনপি আওয়ামী লীগকে নিয়ে খেলবে। পার্থক্য হলো জামায়াতের ছিল এবং আছে শক্ত মতাদর্শগত এবং সাংগঠনিক ভিত্তি যেটি আওয়ামী লীগের নাই। পোস্টে এ’সব কথা বলেছি।
ন্যারেটিভ বিল্ডআপের একটা বিরাট ভূমিকা আছে। ২৪ এর আন্দোলন যারা করেছে তারা নতুন ন্যারেটিভটাকে কত শক্তিশালীভাবে গড়ে তুলতে পারে সেটার উপর নির্ভর করবে তাদের এবং তাদের বিরোধীপক্ষের রাজনীতির ভবিষ্যৎ।
ইন্ডিয়া তার মতো করে চেষ্টা করবে। তাদের যারা প্রতিদ্বন্দ্বী, চায়না এবং আমেরিকা, তারাও নিশ্চয়ই তাদের মতো করে কাজ করবে।
Masudul Alam: বিএনপি লীগকে নিয়ে খেলবে বলে মনে হয় না। ওদের সেই ইনটেনশন এবং ক্যাপাসিটির কোনোটাই নাই।
Mohammad Mozammel Hoque: সে ধরনের কোনো সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে সেন্ট্রার-রাইট পলিটিক্সকে রিপ্রেজেন্ট করার জন্য স্ট্রং কোনো বিকল্প শক্তি গড়ে উঠবে। বাংলাদেশের রাজনীতিটাই হচ্ছে আওয়ামী লীগ বনাম এন্টিআওয়ামী লীগ, এই ফরমেটের। যে যত বেশি শক্তভাবে এন্টি-আওয়ামী লীগ এবং এন্টি-ইন্ডিয়ান পজিশন নিতে পারবে, সেন্টার-রাইট পলিটিক্সে সে ততটাই ভালো করতে পারবে। এটা বিএনপি বোধহয় না বুঝার কথা না।
তবে বিএনপির মধ্যে দুইটা ধারা ছিল এবং আছে: বামপন্থী ধারা এবং ডানপন্থী ধারা। একপর্যায়ে এই দুইটা ধারার মধ্যে একটা ফরমাল ডিভিশনও হয়ে যেতে পারে, জিয়া ডাইনেস্টির অনুপস্থিতিতে। আপাতত সেটা হবে বলে মনে হয় না।
