আলেম কারা?

“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্ৰ্য। এতে তো অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য।” – সুরা রূম, আয়াত নং ২২

আলেমদের সম্পর্কে এখানে যা বলা হয়েছে সে মোতাবেক তাদের এক্সপারটাইজ থাকার কথা:

(১) এস্ট্রনমি এবং এস্ট্রফিজিক্সের নানা শাখায়,

(২) আর্থ-সায়েন্সের সব শাখায়, 

(৩) লিংগুইসটিক্স এন্ড লিটরেচার রিলেটেড নানা বিষয়ে এবং

(৪) এথনিক স্টাডিজ সংক্রান্ত বিভিন্ন ফিল্ডে।

কী, ভুল বললাম? আমাদের আলেম তৈরীর প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ’গুলো দেখি না কেন?

আলেম কারা – এই নিয়ে আপনি গুগল করে দেখেন, ব্যক্তিগতভাবে শুনেছেন এ’বিষয়ে যেসব কথাবার্তা তা সব স্মরণ করেন। দেখবেন কোরআনের এই আয়াতটি বা এই ধাঁচের আয়াতগুলো সহজে সামনে আসে না।

এর বিপরীতে খুব ফ্রিকোয়েন্টলি পাবেন, আলেমদের অধিকার আর মর্তবা সংক্রান্ত রেফারেন্সগুলোকে।

আলেম কারা – এ’প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে দয়া করে ব্লেইম গেইম-এর আশ্রয় নিবেন না। ষড়যন্ত্রতত্ত্ব চর্চাকে আমি খুব অপছন্দ করি। কনস্পিরেসি থিওরি হলো অকর্মণ্য আর দুর্বলদের সান্ত্বনা।

দুনিয়া হলো একটা যুদ্ধক্ষেত্র। একটা উন্মুক্ত খেলার মাঠ। কে পক্ষের লোক আর কে বিপক্ষের লোক, তারচেয়ে এখানে কৌশলে এবং সক্ষমতার গুরুত্বই বেশি। নিতান্তই কোয়ালিটি আর ক্যাপাসিটির ভিত্তিতে এখানে নির্ধারিত হয় জয়-পরাজয়।

এ’টাই আল্লাহ তায়ালার সুন্নাহ। অযোগ্যদেরকে তিনি দেন না দুনিয়া পরিচালনার ভার।

কোনো বিষয়ে মাঠে-ময়দানে, প্র্যাকটিক্যালি এবং ফিজিক্যালি জয়ী হওয়ার আগে মন মগজ আর তত্ত্বে সেই বিষয়কে যথাযথ গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করতে হয়। বুঝতে হয় বিষয়টির গুরুত্ব। অভাবটা ফিল করতে হয়।

পরাজিত হলে পরাজয়টা মেনে নিতে হয়। এরপর রিভিউ করতে হয় পুরো পরিস্থিতি। বুঝতে হয়, কেন এমনটি হলো। পর্যালোচনার ভিত্তিতে ঠিক করতে হয় কর্মকৌশল।

এ’সব কিছুর ধারে কাছে না গিয়ে লোকজন যদি প্রডাকশানে প্যাসিভ কিন্তু কনজাম্পশানে একটিভ, এমন নীতিতে চলে, সমাজ ও রাষ্ট্রকে অন্যদের কাছে বর্গা দিয়ে শুধু ধর্মীয় অধিকার নিয়ে তুষ্ট থাকে, তাহলে আর কিছু বলার নাই।

‘জেনারেল লাইনের’ পড়ালেখাও যে কোরআনে বর্ণিত ইলমচর্চার অন্তর্ভূক্ত, তা কি ‘উনারা’ স্বীকার করেন?

যদি করেন, তাহলে সেই সব বিষয়ে উনাদের কারিকুলাম কোথায়?

দ্বীন (তথা ধর্ম) আর দুনিয়ার এহেন ভাগাভাগি শুধুই কি সেকুলাররাই করে? সোনালী যুগের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন ছিল? সোনালী যুগের কারণে উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা ছিল? নাকি, উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার কারণে সোনালী যুগ গড়ে উঠেছিল এবং কন্টিনিউ করেছিল?

শুনতে চাই আপনার মতামত। ফিল ফ্রি, প্লিজ …!

মন্তব্য – প্রতিমন্তব্য

Mohammad Mozammel Hoque: ‘আলেম’ শব্দটার আরবিতে শাব্দিক অর্থ, কোরআনের পরিভাষাগত অর্থ আর আমাদের মানে সমকালীন সেকুলারাইজড সেটআপের প্রেক্ষাপটে এর অর্থ, এইগুলো ভিন্ন ভিন্ন।

এ’নিয়ে লম্বা আলাপ না তুলে খুব সংক্ষেপে বলছি,

একজন ব্যক্তিকে জ্ঞানী হতে হয় তিনটা কাজের মাধ্যমে:

(১) কোনো একটা ফিল্ডে তাকে হতে হয় এক্সপার্ট।

(২) অপরাপর ফিল্ডগুলো সম্পর্কে তার থাকতে হয় সাধারণ ধারণা। এবং

(৩) তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটা হতে হয় ইনক্লুসিভ, ওয়াইড অ্যান্ড একোমোডেইটিভ।

এ’জন্য ড. সলিমুল্লাহ খান স্যার কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় বলতে নারাজ। এ’গুলো আইনগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গণ্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত হয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ধারণা ও মূলনীতি, সে অনুসারে এ’গুলো অপূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আসলে ব্যাপকভাবে আলাপ আলোচনা হওয়া জরুরী।

Kamal Hossain: মর্যাদার রেফারেন্স বেশি বেশি বলার কারণে মর্যাদা-ই পায়। দায়িত্ব পায়না। শুধু কম্প্রোমাইজ আর কম্প্রোমাইজ। এটা করতে করতে দেখি ফান্ডামেন্টাল পজিশন-ই না-ই হয়ে গেছে। ইসলামি শাসনদন্ড আল্লাহ তায়ালা অযোগ্যদের দেননা। বরং অযোগ্যদের দিয়ে উল্টো ডান্ডা মারেন।

Mohammad Mozammel Hoque: নবীজি সেই সব জ্ঞানকে স্যাঙ্কশান করেছেন, যা তিনি ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছেন। যেমন, ভাষা শিক্ষা, কাব্যচর্চা, কৃষিকৌশল, দিকনির্ণয় এক্সপার্টাইজ, যুদ্ধকৌশল ইত্যাদি। যেহেতু উনার অনুমোদন, সম্মতি ও উৎসাহের কারণে উনার অধীনস্ত লোকেরা এগুলো করেছে, সেই অর্থে উনি ঐ সব জ্ঞানের স্টেকহোল্ডার। লাইক সুপারভাইজার।

জ্ঞান একটা কোলাবরেইটিভ এন্টারপ্রাইজ। এটি তখনও সত্য ছিল। এখনও সত্য। এখানে পারষ্পরিক অবদান ও স্বীকৃতি থাকাটা জরুরী। যা বর্তমানে নাই। এক পক্ষ এখন আরেক পক্ষকে খারিজ করে। Whereas, from a holistic point of view, nobody is a soul agent knowledge.

Adnan Ibrahim: ইমাম শাওকানী রহ: এর মতে আলিম হওয়ার জন্য ৫টি শর্ত ১. ব্যক্তি কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞানী হবে ২. যেসকল মাসআলার ওপর উম্মতের ইজমা রয়েছে তা জানা থাকা লাগবে ৩. আরবি ভাষায় জ্ঞানী হতে হবে ৪. তাকে উসূলে ফিকহ সম্পর্কে জ্ঞানী হতে হবে ৫. তাকে নাসিখ (রহিতকারী) ও মানসুখ (রহিত) বিষয়ে জ্ঞানী হতে হবে।

আর আপনি যেই আয়াত দিয়েছেন সেইখানে “জ্ঞানী” শব্দ দিয়ে আল্লাহ আলেমদের কেই বুঝিয়েছেন সেইটা আপনি বলতে পারেন না। কারণ আল্লাহ আরেক জায়গায় বলেছেন “…. বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।……”, (৩৫:২৮) অর্থ্যাৎ রাস্তার ফকিরও যদি। আল্লাহকে ভয় করে তাইলে সেও আল্লাহর কাছে জ্ঞানী হতে পারে যদিও তার এস্ট্রোনোমি, ফিজিক্স নিয়ে জ্ঞান থাকে না।

আল্লাহ আরো বলেন: – সুরা আলে ইমরান ৩:৭

“….. আর যারা জ্ঞানে পরিপক্ক, তারা বলে, আমরা এগুলোর প্রতি ঈমান আনলাম, সবগুলো আমাদের রবের পক্ষ থেকে। আর বিবেক সম্পন্ন লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে।”

আপনি কুরআনে বর্ণিত জ্ঞানী আর আলেমকে একই কাতারে নিয়ে এসেছেন। একজন ডাক্তারও জ্ঞানী, একজন ইঞ্জিনিয়ারও জ্ঞানী আবার একজন আলেমও জ্ঞানী। কিন্তু একজন ডাক্তার এর ফিজিক্স নিয়ে কতটুকু জ্ঞান থাকে? একজন আলেম এরও ঠিক ততটুকুই ফিজিক্সের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন যতটুকু জ্ঞান তাকে ইজতিহাদ করতে সাহায্য করবে।

আপনি যে আলেম এর পয়েন্ট তুলে ধরেছেন সে পয়েন্ট অনুযায়ী একজন সাহাবী বা তাবেয়তাবেয়ীন এর নাম বলেন তো যিনি আলেম ছিলেন?

Mohammad Mozammel Hoque: আমি ডেফিনেশন কোথায় দিলাম? বরং চাইলাম। ডেফিনেশান আপনি দেন। আপনার সেই সংজ্ঞাতে উদ্ধৃত আয়াতটাকেও একোমোডেইট করিয়েন।

আমি তো বলেছি, ‘জেনারেল লাইনের’ পড়ালেখাও যে কোরআনে বর্ণিত ইলমচর্চার অন্তর্ভূক্ত, তা কি ‘উনারা’ স্বীকার করেন?

যদি করেন, তাহলে সেই সব বিষয়ে উনাদের কারিকুলাম কোথায়? “আমি ফিলসফি পড়েছি। এটি ছাড়াও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো অন্তত ৬০টা সাবজেক্ট আছে। আমি ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ফারেগ’, মানে গ্রাজুয়েট। তারমানে এই নয় যে আমি সব সাবজেক্টের এক্সপার্ট। আশা করি, কথাগুলো বুঝবেন।

Shakil Mia: মির্জা গালিবের এক বন্ধু বলেছিলেন, “আমার ছেলেকে কী পড়াবো? তাকে কি মুহাদ্দিস না-কি মুফাসসির বানাবো?” উত্তরে গালিব বলেন, “যে মরে গেছে তাকে পালন করে লাভ নেই বরং যে বেঁচে আছে তাকে কী করে পালন করা যায় তাই ভাবো। তোমার ছেলেকে বিজ্ঞান পড়াও, চিকিৎসা শাস্ত্র পড়াও, তাকে নতুন ভাষা শেখাও।”

কতটুকু যৌক্তিক গালিবের কথাগুলো?

Mohammad Mozammel Hoque: যেখানে একদিকের লোক ন্যূনতম মানে আছে সেখানে অপরদিকের লোক তৈরী হওয়াটা জরুরী। সকল জ্ঞানই ফরজ। হালাল-হারামের মতো ফরজেও আছে তারতম্য।

কে কোন দিকে জ্ঞান অর্জন করবে তা নির্ভর করছে দুইটা জিনিসের ওপর:

(১) সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আগ্রহ ও যোগ্যতা, এবং

(২) সংশ্লিষ্ট জনপদের সামগ্রিক চাহিদা।

ইসলামিক সেন্সে টার্মটা হচ্ছে ‘বিলাদ’। এর মানে হতে পারে সমাজ অথবা রাষ্ট্র। অথবা, সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়ই। সেক্ষেত্রে বিলাদ বলতে খেলাফত তথা টোটাল পলিটি-কে বোঝাবে।

Mohammad Mozammel Hoque: মাস কয়েক আগে হাটহাজারী মাদ্রাসার শীর্ষ আলেম মুফতি কেফায়েত উল্লাহ’র সাথে আমার একটা সাক্ষাৎ হয়েছিল। উনার বয়ানও শুনেছি। উনার সাথে একসাথে নাস্তা করেছি। অনেক কথাও হয়েছে। বয়ানে উনি জেনারেল লাইনের শিক্ষাগুলোকেও ইসলামী শিক্ষার অন্তর্ভূক্ত হিসেবে বলেছেন।

কারো পক্ষে সব জান্তা হওয়া সম্ভব না। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য এটি সমভাবে প্রযোজ্য। তাই, জ্ঞানী হওয়ার মানে কোনো একটা বিষয়ে বিশেষ করে কিছু জানা, সংশ্লিষ্ট অপরাপর বিষয়ে মোটামুটি জানা এবং জানা-অজানা সব প্রয়োজনীয় বিষয়ের জ্ঞানকে জরুরী বলে মনে করা।

আশা করি, এর আলোকে আমার দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারবেন। আমি প্রশ্ন করেছি, আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে জানার জন্য। প্রসঙ্গক্রমে আমার দৃষ্টিভঙ্গীটাও বললাম। অনুরোধ, অশালীন ভাষা প্রয়োগ হতে বিরত থাকবেন। আলাপ আলোচনার সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখা আমাদের কর্তব্য। কথা চলুক।

AbūSamīhah Sirājul-Islām: বাংলাদেশে মাদরাসায় পড়ুয়া নকল করে পাস করা বা ফেল করা সবাই আলিম; শুধূ আলিমই না, তারা সবাই আল্লামা।

Mohammad Mozammel Hoque: কোনো কোনো দিক থেকে চিন্তা করলে মনে হয় আগেকার গুরু-শিষ্য বা পীর-মুরীদি ব্যবস্থা মনে হয় অধিকতর ফলপ্রসূ ছিল। ওস্তাদ কনভিন্স না হলে ছাত্রের পক্ষে ওস্তাদি হাসিল করা তথা পাগড়ি বা খিরকা লাভ করার কোনো সুযোগ ছিল না। এখনকার প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থায় ওস্তাদ বা শিক্ষকগণের নিয়ন্ত্রণ অনেক কম। মেন্টরের পরিবর্তে তারা হয়ে পড়েছেন ইনস্ট্রাকটরে। যার কারণে বদরুল আহসানদের (formal) education is certified ignorance জাতীয় কথাকেই সঠিক বলে মনে হয়।

তাছাড়া, পড়ানোর পদ্ধতির কারণে বিশেষ করে বাংলাদেশের উচ্চাশিক্ষা পরিণত হয়েছে উন্নতমানের প্রাইমারি শিক্ষায়। শিক্ষার্থীরা তথাকথিত জ্ঞানার্জন করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কিছু মুখস্তবিদ্যার মাধ্যমে। They know about any subject without knowing the subject. Suppose, they know about philosophy without knowing the very essence of philosophy. They know about literature without having the flavour of literature.

ইস্যুবেইজড ক্রিটিক্যাল এনালাইসিস তথা থিমেটিক পদ্ধতিকে এখানে অবহেলা করা হয় মারাত্মকভাবে। পড়ানো হয় সাধারণত হিস্ট্রিক্যাল এপ্রোচে। জ্ঞানচর্চার ঐতিহাসিক সিলসিলা জানার পাশাপাশি এনালাইটিক্যাল স্টাডি না হলে একজন শিক্ষার্থী কখনই ক্রিটিক্যালি থিংক করার যোগ্যতা অর্জন করে না।

মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় থিমেটিক স্টাডি নাই বললেই চলে। যদ্দুর আমি দেখেছি। অথচ মাদ্রাসা ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে একটা চমৎকার শিক্ষাব্যবস্থা, যদি সেখানে এই ৩টা ফিয়েচারকে ইনক্লুড করা হয়:

(১) শিক্ষার্থীদের নির্দোষ চিত্তবিনোদন ও খেলাধূলার ব্যবস্থা।

(২) জ্ঞানের সকল শাখার প্রতি ইনক্লুসিভ হওয়া বা পজিটিভ মেন্টালিটি।

(৩) প্যাসিভ লার্নিং সিস্টেম এবং সামেটিভ এসেসমেন্টের পরিবর্তে একটিভ লার্নিং সিস্টেম এবং ফরম্যাটিভ এসেসমেন্ট পদ্ধতি।

দ্বিতীয় পয়েন্টে আমি ইনক্লুসিভনেসের কথা বলেছি, ইকোয়ালিটির কথা বলি নাই। আরোপিত সমতার ধারণা যে কোনো জিনিসকে ভণ্ডুল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কিছু স্পেশালাইজেশান থাকে। কিংবা থাকতে হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে সকল ডিসিপ্লিনকে সমানভাবে গুরুত্ব দেয়া সম্ভব হয় না।

Mohammad Mozammel Hoque: The daily star পত্রিকায় শুক্রবার একটা উপসম্পাদকীয় লিখতেন মরহুম বদরুল আহসান। ওনার একটা সাব-এডিটোরিয়াল নিয়ে আমরা একটা সেমিনার করেছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পুরাতন কলা ভবনের ১০২ নম্বর কক্ষে। এটি প্রায় ৮-১০ বছর আগে। লেখাটার শিরোনাম ছিল, “Education is Certified Ignorance”.

এখানে এডুকেশন বলতে তিনি ফরমাল এডুকেশনকে বুঝিয়েছেন। আমাদের এখানে প্রচলিত লেখাপড়ার এই যে ফাঁকি, এইটা মাদ্রাসা শিক্ষা এবং সাধারণ শিক্ষা, উভয় ধরনের শিক্ষার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য।

অর্থাৎ, আলেম শ্রেণির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে পরে কেউ আলেম হয়ে যায় না। কামেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে বলে সেই ব্যক্তি কামালিয়াত অর্জন করে ফেলেছে, এমনটা বলা যায় না। একইভাবে স্নাতক উত্তীর্ণ হয়েছে বলে কেউ জ্ঞানী হয়ে যায় না। মাস্টার্স পাস করেছে বলে সে মাস্টার অফ নলেজ হয়ে পড়েছে, এমনটা বলা যায় না।

হতেও পারে। নাও হতে পারে। এটি নির্ভর করে প্রধানত ব্যক্তির এবং এরপরে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপরে। ইফতা শ্রেণী থেকে উত্তীর্ণ হওয়া আর মুফতি হওয়া, দুইটা দুই জিনিস। একটা হলো মুফতি উপাধি লাভ করা, আর একটা হলো কোয়ালিটি সম্পন্ন ফতোয়া দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা।

প্রথমটা সিস্টেম থেকে পাওয়া যায়। সিস্টেমের একদিকে প্রবেশ করলে অন্য দিক থেকে একটা সনদ নিয়ে বের হয়ে পড়াটা সহজতর ব্যাপার। জাস্ট আ মেটার অফ টাইম। কিন্তু সত্যিকারভাবে নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে হলে থাকা চাই নিজের প্রচেষ্টা এবং আল্লাহর রহমত।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ যাকে সত্যিকারের কল্যাণ দান করতে চান তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন। মাদ্রাসার ইফতা বিভাগ থেকে পাশ করে মুফতি হিসাবে খেতাব বা সনদ লাভ করা এবং দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জন করা, বাহ্যত সমার্থক মনে হলেও আসলে দুইটা দুই জিনিস। প্রথমটা আনুষ্ঠানিক। দ্বিতীয়টা প্রকৃত।

বিনয়ামীন মুবাশ্বির: সাহাবাদের সিলেবাসে এ বিষয়গুলো ছিল? তাবেয়ীদের সিলেবাসে? তাদের কেউ বুঝি আলেম ছিলেন না?

Mohammad Mozammel Hoque: সাহাবীগণ কেমন ছিলেন তা আমরা তাদের যোগ্য উত্তরসূরিদের দেখে বুঝতে পারি। তাছাড়া তখনকার সময়ে কোনো ধারাতেই প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে এখন আমরা যেটা বুঝাই সেটার প্রচলন ছিল না। বিষয়গুলো সব আলোচনা হতো ইন্টিগ্রেটেড ওয়েতে।

এই ধরনের অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে কারো যখন core of knowledge বলতে যা বোঝায় সেটা থাকে তখন তাকে আমরা জ্ঞানী হিসেবে আইডেন্টিফাই করি। সে হিসেবে সাহাবাগণ ছিলেন নিঃসন্দেহে সত্যিকারের জ্ঞানী ।

বিজ্ঞান ও কলা অনুষদের বিষয়গুলোর দুইটা আসপেক্ট: একটা হল প্র্যাগম্যাটিক, আরেকটা হল কনসেপ্টচুয়াল। এগুলোর প্রাইভেট দিকটা পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে ডিসকভার হয়েছে। কনসেপচুয়াল দিকগুলো তখনকার সময়ে যেই লেভেলে ছিল সাহাবাগণ মোটের উপরে সেই লেভেলে ছিলেন।

উদ্ধৃত কুরআনের আয়াতে যেসব স্টাডির কথা বলা হয়েছে সেগুলোর কনসেপচুয়াল দিক মানুষকে তার অস্তিত্বগত প্রশ্নকে ডিল করার জন্য বলে। সাহাবাগণ সেই প্রশ্নকে ডিল করেছেন এবং সঠিক উত্তর খুঁজে নিয়ে সঠিক পথে অগ্রসর হয়েছেন। তাই আমি মনে করি উনারা সকল অর্থেই সত্যিকারের জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন।

সাহাবীদের সময়ে তো ‘সিলেবাস প্রথা’ ছিল না। ইসলামী এবং সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় বর্তমানে প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা এসেছে অনেক পরে। আপনি সাহাবীদের সিলেবাস কোথায় পেলেন? কষ্ট করে মন্তব্যের ঘরে আমার করা কিছু মন্তব্য পড়ে নেন। আপনার আইডিয়া ক্লিয়ার হবে। অধৈর্য হলে আল্লাহ হাফেজ।

Mufti Numan Ahmad: সাহাবাদের তো এই জ্ঞানসমূহ ছিল না। তাহলে তারাও তো আলিম ছিলেন না।

Mohammad Mozammel Hoque: তৎকালীন সময়ে যে ধরনের জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রচলিত ছিল সাহাবারা সেগুলো কম বেশি জানতেন। সবকিছু জানতেন এমন তো নয়। কারো পক্ষে তো এককভাবে সবকিছু জানা সম্ভব নয়।

জ্ঞানী ব্যক্তিদের জ্ঞানের এরিয়া বা ফিল্ড অফ ইন্টারেস্টের ভিতরে যেসব জিনিস থাকতে পারে কিংবা যে সব জিনিস সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরী, আমার মনে হয় সেই দিকে মহান আল্লাহতালা এই আয়াতে নির্দেশ করেছেন। এগুলো উদাহরণ মাত্র। কোনো এবসলিউট বা কমপ্লিট লিস্ট নয়।

MH Evan: জেনারেল লাইনের ছাত্র হিসেবে যা বুঝি,

১.শাব্দিক অর্থে আলেম (পেশাগত): চাওয়ালা, গো প্রজনন ফার্মের মালিক, কৃষক, গ্রাফিক্স ডিজাইনার, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার ইত্যাদি। যদি এদের ইন্টার্ন বা শিক্ষানবিশ কর্মচারী বা সহকারী থাকে তাহলে এরাই আবার শিক্ষক বা উস্তাদ।

২.ইসলামী আলেম বা স্কলার: যারা কুরআন ও হাদীস এর ভাষাগত, সনদগত/মতনগত জ্ঞান রাখে এবং ঈমাম ও আসলাফদের রেফারেন্স ও রিসার্চ পেপারে অধ্যয়ন করে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায় দ্বীনি সমাধানে সক্ষম তাদেরকে আলেম বলে। এরা পূর্বের দক্ষ আলেমদের থেকে সার্টিফাইড হয়ে থাকেন।

৩.দ্বীনি সমস্যার সমাধানে তথ্যের জন্য আলেমগণ পেশাগত দক্ষ ব্যক্তির মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন এবং দ্বীনি বিষয় ফয়সালার জন্য সবাই আলেমদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন।

Mohammad Mozammel Hoque: দ্বীনের মধ্যে দুনিয়া নাই, পুরো দুনিয়াটা এই যে নাই হয়ে যাওয়া, এটাই মূল সমস্যা। বিষয় বিশেষকে অগ্রাধিকার দেয়ার মধ্যে সমস্যা নাই। সমস্যা হলো এই মনমানসিকতা, দ্বীনি শিক্ষার মধ্যে দুনিয়াবি শিক্ষাকে একত্রিত করা যাবে না।

অথচ, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে বানাইছেন তাঁরই দুনিয়াটাকে তাঁর মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে পরিচালনা করার জন্য। এখানে এখন চলে এসেছে, দ্বীন-দুনিয়ার বাইনারি। দ্বীন অথবা দুনিয়া, এটি একটি ফলস বাইনারি। এটি আরোপিত এবং গৃহীত সুবিধাবাদিতা। শেষ পর্যন্ত এটি একটা সেকুলার সেট-আপ।

সেকুলারিজম ঠিক এ কথাই বলে, তোমরা তোমাদের দ্বীন নিয়ে থাকো। আমাদের দুনিয়া নিয়ে তোমরা মাথা ঘামাইও না। তোমরা তোমাদের দ্বীন নিয়ে থাকো। দুনিয়াটা আমাদের জন্য ছেড়ে দাও।

Belal Meheraj: জেনারেল শিক্ষিত ছাত্র কীভাবে এসব বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করতে পারে? এ বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?

Mohammad Mozammel Hoque: জ্ঞান অর্জন একটা সামগ্রিক ও পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যাপার। সেই সূত্রে প্রত্যেককে কিছু না কিছুতে বিশেষ করে জানতে হবে। কোনো একটা ফিল্ডে এক্সপার্ট হতে হবে। ঐ ফিল্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সম্পর্কে সে জানবে এরচেয়ে কম। এভাবে তার জানার বৃত্ত যত প্রসারিত হবে অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে তার জ্ঞান তত কম হবে।

তবে জ্ঞানের সব শাখা সম্পর্কে তার ন্যূনতম জ্ঞান থাকতে হবে। এবং সব ধরনের ইতিবাচক জ্ঞানচর্চার প্রতি এবং সংশ্লিষ্ট ফিল্ডগুলোতে কাজ করা এক্সপার্টদের প্রতি একজন জ্ঞানী ব্যক্তিকে থাকতে হবে শ্রদ্ধাশীল।

জেনারেল আর অ-জেনারেল, সব ধারা যে কোনো ধরনের জ্ঞানচর্চার জন্য এটি প্রযোজ্য। কারো পক্ষে সর্ববিষয়ে জ্ঞানী হওয়ার চেষ্টা করা, বিশেষ করে জ্ঞানের এই বিশেষীকরণের যুগে, এটি অনুচিত, অশোভন ও অসম্ভব।

So, don’t try to be polymath, rather be a wise person who is minimally expert in one of the beneficial fields of knowledge.

Belal Meheraj: স্পেসিফিক জ্ঞানের কোন কোন শাখা গুলো সম্পর্কে একটা মানুষকে মৌলিক ধারণা রাখতে হবে বলে, আপনি মনে করেন?

Mohammad Mozammel Hoque: মূল কথাটুকু সামগ্রিকভাবে জানতে হবে সব শাখা সম্পর্কেই। তবে, জানা বলতে কে কী বুঝেছেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ লোক মনে করে জানা মানে ইনফরমেশন রিট্রাইভ করতে পারা। না, জানা মানে তথ্য উপস্থাপনের ক্ষমতা নয়।

তথ্য জ্ঞান নয়, যদিও তথ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে আমরা জ্ঞান উৎপন্ন করি।

জ্ঞান হলো আন্ডারস্ট্যান্ডিং। যার কোর অব নলেজ কাজ করে সে সহজেই বুঝে ফেলতে পারে, what is what. হতে পারে তার ভাষাগত নানা সীমাবদ্ধতা আছে।

এর বিপরীতে কেউ তোতাপাখির মতো অনেককিছু সঠিকভাবে বলতে পারে, দেখা যাবে হয়তোবা, সে আসলে কিছুই বোঝেনি। এই ধরনের সাধারণ জ্ঞান আদতে কোনো জ্ঞান নয়।

এখানে জ্ঞান নিয়ে অত বিস্তারিত আলোচনার স্কোপ নাই।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *