ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়

হঠাৎ করে দেখি, এতদিন দেখা উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের সুন্দর মেয়েটা কোনো এক জাদু মন্ত্রের বলে ধবধবে ফর্সা হয়ে পড়েছে। আহত বোধ করি অনেক বেশি। মেয়েরা, মানে অধিকাংশ মেয়ে মনে করে – ত্বক ফর্সা হলেই সে সুন্দরী হবে। অঢেল স্ফীত-বক্ষ হলেই সে সুন্দরী হবে। শরীরের বাঁক মারাত্মক হলেই পরে তাকে দেখতে সুন্দর লাগবে। যথেষ্ট স্বাস্থ্যবতী নারীদেরকেই পুরুষেরা বেশি পছন্দ করে। দীর্ঘাঙ্গী না হলে কোনো নারী পুরুষের দৃষ্টিতে সুন্দরী হয় না।

তাদের এই সব ক’টি ধারণাই ভুল।

নানা ধরনের প্রসাধনী সামগ্রীর প্রতি তারা যেভাবে আকৃষ্ট, দিনরাত শরীরের প্রতিটি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অংশের তারা যেভাবে যত্ন করে, সেন্স অফ ইনসিকিউরিটি তথা অকারণ বিপন্নবোধ ছাড়া আমি এর আর কোনো কারণ খুঁজে পাই না। ক্ষেত্রবিশেষে এ’ধরনের বাড়াবাড়ি তাদের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে চিরতরে নষ্ট করে দেয়।

আলো ঝলমল বিপণী বিতানের সৌন্দর্য কৃত্রিম। এ’ধরনের চোখ ধাঁধানো পরিবেশে মানুষ কিছুক্ষণ থাকে। সাময়িক সময়ের জন্য মোহিত হয়। কিন্তু সেখানে সে বসবাস করে না। এমনকি শহুরে ফ্ল্যাটনিবাসী মানুষও ইট-সিমেন্টের জঙ্গলের ভিতরে একটা গ্রামীণ পরিবেশ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে।

প্রকৃতির সৌন্দর্য মূলত গ্রামীণ সৌন্দর্য।

এর তুলনা চলে স্বল্পসাজ নারীর সাথে। চট করে বোঝা যায় না এমন সাজ আর রূপচর্চা একজন নারীকে যেভাবে সুন্দর করে তোলে, এগ্রেসিভ প্রসাধনী ব্যবহারের মাধ্যমে একজন নারী কখনো ততটুকু সুন্দর হয়ে উঠে না।

মেয়েরা কি আদৌ পুরুষের জন্য সাজে?

বিবর্তনবাদী মনস্তত্ত্বে sexual dimorphism একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেক্সুয়াল ডাইমার্ফিজমের সূত্র অনুসারে মনুষ্যপ্রজাতিতে পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য নারীরাই হচ্ছে সৌন্দর্য এবং আকর্ষণের প্রতীক। এই দৃষ্টিতে, নারীরা আসলে নিজেদের জন্যই নিজেরা সাজে। নারীমাত্রই স্বল্পমাত্রায় বা প্যাসিভ বাইসেক্সচুয়াল। আত্মপ্রেমী।

কেমিক্যাল দিয়ে নিজেকে ফর্সা করে তোলা একটা মেয়ে নিজেই নিজের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে নষ্ট করে। এভাবে সে নিজেকে কসমেটিকসনির্ভর করে তোলে। নারীর স্বাভাবিক সৌন্দর্যপ্রিয় একজন পুরুষ হিসেবে এটি আমার খুব খারাপ লাগে। তাদের জন্য আমার মায়া হয়।

এটাতো গেলো আমাদের দেশের মেয়েদের ব্যাপার।

পাশ্চাত্যের মেয়েরা আছে আরেক ধরনের সংকটে। কেতাবি ভাষায় cognitive dissonance এর চক্করে।

লক্ষ হাজার বছরের মানব ইতিহাস আমাদেরকে বলে, মেয়েরা তাদের সেক্স এপিল বাড়ানোর ব্যাপারে স্বভাবতই খুব সিরিয়াস। সাজগোজের ব্যাপারে তারা শ্রান্তিহীন, অপরিসীম তাদের ধৈর্য। নিজেদেরকে প্রদর্শনের ব্যাপারে তারা স্বীয় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যতটুকু এক্সপোজার অনুমোদনযোগ্য, সেটার সর্বোচ্চ সীমায় থাকতে তারা পছন্দ করে।

কনজারভেটিভ, নন-কনজারভেটিভ নির্বিশেষে সবার মধ্যেই খেয়াল করলে এটি আপনি দেখবেন। এক্সপোজারের কোনো গ্রহণযোগ্য সুযোগ তারা ছাড়তে নারাজ। এর বিপরীতে, doing the actual thing, এই ব্যাপারে তারা ভীষণ রক্ষণশীল। অনেক অনেক বেশি পরিমাণে চূজি। এটি প্রকৃতিসঙ্গত ও স্বাভাবিক।

কোনো কিছু ভালো বা খারাপ হওয়া নির্ভর করে সেটির প্রয়োগক্ষেত্র এবং মাত্রার ওপরে।

মহানবীর যুবতী স্ত্রী কর্তৃক সেনাপতি-স্বামীর সাথে যুদ্ধযাত্রায় ধার করে গলার হার পরে যাওয়ার ঘটনা থেকে শুরু করে উন্নতবিশ্বনিবাসী মেয়েদের ঘরে বাইরে প্রায়নগ্ন থাকা, এই সব কিছুর মধ্যে আপনি এই social approval theory’র পক্ষে এভিডেন্স খুঁজে পাবেন।

নিছক উদাহরণ হিসেবে বলছি- তথাকথিত উন্নতবিশ্বের নারীরা চুল ছাড়া মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুরো শরীর নিয়মিতভাবে শেইভ করে। অথচ, মেয়েদের শরীরে, বিশেষ করে মুখের ত্বক এবং হাতে পায়ে হালকা লোম থাকা, আমার মত অনেক পুরুষের দৃষ্টিতে মেয়েদের অন্যতম আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য!

ধর্মীয় ও সামাজিক বিধি এবং রাষ্ট্রীয় আইন ছাড়া মেয়েদের এই দুর্দমনীয় এক্সপোজার-টেন্ডেন্সিকে থামানোর কোনো উপায় নাই। তাদের নিজেদের কাছেও নেই এর কোনো halt button।

ইঞ্জিনের কাজ হলো সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলতে থাকা। উল্টিয়ে ফেলার চেষ্টা করা। স্টিয়ারিং এর কাজ হলো চাকাকে ঘোরানো। ট্রেক ঠিক রাখা। ব্রেকের কাজ হচ্ছে গতি কমানো কিংবা গাড়িটাকে থামানো। এই তিন ধরনের শক্তির পারফেক্ট সিঙ্ক্রোনাইজেশনের মাধ্যমে একটা গাড়ি চলে।

তেমনি করে আমাদের ভেতরকার ড্রাইভিং ফোর্সগুলো স্বতন্ত্রভাবে কাজ করে। পরস্পর কন্ট্রাডিক্টরি হলেও একটা সার্বিক সমন্বয়ের মাধ্যমে এ’গুলো শেষ পর্যন্ত আমাদের জন্য নেসেসারি কন্ট্রিবিউটর তথা beneficial হয়ে ওঠে।

লেবু বেশি কচলাইলে যেমন তিতা বের হয়, তেমন করে যৌনস্বাধীনতা পাশ্চাত্য দুনিয়ায়, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে, তৈরি করেছে যৌনহতাশা, অতৃপ্তি ও বিতৃষ্ণা। নানা ধরনের যৌনবিকৃতির স্বাভাবিকীকরণ হলো এর অনিবার্য পরিণতি। পশ্চিমা বিশ্বের লোকেরা তাদের হাইয়েস্ট ভ্যালু হিসেবে ইন্ডিভিজুয়ালিজম এবং লিবারালিজমের কথা বলে। অথচ তারা বিশেষ করে তাদের মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি কনফর্মিস্ট।

নিজেকে সদাসর্বদা ‘প্রেজেন্টেবল’ হিসেবে ফিট রাখার জন্য তাদের নারীদের যে ধরনের অকল্পনীয় চেষ্টা, এর তুলনা চলে সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য চীনা দেশের মেয়েদের পা ছোট করে রাখার সাথে। কিংবা আফ্রিকার মেয়েদের গলার মধ্যে রিং পরিয়ে রেখে দীর্ঘ গ্রীবা হওয়ার চেষ্টার মত নির্দয় সামাজিক নিয়মের। তাদের জন্য মায়া হয়। আহা, বেচারীরা …!

দুনিয়াজোড়া নারীদের জন্য এরকম আরো কত কত অদ্ভুত সব social approval requirement আছে তা আমরা জানি। বেচারী নারীরা সবসময়ে সব সমাজে বাধ্য হচ্ছে। তোমরা যারা আমার এই লেখাটা এ পর্যন্ত পড়েছো, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছো, যাকে আমি কাছে দাঁড়িয়ে মৃদু অথচ স্পষ্ট স্বরে বলেছি, ‘be the best of you’? হ্যাঁ, অনেক ইয়াং মেয়েকে আমি এই কথাটা বলেছি।

আমার কন্যারা, কোথায় তোমাদের স্বকীয়তা? এটা বলো না যে ‘সমাজ বলে, তাই বাধ্য হচ্ছি’।

আমি বাজি ধরতে পারি, ‘এই সমাজ ….’ বাক্যাংশের পরবর্তী অংশ ফিলাপ করতে দিলে প্রায় সকল মেয়েরাই যা কিছু লিখবে, তা কোনো না কোনোভাবে নেগেটিভ কিছু হবে। সমাজ আসলেই এত খারাপ কিনা সেই আলোচনা আপাতত স্থগিত রেখে আলোচনার সুবিধার্থে বলতে হয়, সমাজ যদি এত খারাপই হয়, তাহলে সেই সমাজকে তুষ্ট করার জন্য তোমাদের এত দুর্মর প্রতিজ্ঞা কেন? সমাজ অমুক তমুক ইত্যাদি বাদ দিয়ে তুমি কি তোমার হিউম্যান এজেন্সিকে তোমার জীবনের হায়েস্ট ভ্যালু হিসেবে গ্রহণ করতে পারো না? জীবন তো একটাই।

কথায় বলে, ‘ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়’!

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *