পাঠকের প্রশ্ন: কোরআনের কিছু আয়াত দৃশ্যত স্ববিরোধী। যেমন, সূরা নিসা ৭৮ ও ৭৯ নাম্বার আয়াত। এ ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাই।
উত্তর: পবিত্র কোরআন যে অ্যাপ্রোচে মেটাফিজিক্যাল বিষয়সমূহকে ডিল করে তা সমমাত্রিক নয়। বরং বহুমাত্রিক। মাল্টিলেয়ার্ড, অ্যান্ড স্ট্রিক্টলি কনটেক্সটচুয়াল। এ ধরনের বহুমাত্রিক কোনো বিষয়কে একমাত্রিক হিসেবে পাঠ করাটা মস্ত বড় ভুল। প্রেক্ষা-পটনির্ভর কোনো বিষয়কে প্রেক্ষাপট বিবেচনা ছাড়া অন ফেইস ভ্যালু বোঝার চেষ্টা করলে, সেটাকে স্ব-বিরোধী বলে মনে হওয়াটা খুব স্বাভাবিক।
কোরআনে কিছু কথা বলা হয় আল্লাহর দিক থেকে বিষয়টা কেমন সে হিসাবে। কিছু কথা বলা হয় বান্দার দিক থেকে বিষয়টা কেমন সে হিসেবে। অথচ মূল বর্ণনাতে দৃষ্টিকোণের এই পরিবর্তন থাকে উহ্য। এ ধরনের ভিন্ন প্রেক্ষাপটের বর্ণনা থাকে অনেক সময়ে পরপর। ইমিডিয়েটলি আফটার। যার কারণে হয় ভুল বোঝাবুঝি।
বলা হয়, কল্যাণ আসে আল্লাহর দিক থেকে, অকল্যাণ আসে বান্দার দিক থেকে। অথচ চূড়ান্ত কথা হচ্ছে, আল্লাহর হুকুম ছাড়া দুনিয়াতে কোনো কিছুই হয় না। এই দৃষ্টিতে, কল্যাণ ও অকল্যাণ দু’টোই আসে আল্লাহর কাছ থেকে।
যদি তাই হয় তাহলে আমরা পুতুল বৈ কিছু নই। যেমনি নাচাও, তেমনি নাচি…!
হ্যাঁ, আল্লাহর দিক থেকে দেখলে আল্লাহর মহান সত্তা ছাড়া অন্য যে কোনো কিছু নিতান্তই তুচ্ছ, মূল্যহীন এবং প্রকৃত প্রস্তাবে অস্তিত্বহীন।
আমরা মানুষ। আমাদের কাজ হচ্ছে আমাদের অস্তিত্বগত বাস্তবতার দিক থেকে সবকিছুকে বোঝা ও জানার চেষ্টা করা। From world to God, এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে মেটাফিজিক্যাল সব বিষয়কে সেটেল করা।
From God to world, এই দৃষ্টিভঙ্গি হতে, বিশ্ববহির্ভূত কোনো অনির্দিষ্ট ও অজ্ঞাত দৃষ্টিকোণ হতে কোনো কিছুকে জানা ও বুঝার চেষ্টা করা হচ্ছে ক্যাটাগরী মিস্টেক।
আমাদের জ্ঞানের ক্ষমতা, কাঠামো, ভিত্তি, পরিধি ও কর্মপদ্ধতি; এক কথায় আমাদের সবকিছু আমাদেরই মতো। We are delimited by our very entity and existence.
এন্টিটি হিসেবে জগতের সবকিছুর মতো আমরাও পার্টিকুলার। আমাদের জ্ঞানও আমাদের মতো পার্টিকুলার, পার্শিয়াল অ্যান্ড বায়াসড।
আমাদের আওতার বাইরের দিক থেকে অর্থাৎ from nowhere point of view আমাদের সকল জ্ঞান শেষপর্যন্ত অতিনগণ্য, ক্ষুদ্র, খণ্ডিত এবং ইম্পার্ফেক্ট। মানুষ হিসেবে আমাদের এই সীমাবদ্ধতা ও তুচ্ছতা অনস্বীকার্য।
তাই, খোদার দিক থেকে খোদা কেমন, জগত কেমন, জগতের সাথে তাঁর সম্পর্ক কেমন, কেন তিনি কোনো কিছু করেন, কীভাবে তিনি ‘কর্মসম্পাদন’ করেন ইত্যাদি আমাদের জ্ঞানের অগম্য।
আমাদের এই লিমিটেশনকে স্বীকার না করে, আমরা যদি সবকিছুকে সত্যিকার ও সামগ্রিকভাবে জানা সম্ভব বলে মনে করি, তাহলে এই দাবির পূর্বঅনুমান হচ্ছে, জগতের বস্তুনিচয়ের মতো খোদাও ‘একটা কিছু’।
ইসলামের দৃষ্টিতে এটিই হচ্ছে খোদার সত্তার অংশীদারিত্ব দাবি বা শিরক।
তাই, বিয়ন্ড সম্পর্কে আমি agnosticism বা অজ্ঞেয়বাদকে মেনে চলি। খোদাকে যেহেতু আমি অতিব্বর্তী সত্তা বলে মনে করি, সেই হিসেবে খোদার স্বরূপ সম্পর্কে আমি divine agnosticism বা ঐশী অজ্ঞেয়বাদ-এর নীতি অবলম্বন করাকে সঠিক বলে মনে করি।
ডিভাইনিটি বলে কিছু আছে কিনা, থাকলে আমাদের দিক থেকে সেটি কেমন এবং সেই ডিভাইনিটির সাথে আমাদের সম্পর্ক কেমন হতে পারে বা হওয়া উচিত, ডিভাইন অথরিটিকে কীভাবে আমরা ডিল করতে পারি, এগুলো আমাদের জ্ঞানের গম্য। Accessible by our knowledge।
এসব বিষয়কে আমরা জানতে পারি। বরং এসব বিষয় সম্পর্কে জানা আমাদের জন্য জরুরী।
এর বিপরীতে,
ডিভাইনিটির দৃষ্টিতে ডিভাইনিটি কেমন, ডিভাইনিটি বা পরম সত্তা কীভাবে ফাংশন করেন, তাঁর ‘অস্তিত্বের’ অন্টলজি কী, ইত্যাদি আমাদের জন্য not knowable বা অজ্ঞেয়। আমাদের জ্ঞানের অগম্য।
আমাদের সত্তাগত সীমাবদ্ধতা আমাদের এই জ্ঞানগত সীমাবদ্ধতার কারণ। এই সীমাবদ্ধতা, ঐশী সত্তার স্বরূপ সম্পর্কে জানার বিষয়ে আমাদের অক্ষমতা, এগুলো অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত।
অসীম সম্পর্কে সসীমের কৌতুহল থাকতেই পারে। কিন্তু অসীমকে ধারণ করা সসীমের পক্ষে অসম্ভব। অধিবিদ্যাগত এবং জ্ঞানগত, উভয় দিক থেকে এটি অসম্ভব।
কথা পরিষ্কার।
যা অজ্ঞেয় তা আছে কিনা সেটা নিয়ে আমরা কনসার্নড হতে পারি, যেমন করে নিজেদের সসীম হওয়ার কারণে আমরা অসীমের অস্তিত্বকে অনুমান করি। অসীমের সাথে সসীমের সম্পর্ক কী হবে, তা নিয়েও ভাবিত হই।
বাস্তবতা হলো, অসীম-সসীমের সম্পর্কটাই এমন, জানা-অজানার যে গ্যাপ, অসীম-সসীম সম্পর্কের যে বিরোধভাব, সেটা শেষ পর্যন্ত অবিকল থেকে যায়। The gap remains ever constant. Because, it is a categorical gap.
অজ্ঞেয় কোনো সত্তা হতে পারে কোনো ডিভাইন এনটিটি, যেমন খোদা; কিংবা কোনো পারসনিফায়েড এনটিটি, যেমন ‘প্রকৃতি’। হোক খোদা কিংবা প্রকৃতি, কোনো অজ্ঞেয় সত্তার স্বরূপকে জানা এবং বোঝার চেষ্টা করা আমাদের জন্য সমীচীন নয়। কেননা এটি অসম্ভব।
এ’ধরনের বৃথাচেষ্টা না করাই ভালো। যদি কেউ করে, প্রতি পদে সে গোলমাল পাকাবে, গ্রস মিসটেইক করবে, এটাই স্বাভাবিক।
কোরআনের আয়াতগুলো সাজানোর সময়ে সেগুলোকে বিষয়ভিত্তিক বিন্যস্ত করা হয়নি। কেন হয়নি সেই প্রশ্ন অবান্তর। বরং, মানি বা না মানি, এই গ্রন্থটিকে পাঠ করার সময়ে এর বিশেষ সংকলন রীতিকে অনুসরণ করে একে পাঠ করা উচিত।
Hermeneutics বা ব্যাখ্যা তত্ত্ব অনুসারে যে কোনো গ্রন্থপাঠের এটি মূলনীতি।
