আলোচ্য বিষয়কে আমি আটটি সেকশনে ভাগ করেছি।
- আদর্শ, নীতিবোধ ও রাজনীতি
- রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ধরন ও পদ্ধতি
- আদর্শের রাজনীতি বনাম ক্ষমতার রাজনীতি: কৌশলগত সম্পর্ক
- আদর্শবাদী রাজনীতির বৈশিষ্ট্য, সুবিধা ও কৌশল
- ক্ষমতার রাজনীতির বৈশিষ্ট্য, সুবিধা ও কৌশল
- গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আদর্শবাদী রাজনীতি ও ক্ষমতার রাজনীতির মিথস্ক্রিয়া
- আদর্শবাদী দলের ক্ষমতার রাজনীতি করার সুবিধা ও অসুবিধা
- উত্তরণের উপায়

আদর্শ, নীতিবোধ ও রাজনীতি
একটা দর্শনের ওপর ভিত্তি করে একটা সমাজ গড়ে ওঠে। সমাজের একটা উপরিকাঠামো বা সুপারস্ট্রাকচার থাকে, যেটাকে আমরা রাষ্ট্র বলি। রাষ্ট্র না থাকলেও সমাজ থাকবে। আমরা যে রাজনীতির কথা বলি, এর পিছনে কিন্তু আদর্শ আছে, নীতি আছে। কোনো রাজনীতি হয় না যেটার পিছনে কোনো আদর্শ বা নীতি সক্রিয় নাই।

রাষ্ট্র বা সমাজ—যাই বলি না কেন, এর প্রধান দুটি উপাদান হলো নৈতিকতা ও আইন। আইন ও নৈতিকতার মধ্যে সম্পর্কটা হচ্ছে বিপরীত অনুপাত। দুটো কিন্তু একই মাত্রার জিনিস। যেখানে নৈতিকতা সর্বোচ্চ, সেখানে আইন দুর্বল অথবা আইন থাকবেই না। অপরদিকে নৈতিকতা যেখানে খুব দুর্বল, আইন সেখানে খুব শক্তিশালী হবে। সুতরাং যারা নৈতিকতা অনুসারে চলে, তাদের জন্য আইনের প্রয়োজন নাই। আইন প্রয়োজন হচ্ছে সেই লোকদের জন্য যাদের নীতি-নৈতিকতা দুর্বল।

এরপর প্রশ্ন আসে, আমরা কীভাবে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তুলব? কীভাবে একটি সুন্দর রাষ্ট্র নির্মাণ করা সম্ভব? এর প্রয়োজনীয়তা তো অনস্বীকার্য। আমরা যদি ভালো পরিবেশে বসবাস করি, তবে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারব; পক্ষান্তরে খারাপ পরিবেশ আমাদের অসুস্থ করে তুলবে। সুতরাং রাষ্ট্র পরিচালনা বা শাসনব্যবস্থা মূলত আমাদের নিজেদের স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্র যেহেতু সমাজেরই উপরিকাঠামো, তাই আমরা যদি একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে না পারি, তবে কখনোই একটি ন্যায় রাষ্ট্র গঠন করতে পারব না।
আমরা যখন রাজনীতির কথা বলি, তখন আমরা একটা জাম্প করি। রাজনীতি হলো মূলত একটি ‘টপ-ডাউন অ্যাপ্রোচ’ বা ওপর থেকে নিচের দিকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া—যেখানে আমরা ধরে নিই যে কেবল আইন দিয়েই সবকিছু ঠিক করে ফেলা সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আপনার নৈতিকতা কোথায়? আপনার সমাজ কোথায়? যে সমাজ সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকে ধারণ করতে সক্ষম নয়, সেই সমাজে কি তা কোনোদিন টেকসই হতে পারে? মূলত সমাজ ও রাজনীতি একে অপরকে পরিপূরক হিসেবে সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখে।

রাজনীতি মূলত ক্ষমতার ব্যাপার—যেখানে তিনটি বিষয় মুখ্য: ক্ষমতা অর্জন, ক্ষমতার চর্চা এবং এর হস্তান্তর বা ট্রানজিশন। প্রশ্ন হলো, এই ক্ষমতা কীভাবে অর্জিত হবে? ক্ষমতা যদি বংশপরম্পরায় হস্তান্তরিত হয়, তবে তা রাজতন্ত্র। যদি ক্ষমতার উৎস জনগণ হয়, তবে তা গণতন্ত্র। আর যদি তা বিশেষ এলিটশ্রেণির হাতে ন্যস্ত থাকে, তবে তা ব্যুরোক্রেসি বা মেরিটোক্রেসির রূপ নেয়।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ধরন ও পদ্ধতি
তাহলে আপনি যদি রাজনীতিতে যুক্ত না থাকেন, তবে মূলত নৈতিকতা বা এথিক্সেও আপনার কোনো অবস্থান থাকে না। অনেকেই বলে থাকেন, ‘আমি তো রাজনীতি করি না, রাজনীতির আবার কী দরকার?’ অথচ যিনি রাজনীতি করেন না, তিনিই সবচেয়ে বেশি সুবিধাবাদী। কারণ, আপনি নিজের জন্য যা করছেন তা আপনার একান্ত ব্যক্তিগত পছন্দ বা পার্সোনাল প্রেফারেন্স; কিন্তু যখন আপনি সমাজের জন্য কিছু চাইবেন, তখন তা হয়ে উঠবে সামাজিক নৈতিকতা বা সোশ্যাল মোরালিটি। আর এই সামাজিক নৈতিকতারই একটি অনিবার্য পরিণতি হলো রাজনীতি। তাই রাজনীতি করা একটি অপরিহার্য বিষয়—সবাই কোনো না কোনোভাবে রাজনীতি করে। এমনকি যিনি বলেন ‘আমি রাজনীতি করি না’, সেটিও তাঁর এক ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান বা রাজনীতি।
আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন, সবচেয়ে দক্ষ মিস্ত্রিও যদি ‘ওলম’ মেপে দেয়াল তৈরি না করেন, তবে সেই দেয়ালও একসময় বাঁকা হয়ে যাবে—আমি নিজে প্র্যাকটিক্যালি দেখেছি। ওলম বা সঠিক মাপ ছাড়া আপনি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত হয়ত ইট গাঁথতে পারবেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সমান বা সোজা হবে না। ঠিক একইভাবে, আমাদের রাষ্ট্রের যে মূল ফাউন্ডেশন বা সংবিধান এবং যে মৌলিক কাঠামোগুলো রয়েছে, সেগুলোর দিকে আমাদের গভীরভাবে নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনগুলো এখন অনেক বেশি পলিটিক্যাল। ফলে এটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখা প্রয়োজন যে মানুষ মূলত কেন রাজনীতি করে এবং রাজনীতির মূল তাৎপর্য আসলে কী?
আমার এই আলোচনার মধ্যে কোনো রেফারেন্স নেই। কারণ, আপনি শত রেফারেন্স দিয়ে যা প্রমাণ করবেন, ঠিক তার বিপরীতে অন্য কেউ আরও দশটি রেফারেন্স হাজির করতে পারবে। অর্থাৎ একাডেমিয়াতে রেফারেন্সের কোনো অভাব নেই; মূল অভাবটা হলো সঠিক বোঝাপড়া বা আন্ডারস্ট্যান্ডিং এবং কমনসেন্সের।

মানুষ কেন রাজনীতি করে? সোজা কথায় এর পেছনে দুটি মৌলিক কারণ রয়েছে: একটি হলো বস্তুগত প্রয়োজন (ফিজিক্যাল নিডস) এবং অন্যটি আদর্শগত প্রয়োজন (আইডিওলজিক্যাল নিডস)। এই দুটি জিনিসের জন্যই মূলত মানুষ রাজনীতি করে। আপনি দেশকে যতই উন্নত করুন না কেন, জনগণের সামগ্রিক মূলবোধ বা ভ্যালুর বিপরীতে গিয়ে যদি কোনো পদক্ষেপ নেন, তবে আপনার পতন অনিবার্য। যেমন—প্রফেসর ইউনূস ব্যক্তিগতভাবে হয়ত এলজিবিটিকিউ অধিকারের পক্ষে, কিন্তু ক্ষমতায় থাকার সময়ে তিনি এ নিয়ে টু শব্দটি করেননি। কারণ তিনি জানেন যে এটি আমাদের সামাজিক নৈতিকতা বা পাবলিক মোরালিটির সাথে সাংঘর্ষিক। যদি তিনি এর বাইরে কিছু করতে যেতেন, তবে তাঁর সমস্ত কীর্তি ও ক্রেডেনশিয়াল থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সম্ভবত ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করা হতো।
সুতরাং মানুষের আদর্শগত বা আইডিওলজিক্যাল প্রয়োজন সবসময়ই থাকবে। কিন্তু শুধু আদর্শের বুলি দিয়ে তো আর রাষ্ট্র বা সমাজ চলে না। কেউ যদি এসে বলেন, ‘আমি খুব ভালো কথা বলি, আমাকে ভোট দিন, আমি একজন ভালো মানুষ’—এতে তো সমস্যার সমাধান হবে না। ধরুন, আপনার গাড়িটি আপনি কাকে চালাতে দেবেন? অবশ্যই তাকেই দেবেন যার গাড়ি চালানোর ভালো দক্ষতা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের (র.) একটি ঐতিহাসিক আলোচনার কথা স্মরণ করা যায়। তাঁকে একসময় জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘আমাদের সামনে দুইজন মানুষ আছেন—যাদের একজন অত্যন্ত তাকওয়াসম্পন্ন বা আল্লাহভীরু কিন্তু দুর্বল, আর অন্যজন ফুজুর বা পাপী প্রকৃতির হলেও শক্তিশালী ও দক্ষ প্রশাসক। এমতাবস্থায় আমরা কাকে নেতা বানাব?’ এর জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা ওই ফুজুর বা শক্তিমান ব্যক্তিকে নেতা হিসেবে বেছে নাও। কারণ তার পাপ বা ফুজুর সীমিত থাকবে তার নিজের গণ্ডির মধ্যে, আর তার তাকওয়ার সুফলও তিনি একাকী পাবেন; কিন্তু শক্তিমান ও যোগ্য নেতার মাধ্যমে পুরো সমাজ উপকৃত হবে এবং তোমরা তার কর্মদক্ষতার সুফল ভোগ করবে।’

নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সততা এবং যোগ্যতার মধ্যে ভারসাম্য বা ব্যালেন্স খোঁজার সুযোগ নেই। নেতৃত্বের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো যোগ্যতা। প্রথম শর্তে যদি আপনি ব্যর্থ হন, তবে দ্বিতীয় শর্ত (সততা) দিয়ে কোনো লাভ হবে না। জনগণ সবার আগে ফিজিক্যাল নিডসগুলো চায়। ধরুন, এখানে এসি চলছে—কারেন্ট চলে গেলে জেনারেটর দরকার, জেনারেটর বন্ধ হলে আবার বিদ্যুতের ব্যবস্থা চাই। এই যে ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই ইত্যাদি—এসব মৌলিক জিনিস যদি আপনি সরবরাহ করতে না পারেন, তবে অন্য কোনো বড় আলোচনা বা তত্ত্ব এখানে ধোপে টিকবে না। জনগণ মূলত এই পার্থিব সুযোগ-সুবিধাই চায়। আপনাকে তা দিতেই হবে।
আমরা প্রায়ই বলি যে জনগণ খারাপ, জনগণ কথা মানে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জনগণ আপনাকে কেন মানবে? তাদের আপনি কী দিচ্ছেন? জনগণকে মূলত তিনটি জিনিস দিতে হবে:

এক. তাদের ফিজিক্যাল নিডস বা বস্তুগত প্রয়োজনগুলো পূরণ করতে হবে।
দুই. তাদের চিত্তবিনোদনের বা এন্টারটেইনমেন্টের সুযোগ দিতে হবে। যা আমাদের প্রচলিত ইসলামি সিস্টেমে নেই বললেই চলে। আমি জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর মাদ্রাসায় গিয়েছি, হাটহাজারী মাদ্রাসায় গিয়েছি; উনাদের সাথে আমার কথা হয়েছে। আমি উনাদের বলেছি, শিক্ষার সাথে চিত্তবিনোদনের যে ওতপ্রোত সম্পর্ক, তা উনারা অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন। যার ফলে এক ধরনের ‘জম্বি’ তৈরি হচ্ছে এবং তারা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় প্রোডাক্টিভ হতে পারছেন না। তাই বিনোদনের সুযোগ দিতেই হবে।
তিন. ‘এথিক্স প্লে’ করতে দিতে হবে। অর্থাৎ নৈতিকতার একটা বাতাবরণ বজায় রাখতে হবে। নৈতিকতা থেকে জনগণকে পুরোপুরি বের করেও দেওয়া যাবে না, আবার জোর করে একদম চাপিয়েও দেওয়া যাবে না; বরং একটা ভারসাম্যপূর্ণ মাঝামাঝি জায়গায় তাদের ছেড়ে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, আপনি নিজের ব্যক্তিগত জীবনের জন্য হয়ত ‘আজিমত’ (সংযম ও কঠোরতা) পছন্দ করেন, কিন্তু সাধারণ জনগণের জন্য আপনাকে অবশ্যই ‘রুখসত’ বা সহজ ও বাস্তবসম্মত পথ ধরে এগোতে হবে।
আপনি রাজনীতি করবেন, কিন্তু আপনার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ধরণ কী হবে? সাধারণ একজন মানুষ যখন ভোট দেয়, সেটাও এক ধরনের রাজনীতি; আবার যারা সরাসরি রাজনীতি করেন, তাদেরকে নানাভাবে সাহায্য করাও রাজনীতির অংশ।
‘আমরা রাজনীতি চাই না, রাজনীতি চাই না’—ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ঠেকানোর জন্য সে সময় এই স্লোগানটি তোলা হয়েছিল, যা জুলাই বিপ্লবের পরেও নানাভাবে চালু রাখা হয়েছে। তখন আমি ‘রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা একজন মুসলমান হিসেবে আপনার জন্য কেন অপরিহার্য’—এই শিরোনামে একটি সেমিনার করেছিলাম। সেখানে পরিষ্কার বলেছিলাম, আপনি যদি বলেন যে আপনি রাজনীতি করেন না, তবে আপনি পরিপূর্ণ মুসলমান থাকতে পারবেন না।
আমি যে প্রতিষ্ঠানটি চালাই—‘সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড কালচারাল স্টাডিজ’ (সিএসসিএস)—তা মূলত নন-পলিটিক্যাল। আমরা একটি ইন্টেলেকচুয়াল ফোরাম হিসেবে কাজ করি। কিন্তু রাজনীতি নিয়ে আমাদের অনেক প্রকাশনা রয়েছে। কারণ আমরা মনে করি, পলিটিক্স ইজ অ্যা মাস্ট। রাজনীতি আপনি কেন করবেন? মূলত আপনার সুরক্ষার জন্য। আপনার বস্তুগত প্রয়োজন এবং আদর্শিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যই রাজনীতি প্রয়োজন।
আদর্শের রাজনীতি বনাম ক্ষমতার রাজনীতি: কৌশলগত সম্পর্ক
রাজনীতি আসলে কী বা কয় ধরনের? রাজনীতি মূলত দুই ধরনের: একটি হলো ক্ষমতার রাজনীতি, অন্যটি হলো আদর্শের রাজনীতি। একটি হলো ক্ষমতা পরিচালনার বা ধরে রাখার জন্য রাজনীতি করা, অন্যটি হলো নিজের আদর্শকে মানুষের মাঝে প্রচার ও প্রতিষ্ঠিত করার রাজনীতি—যাতে ক্ষমতার রাজনীতি সবসময় একটি নিয়মের মধ্যে বা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই দুই ধারার মধ্যে আপনি যদি কেবল ক্ষমতার রাজনীতি করেন, তবে তার সূত্র এটি। এর মধ্যে আপনি অমুক দল, তমুক দল বা যেকোনো রাজনৈতিক দলকে মেপে দেখতে পারেন; কারণ এগুলো হলো ইউনিভার্সাল ট্রুথ।
আপনি যদি ক্ষমতার রাজনীতি করতে চান, তবে আপনার মধ্যে সততা থাকতে হবে। ম্যাকিয়াভেলি বলেছেন, ‘ভার্চু’ অ্যান্ড ‘ফরচুন’ দুটোই লাগবে। যেমন—আমরা জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে দেখি যে ফরচুন তাঁকে ফেভার করেছিল, আর ভার্চু দিয়ে তিনি সেটা লুফে নিয়েছিলেন। দুনিয়াতে অনেকেই বড় বড় সুযোগ পেলেও তা কাজে লাগাতে পারেনি। অনেকের হয়ত ফরচুন ছিল কিন্তু ভার্চু ছিল না, আবার অনেকের ভার্চু থাকলেও ফরচুন আসেনি। যারা সফল হন, তারা এই দুটোর সঠিক মেলবন্ধন ঘটাতে পারেন। পক্ষান্তরে, আপনি যদি আদর্শের রাজনীতি করেন, তবে আদর্শের ওপর আপনাকে দৃঢ় থাকতে হবে। কারণ ক্ষমতার রাজনীতি এবং আদর্শের রাজনীতি—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা পথ।

এবার আসা যাক আদর্শের রাজনীতি বনাম ক্ষমতার রাজনীতি প্রসঙ্গে। রাজনৈতিক স্পেকট্রামটি ঠিক যেন আমরা জ্যামিতি বাক্সে যে চাঁদা ব্যবহার করি, তার মতোই—রেডিক্যাল রাইট, রেডিক্যাল লেফট, সেন্টার রাইট এবং সেন্টার লেফট। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগকে আমরা সেন্টার লেফট এবং বিএনপিকে সেন্টার রাইট দল হিসেবে ধরতে পারি। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি হলো মূলত আদর্শের রাজনীতি, কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিও আদর্শের রাজনীতি; পক্ষান্তরে বিএনপি বা আওয়ামী লীগের রাজনীতি মূলত ক্ষমতার রাজনীতি। তাদের মূল লক্ষ্য যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় যাওয়া। এই দুটির পথ ও উদ্দেশ্য আলাদা।
তাহলে এখন রাজনীতির মূল কৌশলটা কী হবে? কাদেরই বা প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হবে? আদর্শের রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রধান শত্রু হবে আদর্শগত বিরোধীরাই। যেহেতু এই ধারার দলগুলো সরাসরি ক্ষমতায় যাওয়ার চেয়ে নিজস্ব আদর্শ প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দেয়। ইসলামপন্থীদের জন্য প্রধান আদর্শগত শত্রু কারা? যারা ইসলামের সম্পূর্ণ বিরোধী, সেই নাস্তিক ও কমিউনিস্টরাই হলো তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ। তাদের কৌশল হবে—সেন্টার রাইট ধারার শক্তিকে নিজেদের মিত্র হিসেবে কাছে রাখা, সেন্টার লেফট ধারার শক্তিকে নিউট্রালাইজ করে রাখা এবং মূল আদর্শগত বিরোধীদের যথাযথভাবে মোকাবেলা করা। এটিই হলো প্রকৃত রাজনৈতিক কৌশল।
রেডিক্যাল লেফটদের দিক থেকে অপজিশনকে (রেডিক্যাল রাইট) মোকাবেলার জন্য পলিসি কী হওয়া উচিত? সেন্টার রাইট বিএনপিকে (সরাসরি) মোকাবেলা না করে সেন্টার লেফট আওয়ামী লীগকে হাতে নিয়েছে। আওয়ামী লীগকে দিয়ে বিএনপিকে নিউট্রালাইজ করে পুরো শক্তি দিয়ে জামায়াতসহ পুরো রেডিক্যাল রাইটকে মোকাবেলা করছে। যার কারণে দেখা যাচ্ছে, সেন্টার লেফট আওয়ামী লীগের সাথে রেডিক্যাল রাইট জামায়াতের বিরোধ লেগে আছে।
আওয়ামী লীগ কিন্তু জামায়াতের আদর্শিক বিরোধী না। জামায়াতের যতটা আদর্শিক বিরোধী কমিউনিস্ট পার্টি, ততটা আদর্শিক বিরোধী কিন্তু আওয়ামী লীগ না। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টি কী করছে? অনেকটা পরজীবীর মতো, যারা অন্য কোনো গাছের ওপর ভর করে বেঁচে থাকে এবং তাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে—ঠিক সেভাবেই তারা আওয়ামী লীগের ঘাড়ে সওয়ার হয়েছে। আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করে তারা যেমন বিএনপিকে নিউট্রালাইজ করেছে, ঠিক একইভাবে তারা জামায়াতের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে। যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল শাহবাগ আন্দোলনের সময়।
রাজনীতির এই কৌশল যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তাহলে বুঝতে পারবো যে অতীতে আমাদের (ইসলামপন্থীদের) অনেকগুলো ভুল হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সেটা হতে পারে।
আদর্শবাদী রাজনীতির বৈশিষ্ট্য, সুবিধা ও কৌশল
আদর্শবাদী দলগুলোও নির্বাচনে অংশ নেয় এবং ভোট চায়, তবে তাদের মূল শক্তি হলো তাদের আদর্শ। যেমন—থাইল্যান্ডের জাতীয় আয়ের একটা বড় অংশ বিভিন্ন ফর্মের পতিতাবৃত্তি থেকে আসে। কিন্তু এদেশে আদর্শবাদীরা (ইসলামপন্থীরা) কখনো জনসমক্ষে মদ বা অনৈতিকতা বৈধ করতে দেবে না, কারণ তাদের আদর্শ তা অনুমোদন করে না। এই আদর্শিক অবস্থান তাদের জন্য রাজনীতিতে একটা সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করে। তারা আদর্শিক পজিশন দিয়ে ক্ষমতাপন্থী দলগুলোর উপর চাপ প্রয়োগ করবে। কারণ ক্ষমতাসীনরা নানান ধরনের এথিক্স প্লে করে। সে জুমার নামাজে যায়, নির্বাচন এলে টুপি পরে। তারা লেজিটিমেসি (সমাজে বিধ্যমান নৈতিক বৈধতা) হারাতে চায় না। লেজিটিমেসি হারালে আর ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।
ইরানে যেমনটা আমরা দেখেছি, রেজা শাহ পাহলভীর লেজিটিমেসি পুরোপুরি খতম করে দিয়েছিলেন ইমাম খোমেনি। ‘বেলায়েতে ফকীহ’ এবং ‘ইমাম গায়েব’-এর বিশ্বাস অনুযায়ী—ইমাম যখন আসবেন, তখন তিনিই প্রকৃত ক্ষমতা গ্রহণ করবেন। কিন্তু ইমাম গায়েব অবস্থায় ইমামের পক্ষ থেকে যারা বেলায়েতপ্রাপ্ত ফকীহ, তারাই মূলত ক্ষমতার অধিকারী এবং শাসক বা প্রেসিডেন্ট হচ্ছে তাঁদেরই প্রতিনিধি। মধ্যযুগে চার্চের পক্ষ থেকে রাজাকে বরখাস্ত করার ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে এর মিল পাওয়া যায়। এ কারণেই তারা একটা মেলবন্ধন বজায় রেখে চলে। আর এটিই হলো আদর্শবাদী রাজনীতি যারা করে, তাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা।

একটি মৌলিক ধারণা হলো বটম-আপ অ্যাপ্রোচ এবং টপ-ডাউন অ্যাপ্রোচ। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাপ্রোচ সবসময়ই একটি টপ-ডাউন অ্যাপ্রোচ; যেখানে একটি কঠোর হায়ারার্কি থাকে এবং তা আবশ্যিকভাবে মেনে চলা হয়। পক্ষান্তরে, গণতন্ত্র হলো একটি বটম-আপ অ্যাপ্রোচ। গণতন্ত্রকে যদি আমরা নিছক শাসনব্যবস্থা না ভেবে একটি মূল্যবোধ হিসেবে ধরি, তবে এটি মূলত একটি বটম-আপ অ্যাপ্রোচ।
কোনো ইসলামী রাজনীতিই মূলত গণতান্ত্রিক নয়। সত্যিকার অর্থে যদি গণতান্ত্রিক রাজনীতিই হয়, তাহলে বলুন তো—(দলের অভ্যন্তরীণ) নির্বাচনে আপনার প্রকৃত ভোটার কতজন? আর ক্যান্ডিডেটই বা কয়জন? নির্বাচনের এই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আজ পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি এবং ভবিষ্যতেও সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।
আসলে এই পুরো বিষয়টি আমার দৃষ্টিতে এক ধরনের (কৃত্রিম) গণতন্ত্র। যেহেতু বিশ্বজুড়ে এখন ‘গণতন্ত্র’ কথাটির একটা প্রচলন আছে, তাই চীন থেকে শুরু করে সবাই নিজেদের গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে, আমরাও দাবি করি। কেন যে সবকিছুতে গণতন্ত্র বলতেই হবে, তা আমার বোধগম্য নয়। অবশ্য ক্ষমতায় যাওয়ার কৌশল হিসেবে কেউ এটা ব্যবহার করলে সেটা ভিন্ন ব্যাপার। কিন্তু সার্বিকভাবে এটি একটি ভজঘট পরিস্থিতি।
ক্ষমতার রাজনীতির বৈশিষ্ট্য, সুবিধা ও কৌশল
এবার ক্ষমতার রাজনীতির সুবিধাগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক। ক্ষমতার রাজনীতি যে করে তার কথা হচ্ছে—‘আমি আমার দেশের উন্নয়ন চাই’। সুতরাং, চীন উইঘুর মুসলিমদের জেলখানায় আটকে রাখলেও জাতীয় স্বার্থে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এমন বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিয়েছেন। আইডিওলজির ব্যাগেজ যদি আপনার মাথার ওপর না থাকে, তবে আপনি অনেক বেশি স্বাধীনভাবে চলতে পারবেন। ঠিক যেমন—গাড়ি চালানো বা সাঁতার কাটার সময় আপনার শরীরের কিছু অংশ যদি বাঁধা থাকে, তবে আপনি কখনোই সাবলীলভাবে সামনে এগোতে পারবেন না।
পাওয়ার পলিটিক্স যে করে সে কিন্তু আইডিওলজি নিয়ে আসে না, আইডিওলজির একটা ফ্লেভার নিয়ে আসে। কিন্তু আদর্শবাদীরা আইডিওলজির ফুল একটা ব্যাগেজ নিয়ে আসে। আপনি (আদর্শবাদী রাজনীতিবিদ) যখন একটা স্ট্র্যাটেজিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, আপনার সিনসিয়ার জনশক্তি তখন বলছে, “এটা কীভাবে করলো? মারদিয়া মমতাজ এই কথা কীভাবে বললো?” তাদের বক্তব্য অনেকটা এমন—‘চরমোনাইর পীর সাহেব যেটা করে থাকেন, মহিলা হলে স্টেইজ থেকে ওঠে চলে যান। মারদিয়া মমতাজও বলতে পারতেন, বেপর্দা মহিলাকে আমি পুরস্কার দেবো না, তাদের সাথে আমি স্টেইজ শেয়ার করবো না।’ এটা হলো আদর্শের দাবি। মুশকিল হচ্ছে, দুইটা দাবি কিন্তু একসাথে পূরণযোগ্য না। আপনি যদি ক্ষমতার রাজনীতি করেন তাহলে আপনার এক ধরনের সুবিধা, আদর্শের রাজনীতি করলে আরেক ধরনের সুবিধা।
গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আদর্শবাদী রাজনীতি ও ক্ষমতার রাজনীতির মিথস্ক্রিয়া
বর্তমানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আদর্শবাদী ও ক্ষমতার রাজনীতির যে মিথস্ক্রিয়া আমরা দেখতে পাচ্ছি, এর ফলাফল কী? জামায়াতে ইসলামী এখন ক্ষমতার রাজনীতির চর্চা শুরু করায় দেশের রাজনীতিতে এক ধরনের উপকারই হয়েছে। এতদিন মানুষ সেন্টার-রাইট শক্তি বলতে কেবল বিএনপিকেই পেয়েছিল। এখন সেখানে বিকল্প হিসেবে একটা ‘ভালো বিএনপি’ যুক্ত হয়েছে। দেশের সার্বিক রাজনীতির জন্য এটি একটি লাভ বটে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্সের প্রয়াত প্রফেসর হাসান মোহাম্মদ স্যার একবার প্রফেসর গোলাম আজম সাহেবকে বলেছিলেন, “স্যার, এমন একটা রাজনৈতিক দল করেন যেখানে রফিকুল্লাহ চৌধুরী, আমি হাসান মোহাম্মদ এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মতো লোকেরা যুক্ত হতে পারি।”
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এখন সেটা করছে। এতে লাভ হচ্ছে। কিন্তু এর একটা খেসারতও (cost) আমরা দেখতে পাচ্ছি। সেসব নিয়ে আমি বিশেষ বলব না। আপনারা জানেন যে ক্ষমতার রাজনীতির যত ধরনের উপ-দলীয় কোন্দল আছে, এসব ক্ষমতার রাজনীতির সু-স্বাস্থ্যেরই লক্ষণ। এক্ষেত্রে সারভাইভাল অফ দ্যা ফিটেস্টই হচ্ছে শেষ কথা। আপনি যদি লোক যোগাড় করতে না পারেন, আপনার পক্ষে যদি লোক না থাকে, আপনি শেষ হয়ে যাবেন। বিচারটা হবে দুর্বলের বিপক্ষে এবং সবলের পক্ষে। যার কারণে সবসময় সবলই জিতে যায়।
বিষয়টি আমরা একটি বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে খুব সহজেই চিত্রায়ন করতে পারি। মনে করুন, একটি হরিণকে তাড়া করেছে একদল ওয়াইল্ড ডগ। জীবন বাঁচাতে হরিণটি তখন দৌড়ে তার পুরো পালের মাঝে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং বুনো কুকুরগুলোকে নিজের পুরো পালের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এদিকে বুনো কুকুরগুলোর দলের আজকের খাবারের জন্য একটি শিকার লাগবেই। এই অবস্থায় তারা হরিণের পুরো পালকেই তাড়া করা শুরু করে। এখন প্রশ্ন হলো—এদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কে ধরা পড়বে? স্বাভাবিকভাবেই পালের মধ্যে যে হরিণটি সবচেয়ে দুর্বল, সেই শিকার হবে।
আমরা যখন হালদা নদীতে ঘুরতে গিয়েছি, তখন একজন গবেষক আমাদের একটি চমৎকার তথ্য জানিয়েছেন। তিনি নিজে আমাকে বলেছেন—‘হালদা নদীতে ডলফিন আছে বলেই মূলত মা মাছগুলো এখানে এসে নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারে; কারণ দুর্বল মাছগুলোকে ডলফিনগুলো খেয়ে ফেলে।’
আদর্শবাদী দলের ক্ষমতার রাজনীতি করার সুবিধা ও অসুবিধা
ক্ষমতার রাজনীতির ক্ষেত্রেও ঠিক একই নিয়ম প্রযোজ্য। আপনি যখন ক্ষমতার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবেন, তখন আদর্শের অনেক বিষয় চাইলেও আর আগের মতো কঠোরভাবে ধরে রাখতে পারবেন না।

আপনি যদি সত্যিকার অর্থে হেলদি পলিটিক্স করতে চান, তবে তার জন্য একটি ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার এনভারনমেন্ট এবং কার্যকর মাল্টিপার্টি সিস্টেম থাকা আবশ্যক। অথচ বাস্তব চিত্র হলো—আপনার দল থেকে দু’জন মানুষ সামান্য মতপার্থক্যের কারণে আলাদা হয়ে নতুন আরেকটি দল গঠন করলেই আপনি সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, ‘ওরা তো আলাদ্দুল খিসাম (সাংঘাতিক ঝগড়াটে)। এদের জন্য হেদায়েতের দোয়া করা ছাড়া আমরা আর কীইবা করতে পারি?’
এর অর্থ দাঁড়ায়, আপনি মনে করছেন, ‘সে দ্বালালান বাঈদা (চরম পথভ্রষ্ট) হয়ে গেছে। তার জন্য আপনি কী করবেন?’ কিন্তু যখনই আপনি গণতান্ত্রিক রাজনীতির কথা বলবেন, তখন আপনাকে অবশ্যই সুস্থ রাজনীতির পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার এনভায়রনমেন্ট’, যেখানে কাজের স্বচ্ছতা থাকবে এবং সত্যিকার অর্থে মাল্টিপার্টি সিস্টেমে বিশ্বাস রাখতে হবে। অর্থাৎ, রাজনীতিতে মতপার্থক্য সত্ত্বেও বহু দলের সহাবস্থান থাকতেই হবে।
আইআইইউসি’র ইকোনমিকস বিভাগের শিক্ষক জুবায়ের আহমেদ একটি পাঠচক্র পরিচালনা করতো। তার সঙ্গে আমার বহুবার আলোচনা হয়েছে এবং আমি নিজেও তাদের পাঠচক্রে গিয়েছি। তখন সে আমাকে বললো—‘স্যার, এই যে অনেক কিছু হবে, সেটার তো একটা সেন্ট্রাল কোঅর্ডিনেশন লাগবে।’ আমরা সাধারণত যেমনটা মনে করে থাকি, একটি আমব্রেলা অর্গানাইজেশন থাকলে সুবিধা হয়, যাতে কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় করা যায়।
তখন আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম, ধরা যাক, এই কেন্দ্রীয় অনুমোদন কমিটিতে মোট ১০ জন সদস্য আছেন। এই ১০ জনের মধ্যে হয়ত দুইজন রাজনীতি ভালো বোঝেন, দুইজন আমার মতো তাত্ত্বিক আছেন, কেউ ব্যবসা ভালো বোঝেন, আবার কেউ পেশায় চিকিৎসক, কিন্তু দ্বীনি বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে নারাজ। এখন সমস্যা হলো, যখন কমিটিতে কোনো দ্বীনি বিষয় আসবে, তখন চিকিৎসক ভদ্রলোক মাইনরিটি হয়ে পড়বেন। আবার যখন কোনো তাত্ত্বিক বিষয় আলোচনার জন্য আসবে, তখন মোজাম্মেল হক ও তাঁর সমমনারাও মাইনরিটি হয়ে যাবেন; কারণ তাত্ত্বিক বা ওই নির্দিষ্ট চিন্তাধারার লোক হয়ত তিনিসহ বড় জোর দুইজন বা তিনজন আছেন, বাকিরা তো এসবের গভীরতা সেভাবে বোঝেন না।
যেই ইস্যুই আসুক না কেন, সেই ইস্যুটা কিন্তু অধিকাংশ না বুঝা লোকদের কনভিন্স করেই পাস করতে হবে। অর্থাৎ আপনি সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করবেন এবং তারা মিনিমাম লেভেলে কনভিন্স হবে। কারণ ঐ নির্দিষ্ট বিষয়টা তো তারা বুঝে না। কারণ যে মানুষটি পলিটিক্সের নানান মারপ্যাঁচ বুঝে না, আপনি তাকে বুঝাতে গিয়ে মাথাটা ভেঙ্গে ফেলতে পারেন, কিন্তু পলিটিক্স বুঝাতে পারবেন না। কিন্তু কোনো কারণে সে কেন্দ্রীয় কমিটিতে চলে এসেছে। অর্থাৎ তারা একে অপরকে ডিলিমিট করবে, টেনে ধরবে। কাজের গতি ও মান কমিয়ে দেবে।

তাহলে আমাদের করণীয় কী হওয়া উচিত? একটি হতে পারে জায়ান্ট ট্রি মডেল। ধরুন, একটি ‘জায়েন্ট ট্রি’ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। এই বিশাল কাঠামোর একটা সুবিধা হলো—যেমনটা আমরা রাশিয়া বা বিভিন্ন বড় রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে দেখি—তারা মরু অঞ্চল থেকে সম্পদ এনে জলাভূমি অঞ্চলে দেয়, আবার জলাভূমি অঞ্চলের সম্পদ অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়ে পুরো সিস্টেমটা চমৎকারভাবে চালিয়ে নেয়। কিন্তু এর বড় অসুবিধা হলো, এই বিশাল ব্যবস্থার যেকোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় যদি সামান্য কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তবে তার প্রভাবে পুরো সিস্টেমটি ধসে পড়বে। অপরদিকে চিটাগং ইউনিভার্সিটির পুরাতন কলা ভবনের কথা চিন্তা করুন, সেখানে মাঝখানে মাঝখানে ফাঁকা। কেন? কারণ বোমা পড়লে বা কোনো দুর্যোগে যে অংশ আক্রান্ত হবে শুধু সেই অংশটাই যেন ভাঙে।
বিকল্প আরেকটি মডেল হতে পারে ‘ওয়াইড গার্ডেন মডেল’, যেখানে প্রতিটি গাছ আলাদা বা স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। এই যে গার্ডেন কনসেপ্ট—এখানে একই আকাশের নিচে এবং একই মাটির ওপরে থেকে প্রত্যেকে যার যার মতো করে নিজেদের বিকাশ ঘটাবে, কিন্তু পুরো বিষয়টিকে একটি ‘গ্র্যান্ড ডিজাইন’ বা একটি ‘মেটা-থিওরি’র নিয়ন্ত্রণ করবে। আর এই কাজটি কেবল আমরাই সফলভাবে করতে পারি; কারণ দুনিয়ার অন্য কোনো মতাদর্শের অনুসারীদের কাছে শরিআহ, ইসলাম কিংবা আল্লাহর হেদায়াত বলে কিছু নেই, তা কেবল আমাদের কাছেই আছে।
তাহলে আপনি আমার হাত ধরার দরকার নাই। পবিত্র কুরআনে যেমনটা বলা হয়েছে—‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জু বা রশি শক্ত করে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সূরা আল-ইমরান: ১০৩) অর্থাৎ তিনিও সরাসরি আমার হাত ধরবেন না, আমিও তাঁর হাত ধরব না; বরং তিনিও রশিটি শক্ত করে ধরেছেন, আমিও সেই রশিটিই ধরেছি। আমাদের মধ্যে মিল হচ্ছে এই আদর্শিক জায়গাতেই।

সুতরাং আমাদের কাজ বা সাংগঠনিক কাঠামো মূলত মৌচাকের মতো অথবা অনেকগুলো বেলুনের মতো হওয়া উচিত। যেখানে প্রতিটি বেলুন আলাদা, কিন্তু একে অপরের সঙ্গে খুব শক্তভাবে এক জায়গাতে লেগে আছে। ঠিক এভাবেই, কোনো ধরনের কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াই যদি আপনি সম-আদর্শের মানুষদের নিয়ে এমন একটি স্বাধীন অথচ সংযুক্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারেন, তবে পুরো কাঠামোটি অনেক বেশি গতিশীল ও কার্যকর হবে।
উত্তরণের উপায়
এবার বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করা যাক। কোনো চলমান কাজকে হঠাৎ করে থামিয়ে দেওয়া যায় না। বিষয়টি অনেকটা এমন, একটি জাহাজকে ঝড়ের মোকাবেলা করে অগ্রসর হতে হবে। জাহাজটির গন্তব্য উত্তর দিকে, অথচ ঝড়টি আসছে ঠিক দক্ষিণ দিক থেকে। এ অবস্থায় সে যদি জেদ ধরে সোজা উত্তর দিকেই যেতে থাকে, তবে ঝড়ের তোড়ে সেটি উল্টে পড়ে যাবে। তাই তাকে পরিস্থিতি সামাল দিতে সাময়িকভাবে দিক পরিবর্তন করে দক্ষিণের দিকেই কিছুদূর যেতে হবে। কিন্তু ঝড় থেমে যাওয়ার পরও সে যদি মনে করে যে, ‘যেহেতু আমি দক্ষিণ দিকেই রওনা দিয়েছি, তবে এখন এ পথেই চলতে থাকি’—আর এভাবেই যদি চলতে থাকে, তবে শেষ পর্যন্ত বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠবে। সুতরাং, একদিকে যেমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে, তেমনই অন্যদিকে সঠিক কৌশল নির্ধারণ করে এগোতে হবে।
তাহলে প্রশ্ন হতে পারে সঠিক কৌশল বা উপায় কী? উপায় হলো ‘সফট পাওয়ার’ তৈরি করা। সাধারণত সংগঠন বলতে আমরা বুঝি সবকিছুকে একটা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করা। কিন্তু দৃশ্যত কোনো কিছুকে কাঠামোবদ্ধ না করেও, কেবল আদর্শিক ঐক্যের মাধ্যমে আপনি একই লক্ষ্যে কাজ করে যেতে পারেন।
ইন্টারনেট সিস্টেমের দিকেই লক্ষ্য করুন—এর সবকিছু কোনো এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত থাকে না, বরং এটি একটি ডিস্ট্রিবিউটেড নেটওয়ার্ক সিস্টেমের মতো কাজ করে। ঠিক একইভাবে, সম-আদর্শের ভিত্তিতে যদি অনেক সহযোগী স্বাধীন সংগঠন গড়ে ওঠে এবং তাদেরকে যদি আপনি পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেন, এমনকি প্রয়োজনে বিরোধিতার সুযোগও দেন—তবে পুরো আন্দোলনটি অনেক বেশি টেকসই ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
মানুষের একটা সহজাত বৈশিষ্ট্য কী জানেন? মানুষ সবসময় পরিবর্তন চায়।
যেমন—অনেকেই বলছে, ‘বিএনপি আরও এক টার্ম ক্ষমতায় থাকবে।’ বিএনপির সমর্থকদের আমি জিজ্ঞেস করেছি, ‘আচ্ছা, সেকেন্ড টার্মের পরেও কি তারা থার্ড টার্মে ক্ষমতায় থাকতে পারবে?’ সাধারণ উত্তর হলো—‘না।’ কেন থাকবে না? তখনও তো রাজনৈতিক বাস্তবতা হয়ত একই থাকবে, জামায়াত ও এনসিপি দুর্বল অবস্থায় থাকতে পারে, তাহলে কেন মানুষ তাদের সরিয়ে দিতে চাইবে? কারণ মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা হলো পবিত্র কুরআনে বর্ণিত (সূরা আল-বাকারা: ৬১) বনি ইসরাইলের ঘটনাটির মতো—আসমান থেকে ‘মান্না-সালওয়া’ পাওয়ার পরও তারা যেমন একঘেয়েমীতে ভুগে বলেছিল, ‘আমরা জমি থেকে উৎপন্ন পেঁয়াজ, রসুন, শাকসবজি ইত্যাদি চাই’। মানুষ সবসময় এন্টিস্টাবলিশমেন্ট বা পরিবর্তনমুখী হয় এবং কখনোই দীর্ঘদিন ধরে একই মুখ দেখতে চায় না।
সেই হিসাবে আপনার অনেকগুলো দল বা সংগঠন হতে হবে, অনেকগুলা এভিনিউ থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ—আওয়ামী লীগ যেমন একসময় বলেছে, ‘সরকারেও থাকবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, আবার বিরোধী দলেও থাকবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি।’ ঠিক তেমনি আপনি যদি সুদূরপ্রসারী কোনো ‘ইসলামাইজেশন প্রজেক্ট’ বাস্তবায়ন করতে চান, তবে সেখানে সরকারি দল এবং বিরোধী দল—উভয়েই ইসলামী মূল্যবোধের হতে হবে; পার্থক্য হয়ত থাকবে যে কেউ বেশি ইসলাম, কেউ কম ইসলাম, কেউ বেশি পলিটিক্যাল ইসলাম, আবার কেউ নন-পলিটিক্যাল ইসলাম চর্চা করবে। অদল-বদল করে আপনার লোকগুলোই থাকবে। এই বৈচিত্র্যকে উৎসাহিত করার মানসিকতা থাকতে হবে।
এই মানসিকতার ঘাটতি এখনো লক্ষণীয়। আামার সম্পর্কে অনেককে বলা হয়েছে, ‘উনি তো চলে গেছেন।’ একইভাবে মজিবুর রহমান মঞ্জু সম্পর্কে আমীরে জামায়াত বলেছেন, “আমরা তার হেদায়েতের দোয়া ছাড়া আর কী করতে পারি?” অর্থাৎ সংগঠন ছাড়লে যেন কেউ হেদায়েত থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলো!
সংগঠন যে এখন ‘সফট পাওয়ার’-এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারছে, এটি দেখে আমার খুব ভালো লাগছে এবং তারা এ বিষয়ে উদ্যোগও গড়ে তুলছে। তবে আমি মনে করি, এ জায়গাটিতে আরও অনেক বেশি মনোযোগ দিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। আর যে ব্যক্তি যেভাবেই কাজ করুক না কেন—আল্লাহ তাআলা যেহেতু আমাদের এই নির্দিষ্ট জনপদে এক নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ে এসেছেন, তাই আমাদের মূল লক্ষ্য হতে হবে এই দেশ ও ইসলামের খেদমতে কাজ করে যাওয়া।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন—‘ সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা করো। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর।’ (সূরা আল-মায়েদা: ০২)। আমরা সাধারণত ধরে নিই যে এই আয়াতটি কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে প্রযোজ্য; কিন্তু এটি দলগত ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হতে পারে। যেমন—চরমোনাইয়ের পীর সাহেবের অনুসারীরা বরিশালে যে সামাজিক বা দাওয়াতী কাজ করতে পারে, তা হয়ত চট্টগ্রাম বা অন্য অঞ্চলের মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। তাই যার যা করার সুযোগ আছে, সে সেই ক্ষেত্রটিতে কাজ করুক।
প্রফেসর গোলাম আযম সাহেবের এমন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। কিন্তু তাতে একটি বুনিয়াদি ভুলও ছিল। তা হলো—জামায়াতে ইসলামীর কাঠামোর বাইরে যারা কাজ করছে, তারা যেন কেবল ‘খেদমতে দ্বীন’ করছে, কিন্তু ‘একামতে দ্বীন’-এ শরিক হয়নি। এই মানসিকতার মাধ্যমে মূলত অন্যদের ‘আদারিং’ করা হতো। অথচ খেয়াল করুন—জামায়াতে ইসলামী কি সরাসরি সশস্ত্র জিহাদকে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসূচিতে যুক্ত করেছে? শরীয়তের এমন বহু মৌলিক দিক জামায়াতে ইসলামীর কর্মসূচিতেও নাই। তাহলে এটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী আন্দোলন হয় কীভাবে?
সুতরাং আমি মনে করি, দ্বীনের খেদমতে নিবেদিত প্রতিটি কাজই মূলত ‘একামতে দ্বীন’ তথা দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেরই অংশ। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ধারণ করে যদি আমরা সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করে যেতে পারি, তবে আমি বিশ্বাস করি, আমাদের বর্তমান সংকটগুলো কাটিয়ে ওঠে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
