সেদিন নোয়াখালী গেলাম একটা ব্যক্তিগত কাজে। এর আগে বছর দু’য়েক আগেও একবার গিয়েছিলাম। সেইম এক্সপেরিয়েন্স অ্যান্ড অবজার্ভেশন। কোথাও বোরকা পরিহিতা নয়, এমন কোনো মুসলিম নারীকে আমি দেখিনি। আপনি দূর থেকেই বলে দিতে পারবেন, মেয়েটি মুসলিম নাকি অমুসলিম। সেখানকার অমুসলিম নারীরা বোরকা না পরলেও চলাফেরা করে যথেষ্ট শালীনভাবে।
চট্টগ্রামের মেয়েরাও বোরকা পরে। তবে, তাদের বেশিরভাগের বোরকা মূলত ফ্যাশন শো। পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা অঞ্চলের মেয়েদের মতো নোয়াখালীর মেয়েরা ততটা চালু না। তারা অধিকতর সহজ, সরল।
বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের মেয়েরা ট্রাডিশনাল জেন্ডার রোলকে মেনে চলে কঠোরভাবে। মূল্যবোধের অবক্ষয় তাদের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোকে এখনো তেমনভাবে স্পর্শ করতে পারেনি। ক’দিন তারা উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের বিষবাষ্প হতে বেঁচে থাকতে পারবে, জানি না।
নোয়াখালীর লোকদের ব্যবহার বন্ধুত্বপূর্ণ, আন্তরিক। দেখলেই জিজ্ঞাসা করবে, ‘আপনার পরিচয়?’ ইত্যাদি। না, আগন্তুক দেখে আপনার ওপর অহেতুক খবরদারী করার জন্য না। বরং, হোয়েদার দ্যা ক্যান ডু এনি হেল্প ফর ইউ।
চট্টগ্রামের লোকদের মতো নোয়াখালীর লোকেরাও তুমুল হাস্যরসপ্রিয়। তারা সারাক্ষণ সার্কাজম করে। এ এর সাথে। ও এর সাথে। যেখানে সেখানে। বয়সের ব্যবধান সেখানে তুচ্ছ। তাদের ফুড হ্যাবিট চট্টগ্রামের মতোই।
চট্টগ্রামের লোকেরা পরষ্পরকে বলছে, ‘এই তুই তো চিটাইংগা’, এটা আমি কখনো শুনিনি। কিন্তু, নোয়াখালীর লোকেরা পরষ্পরকে ‘নোয়াখাইল্যা’ বলে গালি দেয় বা ঠাট্টা-মশকারী করে। ইন দ্যাট সেন্স, দ্যা আর সেলফ-হেইটিং পিপল।
নোয়াখালীর সাথে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় অমিল, নোয়াখালীবাসীর ট্রাজেডি, আই মে বি রং, আমি দেখলাম, নোয়াখালীর স্বচ্ছল, শিক্ষিত ও অভিজাত লোকেরা নোয়াখালীতে থাকে না। তারা স্থায়ীভাবে থাকে ঢাকা অথবা চট্টগ্রামে।
যার ফলে নোয়াখালীতে থাকে মোস্টলি সেখানকার গরীব লোকজন। সেখানকার সর্বত্র এর ট্রাজিক প্রভাব লক্ষ করা যায়।
একমাত্র নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আমি বেপর্দা, মানে, ‘সাধারণ পোশাক’ পরিহিতা নারী দেখেছি। তারা সেখানকার স্টুডেন্ট খুব সম্ভবত। নোয়াখালীর সামাজিক সংস্কৃতিকে তারা অবজ্ঞা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে অবলীলায়।
ব্রিটিশ শাসনামলে দিল্লীর রাস্তায় অবাধে ঘুরে বেড়ানো অর্ধউলঙ্গ শ্বেতাঙ্গ নারীদের মতো এ’সব (নোয়াখালীতে বহিরাগত) বিশ্ববিদ্যালয় স্টুডেন্টরা দেশের ভিতরে কায়েম করেছে ভিন্ন দেশ। লোকাল ভেলুজ অ্যান্ড কালচারকে তারা ‘ধর্ষণ’ করছে উইথআউট এনি গিল্ট ফিলিং।
লোকাল কালচার এবং ভেলুজকে নির্দয়ভাবে আহত করার এমন ‘প্রগতিশীল’ মনমানসিকতা আমি দেখেছি বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকায়!
বিশ্ববিদ্যালয় স্টুডেন্টরা যেন ইংরেজ সাহেব কিংবা মেম সাহেব, আর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকার সাধারণ লোকজন যেন আনকালচারর্ড ন্যাটিভ ইন্ডিয়ানস!
[‘ধর্ষণ’ শব্দটা কেন বলেছি তা ব্যাখ্যা করেছি। এরপরও কেউ যদি আহতবোধ করেন, দুঃখ প্রকাশ করছি!]
সে যাইহোক, গিয়েছিলাম সুবর্ণচরের চেয়ারম্যান ঘাট পর্যন্ত।
আমরা যারা সমতলনিবাসী, আমাদের পক্ষে অনুমান করা কঠিন, নদীরপাড়ের বা দ্বীপবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন কতটা কষ্টকর, সংগ্রামমুখর। ছবিতে দেখা যাচ্ছে হাতিয়া যাওয়ার জন্য সি-ট্রাকে উঠার জন্য টিকিট কাটার লাইন।
আর হ্যাঁ, নোয়াখালী মানে ফেনী, লক্ষ্মীপুরসহ বৃহত্তর নোয়াখালী।
ইচ্ছে ছিল ফেরার পথে লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজারে গিয়ে আমার সিনিয়র ফ্রেন্ড আমীর ভাইকে দেখে আসবো। গাড়িতে একটু গোলযোগ হওয়ায় সে আশা বাদ দিয়ে একদিন-একরাতের চারশ’ কিলোমিটার জার্নি শেষে ফিরে এসেছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, গতকাল।
আল্লাহ চাহেন তো আবার যাবো নোয়াখালী। থাকবো কয়েকদিন। ঘুরে ফিরে দেখবো বাংলার আরব ভূমি।
মন্তব্য – প্রতিমন্তব্য
Wahed Jihan: শত্রু প্রবেশ করলেও, অটোমেটিক তার সাথে আমাদের বন্ধুত্বসুলভ আচরণ চলে আসে। বোরকা বা পর্দাশীল হয়ে থাকে ধর্মীয় বা পারিবারিক অনুশাসনের কারণে, কিন্তু আগামী ৫ বছরে সম্ভবত মূল্যবোধের অবক্ষয় নারীদেরকে স্পর্শ করতে পারে।
Mohammad Mozammel Hoque: এতদিন পরে এই পোস্ট তুমি পাইলা কোথায়? নোয়াখালীর কোন জায়গায় তোমাদের বাড়ি?
Wahed Jihan: কবিরহাট উপজেলা। সাবেক সেনাপ্রধান ঢাকা উত্তর সিটির প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের বাড়ির পাশে। আগামীতে যখন আসবেন নোয়াখালীর উন্নয়ন নিয়ে কিছু লিখলে প্রশান্তি পাবো।
নোয়াখালীতে অনেক শিল্পপতি এবং বড় বড় ব্যবসায়ী রয়েছেন। এছাড়াও ক্ষমতাসীন দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড (ওবায়দুল কাদের)। মওদুদ আহমেদ সাবেক উপরাষ্ট্রপতি ও উপপ্রধানমন্ত্রী, যোগাযোগমন্ত্রী ও আইন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সরকারী দল এবং বিরোধীদলের এতো ভাইটাল পোস্টে নোয়াখালীর লোকেরা নেতৃত্ব থাকার পরও, জীবনমান অনেক অনুন্নত। আমার উপজেলায়, আমার বাড়িতে আপনার অগ্রীম দাওয়াত রইলো, যখন আসবেন৷ আপনি যেহেতু ভ্রমণপিপাসু আগামীতে আপনার সফর সঙ্গী হয়ে। দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখাতে পারলে খুশি হবো।
পোস্টটি পেয়েছি আমার এলাকার সাস্টে অধ্যয়নরত সিনিয়র ভাইয়ের টাইমলাইনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে আমি আপনার লেখা পড়ে থাকি।
Mohammad Rayhan: নোয়াখালীর বাসিন্দা হিসেবে স্যারের প্রতিটি কথাই সত্য মনে হয়েছে। তবে স্যারের মতো করে আমরা ভাবিনি কারণ আমরা এমন পরিবেশে বড় হয়েছি। কখনো কম্পেয়ার করিনি। এখানে অমুসলিমদের পর্দা শহুরে মুসলিম নারীদেরকে হার মানাবে।
Abdullah Al Mahmud: নোয়াখালিতে দেড় মাসের মত থাকার অভিজ্ঞতায় বলি, ঐখানে বোরকা জিনিসটা ট্রাডিশনালি রয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের সব অঞ্চলে হুজুর মানেই নোয়াখালীর হুজুর ছিলেন। আমি কুরআন পড়া, নাজেরা পড়া শিখেছি এমন একজন নোয়াখালীর হুজুর থেকে। কিন্তু এখন ধীরে ধীরে এই পেশায় তাদের অংশগ্রহণ কমে আসতেছে। সেই সাথে বোরকাও তার পরহেজগারিতা হারাচ্ছে। ঢাকা শহরে কোথাও আমি রিকশায় অন্য নারীর পাশে বসার অফার পাইনি, কিন্তু নোয়াখালিতে এটা কমন। বিদ্যুত চালিত অটোরিকশায় বিভিন্ন গন্তব্যের কয়েকজন থাকায় প্রায়ই এইরকম পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে।
Rakib Uddin: আপনি যেদিকে গেছেন সেটা তুলনামূলক দরিদ্র এলাকা। চর এলাকার মানুষকে উত্তর দিকের নোয়াখালীতে নীচু হিসেবে দেখা হয়, চরুয়া ডাকা হয়। চরের মানুষ কাজ করতে উত্তর নোয়াখালী আসে অধিক মজুরির আশায়। রংপুর, ময়মনসিংহের প্রচুর শ্রমিক এখানে কাজ করে। রেমিটেন্স উপার্জনে নোয়াখালী অনেক এগিয়ে যা এ অঞ্চলের আর্থ সামাজিক অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। মেয়েদের পর্দা পুরো নোয়াখালীতে আছে। প্রচুর মাদ্রাসা এ জেলায়। একসময় নোয়াখালীর হুজুররা সারাদেশে দীন শিক্ষা দেয়ার জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। আপনি চৌমুহনী বাজারের উপর দিয়ে গিয়েছেন হয়ত। এটি দেশের প্রাচীন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র।
Salman Farsi: এজন্য নোয়াখালীকে বাংলার আরব বলা হয়। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে সভ্যতার চর্চা হওয়ার কথা সবার অগ্রে। কিন্তু পোশাক-আশাক ও নারী পুরুষের ধর্মীয় বিবেচনায় এ সভ্যতার চর্চার বদলে, অসভ্যতার চর্চা বেশি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে।
আমি কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম। এইখানে নারীদের পর্দার খেলাফ এর কারনে কোন প্রাক্টিসিং মুসলমান পুরুষের ঈমান ধরে রাখা দায়। মনে করছিলাম ঢাকা বোধ হয় এমনই।
কিন্তু পুরান ঢাকা ও দক্ষিন সিটিকর্পোরেশন এলাকায় গিয়ে আলহামদুলিল্লাহ অবস্থা বেশ স্বস্তিদায়ক ছিল। নারীরা প্রায় শালীন পোশাক পরিধান করে। এ থেকে নিশ্চিত হলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গুলোয় সভ্যতার বদলে অসভ্যতার চর্চা বেশি হয়।
Ayesha Fatima: উপর দিয়ে বোরকা পরলেই কেউ পরহেজগার হয় না। তবে এটা ঠিক তুলনামূলক এখনো নোয়াখালীর মেয়েদের মধ্যে পর্দা আছে। কিন্তু আপনি যেই এলাকায় গিয়েছেন ঐটা তো অনেক গ্রাম্য এলাকা। নোয়াখালীর চৌমুহনী, মাইজদী, বসুরহাট এসব এলাকা আধুনিক। এখানকার মেয়েরা আপনার ঐ কথামতো সহজ সরল না।
গ্রামের মেয়েরা একটু এসএসসি, এইচএসসি পাশ করলে অনেক চালু হয়, লাজ-লজ্জা কমে যায়। অনেক লাফায়। আর উপর দিয়ে বোরকা পরে ভিতরে ভিতরে অনেকের অনেক কাহিনী শোনা যায়। তবুও অন্য অনেক জেলা থেকে এখনো তুলনামূলক ভালো। মেয়েরা সাংসারিক হয়। পারিবারিক, সামাজিক মূল্যবোধগুলো আছে। অন্য জেলার মেয়েদের মধ্যে সেটাও কম।
Harunur Rashid: নোয়াখালীতে পর্দানশীল আর বেপর্দার যেই অবজারভেশন আপনি দিয়েছেন আপনার লিখায়, সেটার বাস্তব রুপ ফুটে উঠেছে আপনার যুক্ত করা ছবিতে। এখনো মুরুব্বি সমাজের কাছে অপরিচিত মুসলিম আর অমুসলিম মহিলাদের পার্থক্যের মাপকাঠি পর্দা আর বেপর্দা। আরো ক্লিয়ার চিত্র বুঝা যেত যদি স্কুলের মাঠে ভোট দিতে যাওয়া মহিলাদের লাইনের ছবি দিতেন, অবশ্য সেই দিন তো আর নেই।
