পাহাড়ের বুকে এক দিনমান পথচলা

বেলাল ভাই। চট্টগ্রাম সংলগ্ন খাগড়াছড়ি জেলার একজন কৃষক। কয়েকটা পাহাড়জুড়ে উনার খামার বাড়ি। এর আগেও ওদিকে যাওয়ার সময়ে উনার বাড়িতে থেমেছিলাম। এবারও থামলাম। সাথে ছিল আমার স্ত্রী আর ছেলেমেয়েরা।

বেলাল ভাইয়ের সাথে ছবি তুলতে চাইলে খালি গায়ে বলে উনি ইতস্তত করছিলেন। আমি তখন আমার জামাটা খুলে ফেললাম। এরপর, একসাথে ছবি তুললাম।

আমার দু’মেয়ে। মাহজুবাহ বড়। ল থেকে অনার্স-মাস্টার্স করেছে। ছোটজন রাহনুমা। পড়ছে ডিভেলপমেন্ট স্টাডিজে।

সামসুন নাহার মিতুল। আমাদের মিতুল ম্যাম। চট্টগ্রাম পড়তে এসে পেয়ে গেছেন চাকরী। গড়েছেন সংসার। মাশাআল্লাহ, দীর্ঘ তিন দশকের অলরেডি। পাহাড়ি একটা ফুলের তোড়া ছিঁড়ে উনাকে তাই জানালাম অভিনন্দন!

আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে হারিয়ে যাওয়ার জন্য চাইলে বেড়াতে আসতে পারেন পাহাড়ি কোনো জেলায়। এক অর্থে এটি আমাদের সৌভাগ্য(!), নিকট অতীতে পাহাড়ে ছিল যুদ্ধ আর অস্থিরতা। যার ফলে সেনাবাহিনী নিজেদের প্রয়োজনে এখানে গড়ে তুলেছে প্রচুর অবকাঠামো। করেছে দৃষ্টিনন্দন উন্নয়ন।

এক অর্থে এটিও আমাদের অর্থাৎ ফটিকছড়িবাসীদের সৌভাগ্য, আমাদের পাশে আছে ভারতীয় সীমান্ত। রামগড় স্থলবন্দরের প্রয়োজনে ফটিকছড়িজুড়ে হয়েছে রাস্তার প্রভূত উন্নয়ন।

পাহাড়ে এসে আমি পাহাড়িদের কষ্টটা বুঝতে পেরেছি অনেকখানি। এক একটা বাঙালী পরিবার এখানে ন্যূনতম দুই-তিনটা পাহাড়ের মালিক। অথচ, এগুলো ছিল পাহাড়িদের জায়গা।

কয়েকশ’ বছর আগে তারা এই এলাকায় এসেছে। বংশ পরম্পরায় তারা এখানে থাকছে। স্বভাবতই তাদের নাই ভূমির মালিকানার ‘প্রমাণ’। নাই রেজিস্ট্রিকৃত দলিল। প্রশাসনের এক কলমের খোঁচায় তারা হারিয়েছে তাদের ভূমির স্বত্ব। প্রজন্মের উত্তরাধিকার।

হ্যাঁ, স্বীকার করি, দেশের অখণ্ডতার জন্য এই অভিবাসন ছিল জরুরী। নিঃসন্দেহে সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু তাতে করে পাহাড়ের দাবী নাই হয়ে যায় না। তাদের চাপা কান্না এবং এর বহিঃপ্রকাশের তিক্ততাকেও আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। এ’ এক মানবিক সংকট।

সে যাইহোক। আমরা ভ্রমণ করেছি আড়াইশ’ কিলোমিটার। থেমেছি পথে পথে। যেখানে ভাল লেগেছে, সেখানে। ছিল না ফিক্সড কোনো গন্তব্য। অল-ডে ফ্যামিলি ডে-আউট।

ও হ্যাঁ, আমি পাহাড়ি এক রমণীর পাশে বসে তাদের হুক্কা টানার চেষ্টা করেছি। সফল হইনি। মেয়েরাও ট্রাই করেছে। তাদের দাবী, তারা ধোঁয়া বের করতে পেরেছে। আমি দেখি নাই। তাই বিশ্বাস করি নাই।

পাহাড়ি এক নারী। তার দুইটা বাচ্চা। সে এসেছে লিচু বিক্রী করতে। ওর কাছ হতে নিয়ে বাচ্চাটাকে আমি কোলে নিয়েছি। নিরাপত্তার স্বার্থে পাহাড়ে সবাই কুকুর পালে। তাদের কুকুরগুলো স্বাস্থ্যবান। তাদের মুরগীগুলোর অনেক বাচ্চা। ফুটফুটে সুন্দর। প্রাণবন্ত। তাদের বাচ্চাগুলো নাদুস নুদুস। তাদের নারীপুরুষের শরীর মেদহীন। তারা স্বল্পভাষী। বন্ধু বৎসল। তাদের নারীরা ‘এমপাওয়ার্ড’। যদিও তারা ট্রাডিশনাল জেন্ডার রোল মেনে চলে হানড্রেড পার্সেন্ট। ওভারঅল লাইফস্টাইল ন্যাচারাল।

ছবিতে যেমন দেখছেন, তাদের মাটির সোরাহি হতে খেয়েছি ঠাণ্ডা পানি। সোরাহিকে তারা বলে কল্কি। আমরা মানে চিটাগনিয়ানরাও সোরাহিকে বলি কল্কি। ছোটবেলায় আমাদের বাসাতেও ছিল কল্কি। ছড়া, তাদের ভাষায় ঝিরি থেকে সংগ্রহ করা সেই পানি টেপের ফুটানো পানির মত বিস্বাদ নয়। বরং মিষ্টি এবং সুপেয়। আমি অবশ্য ছড়া হতে কোষ ধরে, মানে দু’হাতের তালু জড় করে খেতে পছন্দ করি।

চেঙ্গী নদীতে নামতে চেয়েছিলাম। স্কোপ পাই নাই। নদীর পাড়ে স্বর্ণালু গাছ হতে স্বর্ণ যেন ঝুলে আছে বেশুমার। ছবিটি তুলেছে শখের চিত্রগায়ক মাহজুবাহ।

ছবিতে দেখছেন, একটা পাহাড়ের চূড়া হতে খাগড়াছড়ি শহরকে দেখা যাচ্ছে। এটি আলুটিলার উপর থেকে তোলা নয়। কোনো এক র‍্যানডম জায়গা হতে তোলা। মেয়েরা রোদের মধ্যে আনন্দে ঘুরেছে। আমরা বুড়াবুড়িরা একটা দোচালার নিচে বিশ্রাম নিয়েছি। আমি খানিকটা ঘুমাইছি। তখন পাশে বসে ম্যাম আমাকে পাহারা দিচ্ছিল।

পাহাড়িদের জীবনে স্বচ্ছলতা আছে। আমার আশংকা শীঘ্রই হারাবে তারা তাদের ঐতিহ্যের অনেকখানি। যেমন, নিচের ঝিরি হতে মেয়েদের পানি তোলার ঐতিহ্য। আধুনিক জীবন তাদের দিবে আয়েশ। কেড়ে নিবে তাদের প্রকৃতিসঙ্গত জীবনধারা। ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। যেমনটি, হয়েছে আমাদের। অনেকখানি।

উন্নয়নের এই প্যরাডক্স তারা কতখানি সমাধান করতে পারবে তা নিয়ে আমি সন্দিহান। তবে উন্নয়ন আর ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের এই দ্বন্দ্ব যারা যতখানি সলভ করতে পারবে, তারা হবে ঠিক ততখানি সফল। ‘সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র’ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিয়োজিত এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

আমরা গিয়েছি রামগড় সীমান্তে নবনির্মিত ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীসেতুর কাছে। সৌরভ আর আমি নেমেছি ফেনী নদীর পানিতে, যেই পানির অন্যায্য প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে কথা বলার ‘অপরাধে’ সতীর্থদের হাতে শহীদ হয়েছে বুয়েটের আবরার।

ফিরে আসার পথে থেমেছি রামগড় টি স্টেটে। পার হয়েছি অনিন্দ্য সুন্দর হেয়াখোঁ রাবার বাগান। সেলফি রোড। থেমেছি হালদার তীরে। তখন অন্ধকার প্রায় ঘনিয়ে আসছিল। তাই ভাল ছবি তোলা হয়নি। সকাল আটটার আগে বের হয়ে আমরা ফিরেছি বরাবর রাত আটটায়।

আমি সবসময়ে সিএসসিএস-এর কাজে এনগেইজ থাকি। মেয়েরা আমাকে কম পায়। তাই ছিল এই অনির্ধারিত গন্তব্যে ছুটে চলার আয়োজন।

দুপুরের খাওয়ার খেয়েছি এক পাহাড়ি দোকানে বসে। আমাদের কিছু খাবার ছিল। ওদের থেকেও নিয়েছি দুই পদ। এরমধ্যে ছিল ঝোল দিয়ে ঝাল করে রান্না করা কুইচ্চা মাছের আইটেম। ভালই ছিল। ম্যাম খান নাই। আমরা মানে আমি, আমার পাতানো ছেলে সৌরভ আর মেয়েরা, আমরা স্ট্রীট ফুড লাভাররা খেয়েছি যখন যেখানে যা পেয়েছি।

বিশ্বাস করি, ইমিউনিটি ইজ বেটার দেন সেফটি।

মন্তব্য – প্রতিমন্তব্য

Nazmul HR: খাটি বাঙ্গালিমনা, স্যার।

Mohammad Mozammel Hoque: নৃতাত্ত্বিকভাবে আমরা বাঙালি। এর সাথে ধর্মের কোনো বিরোধ নেই।

Nazmul HR: স্যার, আমার জন্য কোনটা হওয়া ভালো হবে – বাঙালী মুসলমান হওয়া নাকি মুসলমান বাঙালী হওয়া?

Mohammad Mozammel Hoque: কিছু কিছু বিষয় সমান্তরাল কিংবা হায়ারার্কিকেল। অথচ সেগুলোকে বিপরীত বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যেমন, কোনো মানুষের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় এবং ধর্ম। অতএব, “আমি আগে মুসলমান, না আগে বাঙালি?” এই প্রশ্নটাই হচ্ছে একটা ভুল প্রশ্ন।

Gazi Emran: স্যার, পাহাড়ে বাঙালিরা কখনো কারো থেকে জোর করে ভূমি দখল করে বসতি করেনি। সরকারি রিজার্ভ জায়গায় বসতি গড়েছে।

পাহাড়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী গুলোর বসতি স্থাপনের ইতিহাস বেশি পুরানো না। পাহাড়িদের চাপা কান্না বলতে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড এটা অস্বীকার করতে পারবেন না। সরকার পাহাড়িদের যেসব সুবিধা দিচ্ছে বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে এটা অনেক কিছু। আমাদের পাশের দেশগুলোতে এত সুবিধা পাচ্ছে না।

Mohammad Mozammel Hoque:  এইটা সমতলবাসীদের একটা ‘সমতল বয়ান’। কিন্তু ইস্যুটা নিয়ে একমাত্র বয়ান নয়। কিছু করতে পারি বা কিংবা না পারি, পাহাড়িদের দিক থেকে নেরেটিভটা কেমন, সেটাও আমাদের ভেবে দেখা দরকার।

আমি তাদের অসহায়ত্বটাকে তুলে ধরেছি। তাদের পুরো এলাকা ডুবিয়ে একটা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এইটা এমনকি যারা করেছে তাদের জন্যেও অর্থনৈতিকভাবে লাভবান ছিল না কখনো।

আমার এক পরিচিত নৌবাহিনী কর্মকর্তা সেই এলাকাতে বসেই তাদের ঘাঁটিতে আমাকে বলেছিল, ‘যত পরিমাণের ফসলি জমি সেখানে নষ্ট হয়েছিল সে তুলনায় বিদ্যুতের দাম হিসেব করলে এইটা ছিল একটা টোটালি লস প্রজেক্ট।

এইসব শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে তারা কিভাবে রিএক্ট বা রিটালিয়েট করেছে, সেইটা ভিন্ন কথা। আমি আপনি হলেও হয়তোবা এর অন্যথা হতো না।

Chowdhury Golam Mawla: কোথাও আমার হারিয়ে যাবার

নেই মানা…

এই দিনটি শুধুই আমাদের।

এই দিনটি উৎসবের

আনন্দের।

এই দিনটি হারিয়ে যাওয়ার

শুধু ঘুরে দেখার

পথে প্রান্তরে নিরন্তর ছোটাছুটি

পথ ধরে পৃথিবীর….

কী প্রানবন্ত বর্ণনায় আপনি সারাটি দিনের পরিক্রমা তুলে ধরলেন মোজাম্মেল ভাই!

মুগ্ধ হলাম সরল সুন্দর বর্ণনায় এবং আপনার তারুণ্যদীপ্ত খেই হারিয়ে ফেলা পাগলা-প্রেমিক মনের কত স্বপ্নঘোর কান্ড-কীর্তিতে!

ভীষণ ভীষণ ভালো লাগলো।

মাঝে মাঝে ক্লান্ত এ মনে ইচ্ছে জাগে এমন করে যেন ঘর হতে বেরিয়ে পড়ি…

“কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা”….

পার্থিব এ জীবনে

পৃথিবীর পথে প্রান্তরে

হাঁটতে হাঁটতে

দেখতে দেখতেই

একদিন ফুরাবে এ পথচলা…

Mohammad Mozammel Hoque: Mawla ভাই, আপনার হয়তো মনে আছে, বাংলা বিভাগের প্রফেসর মনিরুজ্জামান স্যারের মেয়ে মারজিয়া জাবিন দোলা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষিণ ক্যাম্পাসে স্কুল বাস থেকে নামার সময়ে এক্সিডেন্টে মারা যায়। তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সেখানে একটা ছোট্ট স্মৃতিফলক আছে। তাতে একটা লেখা আছে। লেখাটা অনেকটা এরকম,

এখানে ঘুমায় দোলা।

এখানে এসে শেষ হয়েছে তার

ছোট্ট জীবনের পথচলা।

কখন আমরা হাঁটতে শুরু করেছি আমাদের ঠিক মনে পড়ে না। কখন আমাদের জীবনের এই পথচলা শেষ হবে, সেটাও আমরা জানি না। কিন্তু এতটুকু নিশ্চিত জানি, একদিন শেষ হবে জীবনের এই পথ চলা। ভাবতেই কেমন জানি লাগে।

আমার ডায়েরির কোথাও যেন লিখেছিলাম,

জন্মের চেয়ে বড় বিষ্ময়

আর মৃত্যুর চেয়ে বড় সত্য

পৃথিবীতে নাই।

এক একজন শিক্ষক কখন এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম এসেছেন সেটা আমরা ঠিক জানি না। কিন্তু চোখের উপরে দেখেছি একেক জন স্বনামধন্য শিক্ষকের লাশ অ্যাম্বুলেন্সে করে চলে গেছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক সুনির্দিষ্ট তারিখে। একদিন আমিও চলে যাব, একদিন আপনিও যাবেন, প্রত্যেকে।

এ এক বাস্তবতা এক অনিবার্য বাস্তবতা।

জীবনের পরিণতি অনিবার্য।

তবুও স্বপ্ন,

তবুও স্মৃতি,

তবুও বিস্তৃতি

বাঁচিয়ে রাখে আমাদের।

Chowdhury Golam Mawla: একদম।

একদমই সত্য কথা ।

তবু আমাদের প্রত্যাশা–

ওপারের অনন্ত জীবনে আমরা আবার আড্ডায় মেতে উঠবো।

গানে গানে উচ্ছসিত হবো মহান প্রভুর অফুরন্ত প্রসংশায়।

আল্লাহ আমাদের কবুল করুন।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *