আমি নিজেই পাবলিক প্লেসে কারো খালি গায়ে থাকা পছন্দ করি না। খালি গায়ে কেউ যদি ফেইসবুকে ছবি দেয় তাকে আমি আনফ্রেন্ড করি। নোমান আলী খানকে একজন দ্বায়ী ইলাল্লাহ হিসেবে আমি যতটা পছন্দ করি, ততটা অপছন্দ করি উনার ব্যায়ামের ভিডিও শেয়ার করা কিংবা কথা বলতে বলতে জামার হাতা গুটিয়ে ফেলার মতো কাজকারবারকে।
মুফতি আবুল লাইসের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা যতটা পছন্দ করি, ততটা অপছন্দ করি উনার রকস্টারসুলভ আচরণকে।
সমকালীন প্রেক্ষাপটে বেহুদা কারো খালি গায়ে কিংবা হাফ প্যান্ট পরে পাবলিক প্লেসে ঘোরাঘুরি করাকে আমি ভীষণ অপছন্দ করি। পুরুষের সতর হাটু বরাবর থেকে নাকি খানিকটা উপর হতে, অর্থাৎ উরুর পুরোটাই সতর কিনা, সেটা নিয়ে ইখতেলাফ থাকলেও নাভির নিচ হতে সতর হওয়ার ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নাই। এটি আমি জানি।
দু’দিন আগে আমি সপরিবারে খাগড়াছড়ি জেলায় আড়াইশ’ কিলোমিটারের একটা লং ড্রাইভে গিয়েছিলাম। যাওয়ার পথে বেলাল ভাইয়ের খামার বাড়িতে থেমেছিলাম। কৃষক বেলাল ভাই ছিলেন খালি গায়ে। তাই ছবি তুলতে ইতস্তত করছিলেন।
উনার সাথে সমতা আনার জন্য আমি আমার জামাটা খুলে উনার সাথে কয়েকটা ছবি তুলেছি। এই সফরের কিছু ছবি দিয়ে আমি ফেইসবুকে একটা পোস্ট দিয়েছি। সেটাতে বেলাল ভাইয়ের সাথে তোলা আমার একটা খালি গায়ের ছবিও ছিল।
উক্ত ছবিতে আমার নাভি দেখা যাওয়াটা ছিল অনিচ্ছাকৃত। এ’ধরনের অনিচ্ছাকৃত পর্দালংঘন সম্পর্কে সুরা নূরে পর্দা সংক্রান্ত আয়াতে বলা হয়েছে, যা অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ে তা উপেক্ষণীয় বা ক্ষমাযোগ্য (ইল্লা মা জাহরা মিনহা إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا) ।
তৎসত্ত্বেও যারা আমাকে খালি গায়ে দেখে আহতবোধ করেছেন তাদের কাছে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। হেভিং সেইড দিস, এ’ব্যাপারে আমার কিছু বলার আছে।
জুতা পায়ে দিয়ে নামাজ পড়াটা সুন্নততুল্য। অথচ, এটাকে প্রাক্টিক্যালি নাজায়েজ, এমনকি গর্হিত কাজ বলে মনে করা হয়। ইহুদীরা জুতো পায়ে নামাজ পড়াকে না জায়েয মনে করে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন তাদের বিরোধিতা করতে। জুতোর তলা নাপাক হলে নামাজের মধ্যে আপনি জুতো খুলে বাকী নামাজ কন্টিনিউ করতে পারবেন।
জনসমক্ষে পুরুষদের পোশাক সম্পর্কে কিছু না বলে এ’ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহর রাসূলের প্রাকটিস কী ছিল তা নিয়ে বলছি। ভুল হলে সংশোধন করে দিবেন।
পাবলিক প্লেসে তিনি কখনো খালি গায়ে থাকতেন না, এমন কোনো বর্ণনা আমি পাইনি। তিনি কখনো চাদর গায়ে জড়াতেন। শুধুমাত্র কাঁধের একপাশে চাদর ঝুলিয়ে রাখাকে তিনি অপছন্দ করতেন। চাদর গায়ে দিলে তিনি বুকের অংশ সবসময় ঢেকে রাখতেন এমন কোনো বর্ণনা আমি পাই নি।
কখনো তিনি হাতাওয়ালা জামা পরতেন। উনার জামাতে ৩টা বোতাম থাকতো। এবং সে বোতামগুলো সব সময়ে খোলা থাকতো। উনি সব সময়ে সেলাইবিহীন লুঙ্গি পরতেন। কখনো পাজামা পরতেন না।
একবার সিএসসিএস-এর এক সেমিনারে আমি অংশগ্রহণকারী নারীদের কাছ হতে জানতে চেয়েছিলাম, আচ্ছা, পর্দা করার মাধ্যমে নারীরা টেম্পটেশন নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে পুরুষদেরকে সহযোগিতা করে। একইভাবে পুরুষের প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত আকর্ষণ হতে নারীদেরকে আত্মসংযমে সহযোগিতা করার জন্য দৃষ্টি নত করা ছাড়া পুরুষরা আর কী কী সহযোগিতা করতে পারে?
কথাটা বোঝেন, নারীদের যা যা পুরুষদের আকর্ষণ করে তা সব নারীরা ঢেকে রাখলো। ফাইন। পর্দা যদি নারী-পুরুষ সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়, তাহলে পুরুষদের যেসব শারীরিক বৈশিষ্ট্য নারীদেরকে আকর্ষণ করে, তাদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত টার্ন অন ঘটায়, তা সব আড়াল করাটাও তাহলে পুরুষদের জন্য ফরজ বা ওয়াজিব হওয়ার কথা ছিল।
তা তো হয়নি।
ইসলামী শরিয়ত পুরুষদের জন্য অনুরূপ শর্ত আরোপ করেনি। ও হ্যাঁ, পুরুষদের শরীরের কোন কোন অংশ নারীদেরকে কীভাবে ও কতটুকু আকর্ষণ করে তা তো বলা হয়নি। থাক, না বলি। আপনার পরিবারের মহিলা সদস্যদের জিজ্ঞাসা করে জেনে নিবেন। অথবা, ‘আল্লামা’ গুগল বা ইউটিউবের সহযোগিতা নিতে পারেন।
ছবিতে আমার নাভি যদি দেখা না যেত, অথবা নাভির অংশটুকু ব্লার করে দিয়ে আমার খালি গায়ের আরো ‘আকর্ষণীয়’ যেসব ছবি কৃষক বেলাল ভাইয়ের সাথে ঐদিন তোলা হয়েছিল, তার কোনোটি যদি আমি ফেইসবুকে দিতাম তাহলেও কি কোনো পাঠক আপত্তি তুলতেন? আমার ধারনায় তুলতেন।
কৃষক বেলাল ভাইয়ের ছবিই শুধু যদি দিতাম, পাশে আমার খালি গায়ের ছবি যদি না থাকতো তাহলে কি পাঠকগণ আপত্তি তুলতেন? আমার ধারণা, না, কৃষক ভাইটির খালি গায়ের ছবিতে তারা আপত্তি করতেন না।
হাও ফানি এন্ড রেইসিস্ট মেন্টালিটি …!
আমি তো একজন প্রান্তজনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করার জন্য, উনার গ্লানিবোধ ও অপ্রস্তুত ভাবকে কাটানোর জন্য, উনার সাথে ছবি তোলার জন্য জামা খুলেছি। রকস্টারগিরি করার জন্য তো নয়। এইটুকু বোঝার মতো কমনসেন্সের এত অভাব কেন পড়লো, বুঝতে পারছি না।
আমি বারে বারে বলি, আনপড়া অপরিণত চিন্তার লোকদের অযাচিত সমর্থনের বোঝা হতে আমি মুক্ত হতে চাই।
আমি খুব আমলদার লোক নই। আমি গান শুনি, সিনেমা দেখি। আমি যে ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক-সামাজিক কাজ করি সেই সূত্রে বিপুল সংখ্যক নানা বয়সী নারীর সাথে আমার (অ-ব্যক্তিগত কিন্তু ঘনিষ্ঠ) যোগাযোগ ও সম্পর্ক। আমি চুল লম্বা রাখছি। মাঝে মাঝে ঝুঁটিও বাঁধি। ফালসাফাকে হারাম মনে করা তো দূরের কথা, একে আমি অপরিহার্য গণ্য করি।
বেশ আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী মাহমুদাবাদ সংলগ্ন ফসলের মাঠে আমি একবার কৃষকদের সাথে ধানও কেটেছি। ধান কাটার সময়ে সুবিধার জন্য কৃষকরা পুরো হাতার জামা পরে। তারা যদি সেদিন খালি গায়ে থাকতেন, খুব সম্ভবত আমিও সেদিন তাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশের জন্য জামা খুলে ফেলতাম।
এ’সব কিছু নতুন করে জানার পরে আপনার যদি মনে হয়, আমাকে ফলো করা আপনার জন্য ঠিক না, তাহলে আমাকে আনফ্রেন্ড/আনফলো করুন। ইন দ্যা মিন টাইম, পোস্টে রাসূল(স.)-এর পোশাক নিয়ে খুব সংক্ষেপে যা বললাম তা নিয়ে এবং পুরুষের সো-কল্ড পর্দা নিয়ে যা বললাম তা নিয়ে স্টাডি করুন।
ভালো থাকুন।
