১৯৭১ সালে একটা চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধকে লোকজন মোকাবেলা করেছে। নানা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ঘটনাচক্রে অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে তারা সফল হয়েছে নয় মাস পরে। যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পরে নিজেদের বৈধতার জন্য তৎকালীন প্রবাসী সরকার তিন মূলনীতির ঘোষণা দিয়েছিল। যুদ্ধ-পরবর্তী সরকার এসে ওই তিন মূলনীতির জায়গায় নতুন চার মূলনীতি চাপিয়েছিল।
আক্রান্ত জনগণের কাছে এসব মূলনীতি ছিল অজ্ঞাত অথবা প্রতীকী। তাদের একমাত্র কনসার্ন ছিল আত্মরক্ষা। আক্রমণকারীদের হটানো। যুদ্ধপরবর্তী দেশ কেমন হবে, কী হবে তা নিয়ে আমজনতা বলতে যাদেরকে বোঝায়, তাদের কোনো ধারণা ছিল না। ছিল না কোনো ‘পূর্ব-প্রস্তুতি’। ছিল না রাজনৈতিক ‘নিউক্লিয়াস’ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা।
তারা বরং মনে করতো, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা আসলেই একটা বানোয়াট অভিযোগ। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে শেখ মুজিবকে ফাঁসানোর চেষ্টামাত্র।
আজ পর্যন্ত কোনো ফ্রিডম ফাইটার বলে নাই, চার মূলনীতি কিংবা এর পূর্ববর্তী তিন মূলনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য তারা যুদ্ধ করেছে। চেতনার যত দফা তা সব পরবর্তীতে স্ফুট।
এ’কথাগুলো বলার কারণ হলো, এটি দেখানো, যে কোনো চাপিয়ে দেয়া আগ্রাসন ও জুলুমের বিরুদ্ধে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব/গণঅভ্যুত্থানের পরে আন্দোলনকারীদের ভেতর থেকে একটা গ্রুপ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। জনগণের কাঁধে বন্দুক রেখে শিকার করে। আসল খেলাটা সময় মত খেলে দিয়েছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে ধানমন্ডির ৩২নং বাড়ি যারা আক্রমণ করতে গিয়েছিলো তাদের প্ল্যানের মধ্যে মুজিবকে হত্যা করা ছিল না। আক্রমণে অংশগ্রহণ করা কারো কারো মধ্যে কিন্তু এই প্ল্যান ছিল। তারা সময়মত খেলে দিছে।
একই ঘটনা ঘটেছে ৩০শে মে ১৯৮১ সালে চিটাগাং সার্কিট হাউজে। যারা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল তারা সময়মত খেলে দিয়েছে।
ক’দিন আগে একটা সংস্থা জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছে। একপর্যায়ে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী আমাকে বললো, ‘সমন্বয়কারীরা তো জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছে…’। আমি তীব্র প্রতিবাদ করে বলেছি, ‘যারা জীবন দিয়েছে তারা কি কোনো ম্যান্ডেট সম্পর্কে জানতো? যারা আহত হয়েছে তাদেকে জিজ্ঞাসা করেন, তারা কার কোন ম্যান্ডেট দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল?
বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের মতো আমিও ঘটনার অংশ। কই, কেউ তো আমার কাছে কোনো মেন্ডেট চায় নাই, আমিও কাউকে কোনো ধরনের ম্যান্ডেট দিই নাই। কোনো ধরনের ম্যান্ডেটের চিন্তা আমাদের মাথার মধ্যে আসে নাই। একমাত্র চিন্তা ছিল খুনি স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারকে হটানো।’
আমার এই কথার পরে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী এ’বিষয়ে আর কিছু বলেননি।
আওয়ামী লীগ বাঘের পিঠে সওয়ার হয়েছে। কোনো নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তারা যাবে না। এদেরকে কোনো না কোনো অস্বাভাবিক উপায়ে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। এটি চায়ের দোকানেও বলাবলি হতো। কখন, কীভাবে বারুদের স্তূপে অগ্নিস্ফুলঙ্গের সংযোগ ঘটবে তা কেউ জানতো না। কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরাও যে জানতো না, তা নিশ্চিত।
গোয়ার্তুমি না করে হাসিনা যদি সময়মতো কোটাসংস্কারের দাবী মেনে নিতো অথবা আন্দোলনের মাঝপথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কিছু পুলিশকে বলির পাঁঠা বানিয়ে কিছু একটা করতো, এমনকি পতনের অন্তত দু’একদিন আগেও যদি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে সরাসরি আর্মিকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতো তাহলে ডেফিনিটলি পরিস্থিতি এখন যা হয়েছে তা না হয়ে ভিন্ন রকমের কিছু একটা হতো।
যা-ই হতো তা অতিঅবশ্যই যা হয়েছে তার তুলনায় আওয়ামী লীগের জন্য অধিকতর মঙ্গলজনক হতো।
একইভাবে ইয়াহিয়া খানের ১৯৭১ সালে ২৫শে মার্চ থেকে রাজনীতির বলটা যেভাবে খেলেছে তার থেকে ভিন্নভাবেও খেলতে পারতো। সেক্ষেত্রে ৭ই মার্চের ‘স্বাধীনতা ষোষণা’র কী হতো তা আল্লাহ মা’লুম!
বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর ইদানীংকার কথাবার্তা যা শুনছি তা ভালো মনে হচ্ছে না। এরাও মনে হয় সময়মত ‘খেলে দিবে’। আওয়ামী লীগের সাথে এই আর্মি-সুশীলব্যাকড অন্তর্বর্তীদের একটা দারুণ মিল। এরা জনগণের নির্বাচনী ম্যান্ডেটকে ভয় পায়। এরাও মনে করছে, জনগণ যথেষ্ট ‘শিক্ষিত’ নয়। তাই ‘যথেষ্ট উন্নয়ন ও সংস্কারের’ আগ পর্যন্ত জনগণকে অবাধ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ না দেয়াই যথার্থ।
যুগে যুগে জনবিচ্ছিন্নদের জন্য ক্ষমতা উপভোগ করার অভিন্ন উপায়, এলিটিজম আর মাইনাস ফর্মূলা। আমার ধারণা, অতীতের মাইনাস ফর্মূলার মতো এই সম্ভাব্য মাইনাস ফর্মূলাও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হবে অথবা আরেকটি ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের’ যুগ শুরু হবে। লেটস ওয়েট অ্যান্ড সি।
মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য
Mohammad Tausif Rafi: ভিন্নমতের জন্য দুঃখিত, তবে আমার ধারণা প্রচলিত ব্যবস্থা আসলে গণতান্ত্রিক না। ব্যাপারটা জনগণের শিক্ষার না, সিস্টেমের। মেজরিটি ভোট পাওয়া দলের এবং প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সেই দলের নেতার একাধিপত্যের সুযোগ থাকা গণতান্ত্রিক না।
Mohammad Mozammel Hoque: আপনি বা কেউ যদি মেজরিটি-মাইনরিটির হিসেব না মানেন, তাহলে আপনি নিশ্চয়ই গণতন্ত্রের পক্ষ নন। ‘আমি গণতন্ত্র মানি কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকে গ্রাহ্য করি না, এরকমটা স্ববিরোধী তথা হিপোক্রেটিক অবস্থান। গণতন্ত্রকে আপনি মানবেন কি মানবেন না, সেটা ভিন্ন আলোচনা।
Mohammad Tausif Rafi: আমি যতটা বুঝি, গণতন্ত্র মানে সবার অধিকার এবং প্রতিনিধিত্ব, মেজরিটির আধিপত্য না।
Mohammad Mozammel Hoque: গণতন্ত্রের এই যে ধারণার কথা তুমি বললে, এটা গত আড়াই হাজার বছর ধরে গণতন্ত্রের যেসব রূপ বা কাঠামো জগতে প্রচলিত আছে তার কোনোটার মধ্যে নাই। বরং তোমার মন্তব্যের প্রথম অংশটা প্রতিফলিত হয় দ্বিতীয় অংশটার মাধ্যমে। এটি সমতার জন্য ন্যায্যতার প্রশ্নের মত ব্যাপার।
কোনো একটা কিছুকে যখন আমরা সংজ্ঞায়িত করি তখন অধিকাংশ লোকেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিষয়টাকে যেভাবে বুঝে সেভাবেই আমাদেরকে সংশ্লিষ্ট বিষয়টাকে বুঝতে হবে। কোন তথ্য ও মতবাদের যে নাম সেটার শাব্দিক অর্থ নিয়ে আমাদের মনমতো অর্থ করলে হবে না।
নেভার মাইন্ড প্লিজ মাই ডিয়ার…
