“স্যার, আশা করি আল্লাহর অশেষ রহমতে ভালো আছেন। ‘ইলমুল কালাম’ সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলাম। ইলমুল কালাম সম্পর্কে অনেক বিশেষজ্ঞ বিরোধিতা করেছেন। যেমন, ইমাম শাফিয়ী (রাহ) বলেন, ‘যারা ইলমুল কালাম চর্চা করে তাদের বিষয়ে আমার বিধান এই,
তাদেরকে খেজুরের ডাল ও জুতা দিয়ে পেটাতে হবে। এই অবস্থাতে তাদেরকে মহল্লায় মহল্লায় ও কবীলাসমূহের মধ্যে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে। বলতে হবে, যারা কিতাব ও সুন্নাত ছেড়ে ইলমুল কালামে মনোনিবেশ করে তাদের এ শাস্তি।’
তাহলে কি ইসলামে দর্শন চর্চা হারাম? এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই।’
প্রশ্নটি প্রায় দুই বছর আগের। কেউ একজন আমাকে ইনবক্সে করেছিলেন। এ’বিষয়ে আমি সংক্ষিপ্ত যে উত্তরটি দিয়েছিলাম সেটি নিম্নরূপ-
আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘যা আমি হারাম করেছি তা আমি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছি।’ কালামশাস্ত্র হারাম হওয়ার কোনো কারণ আমি খুঁজে পাই না। তবে ইমাম শাফেয়ি যা বলেছেন সেটা তখনকার যুগে তখনকার প্রেক্ষাপটে সেখানকার কোনো বিশেষ কারণে হতে পারে।
কোনো একটা বিশেষ প্রেক্ষাপটে জায়েজ কোনো বিষয় নাজায়েজ হতে পারে, আবার নাজায়েজ কোনো বিষয় জায়েজ হতে পারে। সেজন্য ব্যতিক্রম কোনোকিছু দেখলে সেটার প্রেক্ষাপট জানাটা জরুরী।
এখানকার সময়ে এসে তখনকার সময়ে ইমাম শাফেয়ী কেন ইলমুল কালামকে নিষিদ্ধ করেছিলেন সেটা জানাটা আমি আমার জন্য খুব একটা জরুরী মনে করছি না। বরং বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছি।
ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহ অন্যতম দার্শনিক স্বীকার্য, এই সত্যের পাশাপাশি এখনকার বিজ্ঞানবাদীদেরকে ঠেকানোর উত্তম উপায় হলো তাদেরকে বিজ্ঞান ও ধর্মের অন্তর্বর্তী ডোমেইন দর্শনে আটকে ফেলা।
ইসলাম ও দর্শনের মধ্যে যে বিরোধ দেখা যায় তার কারণ হলো ভুল বোঝাবুঝি। বিশেষ করে ফিলসফি ইজ হেভিলি মিসআন্ডারস্টুড বাই দ্যা পিপল অব রিলিজিয়ন। এর জন্য দর্শন চর্চাকারীরা প্রধানত দায়ী। লেটস ফেইস ইট।

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য
Abubakar Muhammad Zakaria: “দর্শন হচ্ছে বস্তাপঁচা গোস্ত যা রাখা আছে মাউন্ট এভারেস্টে। উঠাও সহজ না, খেলেও পেটে সয় না।” – বলেছেন একজন সালাফী আলেম, (যার ব্যাপারে ইমাম যাহাবী বলেছেন, আমি রুকনে ইয়ামানী ও হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে শপথ করে বলতে পারবো তার মতো কাউকে দেখিনি। আরো শপথ করে বলতে পারবো তিনিও তার মতো কাউকে দেখেননি।)
Mohammad Mozammel Hoque: এই যে আপনি একটা কথা বলে সেটার পক্ষে একটা রেফারেন্স দিলেন, একটা অথরিটিকে রেফার করলেন, আপনার কথার পক্ষে এবং আমার বিপক্ষে যুক্তি হাজির করলেন in the format of a reference, and have presented the reference as a criterion of justification (in favour of your position), এটি পিওর ফিলসফিক্যাল প্রসেস। এটাই ডুয়িং ফিলসফি।
আপনি বা যে কেউ জীবন ও জগত সম্পর্কে যাই বলেন না কেন, যুক্তি ও পদ্ধতি হিসেবে যা-ই ব্যবহার করেন না কেন, নীতি-নৈতিকতার ব্যাপারে যেই পজিশন গ্রহণ করেন না কেন, সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে আপনার যে অবস্থান থাকুক না কেন, আপনাকে অথবা যে কাউকে সুনির্দিষ্ট গ্রুপ অব ফিলসফারদের সাথে আইডেন্টিফাই করা যাবে। বরং একটা সুনির্দিষ্ট ফিলসফিক্যাল পজিশন থেকেই আপনি কথা বলছেন। হতে পারে আপনি আপনার ফিলসফিক্যাল পজিশন সম্পর্কে সচেতন নন।
মজার ব্যাপার হলো, ফিলসফি লাগবে না, এই কথাটাকেও ফিলসফিক্যাল ওয়েতে বলতে হয়। ‘সমস্যা’ এখানেই।
People do philosophy when they try to refute philosophy, as did Abu Hamid al Ghazali in his ‘Tahafut al-Falasifa’
Zubair Ehsan Hoque: ইবনে তাইমিয়া (রাহ.) দর্শনের প্রচণ্ড বিরোধী ছিলেন। কিন্তু তিনি দর্শন, কালাম, ইহুদিবাদ, খ্রিস্টবাদ সব চিবিয়ে খেয়েছেন। দার্শনিক পন্থায় দর্শন খণ্ডিয়েছেন।
Mohammad Mozammel Hoque: দর্শন হলো একটা পন্থা। কোনো মৌলিক বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি তর্ক হাজির করা। এই দৃষ্টিতে আপনি যেভাবে ইবনে তাইমিয়াকে উপস্থাপন করলেন, ইনিও একজন দার্শনিক। যেভাবে দর্শনকে খণ্ডন করতে গিয়ে ইমাম গাজ্জালী পরিগণিত হয়েছেন সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম দার্শনিক হিসেবে।
Saadi Chowdhury: পড়ালেখা না করা, কুরআন মাজিদ অর্থ না বুঝে পড়া মুসলিম, দর্শন শাস্ত্র পড়ার সাথে সাথে নাস্তিক হয়ে যাবে, তাই ১০০ ভাগ সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার দর্শন শাস্ত্র হতে।
Mohammad Mozammel Hoque: হ্যাঁ, আনপড়াদের নিয়ে অনেক সমস্যা। এর একমাত্র বিকল্প, একমাত্র সমাধান হচ্ছে পড়ালেখা করা। চাইলেই তো চোখ কান বন্ধ রেখে অন্ধ থাকা যায় না। তাই না?
MD Ibrahim Kholil: ওহী আর দর্শনে অনেক সময় বৈপরীত্য দেখা দেয়। যেমন ওযুর কথাটাই বলা যেতে পারে। হাদস হইলে ঐ স্থান না ধুয়ে হাত, মুখ কেন ধুতে হবে। এইখানে যদি কোন দার্শনিক তার দর্শন বা যুক্তি দিয়া ঐ স্থান ধুতে বলে তখন তো সেই দর্শনে দীক্ষিত ব্যক্তি বা দর্শন নিঃসন্দেহে পরিত্যাজ্য হবে। ইমাম শাফেয়ী সেই কথাটাই মূলত বলতে চেয়েছেন।
Mohammad Mozammel Hoque: পরিচ্ছন্নতা এবং পবিত্রতা দুইটা আলাদা জিনিস। আমরা অজু গোসল করি পবিত্রতা অর্জন করার জন্য। পবিত্রতা কীভাবে অর্জন করতে হবে সেটা আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন। পানি দিয়ে পবিত্রতা হাসিল করতে হয় এক তরিকায়, পানির অভাবে পবিত্রতা হাসিল করতে হয় আরেক তরিকায়। উভয় ক্ষেত্রে আমরা আল্লাহর হুকুম তথা প্রপার অথরটির নিয়মকে মেনে চলি। যে বিষয়ে যা অথরিটি সে বিষয়ে সেটাকে মেনে চলাই হচ্ছে যুক্তির দাবি। ওযু এবং তাইয়াম্মুমের ক্ষেত্রে আমরা আমাদের যুক্তির দাবিকেই অনুসরণ করি।
অথরিটিকে মেনে চলার এই সিম্পল যুক্তিটা কেন ‘যুক্তিবিরোধীদের’ মাথায় ঢোকে না, সেটাই আমি বুঝতে পারছি না।
MD Ibrahim Kholil: দর্শন যখন গ্রীক থেকে খিলাফতের মুলুকে আমদানি হইতে ছিলো, তখন ভালো রুপে আবির্ভূত হতে পারেনি। যার কারণে ঈমাম শাফেয়ী এই ফতোয়া দিতে বাধ্য হন।
Mohammad Mozammel Hoque: হতে পারে। তবে তাতে একটা ক্ষতি হয়েছে। পূর্ববর্তী ইমামদের কার্যক্রম, এক দৃষ্টিতে, মাথাব্যথায় মাথাটাই কেটে ফেলার পরামর্শ দেয়ার মতো হয়েছে।
ইলমুল কালাম এসেছে গ্রিকপন্থী (peripathetic) ফিলসফারদের ভুল চিন্তাভাবনাকে যুক্তি দিয়ে মোকাবেলার জন্য। এটাই ছিল সঠিক পদ্ধতি। ইমাম গাজ্জালী এই কৌশল অবলম্বনকারীদের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
মুহাম্মাদ আল আমিন: বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমরা জানি, আমাদের স্যারেরা বরাবরই দর্শনকে বাতিল করে দেয়। সুতরাং বিজ্ঞানবাদীদের দর্শন দিয়ে আটকানো সম্ভব না। অন্যদিকে ইসলামের বিভিন্ন মতাদর্শিক গোষ্ঠী নিজেকে সবসময় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত দাবী করেছে। সুতরাং এই নিয়ে চিন্তার কিছুই নাই, কারণ সবাই হকপন্থী দাবীদার এবং একে অন্যকে খারিজ করে।
Mohammad Mozammel Hoque: বিজ্ঞানের শিক্ষক মাত্রই দর্শনবিরোধী নয়। তবে যারা বিজ্ঞানবাদী তারা দর্শনবিরোধী। যদিও ধার্মিকদেরকে মোকাবেলা করতে গিয়ে বিজ্ঞানবাদীরা দর্শনকে ব্যবহার করে।
Md. Ashrafuzzaman Jony: দর্শন দিয়ে কি ইসলাম ধর্মের পুরোটাই ব্যাখ্যা সম্ভব?
Mohammad Mozammel Hoque: ইসলাম যা কিছু বলে তা পুরোটাই দর্শন। আর দর্শন যা বলে ইসলাম তার একটা অংশ বা এক ধরনের ব্যাখ্যা, ভাষ্য ও পদ্ধতি।
অবশ্য দর্শন সম্পর্কে লোকদের যে খণ্ডিত এবং বিকৃত ধারণা, সেটার নিরসন হওয়ার আগ পর্যন্ত আমার এই ধরনের কথার সাথে লোকেরা একমত হবেন না, এটি স্বাভাবিক। এজন্য দরকার মুখোমুখি, খোলাখুলি ও বিস্তারিত আলাপ আলোচনা।
আমাদের এখানে লোকেরা পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে ফাটাফাটি করতে যতটা আগ্রহী, কোনো কিছু শেখা জানা, বিশেষ করে যাদেরকে তারা বিরোধিতা করে তাদের বক্তব্যটা সঠিকভাবে জানা, এ ব্যাপারে লোকদের আগ্রহের যথেষ্ট ঘাটতি আছে।
এনিওয়ে, ইন্টারেস্টেড পিপলদের সাথে যে কোনো পর্যায়ের ডায়লগে আমি অলওয়েজ ওপেন।
আবু কালাম সরকার: কালামশাস্ত্র নিয়ে যতটুকু জেনেছি, তখনকার সময়ে অনেক লোক এটাকে একত্ববাদের সাথে গুলিয়ে ফেলতো।
Mohammad Mozammel Hoque: মধ্যযুগে মুসলিম চিন্তাবিদদের মধ্যে প্রত্যেক পক্ষ কমবেশি বাড়াবাড়ি করেছে; যাবারিয়া, কাদারিয়া, মুতাজিলা, আশারিয়া, আরো যারা আছে।
একটা চরমপন্থা আর একটা চরমপন্থাকে উদ্বুদ্ধ করে। ওসব পাল্টাপাল্টির জের এখন না টানাই ভালো।
Salahuddin Ayubi: দর্শনচর্চা দূরে থাক, স্যার। আসলে মুসলমানদের পড়াশোনারই কোনো দরকার নাই। পড়াশোনা করে কী হবে? এসএসসির পর পড়াশোনা মানেই লস প্রজেক্ট। শুধু শুধুই সময়, অর্থ সব নষ্ট। এইটা এখন একটা ট্র্যাপ। মুসলমানদের উন্নতি আসলে বিজনেসে। বিজনেস না করতে পারলে মুসলমানদের কোনো গতি নাই।
Mohammad Mozammel Hoque: সবকিছুরই দরকার আছে। কোরআনে বলা হয়েছে, যেকোনো পরিস্থিতিতে একদল লোক থাকা উচিত যারা জ্ঞান গবেষণায় নিয়োজিত থাকবে এবং বাদবাকি লোকদেরকে নানা ধরনের বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করবে। সুরা তাওবাতে এই আয়াতটা আছে।
এই আয়াতের আলোকে থিঙ্ক ট্যাংক সিস্টেম মূলত ইসলামিক সিস্টেম, যদিও মুসলমানরা একে উপেক্ষা করে।
Zahid Hasan Rifat: এছাড়াও ইসলামে কোন কোন ক্ষেত্রে দর্শন খাটবে না সেটা উপলব্ধির জন্যেও তো দর্শন চর্চা জরুরি তাই না?
Mohammad Mozammel Hoque: যুক্তি চলে না, এমন কোনো জায়গা নাই। তবে যুক্তি বলতে আমরা কী বুঝাই, সেটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি আছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমি যখন কোনো বিষয়ে কাউকে বা কোনো কিছুকে অথরিটি হিসেবে মেনে নেই, তাহলে সেই বিষয়ে সেই অথরিটির কথা বা রুলসকে মেনে নেওয়াই হচ্ছে আমার যুক্তির দাবি।
কথাটা আবার রিপিট করে বললে, কোনো বিষয়ে যখন আমি কাউকে অথরিটি হিসেবে মেনে নেই, এরপরে আমি যদি সেই বিষয়ে নিজের খেয়াল খুশি মতো চলতে থাকি, তাহলে সেটা আমার যুক্তির সাথে কন্ট্রাডিক্ট করার মত ব্যাপার।
এই দৃষ্টিতে, যুক্তি চলে না এমন কোনো জায়গা নাই। যেখানে এক ধরনের যুক্তি চলে না সেখানে অন্য ধরনের যুক্তি চলে। ইন আইদার সিচুয়েশন, আমাদেরকে যুক্তির ভিতরই থাকতে হয়।
যুক্তির বাইরে কিছু নাই।
Sarfaraj Islam: কারণ আর যুক্তি এক?
Mohammad Mozammel Hoque: কারণকে আমরা পিছনের দিকে খুঁজে পাই। আর যুক্তিকে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যবহার করি।
পিছনের দিকে তাকালে আমরা যেটাকে দেখি, সেটাকে আমরা বলি কারণ। আর সামনের দিকে তাকালে আমরা যেটাকে পাই সেটাকে আমরা বলি যুক্তি।
মুদ্রার দুই পিঠের মতো এগুলো একই সাথে আলাদা এবং অভিন্ন।
Faruq Bd: আমার প্রশ্ন, ইসলামে সব বিষয়ে যুক্তি চলে?
Mohammad Mozammel Hoque: দুনিয়াতে যুক্তি বুদ্ধির বাইরে কোনো কিছু নাই। তবে যুক্তি বুদ্ধির কথা যারা বলে তারা যুক্তি বুদ্ধির সাধারণত স্থূল (vulgar সেন্সে) প্রয়োগ করেন। সমস্যাটা ওখানে।
যুক্তির এবং বুদ্ধির মূলত স্তরবিন্যাস আছে। এই লজিক্যাল হায়ারার্কিকে বজায় রাখার সাপেক্ষে যুক্তি আমাদের জন্য সর্বক্ষেত্রে এবং সর্বাবস্থাতেই অপরিহার্য বিষয়।
‘যুক্তি লাগবে না’, এই কথাটার পক্ষেও আপনাকে কোনো না কোনো যুক্তি হাজির করতে হবে।
মানুষের চিন্তার পদ্ধতিটাই হচ্ছে যুক্তিভিত্তিক। হতে পারে সে যুক্তি ভুল অথবা সঠিক, দুর্বল কিংবা শক্তিশালী।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যুক্তি কখনো সত্য কিংবা মিথ্যা হয় না।
