কীভাবে করবেন জুলুমের প্রতিবাদ?

একটা সরকারী মেডিকেলের ইন্টার্নি ডাক্তার। ছাত্র গণহত্যা পরবর্তী অব্যাহত জুলুম, নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনায় আর সবার মতো সেও তব্দা খেয়ে গেছে। কীভাবে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। আমার পরামর্শ চেয়েছে ইনবক্সে। তাকে কথা দিয়েছি, কিছু বলবো। তাই লিখছি।

অন্যায় আর জুলুমের প্রতিবাদ কীভাবে করবেন তা নিয়ে বহু আগে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (স.) । তিনি বলেছেন, অত্যাচারী শাসকের মুখের উপর হক কথা বলা হলো অন্যতম শ্রেষ্ঠ জিহাদ। অন্য এক হাদিসে তিনি বলেছেন, তোমার ভাইকে সহযোগিতা করো হোক সে জালিম অথবা মজলুম। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, মজলুমকে কীভাবে সাহায্য করবো তা তো আমরা বুঝি। কিন্তু যালিমকে কীভাবে আমরা সহযোগিতা করবো? তিনি বললেন, যালিমকে যুলুম হতে বিরত রাখো। এটাই তাকে সহযোগিতা করা।

অন্যায় প্রতিরোধের তিনি একটা মেথডলজি শিখিয়ে গেছেন।

তিনি বলেছেন, তোমরা অন্যায়কে মোকাবিলা করো। শক্তি থাকলে হাতে বাধা দাও। না পারলে মুখে প্রতিবাদ করো। তাও না পারলে অন্তরে ঘৃণা করো। এটি ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।

রাসূল (স.) এবং তাঁর সাহাবীদের জীবনী পড়লে আমরা দেখতে পাই, উনারা সাধ্যের বাইরে গিয়ে অন্যায়ের মোকাবেলা করেন নাই। যেই যুদ্ধে জেতার কোনো সম্ভবনা নাই সেই যুদ্ধ বা সংঘর্ষকে উনারা যথাসম্ভব এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। তৎসত্ত্বেও ঘাড়ের উপর এসে পড়েছে, এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণকে উনারা সর্বশক্তি দিয়ে মোকাবেলা করেছেন।

মক্কাতে উনার শক্তি ছিল না। তাই তিনি সেখানে প্রতিরোধ করেননি। মদিনাতে গিয়ে উনি শক্তি সঞ্চয় করে প্রতিরোধ করেছেন। উনাকে হত্যা করার যখন ষড়যন্ত্র করা হচ্ছিলো তখন তিনি শহীদ হওয়ার জন্য নিজের ঘরে শুয়ে ছিলেন না। বরং মদিনাতে হিজরত করেছেন।

শক্তির চরম ভারসাম্যহীনতার সময়ে সাহাবীগণও হেকমত অবলম্বন করেছেন।

আমীর মুয়াবিয়া (রা.) উনার ছেলে ইয়াজিদের পক্ষে বায়আত গ্রহণের জন্য উনার মৃত্যুর আগে মদিনাতে আসেন। সেখানে তিনি একদিন তিন আবদুল্লাহসহ মদিনার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে মসজিদে নববীতে জমায়েত করেন। তিন আবদুল্লাহ মানে আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়ের (রা.) ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) । এরপর মিম্বরে দাঁড়িয়ে নিজের তলোয়ার উঁচিয়ে তিনি বললেন, হে মদিনাবাসী, তোমাদের মধ্যকার এই তিন যুবককে তো তোমরা মানো। তারা তিনজনই ইয়াজিদের পক্ষে ইতোমধ্যে আমার কাছে বায়াত গ্রহণ করেছে। তোমরাও বায়াত করো।

এই কথা শুনে উপস্থিত লোকেরা ইয়াজিদের পক্ষে বায়াত গ্রহণ করলো। মুয়াবিয়ার ঐ দাবীটা ছিল মিথ্যা। কোনো আবদুল্লাহই বায়াত করেননি। অথচ, তাঁরা এর কোনো প্রতিবাদও করেননি। নিরব ছিলেন। পরে তাঁরা মদিনা থেকে পালিয়ে মক্কায় চলে যান।

এই ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, প্রতিরোধ বা প্রতিবাদের পথে না গেলেই কেউ ঈমানের সর্বশেষ স্তরে চলে গেলো, ব্যাপারটা ঠিক এমন যান্ত্রিক না। আজকের নিরবতা হতে পারে কারো প্রতিরোধ শক্তি সঞ্চয়ের উপায়। সদ্য ইসলামগ্রহণকারী যে সাহাবী নিজের ঈমানকে গোপন করে খন্দকের যুদ্ধে কূটনীতির মাধ্যমে শত্রুপক্ষে ভাঙ্গন ধরিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর কাজটিও ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্র্যাটেজিক। একজন স্ট্র্যাটেজিক ব্যক্তি যা করতে পারেন তা অন্য করো পক্ষে করা সম্ভব হয় না।

সবাইকে এবং সবকিছুকে ঠিক একপাল্লাতে মাপা যায় না। মোকাবেলার ক্ষেত্রে কোনটা কৌশল, কোনটা ভীরুতা, তা ময়দানের পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান ও নিয়ত এবং সামগ্রিক বিবেচনা অনুসারে নির্ণীত হওয়া উচিত।

তারপরও কথা থেকে যায়।

সাহসীদেরকে অবশ্য ঠেকিয়ে রাখা যায় না। পরামর্শ দিয়ে কাউকে সাহসী বানানো যায় না। ইসলাম গ্রহণের পরে হযরত উমর (রা.) তলোয়ার নিয়ে প্রকাশ্যে চিৎকার করতে করতে কাবা তাওয়াফ করেছেন। এ’কাজে উনাকে রাসূলুল্লাহ (স.) অনুমতিও দেন নাই, নিষেধও করেন নাই।

তাই শুধু খেয়াল রাখতে হবে সাহসিকতার সাথে ফেতনাসৃষ্টির পার্থক্যটুকু। নিয়তের বিচার আল্লাহর হাতে। ভীরুরা সংখ্যামাত্র। সাহসীদের জন্যই দুনিয়া।

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Abubakar Muhammad Zakaria: আপনি মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর নামে যা বলেছেন সেটাও মিথ্যা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “একজন মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে সে যা শুনবে তাই বলে বেড়াবে।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৫)

আপনাকে সজ্জন হিসাবে জানি, কিন্তু অনুরোধ থাকবে শিয়াদের বর্ণনা গ্রহণ করে কোনো সাহাবী বিশেষ করে মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, তাঁর বাবা আবু সুফিয়ান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, তাঁর মা হিন্দ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা, আমর ইবনুল আস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুসহ কোনো সাহাবীর ব্যাপারে এমন বেফাঁস মন্তব্য করবেন না।

Mohammad Mozammel Hoque: সালাম নিবেন। যে বিষয়ে আপনি আপত্তি করেছেন সে বিষয়ে আপনার সাথে আমি এনগেইজ হতে চাচ্ছি না। আপনারা মানে আলেম উলামারা এ’সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। আমি খুব সম্ভবত মুফতি আমীমুল ইহসানের তারিখে ইসলাম বা এ’ধরনের নামের কোনো বইয়ে তিন আব্দুল্লাহর ঘটনাটা পড়েছি। যতদূর জানি, মুফতি আমীমুল ইহসান বায়তুল মোকাররমের খতীব ছিলেন। উনার বইটা দাখিল পর্যায়ে পাঠ্য ছিল।

সে যাই হোক, দেশের চলমান গণহত্যা ও গণবিক্ষোভ নিয়ে আপনার বক্তব্য কী? আমি সঠিক জানি না, তাই জানতে চাচ্ছি।

নিত্যানন্দ চট্টোপাধ্যায়: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের গ্রেফতারের নিন্দা ও অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়ে চবির ৫৪ শিক্ষক বিবৃতি দিয়েছেন। সেখানে আপনিসহ দর্শন বিভাগের কোনো শিক্ষকের নাম দেখলাম না। এটা দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জা।

এ বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখছেন।

Mohammad Mozammel Hoque: ৫৪ জন সহকর্মী স্বাক্ষরিত উদ্যোগটির কথা আমি জানতাম না। কেউ আমার কাছে বলে নাই। স্বাক্ষর করবো কিনা জিজ্ঞাসা করে নাই। জানলে তো অবশ্যই পার্টিসিপেট করতাম। এরকম আরেকটি পরবর্তী উদ্যোগে আমি শরীক হয়েছি।

কেউ যদি ভবিষ্যতে কোনো ধরনের উদ্যোগের কথা জানতে পারেন, কোনো না কোনোভাবে আমাকে জানাবেন। অনুরোধ রইলো।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *