ভালোবাসার চাদর

বকুল ভাই। মোহাম্মদ বকুল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা প্রহরী। অবসর সময়ে চবি পোস্ট অফিসের পাশে বসে বিক্রি করেন লুঙ্গি, গেঞ্জি, গামছা ইত্যাদি। দাম ফিক্সড। বরং যা বলেন তার থেকে কিছুটা কমিয়ে রাখেন।

সেদিন আমি উনার কাছ থেকে দুইটা পাতলা গেঞ্জি চাইলাম। উনি বললেন, ‘এখন নাই। আমি আগামীকাল আপনার বাসায় দিয়ে আসব।’

পরদিন গেঞ্জি নিয়ে উনি আসলেন। গেঞ্জির সাথে উনি একটা কালো রঙের চাদর আমাকে দিয়ে বললেন, ‘এটা নেন’। আমি বললাম, ‘আমি তো চাদরের কথা বলি নাই’। উনি বললেন, ‘আমি আপনাকে এইটা গিফট করতেছি’।

আমি এই খাদি কাপড়ের চাদরটা নেয়ার জন্য কোনোভাবেই রাজি হচ্ছিলাম না। বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি নিতে পারি এক শর্তে, যদি আপনি এটার অন্তত ক্রয়মূল্যটা নেন’। আমার এই কথাবার্তার ফাঁকে খেয়াল করলাম উনি চুপ করে আছেন। কোনো কথা বলছেন না।

এক পর্যায়ে আমি উনার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি, উনার চোখে পানি টলমল করছে। আমি ভয় পেয়ে গিয়ে বললাম, ‘ঠিক আছে বকুল ভাই, আমি এটা নিচ্ছি’।

পরের দিন গেঞ্জির টাকা পরিশোধ করার জন্য আবার উনার দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। উনার সাথে ছবি তুললাম। যাওয়ার সময়ে উনি আমার গাড়ির কাছে এসে ভারী গলায় বললেন, ‘—এর ছেলেরা আমার কাছ থেকে অন্ততপক্ষে দুই-আড়াইশো চাদর এমনি নিয়ে গেছে। গায়ে দিয়ে তারা চলে যেত। টাকা চাওয়ার সাহস ছিল না। অথচ, আপনাকে আমি একটা চাদর দিছি, আপনি নিতে আপত্তি করছেন…!’

তখন উনাকে আমি আশ্বস্থ করে বললাম, ‘আপনি মনে কষ্ট নিবেন না। চাদরটা আমি খুশি মনে নিয়েছি। আমি এটা পরবো।’ এই সেই ভালোবাসার চাদর, আর আমাদের বকুল ভাই, একজন সাদা মনের মানুষ।

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Murshed Jahid: ভালবাসার উপহারকে টাকা মূল্যায়িত করা যায় না। আপনাদেরকে আল্লাহ নেক হায়াত দান করুন।

Mohammad Mozammel Hoque: হ্যাঁ, ঠিক তাই। মূল্য পরিশোধের জন্য চাপাচাপি করতে গিয়ে আমি আসলে উনার আন্তরিকতাকে অপমান করছিলাম। এটা ভুল ছিল। এটা আমি পরে বুঝতে পেরেছি। ভালোবাসার মূল্য টাকা দিয়ে পরিশোধ করা যায় না।

Obscure Hamidur: পড়তে পড়তে চোখে পানি এসে গিয়েছিলো।

Mohammad Mozammel Hoque: হ্যাঁ, ওনার চোখে পানি দেখে আমারও খুব খারাপ লাগছিল। আমার ওয়াইফের চোখেও পানি এসেছিল। আসলে কত লোক যে আমাদেরকে ভালোবাসে। যদিও আমরা এ’সবের উপযুক্ত নই, তারপরও তাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়। আল্লাহ তাদেরকে তাদের এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসার উত্তম প্রতিদান দান করুন, আমীন।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *