সাল ২০৭৫। মাস জানুয়ারি। ত্রিবিংশতম দিবস।

আজ থেকে ৫০ বছর পরে। থাকবে না এই দোতলা বাড়ি। এই জায়গাতে হয়তো হবে নতুন অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। অথবা সম্প্রসারিত হবে রাস্তা। অথবা মাঠ। ছুটবে গাড়ি অথবা খেলবে এলাকার দেবশিশু আর উঠতি কিশোরেরা। তুমুল।

আজ থেকে ৫০ বছর পরে।

ফতেপুর গ্রামের মৌজা ‘জঙ্গল পশ্চিম পট্টি’র একাংশ বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠার মতো বদলে যাবে এই এলাকার মানচিত্র। শান্ত সমাহিত এই সবুজের অরণ্য হয়তো থাকবে না আর। বদলে যাবে সবকিছু। যেভাবে দূরের ওই পাহাড় সংলগ্ন ‘বালুর মাঠ’ হারিয়ে গেছে। গড়ে উঠেছে সেখানে বহুতল ভবন। ৬ নম্বর বিল্ডিং।

বছর বিশেক আগে। ব্যাচেলর ডরমেটরি ফ্ল্যাট পার্শ্ববর্তী রাস্তায় মুখোমুখি হয়েছিলাম এক মেছো বাঘের। তখন রাত ন’টা। এখন এমন দৃশ্য অকল্পনীয়। নেই সেই সব বন্য প্রাণী। ধ্বংস হয়েছে তাদের আবাসস্থল।

আমাদের বাসার চারপাশে উঁচু পাহাড়। ঘন জঙ্গলে ঢাকা পাখিদের অভয়ারণ্য। বৃক্ষঠাঁসা পরিবেশ। এ’সবকিছু হয়তো থাকবে না আর। থাকবো না আমি। থাকবে না তুমি। থাকবে না আমাদের এই সংসার। আজ থেকে ৫০ বছর পরে।

এই ক্যাম্পাসে ছিলেন কত স্বনামধন্য অধ্যাপক। এইসব বাংলো বাড়িতে তারা থাকতেন কত দাপটে। তাদের সব আভিজাত্য নিয়ে। আজ তারা নেই। প্রায় সবাই চলে গেছেন মৃত্যুর ওপারে। আমরাও চলে যাবো। চাকরি থেকে এক দশকের ভিতরে। জীবন থেকে অনধিক ৫০ বছরে।

নিজেকে আমি দেখি আমিহীন এক পৃথিবী হতে। কল্পনায়। আনমনে। প্রতিদিন ভোরে জেগে উঠি, যেন আমি প্রাপ্তবয়স্ক এক নতুন শিশু। বোঝার চেষ্টা করি, মেনে নেই, অন্তত নেওয়ার চেষ্টা করি, আমাদের সেই পৃথিবী আর নেই। হারিয়ে গেছে কত শত প্রিয়মুখ। এই পৃথিবী আজ অন্যের। এখনকার যারা, এই নবাগতরা, এরাও মুছে যাবে তাদের চেনাজানা পৃথিবী হতে, আজ থেকে শতবর্ষ পরে।

ভাবতে ভালো লাগে, জীবনের এই কাফেলায় আমিও ছিলাম। ছিলাম এই আনন্দময়তার শরিক। ছিলাম এই নিরন্তর প্রাণপ্রবাহের মধ্যে ডুবে। সুখদুঃখ হাসি-বেদনার এই জীবননদীতে, আমিও সাঁতার কেটেছি অবাধে, কিছু দিন ভেসেছি সুখে। চলেছি‌ অনেকখানি পথ। শুকরিয়া হাজার!

আজ থেকে ৫০ বছর পরে, ২০৭৫ সালের কোনো এক ভোরে আমার এই লেখা কেউ পড়বে কিনা, জানি না। শুধু এতটুকু জানি, তদ্দিনে মুছে যাব আমি, মুছে যাবে আমাদের সব চিহ্ন, স্মৃতি। উত্তরপ্রজন্মের ভিড়ে হারিয়ে যাবো। নাই হয়ে থাকবো কবরে‌।

আজ থেকে ৫০ বছর পরে।

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Shakil Mia: একটি চমৎকার কবিতা পড়লাম। মনে হলো কবিতার শিরোনাম “আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে ২০৭৫” সবকিছুই পরিবর্তিত হয় কিন্তু তা ক্ষণস্থায়ীভাবে। এটাই জগতের শৃঙ্খলার চাবিকাঠি। যে, একটা চাবি মাইরা দিলাম ছাইড়া। তবুও স্মৃতিকথাই মানুষকে আশাবাদী করে, স্মৃতিকথাই মানুষকে সচেতনভাবে বেঁচে থাকার আনন্দ খুঁজে দেয়।

Mohammad Mozammel Hoque: জীবনের পরিণতি অনিবার্য! তবুও স্বপ্ন, তবুও স্মৃতি, তবুও বিস্মৃতি, বাঁচিয়ে রাখে আমাদের.…!

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *