ইন্নালিল্লাহ পড়তে হয় মৃত্যু সংবাদ শুনে। ভাইজানের মৃত্যুতে আমি ইন্নালিল্লাহ পড়ি নাই। অদ্যাবধি। কসম আল্লাহর, আমি বিশ্বাস করি না, ভাইজান মৃত্যুবরণ করেছেন। যদিও আমি নিজ হাতে উনাকে শুইয়ে দিয়েছি কবরে।
এত বছর জ্ঞানতত্ত্ব পড়িয়েও আমি জ্ঞান আর গভীরবোধের পার্থক্য এতটা বেশি করে অনুভব করিনি কখনো।
এখন আমি বুঝতে পারছি পবিত্র কোরআনের সূরা তাকাছুরে বর্ণিত ‘আইনুল ইয়াকিন’ (চোখে দেখার ভিত্তিতে বিশ্বাস) আর ‘হাক্কুল ইয়াকিন’ (অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস), এই দুই ধরনের বিশ্বাসের পার্থক্য।
গত মঙ্গলবারের পর থেকে এ’পর্যন্ত একটি মুহূর্তের জন্যেও মনে হয়নি, তিনি নাই। মনে হচ্ছে তিনি আছেন। এই তো দেখা হবে। কথা হবে। টেলিফোনে অথবা পারিবারিক আড্ডায়। ভাইজানের মৃত্যু উপলক্ষে আমরা যা কিছু করেছি তা সবকিছু যেন স্ক্রিপ্টেড নাটকের রোল, যা আমরা ক্রমাগতভাবে পারফর্ম করে গেছি। আসলে এসব কিছু সত্যি নয়।
কয়েকদিন পরে গতকাল ডিপার্টমেন্টে গিয়েছি। ফ্যাকাল্টিতে যাওয়ার জন্য বের হতে দেখি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ঘন সবুজ আবহে শেষ বর্ষার অবারিত সৌন্দর্য। সকাল থেকে কড়া রোদ। পূব আকাশে ঘন সাদা মেঘপুঞ্জ। শত সহস্র ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনায় জমজমাট কাটা পাহাড়ের রাস্তা, পুরো ক্যাম্পাস।
যেদিকে তাকাই দেখি সবকিছু চলছে যথারীতি নিত্যকার স্বাভাবিক ছন্দে। শুধু আমার মত এক দুর্ভাগার জীবনে ঘটে গেছে বিশাল দুর্ঘটনা। ঘটেছে বিরাট ছন্দপতন। বিদ্ধ হয়েছে এই হৃদয়ে অন্তহীন বেদনার এক বিষাক্ত তীর। যে বোঝার সেই শুধু বোঝে, কিছু কিছু কষ্ট এমন, যত দিন যায় তত বাড়ে। হয়ে ওঠে ক্রমাগত অসহনীয়।
বারবার মনে পড়ে এই কথাটুকু, ‘জীবনের পরিণতি অনিবার্য। তবুও স্বপ্ন, তবুও স্মৃতি, তবুও বিস্মৃতি বাঁচিয়ে রাখে আমাদের।’
ভাইজানের মতো আমিও একদিন হয়তোবা এভাবে ঘুমিয়ে পড়বো। লোকেরা বলবে, ‘বিশ্বাস হচ্ছে না, মানুষটা নেই। মনে হচ্ছে যেন ঘুমিয়ে আছে…!’ এরপর সাদা কাফনে মুড়িয়ে শুইয়ে দিবে কবরে। পুরান পুকুর পাড়ে, বাবার কবরের উপরে। হয়তোবা সহসাই, কিম্বা ক’দিন পরে, কে জানে …!
আজ থেকে ঠিক ৫০ বছর পরে আমাদের জেনারেশনের কেউ থাকবে না বেঁচে। নাই হয়ে থাকবো আমরা মৃত্তিকার সাথে মিশে। এই জমিনের ‘পরে আজ থেকে অর্ধশতকে, থাকবে না আমাদের মিত্রদের কেউ। থাকবে না আমাদের কোনো শত্রু। থাকবে না আমাদের পরিচিত অপরিচিত কোনো মানুষ। নবাগতদের উচ্চকিত ভিড়ে হারিয়ে যাবো আমরা। মুছে যাবে আমাদের সব স্মৃতি। আগামীর সন্তানেরা চাষ করবে এই পৃথিবী। জীবনের এই জমিন।
ভাইজান, মোহাম্মদ মাহফুজুল হক। বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন সচিব। আমার বাবা-মায়ের ১০ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ জন। ছেলে সন্তানদের মধ্যে বড়। তাঁর বড় মেয়ের প্রথম সন্তান সায়হান। দ্বিতীয় সন্তান শিশু আরমান।
এই পৃথিবী এখন তাদের। এই পৃথিবীতে আমরা এখন সময় ফুরিয়ে যাওয়া মেহমান। যেন মেয়াদউত্তীর্ণ আগন্তুকের দল। জীবনের বৃত্ত পূর্ণ করা আমরা এখন যেন বৃন্তচ্যূত পরিপক্ক ফল।
স্মৃতির উল্টো পথে নিজেদেরকে আমরা খুঁজে পাই বাবা-মার সংসারে ছোট্ট শিশু হিসেবে। এরপর আমরা বেড়ে উঠেছি। আমাদের হয়েছে সন্তানাদি। আমাদের সন্তানদের ঘরে যখন সন্তান হওয়া শুরু হয়েছে তখন আমাদের বিদায়ের পালা।
এই পৃথিবী এখন সায়হান আরমানদের মত শিশুদের। জীবনবৃত্ত পূর্ণ হয়েছে আমাদের। সময় ফুরিয়েছে আত্মপ্রজন্মের। আমাদেরকে যেতে হবে, ‘নবাগতদের জন্য ছেড়ে দিয়ে স্থান’। দিনক্ষণ, অনিশ্চিত। যাওয়াটা শুধু নিশ্চিত। নিয়ম। পৃথিবীর এই আজন্ম নিয়মের নেই কোনো ব্যতিক্রম!
