আক্বলমান্দ কে লিয়ে ইশারায়ই কা-ফি!

কখনো কখনো সন তারিখ আমার ঠিক মনে থাকে না। ততদিনে হামিদ হোসেন আজাদ ভাই ঢাকা মহানগর সভাপতি হিসেবে ঢাকায় ট্রান্সফার হয়ে গেছেন। হামিদুর রহমান আজাদ ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সভাপতি। মাস্টার্স পরীক্ষার আগে আলাওল হলের একটা সিঙ্গেল রুমে থেকে পড়াশোনা করেছিলেন কিছুদিন। দায়িত্বশীলরা ছাড়া অন্য কেউ সেটা জানতো না।

তখনকার সময়ে আমরা শুধুমাত্র এফ রহমান হলের সংসদরুমে প্রোগ্রাম করতাম। কারণ সেখানকার ভিপি রেজাউল করিম খন্দকার ভাই ছিলেন হল সভাপতি। সেখানে এক সদস্য বৈঠক শুরু হওয়ার আগে অনুযোগের সুরে হামিদ ভাই তৎকালীন আলাওল হলের দায়িত্বশীলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘এনুয়াল ফিস্টে আপনারা তো শাখা সভাপতিকে দাওয়াত করেন নাই! আমি সে রাত্রে না খেয়ে ছিলাম!’

জবাবে নেছার ভাই বলেছিলেন, ‘আপনি তো এই হলের আবাসিক ছাত্র নন। আপনাকে কিভাবে খাওয়াবো? একটা গেস্ট টোকেন কাউকে দিয়ে কিনে রাখলে আপনি খেতে পারতেন।’

দ্বিতীয়বার হল সভাপতি করার পরে রেজাউল করিম খন্দকার ভাইকে যখন শপথ পড়ানোর জন্য দুই জন দুই পাশে ধরে তুলছিলেন, সেন্ট্রাল মসজিদের দোতলার দক্ষিণ দিকে, তখন উনার শার্ট উঠে যায় খানিকটা। উনি কাঁদছিলেন। দেখা গেল, উনার প্যান্ট ছেঁড়া। বেল্টের পরিবর্তে একটা সুতার দড়ি দিয়ে কোমর বাঁধা।

পাস করে যাবার কিছুদিন পরে এফ আর হলের ক্যান্টিন ম্যানেজারের কাছে উনি কিছু টাকা পাঠিয়েছিলেন। ৫০০ টাকার মতো। পাওনা পরিশোধের জন্যে।

ইনডেক্স ভর্তি গাইড আমরা দোকানে দিতাম কমিশনের বিনিময়ে বিক্রি করার জন্য। শাহজালাল হলের আজহার ভাই। খুব সম্ভবত ফিজিক্সে পড়তেন। উনার একটা হাত কনুইয়ের উপর থেকে ছোটবেলায় কেটে ফেলতে হয়েছিল কোনো কারনে। উনি আমাদের বললেন, আমি কিছু ইনডেক্স বিক্রি করব। আমার টাকার দরকার।

এখনো আমার চোখে ভাসে, ফ্যাকাল্টিতে রোদের মধ্যে একটা ছোট্ট টেবিল নিয়ে উনি বসে আছেন, ইনডেক্স ভর্তি গাইড এর কিছু কপি নিয়ে।

সিলেট কিংবা মৌলভীবাজারের শাহিন ভাই। সংগঠনের সাথী। পড়তেন ফরেস্ট্রিতে। থাকতেন শাহজালাল হলের ৩১৩ নম্বর রুমে। উনার বিছানায় কোনো তোষক ছিল না। একটা চাদর বিছিয়ে উনি ঘুমাতেন।

মাঝে মাঝে এমন হতো, আমরা যখন দোকানে খেতাম তখন দোকানদার হিসাব লিখে রাখতো। অথবা, আমরা খেয়ে চলে যেতাম। হিসাব আমরা রুমে গিয়ে একটা ডায়েরীতে লিখে রাখতাম। মাস শেষে খরচের টাকা থেকে দোকানদারের দাবি মোতাবেক আমরা টাকা দিয়ে দিতাম। অথবা আমরা যে পরিমাণ টাকা আমরা দিতাম দোকানদার সেই টাকাটাই প্রাপ্য মনে করে নিতো।

হিসাব ঠিকমতো লেখা হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে কোনো পক্ষের মধ্যে সামান্যতম সন্দেহ, প্রশ্ন কিংবা অবিশ্বাস ছিল না।

আমি একবার দুই নম্বর গেইটে বিরোধীপক্ষের একটা সশস্ত্র গ্রুপের সামনে পড়ে যাই, হল ভেকেইটের পরে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার আগের দিন সন্ধ্যারাতে। আগে থেকে আশঙ্কা ও প্রস্তুতি ছিল। তাদেরকে দেখামাত্র আমি পকেট থেকে সিগারেট আর লাইটার বের করলাম। এরপর সিগারেটে টান দিতে দিতে তাদের সামনে দিয়ে পার হয়ে গেলাম। তারা আমাকে চ্যালেঞ্জ করে নাই। অথচ আমি দেখতে ছিলাম একেবারেই টিপিক্যাল শিবির। সিগারেট খাইতে দেখে তারা মনে করেছে, এই ছেলে শিবির হতে পারে না।

হলে যখন শিবিরের ছেলেরা মেস চালানোর দায়িত্ব নিতো তখন সাধারণ ছাত্র এবং প্রশাসনের মধ্যে একটা খুশির ভাব ফুটে উঠতো। কারণ মাস শেষে একটা বড় ধরনের ফিস্ট হতো, সেখানে প্লেটের নিচে হলের নাম লেখা থাকতো। খাবার পরে প্রত্যেকে যার যার প্লেট গ্লাস নিয়ে যাওয়ার রেওয়াজ ছিল। সাথে আরো কিছু উপহার সামগ্রী দেয়া হত। কর্মচারীদেরকে কাপড় চোপড় ইত্যাদি দেয়া হতো।

অন্য পার্টির ছেলেরা যখন মেস পরিচালনার দায়িত্ব নিতো, তখন …., অনুমান করতে পারেন, কী হতো! না বলি।

ভিন্ন মতাদর্শের শিক্ষকরা হলে দায়িত্ব পালনের জন্য আসতেন প্রভোস্ট হাউস-টিউটর হয়ে। মেয়াদ শেষে উনারা হয়ে যেতেন আট আনা, বারো আনা, কেউ কেউ ষোলো আনা শিবির।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবির যা অর্জন করেছে তা যথাযথ মূল্য দিয়েই পেয়েছে। যা হারিয়েছে (আমাদের পরবর্তীকালে) তা ছিল অনিবার্য।

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Abu Zafor Mohammad Musa: মাশাআল্লাহ অতীতের সোনালী কথাগুলো চমৎকারভাবে তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ ভাই। মেরিন সায়েন্সের কেউ আছেন?

Mohammad Mozammel Hoque: আমরা শিক্ষক হবার ক’বছর পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি হয়েছেন, পরে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি হয়েছেন, এমন একজন দায়িত্বশীলসহ পরবর্তীকালের অনেকেই আমাদেরকে বলতেন, ‘রাখেন আপনাদের এসব সোনালী দিনের কাহিনী। …. আপনাদের এগুলো আমরা শুনতে চাই না…!’ আমাদেরকে বলতে, নেছারুল করিম ভাই এবং আমাকে।

‘বিশেষ কমিটি’র এক বৈঠকে একবার তাদের দায়িত্বশীলরা রিপোর্ট করলো, আমানত হলে অন্য সংগঠনের আছে পাঁচজন। শাহজালাল হলে চারজন। আলাওল হলে তিনজন। রব হলে সাতজন, এরকম। প্রোগ্রামটা হয়েছিল কেন্দ্রীয় মসজিদের নিচের তলার উত্তর দিকে, সিদ্দিকুল্লাহ হুজুরের রুমের পাশে।

তখনই আমি তাদেরকে বলেছিলাম, ‘এটা একটা বিরাট রেড সাইন! সাবধান!’

খুব সম্ভবত তখনো আমাদেরকে ‘সোনালী দিনের কাহিনী’র কথা বলে তারা মক করেছিল। বিশেষ করে আমাদের কাছাকাছি বয়সের সেই দায়িত্বশীল এ’ধরনের কথা আমাদেরকে প্রায়ই বলতেন, আমার স্পষ্ট মনে আছে।

Tahera Umm Musanna: এসব কথা যখন আব্বু বলতেন শুনতেই ভালো লাগতো। আহ্!

কিন্তু অভিযোগের সুরেই বলছি (যেহেতু আব্বু আপনার জুনিয়র, আপনাকে অনেক বেশি সম্মান করেন এবং ভালোও বাসেন) আব্বু আমাকে চবিতে ভর্তি পরীক্ষা দিতেই দেন নি। এমনকি মেডিকেলে চান্স পাওয়ার পরে আর কোনো ভর্তি পরীক্ষায় বসতেই দেন নি। নিজের সাথে সাথে নিয়ে ঘুরতেন, অনেক বেশি তৃপ্ত ছিলেন তখন।

Mohammad Mozammel Hoque: তোমার বাবার মত আপাদমস্তক স্বচ্ছ মনের সরল মানুষ, যারা হলেন ম্যান অফ ইন্টেগ্রিটি, যাদেরকে আমরা মাঝে মাঝে সুশীলসুলভ তাচ্ছিল্য সহকারে বলি, ‘টিপিক্যাল জামাত’, এরা আছে বলেই সংগঠন টিকে আছে। সংগঠন নামক জাহাজটাকে তারা সঠিকভাবে চালাতে না পারলেও জাহাজটাকে তারা ভাসিয়ে রেখেছেন। সহজ, সরল ও প্রবল ন্যায়নীতিসম্পন্ন এই বিপুল জনগোষ্ঠী অপেক্ষায় আছেন, কখন অধিকতর যোগ্য মানুষেরা এই জাহাজের হাল ধরবেন।

আল্লাহ তাদের এবং আমাদের সবাইকে রহম করুন, আমীন।

Abu Muaz: অথচ আজ আমরা যারা বৃহত্তর ইসলামী আন্দোলন করি তারা শুধু এসব বক্তব্য দেই, বুলি আওড়াই, তোতা পাখির মতো রিপিট করি, মৌখিক স্বীকৃতি পর্যন্তই যথেষ্ট মনে করি। আমার কেন জানি মনে হয় আমরা আমাদের সেই সোনালী অতীত থেকে দিন দিন দূরে চলে যাচ্ছি।

ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্তরিকতা, রুহামা অ-বাইনাহুম, খুলুসিয়াত বাদ দিয়ে ব্যাক্তি স্বাধীনতার নামে ব্যক্তিকে খুশি করায় ব্যস্ত সময় পার করতে করতে প্রকৃত আনুগত্য থেকে সরে গিয়ে অন্ধ আনুগত্যের দিকে ধাবিত হচ্ছি।

Mohammad Mozammel Hoque: এখন সেটআপের পরে মিষ্টি বিতরণ হয়। ফুলের তোড়া নিয়ে তাদেরকে বরণ করা হয়। তারা ফুলের তোড়া নিয়ে উর্ধ্বতন সংগঠনের কাছে দেখা করতে যায়। এগুলো আমাদের সময়ে দুঃস্বপ্নেও কল্পনাযোগ্য ছিল না।

মনে শংকা জাগে, ক’দিন পরে সাংগঠনিক পদ পদবীর জন্য প্রকাশ্যে লবিং হবে। ফেইসবুকে পোস্ট হবে, অমুক ভাইকে অমুক পদে চাই। সংগঠন ক্রমে পার্টি হয়ে উঠবে।

Rtn Masbah Uddin Nayeem: স্যার প্রকাশ্য লবিং, দ্বন্দ্ব অলরেডি কোন কোন এলাকায় চলছে। তাঁর সর্বশেষ চিত্র কুমিল্লার চান্দিনায়।

Mohammad Mozammel Hoque: চান্দিনার ঘটনা আমি ঠিক জানি না। তবে যেই পথে চলছে সেই পথে এটা হতেই পারে।

সাংগঠনিক কাঠামো হচ্ছে আদর্শবাদী রাজনীতির জন্য উপযোগী। আর সংগঠন চলছে ক্ষমতার রাজনীতির পথে। এইটা একটা মিসম্যাচ ঘটাবেই।

তার চেয়ে বরং উচিত ছিল, মূল সংগঠন আমব্রেলা অর্গানাইজেশন হিসেবে থেকে এক বা একাধিক পলিটিকাল উইং করা। সে যাই হোক, আল্লাহ আমাদের সবাইকে রহম করুন, আমিন।

Sakib Khan: এক বামপন্থী ছাত্রনেতার মুখে আপনার প্রশংসা শুনেছি। সম্ভবত এই প্রাপ্য টাও ছাত্রজীবনে শিবির করার বদৌলতে।

Mohammad Mozammel Hoque: ১৯৯৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর আজ পর্যন্ত, আমি ছাত্র-ছাত্রীদেরকে এমনভাবে দেখেছি যেন তারা শুধুই স্টুডেন্ট, এবং আমি তাদের টিচার। কখনোই কোনো স্টুডেন্টকে আমি ক্ষতিগ্রস্ত করি নাই, এইটা আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে অত্যন্ত শক্তভাবে বলতে পারি।

এই বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে থাকার ঠিকানা দিয়েছে। জীবিকা দিয়েছে। সম্মান দিয়েছে। পরিচিতি দিয়েছে। আমি চেষ্টা করেছি, এখানে পজিটিভলি কন্ট্রিবিউট করার।

শিক্ষকতার চাকরিকে সুবিধা হাতানোর উপায় হিসেবে দেখিনি কখনো। বরং নিজেকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছি। জ্ঞান অর্জন করা এবং অন্যদের নলেজ জার্নিতে তাদেরকে যথাসাধ্য হেল্প করার চেষ্টা করেছি।

কেউ স্বীকৃতির দিক বা না দিক, এইটা আমি দাবি করতেই পারি।

আর হ্যাঁ, শিবিরকে আমরা আদর্শ হিসেবে নিয়েছি, পার্টি হিসেবে নেই নাই। কখনো বলি নাই, ‘আমরা পলিটিক্স করতাম’। বরং সব সময়ে বলেছি, এখনও বলি, ‘আমরা সংগঠন করতাম’।

পানি আর জল যেমন ভিন্ন, তেমনি করে সংগঠন আর পার্টি আলাদা ধাঁচের জিনিস। আমরা সংগঠন করেছি। ‘পার্টি করা’র কথা কখনো কল্পনাও করি নাই।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *