বহুদিন পর হারুন স্যারের ছেলে মামুনের কথা মনে পড়লো। ‘যখন থামবে কোলাহল, ঘুমে নিঝুম চারিদিক’ – রুনা লায়লার এই গানটা শুনতে গিয়ে। ওর প্রিয় গান ছিলো এটি। ক্যানসারে পা কেটে ফেলার পরে বাসায় বসে সময় কাটানোর জন্য ও অনেক গান শুনতো।

বিয়ের পরে একদিন আর্টস ফ্যাকাল্টির নিচতলা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে মামুন পিছন থেকে এসে মিতুলের চোখ হাত দিয়ে ঢেকে দিয়ে আমাকে ইশারা করলো, যাতে কে না বলি…!

স্টুডেন্ট লাইফে হারুন স্যারের উত্তর ক্যাম্পাসের বাসায় মিতুল প্রায়ই যেতো। স্যারের দুই ছেলে। মিতুলকে উনারা মেয়ের মতো স্নেহ করতেন। মাঝে মধ্যে ওই বাসায় থাকতোও। তখন গল্প শোনার জন্য মামুন-আমিন মিতুলের সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করতো। সেই মিতুল আপা যে টিচার হয়ে গেছে, ও যে আর ফুলকুঁড়ি করা বাচ্চা নাই, সেটা ওর মনে নাই। এমন নির্মল সুন্দর সম্পর্ক ছিলো মুক্তিযোদ্ধা অথচ জামায়াত নেতা হারুন স্যার, ভাবী (মিতুলের চাচী) আর মামুন ও আমীনের সাথে।

হারুণ স্যার বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে আনশিডিউলড আমাদের কারো বাসায় আসলে আমরা ধারণা করতাম, আজ খুব সম্ভবত মামুনের কেমো দেয়ার ডেট। মামুনকে এম্বুলেন্সে করে শহরে নেয়ার আগেই স্যার কোনো অজুহাতে বাসা হতে বের হয়ে যেতেন। অপত্য স্নেহ এত অন্ধ ছিলো যে, ডাক্তার, নেছার ভাই ও সব শুভাকাঙ্খীদের বার বার বলা সত্ত্বেও স্যার মামুনের পা কাটার জন্য সময় মতো সম্মতি দিতে ব্যর্থ হন। ইন্ডিয়া থেকে ঘুরে আসার পরও কোনো উন্নতি না হওয়ায় এক পর্যায়ে হাঁটুর উপর হতে এক পা কেটে ফেলা দেয়া হয়।

তবুও ক্যান্সার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। পুরো শরীর টিউমারে ভরে যায়। মামুন মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটান হাসপাতালে মাঈনুদ্দীন ভাই আর আমি মিলে মামুনের জন্মদিন পালনের জন্য ফুল আর কেক নিয়ে গেলাম। জন্মদিনের তারিখটা তখনও ক’দিন বাকি। মামুন হাসিখুশিই ছিলো। বললো, ‘মোজাম্মেল ভাই, জন্মদিন পর্যন্ত হয়তো আমি থাকবো না।’

যেদিন সন্ধ্যায় মারা গেলো রাজিয়া আপা নাকি সেখানে ছিলেন। শুনেছি, মামুন বলেছে, ‘চাচী আমি অনেক ফুল, পাখি, সুন্দর বাগান এসব অনেক কিছু দেখতে পাচ্ছি। আপনি নামাজ পড়ে নেন।’ উনি নামাজ পড়ে দেখেন, মামুন আর নাই…!

সেই মামুন, আজ প্রায় বিশ বছর ঘুমিয়ে আছে চবি কেন্দ্রীয় মসজিদ লাগোয়া পাহাড়ের পাদদেশে চিহ্নহীন এক কবরের মিশে যাওয়া গহ্বরে…!!!

ছবিতে বা দিক থেকে হেলাল, আমীন, আমি, মাঈনুদ্দীন ভাইয়ের কোলে আমার মেয়ে মাহজুবাহ আর বিছানায় শোয়া মামুন।
ছবিতে বা দিক থেকে হেলাল, আমীন, আমি, মাঈনুদ্দীন ভাইয়ের কোলে আমার মেয়ে মাহজুবাহ আর বিছানায় শোয়া মামুন।

 

ফেসবুকে প্রদত্ত মন্তব্যপ্রতিমন্তব্য

M Zaker Sumon: স্মৃতিতে আনন্দ আছে / বেদনা থাকলে দোষ কি? কিছু স্মৃতি আনন্দের / আর কিছু শুধুই বেদনার

Zia Ul Haque: ভাই, তাকে চিনতাম না, তাকে জানিও না। তারপরেও আপনার লেখাটা পড়ে চোখ কেন যেন ভিজে এলো! আল্লাহ আপনার প্রিয় মামুনকে জান্নাতের মেহমান করে রাখুন- প্রাণভরে দোওয়া করি

Mohammad Mozammel Hoque: অচেনা এক উঠতি কিশোরের করুণ মৃত্যুর কাহিনী, ব্যক্তিগতভাবে অপরিচিত কারো স্মৃতিচারণমূলক লেখায় ফুটে উঠা কষ্ট, বেদনা, হাহাকার আপনাকে স্পর্শ করেছে, তা দেখে অভিভূত হলাম। আল্লাহ আপনাকে উত্তম জাযা দান করুন। আ-মীন।

Akhi Eyerin: reminded me my brother (same name) who also died of cancer 11 yrs ago. May Allah grant Jannah for them.

Mohammad Mozammel Hoque: আপনার ভাইয়ের সব ঘটনা আমি জানি। ইব্রাহিম হোসেনের কাছে থেকে শোনা। খুব ই মর্মস্পর্শী ।

Borhan Ahmed: এতো সুন্দর করে লিখতে পারেন আপনি! মিতুল আপাকে প্রথম চেনার স্মৃতি আজ ২৫ বছর পরও ভুলিনি। আর মাইনুদ্দীন ভাই তো তার রুমে আমাকে কিছুদিন ছোট ভাইয়ের মতোই আগলে রেখেছিল, সে এক মধুর স্মৃতি। আহা! আমার প্রিয় চবির সেই মধুমাখা স্মৃতিগুলো কেন ফিরে আসেনা! মি: মামুনকে আল্লাহ সুবহানুতায়ালা জান্নাত দান করুন।

Abu Jafar Syed: ফুলকুঁড়ির সংগঠক ছিলাম, মামুনকে নিয়ে অনেক কাজ করেছি। কি যে আনন্দোচ্ছল এক ছেলে। মামুন, তারই প্রতিবেশী বদিউল আলম স্যারের আকস্মিক মৃত্যু কোন দিন ভুলতে পারবো না। ফুলকুঁড়ির শামীম ভাই মামুনকে অসম্ভব রকমের সময় দিয়েছেন, যা আমরা পারিনি। আল্লাহ তুমি মামুনের উপর রহম কর ।

Fatima Khanam: Life is too short.

Mohammad Mahfuzul Hoque: Life is beautiful

Mohammad Mozammel Hoque: Life is beautiful, sometimes terrific though. life is beautiful until its cut’s our sweet times. Life could had been really beautiful if there were no loss of lives, specifically of the beloved ones.

Raihan Jamil: মোজাম্মেল ভাই, আপনার লিখা পড়ে আগের সব কথা মনে পড়ছে আর নিজেকে সামলানো অনেক কষ্ট হচ্ছে। মামুন ভাই আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু ছিলেন আর আমাকেও খুব আদর করতেন। মৃত্যুর আগে মেট্রোপলিটন হসপিটালের ২ই রুম পরের রুমেই আমার আব্বা চিকিৎসাধীন ছিলেন অনেকদিন, তাই আব্বুর সাথে উনাকেও প্রায় প্রতিদিনই দেখা হতো। মৃত্যুর আগেরদিন আমাকে বললেন বড় জিলাপি খেতে ইচ্ছে করছে। তখন আমি GEC মোড় থেকে এনে দেই। উনি খুব মজা করে খেলেন আর আমাকে বললেন ক্যাম্পাসে গিয়ে মামুন হুজুরকে উনার জন্য দুআ করতে অনুরোধ করার জন্য।

প্রায়ই অনেক বিষয়ে উনার সাথে গল্প হতো হসপিটালে। সবই মনে পড়ছে। আমি নিশ্চিত, উনি বেহেস্তবাসী। আমার আব্বু উনার কথা শুনে অনেক কেঁদেছিলেন যা আমি জীবনে খুব একটা দেখিনি।

Md Riduanul Hoque Khokon: Sir, I also missed Mamun vai. ১৯৯৭-৯৮ সালের ঘটনা মনে হয়। চবি কলেজে পড়ি, আমিন ভাই আমার ক্লাসমেট ছিল। মামুন ভাই এর অনেক গল্প শুনতাম। Missed you all. Your vocal, voice of Harun sir & all of you.

Mohammad Main Uddin: প্রিয় মামুন সম্পর্কে মুযযাম্মিল ভাইয়ের এ লিখায় আমি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ১৯৯৮ সালে সার্টিফিকেট উঠাতে গিয়ে আমি ও আমার চাচাত ভাই হেলাল রাতে মুযযাম্মিল ভাইয়ের দক্ষিণ ক্যাম্পাসের বাসায় থেকে পরদিন মেট্টোপলিটন হাসপাতালে মামুনকে দেখতে যাই। এ সম্পর্কে আমি আরো লিখব।

Mohammad Mozammel Hoque: মামুনের কথা মনে হলে কষ্টে ভেতর থেকে মোচড় দিয়ে উঠে…!!!

লেখাটির ফেসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *