পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ

প্রশ্ন: কোথা থেকে কীভাবে পাবো সঠিক ইতিহাস?

উত্তর: শুধু একধারার ইতিহাস পড়ে এই ঐতিহাসিক ঘটনার সঠিক চিত্র পাওয়া অসম্ভব। সঠিক ইতিহাস জানার জন্য নির্মোহভাবে পড়তে হবে, জানতে হবে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য।

প্রশ্ন: পাকিস্তান কি একটি ইসলামী রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল?

উত্তর: ব্রিটিশরা যাওয়ার সময় সারা ভারতবর্ষের মুসলমানেরা চেয়েছে মুসলমানদের একটা আলাদা হোমল্যান্ড। ইসলামপন্থীদের কেউ কেউ ইসলামী রাষ্ট্র চাইলেও পাকিস্তান একটা ইসলামী রাষ্ট্র হবে, এটি পাকিস্তান আন্দোলনের মূলধারা ছিলো না।

এতদঅঞ্চলের মুসলমানেরা ছিলো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অগ্রণী। এর কারণ হলো, এই অঞ্চলের হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানেরা ছিলো তুলনামূলকভাবে বেশি পিছিয়ে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভারতের ‘অবদান’ কতটুকু?

উত্তর: পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই ইন্ডিয়ান অপারেটিভস পাকিস্তান ভাঙার লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। পাকিস্তানের তৎকালীন রাজনীতিতে সকল সরকারবিরোধী পক্ষ এই ‘দেশবিরোধী’ তৎপরতায় নানাভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। ভারত যদি সরাসরি যুদ্ধে না নামতো তাহলে বাংলাদেশ খুব সম্ভবত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারতো না।

প্রশ্ন: ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ কি আসলেই ষড়যন্ত্রমূলক মামলা? নাকি, সঠিক ঘটনা?

উত্তর: কমিউনিস্ট আদর্শে উদ্বুদ্ধ বিপ্লবীরা আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় পূর্ব-পাকিস্তানকে একটা আলাদা রাষ্ট্র হিসাবে স্বাধীন করার জন্য সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই কাজ শুরু করে। এমনকি তারা সামরিকভাবেও কাজ করার বিকল্পকে সব সময় সামনে রেখেছে। ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ ছিল এরই অংশ।

পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণের অভিযোগগুলো কি সঠিক? নাকি, নিছক প্রচারণা?

প্রশ্ন: পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব-পাকিস্তানকে শোষণ করার প্রচারণা ছিল একইসাথে ভিত্তিহীন, এবং সঠিক।

দেশভাগের পরে শিক্ষিত হিন্দুরা চলে যাওয়ার কারণে এবং মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার হার অত্যন্ত কম হওয়ার কারণে পাকিস্তানের সরকারী চাকরিতে পূর্ব-পাকিস্তানের লোকজন ছিল কম। এইজন্য উচিত কাজ ছিল দেশভাগের সময় থেকেই পিছিয়ে থাকা পূর্ব-পাকিস্তানের উন্নয়নের উপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করা।

তা না করে তাদেরকে অর্থাৎ বাঙালিদেরকে বিশেষ করে পাঞ্জাবীরা অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখেছে।

এর সাথে ছিল ভারতপন্থীদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা।

প্রশ্ন: শেখ মুজিব কেমন ছিলেন? তিনি কী চেয়েছিলেন? এবং কী কারণে?

উত্তর: শেখ মুজিবুর রহমান পুরো ঘটনাতে বহুমুখী চরিত্রে রোল প্লে করে গেছেন। একদিকে তিনি পাকিস্তান ভেঙ্গে যারা স্বাধীন দেশ চাচ্ছিলেন তাদেরকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে মুসলিম লীগের নেতৃত্ব ও সেনা কর্তৃপক্ষের সাথে তিনি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলেছেন।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন লিবারেল ইসলামপন্থী। রাজনৈতিকভাবে তিনি ছিলেন ভারতবিরোধী। কখনো তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন না।

খুব সম্ভবত জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্বপ্রিয়তার কারণে তিনি এই পরস্পরবিরোধী ধারাগুলোর সাথে একই সাথে যুক্ত ছিলেন।

তিনি ছিলেন একজন সৎ রাজনীতিবিদ। দেশপ্রেমিক। সুবক্তা। সরকারবিরোধী আন্দোলনে জনগণকে উদ্বুদ্ধকারী বা public agitator। ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়।

তারচেয়েও বেশি জনপ্রিয়তা-আকাঙ্ক্ষী বা populist। মাত্রাতিরিক্ত স্বজনপ্রীতি ও বাদশাহীমূলক মনোভাবসহ নানামুখী সীমাবদ্ধতার কারণে প্রশাসক হিসেবে তিনি ছিলেন অদক্ষ ও ব্যর্থ।

প্রশ্ন: আলোচিত ১৯৭০ সালের নির্বাচন কি ফেয়ার ছিল? কোনো দল কি ব্রুট মেজরিটি পেয়েছিল?

উত্তর: ১৯৭০ সালের নির্বাচন ফেয়ার ছিল না। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর পরই একটা ইলেকশন হোক, এটি চায়নি তৎকালীন দ্বিতীয় বৃহত্তম দল ন্যাপ। তারা মানে মাওলানা ভাসানী নেতৃত্বে ন্যাপ নির্বাচন বর্জন করেছিলো। মুসলিম লীগ, জামায়াত প্রভৃতি দলকে আওয়ামী লীগ মাঠে নামতেই দেয়নি।

১৯৬৬ সালে আমার জন্ম। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ভোট দিয়েছে, এমন অনেকের সাথে আমি কথা বলেছি। তাদের প্রত্যেকেই বলেছে, তারা জাল ভোট দিয়েছে। একেক জন কমপক্ষে ৮/১০টি করে ভোট দিয়েছে।

আমাদের বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক ওয়াহিদুর রহমান স্যারের ওয়াইফ বলেছেন, তিনি একাই ১৬টি ভোট দিয়েছেন। তখন তিনি ছিলেন কিশোরী বয়সের।

এমন কাউকে আমি পাই নাই যিনি আমাকে বলেছেন তিনি ৭০’র নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন, এবং একটা ভোটই দিয়েছেন।

প্রশ্ন: পাকিস্তান ভাঙার জন্য আর্মিদের দায় কতটুকু?

উত্তর: পশ্চিম পাকিস্তানীরা যে কোনো মূল্যে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখতে চেয়েছে। তারা যদি জনগণের ওপর হামলা করে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির পরিবর্তে শুধু আওয়ামী লীগকে টার্গেট করতো, তাহলে হয়তোবা পরিস্থিতি ভিন্ন রকম হতো।

অন্যদিকে, যেভাবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থানরত অবাঙালি, বিশেষ করে বিহারীদের হত্যা করা হচ্ছিল এবং ল-লেসনেস ক্রিয়েট করা হচ্ছিল তাতে করে একটা ক্র্যাকডাউন অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।

‘৭০-এর নির্বাচন পরবর্তী অচল অবস্থা নিরসনের শান্তিপূর্ণ দুইটা পথ খোলা ছিল: (১) পশ্চিম পাকিস্তানে ব্রুট মেজরিটি পাওয়া পিপিপিকে সেখানে ক্ষমতা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ব্রুট মেজরিটি পাওয়া আওয়ামী লীগকে পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতা দেয়া।

(২) দ্বিতীয় পথটি ছিল, দৃশ্যত শেখ মুজিবুর রহমান যা চেয়েছেন, ওভারঅল সিম্পল মেজরিটি পাওয়া আওয়ামী লীগকে উভয় পাকিস্তান মিলে পুরো দেশের ক্ষমতা দেয়া।

আইনের দৃষ্টিতে নয়, যুক্তির নিরিখে প্রথম বিকল্পটি ছিলো অধিকতর গ্রহণযোগ্য। সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে সক্রিয় দৃশ্যত ভারতপন্থী আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব চায়নি, সমঝোতা হোক।

প্রশ্ন: শেখ মুজিব বামপন্থীদের দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। অথচ সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে জাতীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

এই বৈপরীত্যের কারণ কী?

উত্তর: দেশ স্বাধীনে নেতৃত্ব দেয়া তাজউদ্দীনকে শেখ মুজিব তেমনভাবে মূল্যায়ন না করা, লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে অংশগ্রহণ ও ভুট্টোকে ঢাকায় লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া, ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করা, ভারতের সাথে তাজউদ্দীনকৃত মৈত্রী চুক্তিকে কার্যত অস্বীকার করা, রাজাকারদের সাধারণ ক্ষমার আওতায় ছেড়ে দেয়া, দালাল আইন বাতিল করা, মাদ্রাসাগুলো খুলে দেয়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে পুনরায় চালু করা, এইসব ঘটনার সাথে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রভিত্তিক সংবিধান প্রণয়নসহ ভারতপন্থী অনেক ঘটনাকে মেলানো যায় না।

প্রথম ধরনের কার্যক্রমের দিকে তাকালে এটি মনে হওয়া স্বাভাবিক, শেখ মুজিব, ভুট্টোর দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন।

অন্যদিকে, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রভিত্তিক চার মূলনীতির ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নের দিকে তাকালে এটি মনে হওয়া স্বাভাবিক, তিনি ভারতের স্বার্থে কাজ করেছেন।

প্রশ্ন: মুক্তিবাহিনী (FF) যুদ্ধ করেছে, কিন্তু মুজিব বাহিনী (BLF) যুদ্ধ করেনি। তাহলে এই বাহিনী কেন গঠন করা হয়েছিল?

উত্তর: তাজউদ্দীনদের সমাজতান্ত্রিক বাংলা গঠনের উচ্চাভিলাস সম্পর্কে ইন্ডিয়া সচেতন ছিল। তাদেরকে ঠেকানোর জন্য সরাসরিভাবে যারা ছাত্রলীগ করতো, আওয়ামী লীগ করতো এমন লোকদেরকে দিয়ে বিএলএফ গঠন করা হয়েছিল। জেনারেল ওভারের নেতৃত্বে তাদেরকে স্পেশাল ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল। এটি মুজিব বাহিনী হিসাবে পরিচিত ছিল।

প্রশ্ন: ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ইসলামপন্থীরা কোন পক্ষকে সমর্থন করেছে?

উত্তর: ইসলামপন্থীরা মোটাদাগে পাকিস্তান রক্ষার পক্ষে ছিলো। আর্মির নৃশংস অত্যাচারের কারণে এর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ পরবর্তীতে নিউট্রাল হয়ে যায়, কিংবা মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে। শুরু থেকে স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন শুধুমাত্র মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও মাওলানা ভাসানী। আলেম হিসাবে তাঁরা শীর্ষস্থানীয় ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন রাজনীতিবিদ।

প্রশ্ন: পাকিস্তান সৃষ্টি না হলে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় সম্ভবপর ছিল?

১৯৪৭-এ যদি অখণ্ড পাকিস্তানের সাথে পূর্ব-বাংলা যুক্ত না হতো তাহলে কখনোই বাংলাদেশ নামক একটা স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি হতো না।

প্রশ্ন: ‘৭১-এ বিহারীদের ভূমিকা কেমন ছিল?

উত্তর: ‘৪৭-এ দেশভাগের সময় ভারতের বিহার প্রদেশ থেকে আগত মুসলিম রিফিউজিরা বিহারী নামে পরিচিত। সঙ্গত কারণে তারা ছিল পাকিস্তানপন্থী। মুক্তিযুদ্ধে বিহারীরা যেখানে পেরেছে গণহারে বাঙালি নিধন করেছে।

এর বিপরীতে বাঙালিরা যুদ্ধের আগে, যুদ্ধকালীন ও যু্দ্ধপরবর্তী সময়ে গণহারে বিহারীদের হত্যা করেছে।

প্রশ্ন: যুদ্ধের সময়, যুদ্ধের আগে ও যুদ্ধের পরে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তানীদের আচরণ কেমন ছিল?

উত্তর: যুদ্ধের আগে, যুদ্ধকালীন বা যুদ্ধপরবর্তী সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে আটকে পড়া অসামরিক ও সামরিক বাঙালি ব্যক্তিবর্গ ছিল সম্পূর্ণ নিরাপদ। পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো বাঙালি হত্যা হয়নি। গণহত্যা তো দূরের কথা।

(এগুলা ইতিহাসের তথ্য। সত্য। আপনি যাচাই করতে পারেন। একজন আগ্রহী তরুণের প্রশ্নের উত্তরে ১৪ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে এটি লিখেছিলাম। এতদিন ড্রপবক্সে পড়েছিল।)

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *