আধ্যাত্মিকতা, ঈশ্বর এবং নাস্তিকতা

ভণ্ড নবী দাবিদার ইবনু সাইয়াদের ঘটনা প্রমাণ করে আধ্যাত্মিক ক্ষমতা থাকা হকের ওপর থাকার প্রমাণ হতে পারে না। ইবনু সাইয়াদ দাবি করেছিল আধ্যাত্মিক ক্ষমতা বলে সে মানুষের অন্তরের খবর বলতে পারে। এর প্রমাণ হিসেবে রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) সে বললো, ‘তুমি একটা কথা তোমার মনে স্মরণ করো। আমি বলে দিচ্ছি, সেই কথাটা কী।’

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন সূরা দুখানের ১০ নম্বর আয়াতটি স্মরণ করলেন যেখানে ‘দুখান’ শব্দটা আছে। ইবনু সাইয়াদ বললো, ”তুমি যা ভেবেছো সেখানে ‘দুখ’ শব্দটা আছে।”

নবী হওয়ার কারণে যে প্রটেকশন আল্লাহর রাসূল পেয়েছেন সেই সুবাদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্বলব থেকে ইবনু সাইয়াদের পক্ষে পুরো কথাটা বের করা সম্ভব না হলেও সে কাছাকাছি গিয়েছিল। সেজন্যই দেখা যায়, অনেক পীর, বুজুর্গ, মুনি, ঋষি, যোগী কিংবা সাধকের মধ্যে আধ্যাত্মিক অনেক ক্ষমতা আছে বা ছিল।

এর ব্যাখ্যা কী?

কিছু কিছু ফ্যাক্টর বা শর্ত কোনো কিছু হওয়ার জন্য অপরিহার্য। যেমন, চা বানানোর জন্য চা পাতা, পানি, কেটলি বা ডেকচি, আগুন, এগুলো necessary cause or condition। এসব ঠিকঠাক মতো হলে তৈরি হয় চা হওয়ার জন্যে sufficient condition। চা বানানোর জন্য চা পাতা লাগে। কিন্তু চা পাতা মানে চা নয়।

তেমনি করে, ইসলাম হওয়ার জন্য যা কিছু লাগে তার মধ্যে আধ্যাত্মিকতা একটা অপরিহার্য শর্ত। এর মানে এই নয়, কারো আধ্যাত্মিক ক্ষমতা আছে, কিংবা সে আধ্যাত্মিকতার চর্চা করে, অতএব তিনি হেদায়েতপ্রাপ্ত।

এর আগের লেখায় আমি বাউলবাদকে একটি নাস্তিক্যবাদী মতবাদ হিসেবে উল্লেখ করেছি। সেই প্রসঙ্গে এই কথাগুলো বললাম। সার্চ করে দেখেন, ‘স্পিরিচুয়ালিটি উইথআউট রিলিজিওন’ – এটা পাশ্চাত্য দুনিয়ায় একটা মশহুর বিষয়।

আরেকটা জিনিসের ব্যাপারে শিক্ষিত লোকেরাও খুব কমন একটা ভুল করে। লোকেরা মনে করে, খোদাকে না মানাই হচ্ছে নাস্তিকতা। না, খোদাকে না মানা নাস্তিকতা নয়। বরং প্রচলিত কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করাই হচ্ছে নাস্তিকতা। নাস্তিকতা সংক্রান্ত বার্ট্রান্ড রাসেলের বইটার শিরোনাম হলো, ‘হোয়াই আই এম নট আ ক্রিশ্চিয়ান’।

‘ফোর হর্সম্যান অফ এথিইজম’ এর অন্যতম হলেন রিসার্চ ডকিন্স। ‘গড ডিলিউশন’ বইয়ে উনি নাস্তিকতার একটা স্কেল দিয়েছেন। সেই স্কেল অনুসারে নিজেকে তিনি পরিচয় দিয়েছেন ‘ডি ফেক্টু নাস্তিক’ হিসেবে।

‘প্রমাণের বোঝা’ হতে মুক্ত থাকার জন্য বুদ্ধিমান নাস্তিকেরা নিজেদেরকে পরিচয় দেয় অজ্ঞেয়বাদী বা অ্যাগনস্টিক হিসেবে। ক্লাসিক্যাল নাস্তিকেরা নিজেদেরকে পরিচয় দেয় মানবতাবাদী হিসেবে। এই অর্থে, মানবতাবাদ নাস্তিক্যবাদেরই একটা ভ্যারাইটি বটে।

খোদার মেটাফিজিক্যাল বৈশিষ্ট্যগুলোকে অস্বীকার করা কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব। এই অর্থে, মানুষ মাত্রই (ফিলসফিক্যাল) গডে বিশ্বাসী। তারাই নাস্তিক যারা ‘অর্গানাইজড রিলিজিয়নে’ বিশ্বাস করে না।

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Ibrahim Hossain: আলোচনার জন্য বা তাত্ত্বিকভাবে এই বিভাজনগুলো ঠিক আছে। তবে আমার মনে হয়, কারো পক্ষে পুরাপুরি সব ব‍্যাপারে কোনো একটি বিশেষ বর্গে আবদ্ধ থাকা কঠিন ।

Mohammad Mozammel Hoque: আমার কাছে বিশেষ বর্গের বাইরে কোনো কিছু নাই। প্রত্যেকে কোনো না কোনো পক্ষে। হতে পারে, কেউ ‘নিরপেক্ষ’ নামক কোনো পক্ষে। সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বে সত্য হলো এককপক্ষ। বাদবাকি সবকিছু মিথ্যাপক্ষ। সত্য হলো আগাগোড়া সত্য। আর মিথ্যা হলো সত্য এবং মিথ্যার সংমিশ্রণ।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *