বাউলবাদ – একটি নাস্তিক্যবাদী মতবাদ

নাস্তিকতার অনেক ধরনের মধ্যে একটি হলো প্রকৃতিবাদ বা ন্যাচারালিজম। প্রকৃতিবাদ অনুসারে আমরা প্রকৃতিতে যা কিছু দেখি তার বাইরে ‘অতিপ্রাকৃতিক’ বলে কিছু আসলে নাই। বাউলবাদ হলো এই ধরনের দার্শনিক প্রকৃতিবাদ বা ফিলসফিক্যাল ন্যাচারালিজমেরই একটা ভার্সন।

বাউলবাদ হলো এক ধরনের মরমীবাদ। যেমন করে সুফিবাদ হলো মরমিবাদের ইসলামিক ভার্সন। সুফিবাদ খোদাকেন্দ্রিক মরমিবাদ। বাউলবাদ মানবকেন্দ্রিক মরমিবাদ। সুফিবাদ ও বাউলবাদের মধ্যকার সম্পর্ক ও পার্থক্য হলো আস্তিক্যবাদী অস্তিত্ববাদের সাথে নাস্তিক্যবাদী অস্তিত্ববাদের সম্পর্ক ও পার্থক্যের মতো।

মরমিবাদ জিনিসটা কী? মরমিবাদ হলো আধ্যাত্মিকতা চর্চার একটা ধরন।

যারা জানেন না তাদের জন্য বলছি, আধ্যাত্মিকতা, ধর্ম এবং ঈশ্বর, এই তিনটা আলাদা জিনিস। কেউ স্পিরিচুয়ালিটির চর্চা করতে পারে ধর্ম এবং ঈশ্বরকে বাদ রেখে, মেডিটেশন ইত্যাদির মাধ্যমে।

ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা এবং ঈশ্বর, এ’গুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ভিন্ন আলোচনার বিষয়। এখনকার গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো,

পরমসত্তার সাথে ব্যক্তিসত্তার সম্পর্ক হচ্ছে মরমিবাদের মূল বিষয়। সেই পরমসত্তা আল্লাহ, খোদা, ভগবান, ঈশ্বর, যাই হোক না কেন। বাউলদের কাছে ব্যক্তিমানুষই হচ্ছে পরমসত্তা। মানবসত্তার বাইরে পরমসত্তা বলে কিছু নাই।

মুসলমানদের দৃষ্টিতে, খোদা আছেন জগতের বাহিরে, কিন্তু জগতের সর্বত্র ও সব কিছুর ওপরে রয়েছে তাঁর সার্বক্ষণিক, নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ। হিন্দুদের দৃষ্টিতে, ঈশ্বর একই সাথে জগতের বাইরে এবং জগতের সর্বত্র বিরাজমান।

বাউলদের দৃষ্টিতে, যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে তা-ই আছে ভান্ডে। তাই তাদের দৃষ্টিতে, মানুষই ঈশ্বর। মনুষ্যসত্তার বাইরে ঈশ্বরের কোনো স্বতন্ত্র ও স্বাধীন অস্তিত্ব নাই।

বাউলদের মানবতাবাদ তথা দেহতত্ত্ব অনুসারে, সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ, বিশেষত মানুষের যৌনতা। তাই প্রজনন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চলে তাদের এই বিচিত্র (কিংবা বিকৃত) দেহসাধনা।

তাদের এই দেহতত্ত্ব ভুল না সঠিক, সেটা ভিন্ন আলোচনার বিষয়। আমি এখানে শুধু দেখাতে চাচ্ছি, বাউলবাদ মূলত নাস্তিকতারই একটা প্রকরণ।

সমীকরণটা নিম্নরূপ:
বাউলবাদ = মানবকেন্দ্রিক মরমীবাদ
মানবকেন্দ্রিক মরমিবাদ = সর্বেশ্বরবাদী প্রকৃতিবাদ
সর্বেশ্বরবাদী প্রকৃতিবাদ = অজ্ঞেয়বাদী প্রকৃতিবাদ
অজ্ঞেয়বাদী প্রকৃতিবাদ = নাস্তিক্যবাদী প্রকৃতিবাদ
প্রকৃতিবাদ = নাস্তিক্যবাদ

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Saifur Rahman Saif: Baulism has basically evolved around some fictional beliefs. To me it’s somewhat madness. It’s a form of atheism only if one considers rejection of institutionalized religious belief, is atheism.

Mohammad Mozammel Hoque: of course. in general, atheism is considered as the rejection of the organized religions.

Inan Hossain: আজ্ঞেয়বাদী প্রকৃতিবাদটা বুঝিনি। আরেকটু বিশ্লেষণ করলে ভালো হতো।

Mohammad Mozammel Hoque: প্রকৃতি যেভাবে চলে সেইটা কেন চলে, সেইটা জানা বাইরে তথা অজ্ঞেয়, এমনটা যারা মনে করে তাদেরকে বলে অজ্ঞেয়বাদী প্রকৃতিবাদী।

‘প্রকৃতি’ তাদের কাছে শেষ কথা। এজন্য তারা প্রকৃতিবাদী। আর জানার মূল বিষয়গুলো আমাদের জানার ক্ষমতার বাইরে, এমনটি তারা মনে করে, সে জন্য তারা অজ্ঞেয়বাদী।

আমরা এ’ধরনের অজ্ঞেয়বাদ ব্যবহার করি খোদার সত্তাকে প্রকৃতভাবে তথা intrinsically জানার ব্যাপারে।

আমরা লিমিটেড এনটিটি। এই কারণে আমরা খোদার মত এবসোলিউট এনটিটিকে ইন্ট্রিনজিক্যালি জানতে পারি না।

Shahin Rahman Sajid: এক সময় বাউল আখড়া ও পালাগান তো মূলত গ্রামীণ নিরক্ষর মানুষের বিনোদনের মাধ্যম ছিল। কিন্তু এখন তো দেখছি বাউল সাধনা ও লালনচর্চাকে কেন্দ্র করে নানা প্রতিষ্ঠান, উৎসব আর সাংস্কৃতিক আয়োজন তৈরি হয়েছে; এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষিত তরুণরাও এতে আগ্রহ নিয়ে অংশ নিচ্ছে।

এদের মধ্যে এমন আকর্ষণ বাড়ার মূল কারণগুলো কী হতে পারে? এর পেছনে কি কোনো ভিন্নধর্মী মতাদর্শ বা ধর্মীয় এজেন্ডা কাজ করছে? আর যারা এসব আয়োজনে অংশ নিচ্ছে, তারা কি সত্যিই শিক্ষিত ও ভদ্র বলে বিবেচিত হতে পারে?

Mohammad Mozammel Hoque: ‘শখের বাউল’ বলে একটা কথা আছে। বাউল ফকিরদের কিছু কিছু গান আমাদের ভালো লাগে। এক ধরনের আধ্যাত্মিকতা যখন আমাদের ওপর ভর করে, এবংঅস্তিত্বের শূন্যতাসংকটে পড়ে যখন আমরা একটা ‘মনের মানুষ’কে খুঁজে বেড়াই, তখন, এই ধরনের ভাবালুতার সময়ে কিছু কিছু বাউল গান আমাদের ভালো লাগে।

এই ধরনের নির্দোষ ভালোলাগা খুবই স্বাভাবিক। রবীন্দ্রনাথও ছিলেন এই ধরনের শখের বাউল। আমরাও এই অর্থে কম বেশি শখের বাউল।

কিন্তু মনে রাখতে হবে, সাংস্কৃতিকভাবে কিছুটা আধ্যাত্মিকতা, বাউলদের কিছু কিছু গান ভালোলাগা, আর বাউল ফকিরদের যে বাউলতত্ত্ব বা বাউল মতবাদ, এই দুইটা ফেনোমেনা সম্পূর্ণ আলাদা। বরং বিপরীতধর্মী।

বাউল মতবাদ একটা ‘দ্বীন’ তথা জীবন দর্শন, এবং একই সাথে একটা বিশেষায়িত জীবনযাপন পদ্ধতি। যেভাবে ইসলাম একটা দ্বীন তথা জীবনদর্শন ও সুনির্দিষ্ট জীবনযাপন পদ্ধতি বা লাইফ স্টাইল।

আপনি আমি বা যে কেউ ইসলামে থেকে ‘শখের বাউল’ হতে পারি বা পারলেও কারো পক্ষে ইসলামের ভিতর থেকে সত্যিকারের বাউল হওয়া সম্ভব না। সামাজিকভাবে মুসলমান পরিচয় বহন করা আর মুসলিম হওয়া এবং ইসলাম সম্মত জীবন যাপন করা, দুইটা ভিন্ন জিনিস।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *