বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মারামারি হয় ছাত্রদের এলাকাতে

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মারামারি হয় ছাত্রদের এলাকাতে। দক্ষিণ ক্যাম্পাসে কখনো গোলাগুলি, বোমা ফাটানো এগুলো হয়নি অতীতে। এই ধরনের চরম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে বর্তমান সরকারের সময়ে। জাতীয় নির্বাচনের দিনগুলোতে। আমার চোখের সামনে। কিন্তু আমি প্রতিবাদ করিনি। চুপ ছিলাম।

‘সুবোধ বালকেরা’ চবি শাটল ট্রেনের বগিগুলো দখল করে সেগুলোর গায়ে এক একটা নাম দিয়েছে যখন, বেশ আগে, তখন থেকে তারা নিয়ম করেছে ‘পলিটিক্যাল’ ছেলেমেয়েরা যার যার গ্রুপের বগিতে উঠবে এবং শেষ মুহূর্তে আসলেও সিট পাবে।

তখনও আমি চুপ ছিলাম।

বিচিত্র সব নামের পলিটিক্যাল গ্রুপগুলোকে যখন প্রশাসনের উদ্যোগে হলগুলোকে ভাগ করে দেয়া হলো তখনও আমি চুপ ছিলাম।

যখন শুনতাম প্রক্টর অফিসে বসে ঠিকাদারী কাজের ভাগ বাটোরোয়া করা হচ্ছে, তখনও আমি চুপ ছিলাম। ছাত্রনেতারা লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ নিয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী ‘নিয়োগ দিচ্ছে’, তখনও আমি চুপ ছিলাম।

প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠনের নেতাকে যখন আক্ষরিকভাবে হলের মধ্যে জবাই করা হলো, অথচ হল প্রভোস্ট ঘটনার আগে, চলাকালীন এবং পরে আদৌ হলে যাননি, পার্শ্ববর্তী শিক্ষক ক্লাবে বসেছিলেন, তখনও আমি চুপ ছিলাম।

হলগুলাতে যখন অ্যালটমেন্ট সিস্টেম বন্ধ হয়ে গেল, হাটহাজারীতে চাকরি করা লোকেরাও যখন নেতাদেরকে টাকা দিয়ে হলে থাকা শুরু করলো, পাস করে যাওয়ার ৫-৭ বছর পরও ছাত্রনেতারা মোটা চাকার বাইক চালিয়ে সদর্পে ক্যাম্পাস জুড়ে ঘুরতে লাগলো, চাঁদার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে যখন পরস্পর পরস্পরকে খুন করলো, প্রধান প্রকৌশলীকে মারধর করলো, এমনকি হলের ডেকছি পাতিল, জানালার গ্রিল বিক্রি করে দেওয়া শুরু করলো, তখনও আমি চুপ ছিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে সরকারবিরোধী আন্দোলন না হয় সেজন্যে করোনার অজুহাতে যখন দীর্ঘ সময়ধরে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হলো, এরপর যখন ক্লাস খোলা হলো তখনো হলগুলো বন্ধ রাখা হলো দীর্ঘ সময় ধরে, সেই সময়েও হলগুলোতে পলিটিক্যাল ছেলেরা থাকছিলো অবাধে, তখনও আমি চুপ ছিলাম।

আমার বিভাগে বছর কয়েক আগে শিক্ষক নিয়োগ হলো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বর্ণপদক পাওয়া ছাত্রসহ সবচেয়ে ভালো ছাত্রদেরকে যখন সিলেকশনের শুরুতেই ডিজিএফআই এর আপত্তির কথা বলে বাদ দেয়া হলো, তখনও আমি চুপ ছিলাম।

প্রতিটি অন্যায়কে আমি ঘৃণা করেছি। প্রতিবাদ করিনি তেমন। প্রতিরোধ করার সক্ষমতা আমার নাই।

আমার অবস্থা ককপিটচ্যূত পাইলটের মত।

আমি আজ অসহায়, কিন্তু ভীতু ছিলাম না কোনোদিন। বিচারিক হত্যাকাণ্ডের শিকার এক জননেতার মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়নের দিন একটা মৌন মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সারাদেশের মধ্যে শুধুমাত্র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সেদিন প্রতিবাদ হয়েছিল। আমি ছিলাম এর মূল উদ্যোক্তা।

নানা কারণে আমি আজ ডিকমিশন্ড কাপ্তেনের মতো। নিরুপায়।

প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা, তোমরা পারলে আমাকে ক্ষমা করো। তোমাদের বিরুদ্ধে যে সব মারাত্মক অন্যায় ও জুলুম হচ্ছে সেগুলোকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আমার নাই। 

প্রতিরোধ না হোক, প্রতিবাদ কেন করিনি?

হ্যাঁ, করেছি। সীমিতভাবে। আমি বলেছি, দেশটা তো একজনের নামে লিখে দেওয়া হয়েছে। বলে দেয়া হয়েছে, ‘…. শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’ প্রতিটি কাগজের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়। বাংলাদেশটাই যদি হয় ব্যক্তিবিশেষের ব্যক্তিগত সম্পদ, সেখানে আমি তুমি বা কারো কোনো অধিকার কেন খাটবে?

তিনি যাই বলবেন তাই আইন। সেটাই শেষ কথা।

এই ধরনের চরম স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ছাড়া এখন বা কখনো তোমার আমার বা কারো কোনো ন্যায্য অধিকার অর্জন সম্ভব নয়।

এতটা গ্লানিবোধ, এত বেশি পরাজয়বোধ কখনো অনুভব করিনি।

আমার মতো শত শত শিক্ষক ছটফট করছেন কিছু একটা করার জন্য। আমাদের যে তিনজন সহকর্মী শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছেন, জানতে পারলে আমিও সেখানে যেতাম। এই ধরনের কোনো প্রতিবাদের আয়োজন এর খবর যদি জানা যায় আমার ধারণায় প্রচুর সংখ্যক শিক্ষক দলমত নির্বিশেষে সেখানে দাঁড়াবেন।

এককভাবে আমি দাঁড়িয়ে কিছু করব, সেই ক্ষমতা একসময় আমার ছিল। এখন নাই।

হলগুলো যখন অবৈধ দখলমুক্তকরণ শুরু করলো সর্বস্তরের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা, তখনই হলগুলোকে বন্ধ করে দেয়া হলো। ক্ষমতাসীন ঠেঙ্গারু-বাহিনীর কর্তৃত্ব চলে যাবার পর-পরই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। অথচ এর আগের দিন শুধু অনির্দিষ্টকালের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছিল। হল বন্ধ করার ঘোষণা সেখানে ছিল না।

হল বন্ধ করার ঘোষণা মূলত ঠেঙ্গারুবাহিনীর পরাজয়ের ব্যাকআপ। ড্যামেইজ কন্ট্রোল ম্যানেজমেন্ট।

দাবি করছি, ছাত্র এবং শিক্ষক রাজনীতি অন্তত এক দশকের জন্য নিষিদ্ধ হোক বাংলাদেশে। অবিলম্বে জুলুম, অত্যাচার, নিপীড়ন বন্ধ করা হোক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হোক। মেধারভিত্তিতে সিট বণ্টন করা হোক। সকল ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ হোক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতার ভিত হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করা হোক।

শুধুমাত্র এক পার্সেন্ট প্রতিবন্ধী কোটা রেখে চাকুরীতে সকল ধরনের কোটা তুলে দেয়া হোক।

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Nasim Ahmed: আপনার কৈফিয়ত গ্রহণযোগ্য নয়। নিরবতা স্বৈরশাসকের পক্ষেই যায়। কিছু মনে করি না, বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষকই এমন। আসিফ নজরুল ক’জনই বা আছে?

Mohammad Mozammel Hoque: নাসিম ভাই, আসিফ নজরুলের ব্যাকগ্রাউন্ড সুশীল বাম। ইদানীং উনার অবস্থান ডানে। আমার ব্যাকগ্রাউন্ড সে তুলনায় খুবই দুর্বল। আমি হত্যামামলাসহ অনেক মামলার শিকার। নিষ্পত্তি হওয়া সেই সব মামলা রিভাইভ করা জালিমদের পক্ষে খুব সম্ভব।

তারপরও আপনার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। দোয়া করবেন।

Farid A Reza: আপনার কী হলো? চুপ কেনো?

Mohammad Mozammel Hoque: রেজা ভাই, রাজনৈতিক সংকটের সময় রাজনীতির ময়দানে যারা সক্রিয় তাদেরই উচিত নেতৃত্ব দেওয়া। অরাজনৈতিক লোকেরা রাজনৈতিক সংকটে নেতৃত্ব দেওয়াটা নানা দিক থেকে সমস্যা। আন্দোলনটা কোটা সংস্কার প্রসঙ্গে হলেও এর ইনভলভমেন্ট ডাইরেক্টলি পলিটিকাল।

Md. Raju Khan:  আপনাকে অসহায় করে দেয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন শিক্ষকগণ আজ আমাদের পাশে নাই।  

Mohammad Mozammel Hoque: যারা শতাধিক শিক্ষকের নেতা, তারা আজ কোথায়? গর্তে শুধু জাফর ইকবাল স্যারই লুকিয়েছিলেন, তা নয়। এখনো গর্তজীবীরাই বিভিন্ন দলের নেতা।

আমি যখন রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলাম, তখন বুক ফুলিয়ে চলেছি। প্রতিবাদ কিংবা প্রতিরোধ ছাড়া কোনো জুলুমকে সহ্য করি নাই। সত্যি, আজ আমি অসহায়। খুব খারাপ লাগছে। স্বীকার করছি নিজের দায়।

Mohammad Uddin: সব সত্যের ও অপারগতার মাঝেও একটা উদ্যোগ নেয়া হলে অনেকে যোগ দিত। খুবই দরকার ছিল। লজ্জিত আমরা লজ্জিত। ক্যাম্পাসে অন্তত ২০ জন শিক্ষক তো পাওয়া যেত।

Mohammad Mozammel Hoque: কেউ আহবান করলে আমি অংশগ্রহণ করবো। কিন্তু উদ্যোগ নেব না। পলিটিকাল লিডারশিপ থেকে আমি সরে এসেছি। তাই, যারা পলিটিক্যাল লিডার তাদের উচিত প্রোটেস্ট অর্গানাইজ করা।

Mohammad Uddin: আমি এখন আপনার কাতারে। কাল সাদা দলের মিটিংয়ে বলছিলাম। যে দিন শহীদ মিনারে আক্রমণ হলো আমরা বেরুতে পারলাম না। জাতীয়তাবাদী ফোরাম এখন কোথায়?

Mohammad Mozammel Hoque: এক নম্বর অপদার্থ হল জামায়াতের লোকজন। কাছাকাছি দুই নম্বরের অপদার্থ হল বিএনপির লোকজন। এরা হলো নাম্বার ওয়ান ক্যাটাগরির বাচাল। Talkative and hypocrite and cowardly. এজন্যই কিছুদিন আগে লিখেছিলাম, সততার চেয়েও এখন বেশি দরকার সাহসিকতার। গাজা ইস্যুতে লিখেছিলাম। কথাটা ডোমেস্টিক ইস্যুতেও সমানভাবে প্রযোজ্য‌। এসব অথর্ব লোকদের সাথে আমি নাই।

Nur Hossain Dil: পুরো বাস্তবতার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। আসলে কারো কিছু করার সক্ষমতা নেই। তবে যা করা যাবে তা আন্দোলনের মাঠ থেকে আদায় করতে হবে।  আর আপনারা আপনাদের অবস্থান থেকে ছাত্রদের সাহস যোগান লেখার মাধ্যমে।

Mohammad Mozammel Hoque: দুইটা জিনিস খুব গুরুত্বপূর্ণ: সংগঠন থাকা এবং ভীতু লোকেরা সংগঠনের নেতৃত্বে না থাকা।

Mohammed Rafiqul Islam: চবি’র শত শত শিক্ষকের বুকে ব্যথা হচ্ছে, না লিখতে পারছে, না নামতে পারছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কী চলছে তা কয়েক মাস আগে আমার লেখায় কিঞ্চিত প্রকাশ পেয়েছে। আশা করি কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা আমাদের ভুল বুঝবে না।

Mohammad Mozammel Hoque: ছাত্ররা শিক্ষকদেরকে ভুল বুঝতেছে, শিক্ষকদের দৃশ্যমান নিষ্ক্রিয়তার কারণে। আমাদের ভীরু, অপদার্থ, পক্ষপাতদুষ্ট নেতৃত্বের কারণে আমরা জাতির এই ক্রান্তিকালে শিক্ষক সমাজের জন্য উপযুক্ত নৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়িত্বপালনে কালেক্টিভলি ব্যর্থ হচ্ছি।

আমার সাথে এমনকি দশ জন শিক্ষকও যদি থাকতেন তাহলে আমি হয়তোবা কিছু একটা করতাম। এমন জুলুমতন্ত্রের বিরুদ্ধে একা লড়াই করা অসম্ভব-প্রায়।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *