হৃদয় কেনাবেচার স্মৃতি

প্রিয় কমলা,

এই দীর্ঘ জীবনে সম্পর্ক করেছি অনেকের সাথে নানা মাত্রায়। ভালোবেসেছি। প্রেমে পড়েছি। জড়িয়েছি হৃদ্যতার সম্পর্কে। তুমি তেমনি একজন। সে তুমি জানো।

তোমার তুল্য মাত্র দু’জন। তাদেরই একজন তোমার অতিআপন। আরেকজনকে তুমি দেখনি। আমিও দেখিনি। তবুও ভালবেসেছি তাকে। যেমন করে ভালোবেসেছি তোমাকে। ভালবেসেছি তোমার সেই আপনজন প্রিয়তম মানুষটিকে। এসব কিছু নয় অজানা তোমার।

প্রতিটি পুরুষের হৃদয়ে আঁকা থাকে এক আদর্শ নারীর ছবি। প্রতিটি নারীর হৃদয়ে আঁকা থাকে এক প্রবল পুরুষের ছবি। বাস্তবের নারী আর পুরুষেরা একে একে মূর্ত হয়ে ওঠে সেই সুপ্ত অবয়বে। জীবনের এক একটি বাঁকে, দেখা হয় একেক জনের সাথে।

ভালোলাগা প্রতিটা মানুষকে আমরা তুলনা করি, মিলাতে থাকি আমাদের সেই মনের মানুষের সাথে। কল্পনার সেই চিরন্তন পুরুষ কিংবা নারীর সাথে। আমার কল্পনায়, ধ্যানে, জ্ঞানে, মননে তুমি তেমনি একজন অনন্যসাধারণ অন্তজন।

প্রথম যৌবনে দেখেছিলাম তোমাকে। আমার বিয়ের রাতে। প্রথম দৃষ্টিতেই তোমাকে চিনে ফেলেছিলাম। আগে থেকে শুনেছিলাম তোমার অনেক গল্প। আমাকে দেখে লজ্জায় তুমি দৌড়ে পালিয়ে ছিলে পাশের রুমে।

ভব্যতা ভুলে পিছনে ছুটে গিয়ে তোমার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম আগ্রাসী ভঙ্গিতে। খুব কাছে। বলেছিলাম আমার নাম। প্রথম দেখাতেই আমরা প্রেমে পড়েছিলাম, পরস্পরের। সে তুমি জানো।

আমাদের এই সম্পর্কের কথা, প্রথম থেকেই জানতো আমাদের উভয় পরিবারের সব লোকজন। কীভাবে যেন আমরা হয়ে উঠেছিলাম একে অপরের নিত্য সহচর। যেন চির পরিচিত একান্ত আপন।

কত সময় আমরা কাটিয়েছি একসাথে, পারিবারিক আড্ডায় অথবা নির্জনে। কখনো মনে হয়নি, স্থূল প্রাপ্তির কদর্যতা আসতে পারে আমাদের সম্পর্কের মাঝে। অথচ তুমি ছিলে পূর্ণযৌবনা, আমি ছিলাম উচ্ছ্বল এক তরুণ। আমরা পছন্দ করতাম একে অপরকে। এর চেয়ে বেশি কিছু যেন হতে পারে না আর।

চাইলেই ছোঁয়া যায়, অথচ স্পর্শ না করে থাকা …! কী মধুর সম্পর্ক ছিল তোমার আমার মাঝে। ছিল অদ্ভুত এক বোঝাপড়া। তুমি অসাধারণ সংযমী এক নারী। পরশ পাথরের ছোঁয়ায় স্বর্ণ হয়ে ওঠা ধাতবের মতো, আমিও যেন হয়ে উঠেছিলাম এক সিদ্ধ পুরুষ।

যখন তুমি ছিলে, আমার জীবনে ছিল তোমার প্রবল উপস্থিতি, সে সময়টুকু ছিল প্রচণ্ড সুখের, অনির্বচনীয় ভালোলাগার এক বিরল সময়। এক ব্যতিক্রমী অধ্যায় আমার জীবনে।

তোমার পরের জনের কাছে, তোমার গল্প করেছি কত, সে তুমি যদি জানতে …! আমার ব্যক্তিগত জীবনের গল্প করেছি, অথচ তোমার কথা বলিনি, এমনটি হয়নি কখনো কারো সাথে।

আমার স্মরণে, স্বপনে, জাগরণে, মানবিক সংকটকাল আর কল্পনার প্রতিটি অনুরণনে, এখনো আছো তুমি, ঠিক তেমন করে।

তোমাদের সাথে আমি প্রতারণা করিনি। মিথ্যে করে বলিনি কাউকে, ‌‘শুধু তোমাকেই ভালোবাসি’। কাউকে বাদ দেইনি। অন্য কাউকে দিয়ে কাউকে করিনি প্রতিস্থাপিত।

মাতৃগর্ভে সঞ্চারিত একাধিক ভ্রুণের মত, আমার ভালোবাসার নারীদেরকে রেখেছি যতনে, আমার হৃদয়ে। প্রার্থনা করি তাদের মঙ্গল কামনায়।

হৃদয়ের দামে যতটুকু পাই, কিনে নিতে চাই। তাতেই তুষ্ট আমি। চাই না কৌশলী হতে। তাই, গোপন করিনি কোনো কথা। এতে করে আমাকে নির্লজ্জ, নির্বোধ অথবা সাহসী, যা-ই বল, আপত্তি করব না তাতে। চেয়েছি শুধু অকপট হতে। যেমন করে মানুষ অকপট থাকে নিজের কাছে নিজে।

কত কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়েছি তোমাকে। মনে পড়ে। বিশেষ করে সেই কবিতাটি যখন আবৃত্তি করি তখন প্রবল হয়ে ওঠে তোমার স্মৃতি, ‍“তীরে তমালের ঘন ছায়া, আঙিনাতে যে আছে অপেক্ষা করে তার পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর!”

আজ তুমি কত দূর …! অথচ, আমার জীবনে যত স্মৃতি মধুর, তাতে আছে যে ক’টি প্রিয় মুখ, তুমি তেমনি একজন চির আপন স্বপ্ন-সহচরী।

আমার কাছে তুমি শুধু এক নারী। তোমার সামাজিক পরিচয় আমার কাছে নয় ততটা গুরুত্বপূর্ণ। তুমি অন্য কারো সন্তানের মা, তাতে আমি হইনি বিব্রত কোনোদিন। সে তুমি জানো।

তোমার প্রতিটি সুখ যেন আমারই সুখ। তোমার প্রিয়জন যেন আমারই প্রিয়জন। সেভাবেই অনুভব করেছি তোমাকে। অন্য কারো চেয়ে এটি সবচেয়ে বেশি তুমি জানো।

ভালোবাসা দিয়েছি, পেয়েছি অকৃত্রিম। এর চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না মানুষের জীবনে।

প্রথম দেখার ছাব্বিশ বছর পরে, এই তো ক’মাস আগে বলেছি তোমাকে ‌‘ভালোবাসি’। বলেছি হৃদয়ের কথা। তোমার সাথে। তোমার প্রিয়জনের সাথে। আর সেই অদেখা জনের সাথে। এই স্মৃতি অবিস্মরনীয় আমার জীবনে।

ভালোবাসার কোনো নারীর কাছ থেকে আমি লুকাইনি আমার কারো সাথে তেমন কোনো সম্পর্কের কথা। বরং, বলেছি আমার ভালোলাগার কথা, ভালোবাসার কথা।

প্রথম বর্ষার সেই রাতে, এক কিশোর প্রেমিকের মতো ভালোবাসা নিবেদন করেছি একে একে। পরস্পরের গোচরে। নির্ভয়ে। স্বকন্ঠে। তুমি সেই ত্রয়ীর অন্যতম। দ্বিতীয় জন।

মাঝে মাঝে মনে হয় এমন, মনে হয়‌ তখন আমি ভুল করেছি। এত বেশি কষ্ট পেতে হবে আমাকে সেই সরলতার জন্যে, সেটি যদি জানতাম, তাহলে হয়তোবা কিছুটা কৌশলী হতাম। আবার ভাবি, কী দরকার, ভালোবাসার মানুষের সাথে কৌশলী হওয়ার? যা হবার তা হবে।

তুমি বা তারা, যদি না বাসে ভালো আমাকে আর, তাতে তো আমার কিছু করার নাই। আমি প্রেমিক পুরুষ। ভালোবাসাতেই আমার সুখ। ভালোবাসাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।

ভালোবাসতে পারার মতো বড় সুখ আর নাই। হতে পারে না কিছু ভালোবাসার চেয়ে বেশি দামি। তেমন সুখ আমি পেয়েছি যে ক’জনার কাছ থেকে, তুমি তার অন্যতম।

মাঝে মাঝে মনে হয়, সামাজিক সব পরিচয় আর সম্পর্কের উর্দ্ধে উঠে, যদি হতে পারতাম আবার, তেমন অবাধ, নিশঃঙ্ক চিত্ত, দুর্দান্ত, দুর্বার, তোমার সাথে …!

এ জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি, যা ছিল না পাওয়ার …! তেমনি এক দুর্লভ প্রাপ্তি, তুমি। আমার এই অপ্রার্থিত জীবনে।

বেশি দিন আর নাই। স্বাভাবিক জীবনকালের দুই-তৃতীয়াংশ হয়েছে বিগত-প্রায়। চলে যাব সহসাই। কে যে আগে যাবে, কে জানে!

তোমার আগে যদি চলে যাই, একদিন আসবে আমার সমাধি পরে। কথা দাও …! ক’ফোটা অশ্রু ফেলে যাবে, সেই ‌‘মাটির ঘরে’। যদি পারো, এই অনুরোধটুকু রেখো। ভালো থেকো।

ভালোবেসে যারা করেছে জীবন পার, অগুণিত সেই মানুষের মতো, আমাদের পূর্বসূরিদের মতো আমরাও হারিয়ে যাব এই সুন্দর পৃথিবী হতে। মিশে যাব ধুলায়। তবুও কেন জানি মনে হয়, কোথাও কোনোখানে রয়ে যাবে আমাদের, দু’জন অসহায় নর-নারীর, এই হৃদয় কেনাবেচার স্মৃতি।

ইতি –
এই পৃথিবীতে তোমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ,
অন্তত এক সময়ে যে ছিল তেমন,
সেই প্রিয়জন, ভাই, বন্ধু, আপন,
শ্রাবণ দিনের আকাশ

Leave a Reply