বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা হচ্ছে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা

“বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশাল এক উচ্চাশা নিয়ে ভর্তি হইছিলাম। টানা দুইবার HSC-তে ফেল করার পর জ্ঞান গবেষণার বড়সড় নেশা চেপে গেছিল মাথায়৷ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দেবতূল্য মনে করতাম৷ কিন্তু এনাদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে পড়াশোনা থেকে কবে যে হাজার মাইল দূরে সরে এসেছি, নিজেই বুঝতে পারিনি৷ যখন বুঝলাম তখন দেখি অনেক দেরি হয়ে গেছে৷

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে ২ বছরে যতটুকু পড়েছি, ভর্তির পর ৫ বছরে সম্ভবত তার ৫ ভাগের ১ ভাগও পড়ি নাই৷ এর দায় আমি সম্পূর্ণভাবে এসব প্রতারক শিক্ষকদের উপরেই দিব, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার নামে কেবল প্রতারণা আর … উপহার দিয়ে গেল।”

ইনবক্সে আমাকে বলা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রাক্তন ছাত্রের কিছু কথার এটি শেষাংশ। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিচারণ করে সে ফেইসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিল, যার সূত্রে তারসাথে ইনবক্সে আমার এই আলাপ। ছাত্রজীবনে তার সাথে আমার পরিচয় ছিল।

তার চালচলন দেখে মনে হয়েছিল, সে প্রগ্রেসিভ পলিটিক্স করে কিংবা এ’ধরনের ধ্যান-ধারণা পোষণ করে। উক্ত ফেইসবুক স্ট্যাটাসে সে বলেছে,

“আমাদের এক শিক্ষক ছিলেন, ক্লাসে এসে খবর পাঠ শেখাতেন৷ তার ক্লাসে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। প্রশ্ন করলে সমস্যা আছে। ’লেকচারটা মনোযোগ দিয়ে শোন, তোমার প্রশ্নের উত্তর এখানেই থাকতে পারে, হুঁ, হ্যাঁ …!”

সঙ্গত কারণে পুরো বিষয়টাকে নৈর্ব্যক্তিক রেখে যতটুকু বলা যায় তা এখানে বললাম। তার দাবী মোতাবেক, “পুরো ডিপার্টমেন্টটাই এমন … শিক্ষকে ভর্তি৷ তাঁরা নিজেরা জানেন না তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার, পড়াশোনার, শিক্ষকতার উদ্দেশ্য কী৷ শুধু ডিপার্টমেন্ট না, পুরো বিশ্ববিদ্যালয়েরই একই হাল৷”

তার স্ট্যাটাসে অনেক স্টুডেন্ট মন্তব্য করেছে। একটি মন্তব্য এ’রকম, “বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের এক ম্যাডাম ছিলেন, খুব গ্লামারাস দেখতে। ক্লাসে এসে ছেলে, মেয়ে এবং নিজের বিদেশ ভ্রমণের কিচ্ছা বলতেন। বাজার থেকে গতকাল কি কি কিনেছিলেন সেটাও বলতে ভুলতেন না। শুধু পড়াটাই হতো না ক্লাসে। বাকি সব ঠিক ছিলো।”

বাজারদর অনুসারে ভাল, এমন একটা বিভাগে পড়তো আমার ব্যক্তিগত অধ্যয়ন কেন্দ্র সিএসসিএস-এর এক প্রাক্তন সহকারী মো. আইয়ুব আলী। বিভাগ সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা ছিল খুব খারাপ। সে ছিল রেজাল্টের দিক থেকে তাদের ব্যাচে প্রথম কয়েকজনের একজন।

ডিপার্টমেন্ট নিয়ে তাকে কিছু বলতে আমি ভয় পেতাম, না জানি কখন সে আউটবার্স্ট করে, কোনো পরিচিত শিক্ষক সম্পর্কে আমার সু-ধারণা নষ্ট করে দেয়!

আমার বর্তমান সহকারীদের একজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ঐতিহ্যবাহী বিভাগের সিনিয়র স্টুডেন্ট। বিভাগের একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে সে যেসব কথাবার্তা বলে, যে ধরনের অভিজ্ঞতা আমার সাথে শেয়ার করে, শুনে আমি তাজ্জব বনে যাই!

নিজেকে মনে হয়, আমি যেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ না। অবাক হয়ে ভাবতে থাকি, একটা বিভাগ কি এভাবে চলতে পারে? এমনও কি সম্ভব?

শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর একটা আন্দোলন হয়েছিল। সে’সময়ে আমি লেখালেখি করেছিলাম। বলেছিলাম, শিক্ষকদেরকে ঠকানো মানে নিজেকে নিজে ঠকানো। পশ্চিমাবিশ্বের মতো না হলেও অন্তত পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করা উচিত। একইসাথে এমন ধরনের কথাও বলেছিলাম,

শিক্ষকতাকে এনজয় করে না, ঔন করে না এমন অযোগ্য শিক্ষকদেরকে বিসিএসআইআর ল্যবরেটরিজের মতো তাদের জন্য উপযুক্ত গবেষেণাকেন্দ্রে ট্রান্সফার করা হোক। অথবা, প্রশাসনিক কর্মে আগ্রহীদেরকে বিসিএস-এর মতো পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষা-কর্মকর্তা হিসেবে স্থায়ীভাবে পদায়ন করা হোক।

এই দুই ধরনের কাজের কোনোটিতেই উপযুক্ত নন এমন শিক্ষকদেরকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় স্বেচ্ছা-অবসর প্রদান করা হোক। বছরের পর বছর ধরে শিক্ষকতার নামে প্রতারণা করার জন্য ক্ষেত্রবিশেষে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদেরকে জেল-জরিমানার আওতায় আনার কথাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

এ’সব কথার জন্য তখন আমি সহকর্মীদের কাছে খুব অপ্রিয় হয়েছিলাম। কাছের কেউ কেউ আমাকে সেলফ-হেইটারও বলেছিলেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে স্টুডেন্টদের জন্য অনেককিছু করতে পারতাম। যখন যৌবন ছিল, অপরিমিত ক্ষমতা ছিল তখন ছিলাম দলান্ধ। অবশ্য তখনও আমি ব্যক্তিগতভাবে কারো ক্ষতি করিনি। কারো সাথে মিসবেহেইভ করিনি। নিয়মিত প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাস নিয়েছি। নতুন নতুন কোর্সে পাঠদান করেছি।

এ’সব সান্ত্বনা আমার অনুশোচনা ও গ্লানিবোধকে কিছুমাত্র কমাতে পারে না। বৃন্তচ্যূত পত্রের মতো আমি এখন শিক্ষক কমিউনিটি থেকে বিচ্ছিন্ন। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি এক্সট্রা-একাডেমিক সব কার্যক্রম থেকে। ওয়ার্কিং রিলেশন বজায় রাখার জন্য লোকজনের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রেখে চলি।

ভাবি, টিচারদের জন্য এসি বাস হয়েছে। ভাল। এটি তাদের দরকার। তাই বলে ছাত্রছাত্রীদের জন্য সিলিং ফ্যানও থাকবে না, এতটা বৈষম্য কেন?

ছাত্রছাত্রীরা কোথায় থাকে, কীভাবে আসে, কীভাবে যায়, কী খায়, কী করে, পড়ালেখা না করে, না ঘুমিয়ে রাত-বিরাতে ক্যাম্পাসজুড়ে কেন তারা ঘুরে বেড়ায়, কী তাদের ভবিষ্যত, শিক্ষকদের কাছে এ’গুলি কার্যত অবান্তর প্রশ্ন। এসব নিয়ে ইনজেনারেল শিক্ষকদের কোনো মাথাব্যথা নাই।

বিশেষ করে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের এই যে ব্যাপক মান-অবনতি, এর অবসান কোথায়? কীভাবে?

এই যে ‘মান-অবনতি’র কথা বললাম, এটাকেও শিক্ষকেরা নিজেদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নের জন্য ফান্ড আসবে। নানা কায়দায় তারা এ’সব ফান্ডকে ভাগ বাটোয়ারা করে নিবে।

শেষ পর্যন্ত বঞ্চিত থেকে যাবে স্টুডেন্টরা, যাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় নামক এই জাতীয় প্রতিষ্ঠান। ইউনিভার্সিটি কন্সেপ্টে যারা হলো মূল স্টেকহোল্ডার। বাস্তবে তারা, মানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা হচ্ছে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা।

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

রূহান: আজকে আমার স্ত্রীকে কুষ্টিয়া, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে নিয়ে এসেছি। এলাকার এক জুনিয়রের রুমে অবস্থান করছি। আপনার পোস্টটা পড়ে, এখন কমেন্ট করছি। ঐ জুনিয়রের থেকে কিছুক্ষণ আগেই শুনলাম এখানেও দুইটা রুম চেঞ্জ করে বর্তমান রুমে এসেছে। কেননা আগের রুমমেটরা রুমের মধ্যেই গাঁজা সেবন করত। আজকে সন্ধ্যায়ই নাকি প্রক্টরকে ক্যাম্পাসের আড়ালে আবডালে অন্ধকার জায়গা থেকে লাইট ধরে ধরে ছেলে-মেয়েদের উঠিয়ে দিলো।

Mohammad Mozammel Hoque: আমরা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েছি পাশ্চাত্য থেকে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশকে সাজিয়েছি পাশ্চাত্যের মতো করে। অথচ, সেখানকার প্রাকটিসকে এখানে আমরা মানতে নারাজ। সমস্যার গোড়া এখানে।

এই দৃষ্টিতে, আমাদের দ্বিমুখী শিক্ষাব্যবস্থাই সর্বনাশের কারণ। অপ্রিয় সত্য কথা হলো, মাদ্রাসাশিক্ষার ব্যর্থতার কারণে সাধারণ শিক্ষা আমাদের মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

দ্বীন-দুনিয়ার এই ভাগাভাগি আমাদেরকে এই বিপদজনক পরিণতির সম্মুখীন করেছে। একদিকে নাই দুনিয়া পরিচালনার যোগ্যতা, যার জন্য আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাঁর খলিফা বানিয়েছেন; অন্যদিকের ব্যবস্থায় নাই নৈতিকতার কোনো বালাই। আম গাছ হতে তো আর কাঁঠাল ফলবে না। তাই না?

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *