খোদা কি একটা বিরাট শিশু, যার কাছে জগত একটা ভিডিও গেইম?

“আমরা হলাম ভিডিও গেমের ভিতরে থাকা এক একটা চরিত্রের মতো। সবাই গেমের ভিতর থেকে খুঁজছি, গেমের উদ্ভাবক কে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব না। উদ্ভাবক যে কোনোসময় চাইলে গেমের যেকোনো চরিত্রকে অথবা পুরো গেমটিকে মুছে দিতে পারেন।”

খোদার সাথে মানুষ ও জগতের সম্পর্ক কী?

এই প্রশ্নের আগের প্রশ্ন হলো, জগতের সাথে মানুষের সম্পর্ক কী? তারও গোড়ার প্রশ্ন হলো, মানুষ আসলে কী?

আমার মনে হয় ‘মানুষ আসলে কী’ এই প্রশ্নেরও আগের একটা প্রশ্ন আছে এবং সেটাই মূল প্রশ্ন। এই নাম্বার ওয়ান কোশ্চেনটি হলো, আমি কে? কী আমার পরিচয়? কেন আমি আছি? কোথা থেকে আমি এসেছি? কোথায় বা আমি যাব?

আমি আছি, এটি ধ্রুব সত্য। আনডিনায়েবল ব্রুট ফ্যাক্ট। যেভাবেই আপনি এই সত্যকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেন না কেন, সেই চেষ্টা আপনার অস্তিত্বশীল থাকাকেই বরং আরো বেশি করে প্রমাণ করবে।

আমি আছি। কিন্তু কোথায় আছি?

এ পর্যায়ে আপনি বুঝতে পারবেন, আপনি একটা জগতের মধ্যে আছেন। যেখানে বাই ক্যাটাগরি আপনার মতো আরো কিছু সত্ত্বা অস্তিত্বশীল। তারা মানুষ।

তাহলে আমরা ফেরত আসলাম এই প্রশ্নে, আমরা মানুষেরা এবং আমাদেরকে ধারণ করার জন্য এই বিশ্বজগত, এ’সবকিছু কেন অস্তিত্বশীল? এ’গুলো কোত্থেকে এসেছে? এসব কিছু অস্তিত্বশীল থাকার এবং যেভাবে আছে সেভাবেই থাকার অর্থ কী? এ ধরনের মৌলিক প্রশ্নের উত্তরে আমরা খোদার ধারণায় উপনীত হই। খুঁজে পাই তাঁকে সবকিছুর ‘কারণ’ হিসেবে।

অতএব খোদা আছেন।

খোদাকে আমরা জানতে পারি না। কিন্তু জানার চেষ্টা করি। যেমন করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি ফিগার-আউট করার চেষ্টা করে একটা বৃহৎ হাতিকে। জন্মান্ধের কাছে আপনার-আমার চেনা, জানা, দেখা এই দুনিয়াটা অনেকখানি ভিন্নরকম। জন্মান্ধের সেই বাস্তব তার মতো করে বাস্তব। সেই জগতে কোনো আলো নেই, কোনো দৃশ্য নেই। কিন্তু আছে কিছু পরিস্থিতি। আছে তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি। সেই সবকিছু তার মত করে, তার দিক থেকে, তার জন্য বাস্তব। আমাদের দৃষ্টিতে এ’গুলো খণ্ডিত বাস্তবতা।

তেমনি করে পরম সত্তা সম্পর্কে আমাদের যত জ্ঞান, তা শেষ পর্যন্ত আলটিমেট রিয়েলিটির খণ্ডচিত্র মাত্র।

দূর থেকে যেই পাহাড়ের একটা অংশ আপনি দেখেন, সেটা সেই পাহাড়েরই অংশ। আপনার অবস্থান থেকে পাহাড় মানে তা-ই। যদিও আপনি জানেন, পাহাড় মানে আসলে এর বাইরে আরো অনেক কিছু। প্রকৃত পাহাড় অনেকখানি ভিন্নরকম।

মানুষের দৃষ্টিতে খোদাও তেমন।

আমরা সব কিছুকে আমাদের মতো করে দেখি, আমাদের মতো করে ভাবি। আমাদের এই anthropomorphic দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নাস্তিক্যবাদের পক্ষের লোকেরা মনে করে, খোদা হলো মনুষ্যসৃষ্ট একটা ধারণা মাত্র।

পিউর অ্যাথিস্টিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুধু খোদা নয়, আমাদের সকল জ্ঞানই আমাদের সৃষ্ট। মানুষ, জগত, রাষ্ট্র , সরকার, অর্থ, বিদ্যালয়, পরিবার, এক কথায় আমাদের সবকিছু আমাদের সৃষ্ট। একজন সংশয়বাদী কিংবা একজন অবিশ্বাসীর দৃষ্টিতে পিউর অবজেক্টিভ বলে কোনো কিছু নাই।

অবজেক্টিভিটি-সাবজেক্টিভিটির অন্টলজিক্যাল রিলেশন নিয়ে আমি এখানে কোনো আলোচনার সূত্রপাত করতে চাচ্ছি না।

আপনি একটু খোলা মন নিয়ে হারারিকে পড়ে দেখেন। দেখবেন, ‘বিজ্ঞান’ নামক যে ‘গর্বের ধন’, সেটিও মূলত মানবসৃষ্ট। হিউমান-ইন্ডিপেন্ডেন্ট কোনো নলেজ আউট দেয়ার অটোমেটিক্যালি এগজিস্ট করে না।

হারারির দৃষ্টিতে এগুলো সব মিথ। এবার ঠেলা সামলান। গডকে মিথ বলতে গিয়ে দেখা গেল সব কিছুই মিথ।

এখানে আমি অবজেক্ট ল্যাঙ্গুয়েজ এবং মেটাল্যাংগুয়েজ এর প্রসঙ্গ টেনে জটিলতা সৃষ্টি করতে চাচ্ছি না।

হারারির গ্রস মিস্টেকগুলো নিয়ে আমি বেশ ক’বছর আগে একটা সেমিনার করেছিলাম। এখানে শুধু এটুকু বলি, তিনি ইমাজিনেশন এবং মেটাফিজিক্যাল রিয়েলিটির পার্থক্যকে গুলিয়ে ফেলেছেন।

মন্তব্য – প্রতিমন্তব্য

Mohammad Mozammel Hoque: খোদা সম্পর্কে আমরা তিন স্তরে ধারণা পোষণ করি:

প্রথম স্তরে আমাদের দিক থেকে খোদাকে আমাদের যেমন মনে হয়, খোদা সম্পর্কে আমরা তেমন ধারণা পোষণ করি।

খোদার সম্পর্কে আমাদের এই প্রাথমিক স্তরের ধারণা অ্যাড হক পর্যায়ের। ক্ষেত্রবিশেষে সঠিক, ক্ষেত্রবিশেষে খণ্ডিত এবং ক্ষেত্রবিশেষে পরিত্যাজ্য।

খোদা নিজের সম্পর্কে যা বলেছেন তা সর্বান্তকরণে আমরা মেনে নেই। খোদা সম্পর্কে এটি আমাদের দ্বিতীয় স্তরের ধারণা। এর বাইরে খোদা আসলে কেমন সেটা আমরা জানি না। খোদার স্বরূপ আমাদের জানার অগম্য। এটা খোদা সম্পর্কে আমাদের চূড়ান্ত ধারণা।

ইসলামিক দিক থেকে, দ্বিতীয় ধরনের ধারণা বা বিশ্বাস হচ্ছে খোদার সিফাতের উপর ঈমান। খোদার জাতের উপরে বিশ্বাস স্থাপন হচ্ছে খোদা সম্পর্কে আমাদের চূড়ান্ত বিশ্বাস।

Mohammed A. Bashar: খোদা সম্পর্কে মানুষ তাই ধারণা ও বর্ণনা করে, জন্মান্ধ ব্যক্তি দুনিয়া সম্পর্কে যা ধারণা ও বর্ণনা করে ঠিক তার অনুরূপ। ধন্যবাদ।

Mohammad Mozammel Hoque: যেমন ফিজিক্স, তেমন মেটাফিজিক্স, তেমন জ্ঞানতত্ত্ব, তেমন মূল্যতত্ত্ব। For any entity, physics determines metaphysics, metaphysics determines, epistemology. concerned entity’s epistemic appraisal determines its/his logic, ethics and aesthetics. সোজা কথায়, যে যেমন তার জ্ঞানও তেমন।

Mohammad Tausif Rafi: I think whether physics determines metaphysics or vice versa is an epistemological position, based on subjective ontological and epistemological ideas. Am I wrong?

Mohammad Mozammel Hoque: I do not think so. Of course, subjective phenomena, specifically intentionality has a genuine role, but physical setup sets the boundary or the limit. For potentiality, physics or physical condition is a necessary condition. For actuality, physics or physical condition is not a sufficient condition.

Mohammad Tausif Rafi: আমি যতটা বুঝি, আমি আছি এটা লজিকালি ঠিক অবশ্যই, মূলত ল অব ননকন্ট্রাডিকশন নির্ভর, আমি আছি আর নাই একসাথে হতে পারে না, তাই অবশ্যই আছি। কিন্তু এই ল তো ফান্ডামেন্টালি এক্সিয়ম্যাটিক, আমাদের অভিজ্ঞতায় একসাথে আছে এবং নাই এইরকম কিছু নাই, থাকা সম্ভবও না, কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বাস্তবতার নির্ধারক সেটা আমরা কীভাবে জানি? আর কেউ অন্য কারো কল্পনা বা স্বপ্ন হিসাবে থেকেও আছে বলে ভাবা সম্ভব। তবে সেটাও অবশ্য একভাবে থাকা, তাই সেটা আসলে কোন পয়েন্ট হতে পারে না সেটা বুঝি।

Mohammad Mozammel Hoque: আমাদের যে কোনো যাচাই আমাদের প্রি-ফিলসফিক্যাল বেইসিক বিলিফগুলোর ভিত্তিতে আমরা সম্পন্ন করি। এইগুলোকে আমরা স্বতঃসিদ্ধ বলি। এইগুলো সব মানুষের মধ্যে সমান। আমরা যদি এ’গুলোকে কেয়ারফুলি এপ্লাই করি বা ফলো করি, তাহলে আমাদের মধ্যকার যে কোনো বিরোধ মিমাংসা সম্ভব।

একটা তত্ত্বের সরলতার সাথে সেটির ব্যাখ্যাগত ক্ষমতাও থাকা লাগে। আগামীকালের ক্লাসের জন্য এখনি একটু প্রস্তুতি ঝালাই করলাম, মেটাফিজিক্যাল রিয়্যালিজম বনাম অস্টিয়ার (মানে, র‍্যাডিক্যাল) নমিনালিজমের ওপর।

প্রথম পক্ষের তত্ত্ব Two-category theory, দ্বিতীয় পক্ষের তত্ত্ব one-category theory। সরলতার হিসেবে নামবাদীদের তত্ত্ব অধিকতর গ্রহণযোগ্য। অথচ, নমিনালিজম বা নামবাদ মেনে নিলে সব কনক্রিটকেই বেইসিক এবং অব্যাখ্যাত হিসেবে মেনে নিতে হয়। সেই হিসেবে এই তত্ত্ব বহন-অযোগ্য ভারী। এটি সরল, কিন্তু খণ্ডিত। এটি সমগ্রকে ব্যাখ্যা করতে পারে না।

চাইলেই আমরা যে কোনো কিছু বস্তুগতভাবে বানাতে পারি না। কিন্তু চাইলেই আমরা যে কোনো কিছু কল্পনা করতে পারি। এই যে ধারণা, এটি ভুল। মানুষ গণহারে এই ভুল করে।

তোমার আগ্রহ থাকলে কল্পনা, কল্পনার সীমা ও অধিবিদ্যাগত বাস্তবতা নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে লিখতে পারি। কাল-পরশুর পর্বগুলোও লিখে রেখেছি। সেখানেও কিছু কন্টেন্ট পাবে। থ্যাঙ্কস ফর ইউর ইন্টারেস্ট।

Mohammad Tausif Rafi: সরি, আমি ল অব ননকন্ট্রাডিকশন যে কল্পনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য সেইটা উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। একইসাথে অস্তিত্বশীল এবং অস্তিত্বহীন কোনো কিছু আমরা অবশ্যই কল্পনা করতেও পারি না। কিন্তু বাস্তবতা নিশ্চয়ই আমাদের কল্পনার সীমা দিয়ে নির্ধারিত না? স্বতঃসিদ্ধের ব্যাপারে আমি অবশ্যই একমত।

আমার আগ্রহের ব্যাপারে কেয়ার করার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমি উল্লেখিত বিষয়গুলোর ব্যাপারে আগ্রহী, তবে এতটা বেশি আগ্রহী না যে আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করে এই প্রসঙ্গে লিখার অনুরোধ করবো।

Iftekhar Hossain Simanto: যিনি প্রশ্ন করছেন উনি এখানে “anthropomorphic fallacy” commit করেছেন।

Mohammad Mozammel Hoque: ফ্যালাসি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে দেখলাম, ফ্যালাসির বাইরে কোনো জ্ঞানের দাবী নাই। সেজন্য ফ্যালাসির বইয়ে একটা ফ্যালাসি আছে, সেটি হলো ফ্যালাসি অব ফ্যালাসি।

আর হ্যাঁ, উদ্ধৃতির অংশটুকুতে এনথ্রোপোমর্ফিক ফ্যালাসি হয়েছে।

এনথ্রোপমর্ফিজম সম্পর্কে দু’টা কথা:

১. আমরা এর থেকে বেরোতে পারি না।

২. এটি যে আমাদের সীমাবদ্ধতা, সেটি আমরা বুঝতে পারি।

তোমাকে একটা দুঃখের কথা বলি। ফিলসফি নিয়ে মনখুলে কথা বলার সুযোগ সচরাচর হয়ে উঠে না। অথচ, তাত্ত্বিক আলোচনা হলো আমার জন্য এন্টিডৌট। তাত্ত্বিক আলোচনার সময়ে আমি সব কষ্ট ভুলে যাই। কোত্থেকে যেন শক্তি পাই।

ভালো থাকো।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *