দেশে ধর্মবিদ্বেষের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে এক প্রবল ধর্মান্ধতা।
এই যে রোজা আসছে। ক্লাসের স্টুডেন্ট সংখ্যা ১২০। সকালে গিয়ে দেখি আছে মাত্র দুইজন। পরে আরো ১৫-২০ জন আসছে। রোজা শুরু হওয়ার আগেই তারা সবাই বাড়ি চলে গেছে।
ধর্মের কোথায় আছে রোজার সময়ে ক্লাস করা যাবে না? শরই কোনো নির্দেশনা যদি না থাকে তাহলে কিসের ভিত্তিতে ‘রোজার মধ্যে ক্লাস করা যাবে না’ সেজন্য মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত হচ্ছে?
সপ্তাহে একদিন দুইদিন ছুটি থাকতে হয়। সেই হিসেবে ছুটির দিন যে কোনো দিন হতে পারে। সেটা শুক্রবারই হতে হবে কেন?
কুরআনের ১১৪টা সূরার মধ্যে একটা সূরার নাম সূরা জুমা। সেখানে ৭ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে যখন জুমার নামাজ শুরু হবে তখন সবকিছু বাদ দিয়ে নামাজে শরিক হতে হবে। এর অব্যবহিত পরের আয়াতে বলা হচ্ছে ‘অতঃপর যখন নামায সমাপ্ত হয়, তখন যমীনে ছড়িয়ে পড়, আর আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর।’
তারমানে আল্লাহতালা বলছেন, জুমার নামাজ যখন শেষ হয়ে যাবে তখন মসজিদে বসে থাকার চেয়ে পেশাগত কাজকর্মে নিয়োজিত হওয়াটাই উত্তম।
এখন ইহুদি খ্রিষ্টানদের মতো আমরা ঠিক করে নিছি যে আমাদের একটা সাপ্তাহিক ইবাদতের দিন, এবং সেদিন কোনো কাজকর্ম না করাই ভালো। কেমন কথা?
সফরে নামাজ কসর হয়ে যায়। মানে, সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়। জুমা ফরজ থাকে না। অথচ দেখা যায় ইন্টারডিসট্রিক্ট গাড়িগুলো জুমার সময়ে থামিয়ে লোকেরা ফরজ ওয়াজিব সুন্নত নফল সব গণহারে পড়তে থাকে।
এক সাহাবী উনার এলাকাতে লম্বা কেরাতে নামাজ পড়াতেন। একজন সাহাবী একদিন নামাজ ভেঙ্গে নিজে নিজে নামাজ পড়ে চলে যাওয়ার পরে লোকজন উনাকে অভিযুক্ত করলো। বিষয়টা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পেশ করা হলে তিনি উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে জামায়াত থেকে বের হয়ে গিয়ে একাকী নামাজ পড়ে বাড়ি ফেরা সাহাবীর পক্ষ নিয়ে বললেন, ‘আমারও ইচ্ছা করে বড় কেরাতে নামাজ পড়াই। কিন্তু আমি সেটি করি না। কারণ নামাজের মধ্যে থাকে এমন নারীরা যাদের শিশুসন্তান আছে, এবং এমন ব্যক্তি যাদের কোথাও যাওয়ার তাড়া আছে। তোমরা ছোট ছোট সূরা দিয়ে নামাজ পড়াবে।’ এর পরে উনি আমপাড়ার দু’একটা ছোট ছোট সূরার কথা বললেন।
কোথায় আল্লাহ রাসুলের সুন্নত, আর কোথায় আমাদের ….!
রাস্তার পাশের মসজিদগুলো থেকে দূরপাল্লার যাত্রীদের বরং বলা উচিত, ‘যাত্রী ভাইয়েরা, আপনারা তাড়াতাড়ি দুই রাকাত নামাজ পড়ে বাসে উঠে পড়েন। জুমা আপনাদের জন্য ফরজ না।’ না, সেটা তো উনারা বলবেন না। … হক কথাটা বললে মসজিদে কালেকশনের ‘বরকত’ হবে কীভাবে?
বাংলাদেশে ধর্মবিদ্বেষের ব্যাপারগুলো যতটা বাস্তব, ধর্মান্ধতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামিও ঠিক ততটাই বাস্তব।
কিছু লোক দেখবেন অলওয়েজ ধর্মান্ধতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সোচ্চার। কিছু লোক দেখবেন, শুধুমাত্র ধর্মবিদ্বেষের ব্যাপারে সোচ্চার। প্রথম প্রকারের মানুষ হল প্রগতিশীলতার নামে মূলত ধর্মবিদ্বেষী। দ্বিতীয় প্রকারের মানুষ ধার্মিকতার নামে মূলত ধর্মান্ধ। ফ্যানাটিক।
এই উভয় ধরনের এক্সট্রিমিজমসহ যে কোনো রকমের চরমপন্থাকে আসুন রুখে দাঁড়াই সত্য ও ন্যায়ের প্রবল শক্তিতে।
ইসলাম মূলত ‘ওয়াসাতিইয়া’ বা মধ্যপন্থার পক্ষপাতি। কোরআনের মধ্যে তাই বলা আছে। আমরা যেন নিজেদেরকে পোপের চেয়ে বড় খ্রিস্টান, রাসুলের চেয়ে বড় মুসলমান মনে না করি…!

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য
Farzana Subrin Rinti: সাপ্তাহিক একটা ছুটির ব্যবস্থা সব দেশে এবং সব অফিসেই থাকে। যদি আমাদের ৯০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশে সাপ্তাহিক ছুটি দিতেই হয় তবে সেটা কেন শুক্রবার নয়? যেহেতু জুম্মা পরতে যায় মানুষ একটা প্রস্তুতি আছে একটা বিশেষ মাহাত্ম্য আছে জুমার যেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই সর্বাত্মক বিবেচনায় শুক্রবার দেয়া হয়েছে বন্ধটা।
অন্যান্য দিনে যোহরের নামাজে কাজের কারণে বেশির ভাগ মানুষই গরিমসি করে। অন্তত জুমার দিনে যেন কোনো ভাবে ব্যহত না হয় এটাই চিন্তা ছিলো। এটা একান্তই আমার নিজস্ব চিন্তা এবং পর্যালোচনা।
Mohammad Mozammel Hoque: Thanks for giving a self-evident comment.
Shah Taihan: এই ধর্মান্ধতার কারণে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলো। যাইহোক অতঃপর তারা রায় বাতিল করলো। এবং আপনার প্রত্যেকটা বাক্য যুক্তিযুক্ত। এই ধর্মান্ধতা থেকে আমরা সমাজকে কীভাবে বের করবো?
Mohammad Mozammel Hoque: ধর্মের সঠিক ও নির্মোহ পাঠ, এবং যুক্তি-বুদ্ধির প্রয়োগের মাধ্যমে হতে পারে সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্র।
Shah Taihan: এই যে আমরা মূলত নিজে থেকে কি কি উদ্যোগ নিবো যেন সমাজ হতে একদম তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত অন্ধবিশ্বাস দূরীভূত হয়?
Mohammad Mozammel Hoque: নিজেকে ক্রিটিকাল থিংকিং এ অভ্যস্ত করা এবং সোশ্যাল স্টুপিডিটি থেকে আত্মরক্ষা করার মাধ্যমে আমরা ধর্মবিদ্বেষ এবং ধর্মান্ধতার মত ধ্বংসাত্মক চরমপন্থা থেকে মুক্ত রাখতে পারি।
Ridwanul islam: কোনো মসজিদ থেকে কি বলা হয় যে সফর অবস্থায় কসর পড়বেন না? যিনি মুসাফির এটি তো তার ই দায়িত্ব। এর সাথে মসজিদে কালেকশনের বিষয়টি যুক্ত করা কি সঠিক বিশ্লেষণ?
Mohammad Mozammel Hoque: লোকেরা মনে করে কসরের সুবিধা না নিয়ে পূর্ণাঙ্গ নামাজ পড়াটাই বোধহয় অধিকতর ভালো। এগুলো লোকদের ভুল ধারণা। আলেম-ওলামাদের দায়িত্ব, দ্বীন সম্পর্কে লোকজনের এই ধরনের ভুল ধারণাকে সংশোধন করে দেওয়া। সেটা কি উনারা করেন?
Mohammad Uddin: এই নামাজী যাত্রীদের জন্য বাসে মহিলা ও শিশুরা প্রখর রোদে কষ্ট পেতে দেখেছি। কে বুঝাবে? মহিলাদের নামাজ?
Mohammad Mozammel Hoque: আমার শাশুড়ির জানাযা পড়ার জন্য আমি চিটাগং থেকে রওনা করেছি। বাসের মধ্যে কাঁদতে কাঁদতে শেষ। এদিকে কুমিল্লায় এসে জুমা পড়ার জন্য দীর্ঘ বিরতি। কি যে এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা ছিল সেটি!
Misbahur Rahman: শ্রদ্ধার সাথে দ্বিমত পোষণ করছি। এর সাথে ধর্মান্ধতার কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে করি না। আমি যেহেতু বর্তমান শিক্ষার্থী তাই বিষয়টা আরো কাছ থেকে দেখি।
রোজা রেখে টায়ার্ড হয়ে যাবে বলেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে আসেন না। তাছাড়া এবার নির্বাচন এবং রামাদান কাছাকাছি হওয়ায় দূরবর্তী জেলাগুলোর শিক্ষার্থীরা একেবারে ইদের ছুটি শেষে ক্যাম্পাসে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যদি এমন হতো যে রোজা রেখে সবাই ইবাদাত বন্দেগি করছে, পড়াশোনা বাদ দিয়ে আমল করছে, তাহলে ভিন্ন কথা, কিন্ত বাস্তবতা মোটেই তা নয়। তাই ‘ধর্মান্ধতা’ শব্দটি যথাযথ হয়নি বলে মনে করি।
Mohammad Mozammel Hoque: আমাদের আর্লি টিচিং লাইফে আমরা দেখতাম, ঈদের সপ্তাহখানেক আগে ইউনিভার্সিটি এবং ক্লাস বন্ধ হইতো। ব্যাপকভাবে ক্লাস পরীক্ষা ইত্যাদি চলতো। ইনফ্যাক্ট রোজার সময়ে সব কিছুর মধ্যে অনেক বরকত থাকে।
এখন রোজা শুরু হয়েছে, আর ক্লাস হবে না…! আমার এই আইডিয়া যদি ভুল হয়ে থাকে তাহলে তো ভুল। তবে মনে হয় না ভুল। এবং যদি লোকজনের এই মানসিকতা হয়ে থাকে তাহলে সেটি রোজার সেন্টিমেন্টের সাথে মানানসই নয়।
ধর্মান্ধতা তুমি যদি বলতে না চাও ঠিক আছে না বলো, কিন্তু রোজার সময়ে কাজ কর্ম না করাটা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি তো বটে।
Eḥsânul Ḥaque Shipon: সফরে জুমুআ ফরজ থাকে না একথা সঠিক। তবে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই সারা সপ্তাহ জুড়ে অন্য কোনো নামাজ পড়েন না, শুক্রবারে জুমুআ পড়েন শুধু। এবং শুক্রবার না হয়ে অন্যদিন ছুটি হলে এই সাপ্তাহিক হাজিরা দেয়ার বিষয়টিতে নিশ্চিত ভাবেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
Mohammad Mozammel Hoque: লোকজন ফজরের সুন্নত নামাজ পড়ে না। সেজন্যে কেউ যদি বলা শুরু করে, ফজরের ফরজ নামাজের আগের দুই রাকাত নামাজ পড়া ওয়াজিব, তাহলে সেটা হবে দ্বীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি। ইসলামী পরিভাষায়, ‘গুলু’। আপনি যা বলছেন সেটাও দৃশ্যত এ’ধরনের গুলু’র অন্তর্ভুক্ত।
