ধর্ম শিক্ষা দেয়া কারো পেশা হতে পারে কিনা

হ্যাঁ পারে। সেই শিক্ষা যদি নৈতিক দিক-নির্দেশনা বা আদর্শ প্রচারের কাজ না হয়। এ ধরনের নিছকই শিক্ষা যে কোনো বিষয়ে যে কেউ দিতে পারে। যেমন করে কোনো অমুসলিম পণ্ডিত কাউকে কোরআন, হাদীস ও ফিকাহ নিয়ে শিক্ষাদান করতে পারে। বৃটিশ ভারতে তা প্রচলিত ছিল। ইউরোপ আমেরিকাতে এখনো এটি চালু আছে।

প্রসংগত উল্লেখ্য, শিক্ষা গ্রহণ হতে পারে তিন ধরনের:

১. দক্ষতা অর্জনের জন্য শিক্ষা।

২. সাধারণভাবে কোনো কিছু জানার জন্য শিক্ষা। এবং

৩. নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সংক্রান্ত শিক্ষা।

প্রথম ধরনের শিক্ষা আমরা যাদের কাছ থেকে গ্রহণ করি, তারা হলেন প্রশিক্ষক।

দ্বিতীয় ধরনের শিক্ষা যাদের কাছ থেকে গ্রহণ করি, তারা হলেন শিক্ষক। এবং

তৃতীয় ধরনের শিক্ষা যাদের কাছ থেকে আমরা গ্রহণ করি, তারা হলেন মেন্টর, গাইড বা মুর্শিদ।

বুঝতেই পারছেন তাহলে, কোন ধরনের শিক্ষক অর্থ গ্রহণ করতে পারেন। আমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানই আমাদেরকে বলে দেয়, নৈতিকতা শিক্ষা দিয়ে বিনিময় গ্রহণ বা গ্রহণের দাবি করাটা কতটা হাস্যকর, স্ববিরোধী, নৈতিক শিক্ষার জন্য অকার্যকর ও স্বয়ং একটি অনৈতিক কাজ …!

সমকালীন মুসলিম সমাজে ‘আলেম সমাজ’ বলে যে একটা বিশেষ শ্রেণী গড়ে উঠেছে, সেটি কি জ্ঞানী সম্প্রদায়?

উত্তর যদি হ্যাঁ-সূচক হয় তাহলে বলতে হয়, যে কোনো সমাজের জন্য জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিবর্গ হচ্ছেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রদায়। সমাজের জন্য তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী। কোরআনের সূরা তওবার ১২২ নং আয়াতে এ ধরনের থিংক-ট্যাংক সিস্টেমের কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও বহু আয়াত ও হাদীসে জ্ঞানী-গুণীদের সম্মান, গুরুত্ব, মর্যাদা ও দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রচলিত আলেম সমাজ আমাদের সমাজ কাঠামোতে মস্তিষ্কতুল্য পজিশনে থাকার কথা হলে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রে নেতৃত্বের আসনে নেই কেন?

এ পর্যায়ে এসে কেউ ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কথা বলতে পারে। আমি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও ব্লেইম গেইম চর্চার ঘোরতর বিরোধী। আমি মনে করি, আল্লাহ তায়ালা যোগ্য লোকদেরকে দিয়েই দুনিয়া পরিচালনা করেন। কেউ নেতৃত্বের আসনে না থাকাটা তার বা তাদের সমস্যা, জনগণের নয়। অথবা, তারা উক্ত ধরনের নেতৃত্বের পরিবর্তে হয়তো অন্য ধরনের নেতৃত্বের উপযোগী।

“ধর্মের লোকেরা ধর্মীয় বিষয়ে নেতৃত্ব দিবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর বিষয়ে তারা ইন্টারফেয়ার করবে না” – এটি হলো সেকুলার সেটআপ। প্যারাডক্সিক্যালি আমাদের ধর্মপ্রিয় জনগণ ও আলেম সমাজ বাহ্যত: সেকুলারিজমের চরম বিরোধিতা করলেও কার্যত এই সেকুলার সেট-আপকেই মেনে নিয়েছেন। বরং বেতন-ভাতা দাবি করে এই ধরনের মিউচুয়্যাল এক্সক্লুশান সিস্টেমকে বৈধতা দিচ্ছেন।

তো, যে প্রশ্নটি উপরে করেছি, “সমকালীন মুসলিম সমাজে ‘আলেম সমাজ’ বলে যে একটা বিশেষ শ্রেণী গড়ে উঠেছে সেটি কি মূলত: জ্ঞানী সম্প্রদায়?” – এই প্রশ্নটির উত্তর যদি না-সূচক হয়, তাহলে তারা আসলে কী?

উত্তর হতে পারে, তারা priest class বা ধর্মজীবী সম্প্রদায়। সে ক্ষেত্রে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে পারে, ইসলাম কি ধর্মজীবী সম্প্রদায় থাকার ব্যবস্থাকে অনুমোদন করে? সকল তথ্য প্রমাণ ও যুক্তি বলবে, “না। ইসলামে আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক সরাসরি। এখানে অন্যান্য ধর্মের মতো কোনো প্রিস্ট-ক্লাস থাকার অবকাশ নাই।”

যদি তা-ই হয়, তাহলে এই ধর্মজীবী সম্প্রদায় নিয়ে আমরা কী করতে পারি? বেতন-ভাতা দিয়ে সেটাকে বাঁচিয়ে রাখবো, নাকি এই ভুল সেটআপকে ক্রমান্বয়ে সংশোধন করার চেষ্টা করবো? ‌এ প্রসঙ্গে সমকালীন মুসলিম চিন্তাবিদ মাওলানা মওদূদীর একটা কথাটা আমি পড়েছি। কিন্তু রেফারেন্স খুঁজে পাচ্ছি না। তিনি বলেছেন, মসজিদে ইমামতি করে যিনি জীবিকা নির্বাহ করেন তার চেয়ে মসজিদের সামনে যে লোকটা জুতো সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করেন তার রুজি অনেক বেশি হালাল। স্মরণ থেকে বলছি, তাই এটি হুবহু উদ্ধৃতি নয়।

অবশ্য, লেনিনের কমিউনিস্ট সিস্টেম দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি নিজেই আদর্শ ও পেশাকে আলাদা রাখার এই নীতি ভঙ্গ করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংগঠনে তিনি ফুলটাইমার হিসাবে এক ধরনের সংগঠনজীবী শ্রেণীর উদ্ভব ঘটিয়েছেন, যারা অর্গানাইজেশনাল প্রিস্ট-ক্লাস হিসাবে ভালো-মন্দ দু’ধরনের ভূমিকা পালন করেছেন এবং করে যাচ্ছেন।

ইসলামী মতাদর্শের আলোকে সামাজিক আন্দোলন যারা করতে চান বা অলরেডি এ ধরনের কাজে নিজের মতো করে নিয়োজিত আছেন, তাদেরকে এই গোড়ার সমস্যা নিয়ে ভাবতে হবে। এ ধরনের মৌলিক বিষয়ে কনফিউজড হলে চলবে না। পপুলিস্টও হওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, আদর্শকেই কম্প্রোমাইজ করে আদর্শ প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পন্ন হতে পারে না, যদি সেই আদর্শ হয়ে জীবনাদর্শ।

ইসলামপন্থীদের সমস্যা হলো, তারা মেন্টর, টিচার ও ইনস্ট্রাক্টরের পার্থক্যকে গুলিয়ে ফেলে। এ নিয়ে আমার এই লেখাটি পড়তে পারেন: “প্রশিক্ষক, শিক্ষক ও গুরুর মধ্যে পার্থক্য করতে না পারার ব্যর্থতা ও এর পরিণতি”। এটি নিম্নে সংযুক্ত ভিডিও বক্তব্যটির শ্রুতিলিখন।

দয়া করে কেউ বলবেন না, উমাইয়াদের আমলে এ ব্যাপারে এই হয়েছে, আব্বাসীদের আমলে এই করা হয়েছে, ফাতেমীদের আমলে বিষয়টিকে এভাবে দেখা হয়েছে, অটোমানরা এই ব্যাপারটাকে এভাবে দেখেছে, মোগলরা ওইভাবে করেছে ইত্যাদি। পারলে কোরআন, হাদীস ও সীরাত থেকে কিছু অথেন্টিক কথা বলেন। যা বলবেন কম্প্রিহেনসিভলি বলবেন। ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে অমুক তমুক শাইখের রেফারেন্স বা ফতোয়ার হাওলা করে বলবেন না। বরং সেইসব ফতোয়ার যে ভিত্তি তথা কোরআন-হাদীস, সেগুলো থেকে বলেন। এবং সেগুলো যেন সংশ্লিষ্ট অপরাপর দলীলগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা খেয়াল করে বলবেন। তারমানে হলো, mere authenticity of reference is not enough. It has to be consistent.

আমি এই কথাগুলো এভাবে বলার কারণ হলো, আমি মাদ্রাসায় পড়ি নাই। আরবী পারি না। আমি দেখেছি, নানা ধরনের তাত্ত্বিক বিষয়ে ফায়সালার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক পদ্ধতির অপপ্রয়োগ হয়েছে। হিস্টোরিক্যাল অ্যাপ্রোচের চেয়ে আমি বরং থিমেটিক অ্যাপ্রোচ বা ইস্যুভিত্তিক যৌক্তিক আলোচনা পদ্ধতির পক্ষপাতী। আপনি যদি যৌক্তিক আলোচনায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করেন, তাহলে আমাকে তাকফির করে কেটে পড়তে পারেন।

ফিকাহ শাস্ত্র চর্চা করতে গিয়ে ডকট্রিনাল নেসেসিটিগুলোকে ফর্ম করা হয়েছে। কখনো কখনো এই ফিকহী নীতিমালাকে কোরআন-হাদীসের সুস্পষ্ট বিধানের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এটি দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু এটি হয়েছে। এ বিষয়ে শ্রদ্ধেয় আকরাম নদভীর এই লেখাটা পড়ে দেখতে পারেন: “ইসলামিক ফাইন্যান্স: কল্পকথা বনাম বাস্তবতা”।

এ সংক্রান্ত আমার ভিডিও বক্তব্যটি শুনুন:

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

জাহিদ হাসান হৃদয়: উপমহাদেশে বোধহয় এই প্রিস্ট-ক্লাসের উত্থান হয়েছে ব্রিটিশ কর্তৃক আলিয়া মাদ্রাসা স্থাপনের মধ্য দিয়ে। এখন মাদ্রাসাগুলো এবং ইসলামী বিশ্বিবদ্যালয়ের ‘ইসলামী অনুষদ’গুলোকে কী বলা যায়? একাডেমিক্যালি ইসলাম শিখতে গেলে সেটা এক ধরনের হবে, সেখানে ধর্মকে দেখা হয় সেক্যুলার পার্সপেক্টিভ থেকে। আবার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামকে কিন্তু বিশ্বাসীর দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখা হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষক তথ্য দানেই শুধু সীমাবদ্ধ থাকেন না, ইনডক্ট্রিনেইটও করেন। আবার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাসিক স্যালারিও নেন। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষই ছিলো ধর্মীয় বিশ্বাসকে ইনডক্ট্রিনেইট করা, যা মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান জগতে ছিলো, এমনকি ইমাম গাজ্জালীর যুগের মাদ্রাসাগুলোতেও ছিলো। সেক্ষেত্রে শিক্ষকরা অবশ্যই টাকা নিতেন। এখনকার মাদ্রাসা, এমনকি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষকরা টাকা নেন। এ ব্যাপারে কিছু বলবেন?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: টাকা পয়সা দিয়ে মানুষকে আদর্শপন্থী করা যায় না, নীতিবান করা যায় না। সেজন্য এই ধরনের হিডেন ইনড্রকট্রিনেশন প্রকল্প বাস্তবে ব্যর্থ হচ্ছে। লোকজন মিষ্টিটা খাচ্ছে ঠিকই, পুরোটাই; শুধু ‘বিচিটা’ ফেলে দিচ্ছে …!

Misbah Mozumder: হযরত আবু বকর (রা) খেলাফতের দায়িত্ব পাওয়ার পরও জীবিকা অন্বেষণের উদ্দেশ্যে নিজের ব্যাবসায়িক কাজে বেরিয়ে যান। কারণ, খলিফা হয়ে জনগণের সেবা করে পেট চলবে না। আবার, সেবা করে অর্থ নেয়াটাও স্ববিরোধী।

পথিমধ্যে হযরত উমর (রা) তাঁকে আটকালেন এবং বললেন আপনি চলে গেলে খেলাফতের দায়িত্বে ব্যাঘাত ঘটবে। বরং, আপনাকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হতে কিছু ভাতা দেয়া হবে চলা যায় মতো। আপনি ফুল টাইমার সেবকই হোন।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: তখন যারা অমুসলিমদের মাঝে ইসলামের দাওয়াতী কাজ করছিলেন, মুসলিমদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিকতা শিক্ষা দিয়েছিলেন, অর্থাৎ নীতি নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়ার কাজ করছিলেন, তারা কি বেতন ভাতা নিয়েছিলেন?

না, নেননি। তারা এ ধরনের কোনো কিছু চিন্তা করেছেন, এমনটি আমরা দেখতে পাই না। আমাদের সমস্যা হলো, আমরা বিশেষ প্রেক্ষাপটে সম্পাদিত একটা ব্যতিক্রমী কাজকে উদাহরণকে টেনে নিয়ে এসে সাধারণভাবে সেই কাজ করার দলিল হিসেবে গ্রহণ করি। এটি ভুল পদ্ধতি।

Misbah Mozumder: ইজতিহাদের দরজা সব সময় খোলা আছে

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ইজতিহাদের মাধ্যমে বিশেষকে স্বাভাবিক অনুমোদন তথা সার্বিক নিয়ম হিসাবে কি গণ্য করা যাবে? কিংবা সার্বিক হুকুমকে বিশেষ-ব্যতিক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা?

বর্তমানে যে সংকট, সেটার জন্য অগত্যা পরিস্থিতির অনুমোদনকে ব্যবহার করাই যথেষ্ট।

Misbah Mozumder: সরকার যদি কোনো ব্যক্তিকে ধর্ম প্রচারক হিসেবে নিয়োগ দেয় এই শর্তে যে আপনি অন্য কোনো কাজে সময় দিতে পারবেন না। আপনাকে ফুলটাইমার দাঈ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো এবং আপনার জীবিকার ব্যবস্থা আমরাই করবো। এ নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না। তাহলে কি তা অবৈধ হবে?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আগেই আশংকা করেছিলাম, এ ধরনের মন্তব্য কেউ করতে পারে। সেজন্য পোস্টে এ কথাটুকু লিখেছিলাম, “দয়া করে কেউ বলবেন না, উমাইয়াদের আমলে এ ব্যাপারে এই হয়েছে, আব্বাসীদের আমলে এই করা হয়েছে, ফাতেমীদের আমলে বিষয়টিকে এভাবে দেখা হয়েছে, অটোমানরা এই ব্যাপারটাকে এভাবে দেখেছে, মোগলরা ওইভাবে করেছে ইত্যাদি। পারলে কোরআন, হাদীস ও সীরাত থেকে কিছু অথেন্টিক কথা বলেন। যা বলবেন কম্প্রিহেনসিভলি বলবেন। ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে অমুক তমুক শাইখের রেফারেন্স বা ফতোয়ার হাওলা করে বলবেন না। বরং সেইসব ফতোয়ার যে ভিত্তি তথা কোরআন-হাদীস, সেগুলো থেকে বলেন। এবং সেগুলো যেন সংশ্লিষ্ট অপরাপর দলীলগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা খেয়াল করে বলবেন।”

Misbah Mozumder: খোলাফায়ে রাশেদা অবশ্যই আমাদের অনুসরণযোগ্য। এবং আবশ্যক।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: “খোলাফায়ে রাশেদা অবশ্যই আমাদের অনুসরণযোগ্য।” – এই কথাটাকেও কাণ্ডজ্ঞান ও বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে হবে। খোলাফায়ে রাশেদার যুগে সাহাবীদের মধ্যে সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত অনেক সমস্যা হয়েছে। সুতরাং “খোলাফায়ে রাশেদা অবশ্যই আমাদের অনুসরণযোগ্য।” কথাটাকে মানতে হবে স্বয়ং রাশেদ খলিফাগণ যেটাকে মানদণ্ড হিসাবে গ্রহণ করেছেন সেইটার ভিত্তিতে। সেটি হলো আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ। কোরআনকে বুঝার পদ্ধতি কোরআনেই বলা আছে। সুন্নতকে কীভাবে আইডেন্টিফাই করা হবে তা হাদীসে স্পষ্ট করে বলা আছে।

প্রসংগত উল্লেখ্য, এমনকি রাসূল (সা) যা কিছু করেছেন বা বলেছেন তা সব সুন্নাহ নয়। বরং তিনি রেসালতের দায়িত্ব পালনের অংশ হিসাবে ওহীর ভিত্তিতে যা কিছু করেছেন, তা-ই শুধু সুন্নাহ হিসাবে অনুসরণযোগ্য।

এসব কথা লিংক দেয়া বক্তব্যটিতে বলা আছে।

Misbah Mozumder: জ্বি।

Rizaul Karim: আপনাকে একজন মেন্টর হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে কি?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: আমি কারো কাছে প্রশিক্ষক হওয়ার প্রস্তাব করতে পারি। কোথাও আমি শিক্ষক হিসাবে উপস্থাপন করতে পারি। কিন্তু কেউ কারো গাইড হওয়ার প্রস্তাব করতে পারে না। “আপনাকে একজন মেন্টর হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে কি?” – বুঝতেই পারছেন, এ ধরনেরর প্রশ্নও করা যেতে পারে না। আমাদের আল্টিমেইট গাইড হলো আমাদের বিবেক। সেটি আমাদেরকে উপযুক্ত কিতাব তথা বর্ণনা ও উপযুক্ত ব্যক্তির দিকে নিয়ে যায়।

তারমানে, কোনো কোনো শিক্ষক কালক্রমে, এমনকি অজান্তেই মেন্টর হিসাবে গড়ে উঠতে পারে। কোনো ব্যক্তি কাউকে ভালোবাসে কিনা, সেটা প্রশ্ন হতে পারে। কিন্তু ‘আমি আপনাকে ভালবাসতে চাই’– এমন প্রস্তাবের কথা শুনি নাই।

ভালোবাসা গড়ে উঠে। এটি বানানো যায় না। Love grows; it can’t be made, you know

Nasrin Akter: স্যার, আপনি কোন পথে বললেন? ধর্ম শিক্ষা পেশা হতে পারবে না?

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ধর্মশিক্ষাটা যদি সাধারণ শিক্ষা হিসাবে দেয়া হয় তাহলে সেটার জন্য বেতন নেওয়া যেতে পারে। আর কেউ যদি ধর্ম শিক্ষা দেয় ধর্মীয় দায়িত্ব মনে করে, তথা নীতি আদর্শ প্রচার করার জন্য তখন সেটার জন্য বেতন দাবি করাটা অযৌক্তিক ও অবাস্তব।

Nasrin Akter: শুধু নীতি শিক্ষা দিতেও সময় লাগে! এখন কেউ নিজের সময়কে শুধু এমনিতে ব্যয় করে না!

কারণ আল্লাহ বলে দিয়েছেন, তোমরা ইবাদাতের পর জমিনে ছড়িয়ে পড়ো!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: পয়সার বিনিময়ে নীতি শিক্ষা দেয়া যায় না। দিলেও সেটা কাজে লাগে না। কেননা, নৈতিকতা ভিতর থেকে গড়ে উঠার বিষয়। জেনে নেয়ার বিষয় নয়। নৈতিকতার দাবি হিসাবে করণীয় কী, সেটার খুঁটিনাটি বা বিস্তারিত প্রয়োগ-পদ্ধতি কী হতে পারে, তা কারো কাছ হতে জেনে নেয়া যেতে পারে।

দর্শন বিভাগে নীতিবিদ্যা পড়ানো হয়। এখানে নৈতিকতাকে বর্ণনা ও বিশ্লেষণ হিসাবে পড়ানো হয়। নৈতিকতা প্রচার করা হয় না। ডেসক্রিপটিভ এন্ড এনালাইটিক এথিক্সের সাথে প্রেসক্রিপটিভ এথিক্সের পার্থক্য বুঝলে এ ব্যাপারে আর কথা থাকে না।

তাই, নীতিবদ্যিা পড়ানো আর বিশেষ কোনো নৈতিক মতবাদ প্রচার করা এক জিনিস নয়। প্রথমটি নিছক শিক্ষা। এ কাজ যিনি করেন তিনি শিক্ষক। দ্বিতীয়টি মতাদর্শগত ব্যাপার। মতাদর্শ যিনি প্রচার করেন, তিনি নিছক শিক্ষক নন। তিনি শিক্ষাগুরু টাইপের শিক্ষক, যাকে আমি মেন্টর বা মুর্শিদ বলেছি।

তাহলে বুঝতেই পারছো, কেন নবী-রাসূলগণ বার বার বলেছেন যে দেখো, আমার কথা তোমরা মেনে নিলে আমার কোনো লাভ নাই। আমি নিছক তোমাদের ভালোর জন্যই বলছি।

প্রসংগত একটা কথা বলে নেয়া দরকার বলে মনে করছি। নবী-রাসূলগণের অনুপস্থিতিতে আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব সকল অনুসারীর। যারা অনেক বেশি জানেন তারা অনেক বেশি বলেন বা বলবেন। যারা কম জানেন তারা যেটুকু জানেন সেটাই বলবেন। এমনকি একটা কথা হলেও। জেনে-বুঝে সত্য গোপন করা হারাম।

তারমানে হলো, আদর্শের অনুসারী মাত্রই আদর্শের প্রচারক বা মুবাল্লিগ। কোরআনে বলা হয়েছে, তোমরা সত্যের সাক্ষী হিসাবে এপিয়ার করো।

তোমাকে স্নেহ করি এবং তোমার আগ্রহ দেখতে পাচ্ছি। তদুপরি তোমার ভাষাও মার্জিত। তাই তোমাকে একটু ভেংগে বললাম।

এটিও আমি বারম্বার বলে থাকি, কোনো সমস্যাকে সমাধানের পূর্বশর্ত হলো– সমস্যা যে আছে, সেটি অকপটে স্বীকার করা। বলা যায়, identification of any problem is half of the solution.

ভালো থাকো।

মূল পোস্ট ও মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য | আরো মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Leave a Reply