একে খন্দকারের ‘১৯৭১ ভেতরে বাইরে’ বইটা কেনার জন্য গত ৭ তারিখ আজিজ সুপার মার্কেটের পাঠক সমাবেশে ঢুকলাম। সকাল সাড়ে নয়টা। দেখলাম আরও কাষ্টমাররা বইটার খোঁজ করছেন। সেলসের ছেলেটা বলল, প্রায় সাড়ে চারশত কাষ্টমার এডভান্স করেছেন, এখনো বই দিতে পারি নাই। কখন পারবো, জানি না। এসব শুনে আমি তো তাজ্জব। কেউ বললো, কাওরান বাজারে প্রথমার মূল শপটাতে পাওয়া যেতে পারে। ইতোমধ্যে আর এক কাষ্টমার জানালো, তিনি ইতোমধ্যে সেখান থেকেও ঘুরে এসেছেন। বই নাই।

দেখলাম, বর্তমান নিরাপত্তাজনিত নাজুক সময়েও লোকেরা বইটার সেন্সেটিভ অংশগুলো নিয়ে দোকানের ভিতরেই রীতিমত আলোচনা শুরু করে দিয়েছে। এর ফাঁকে ফাঁকে যাদের কাছে সেখানকার প্রথমার সেলসের লোকজনের নাম্বার-পরিচয় আছে, তারা ফোন করছেন। সবার ফোন বন্ধ। একপর্যায়ে কে যেন বললো, এসেছে …। তাড়াতাড়ি বের হয়ে দেখলাম, প্রথমার দুজন কর্মচারী এসেছে। তারা শাটারের তালা খুলছেন আর একে খন্দকারের বই কেনার জন্য লোকজনের অতিআগ্রহের জন্য চরম বিরক্তি প্রকাশ করছেন। দোকান খোলামাত্র দশ-বারোজন ঢুকে পড়লো। আমি কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে ঢুকে পড়লাম।

একে খন্দকারের বই কেনার জন্য ক্রেতাদের লাইন ...
একে খন্দকারের বই কেনার জন্য ক্রেতাদের লাইন …

লোকজনের ভীড় বাড়তে লাগলো। সেলসের লোকেরা বলছে, ১২টা সাড়ে ১২টার দিকে কিছু বই আসতে পারে। আমাদের অবস্থা হলো দাওয়াত খেতে গিয়ে খাওয়া শর্ট পরার পরে উপস্থিত মেহমানদের মতো। জোর করে লোকেরা এডভান্স দিতে চাচ্ছে। ব্যাপক হৈ-চৈ। আমি চুপচাপ একটা টুলে বসে ট্যাব খুলে নিবিষ্ট মনে পড়তে লাগলাম। ১২টার দিকে মনে হলো, লাইনে না দাঁড়ালে শেষ পর্যন্ত আম-ছালা দুটোই যেতে পারে! দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানো কষ্টকর হবে ভেবেও সেলসের ছেলেটার টেবিলের দিকে পা বাড়ালাম। মরিয়া হয়ে পকেট থেকে নেম-কার্ড বের করে দিলাম। ছেলেটা সবার সাথে তাচ্ছিল্যের সাথে ব্যবহার করলেও আমাকে বললো, আপনার টাকা দেন। আর ওখানে গিয়ে বসেন। আপনাকে দিয়েই শুরু করবো।

বিরক্ত হবে নাই বা কেন? এর আগের দিন নাকি বিকেল পাঁচটাতেই দোকান বন্ধ করে বাসায় গিয়ে সব ফোন অফ করে বসে আছে। যাহোক, সাড়ে ১২টার দিকে বই এলো। জন প্রতি সর্বোচ্চ দুটি করে বই দেয়া শুরু হলো। আমাকে দিয়েই শুরু হলো। বই দুটো নিয়ে উচু করে ধরে খানিক উচ্ছস্বরে ক্রেতাদের লম্বা লাইনের সামনে দাড়িয়ে বললাম, এই যে পেয়েছি ….। টাইটানিকের টিকেট পাওয়ার মতো। পেয়েছি ….। বের হয়ে অপেক্ষারত লোকদের কয়েকটা ছবি তুললাম। বড় আপার বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে একটানা বইটা পড়ে ফেললাম।

পাঠ-প্রতিক্রিয়া

হ্যাঁ, বলছিলাম, একে খন্দকারের ‘১৯৭১ ভেতরে বাইরে’ বইটা কেনার কাহিনী। আজিজ সুপার মার্কেটের দোকানদারদের কেউ কেউ বললো, হুমায়ূন আহমেদের বই নিয়েও নাকি এমন ঘটনা ঘটেনি। বইটা পাওয়ার জন্য লোকজনের রীতিমতো পাগলামি। আমার ধারনায় এটি বাংলাদেশের সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত বই হিসাবে বিবেচিত হবে। এই বই হাতে নিয়ে যেখানেই গেছি, লোকজন দেখি চোখ পাকিয়ে তাকাচ্ছে। কেউ কেউতো বলেই ফেললো, বইটা শীঘ্রিই নিষিদ্ধ হবে। আমি বাজি ধরতে পারি, সরকার বইটা বাজেয়াপ্ত করবে না। একচুয়েলি, সাহস করবে না। বা করছে না। কারণ? উত্তরটা সহজ, প্রথম আলো।

বইয়ের শুরুতে দেখলাম, দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকা। ব্যাপার কী? ব্যাপার সহজ। একে খন্দকার সাহেব ১ তারিখে বের হওয়া বইয়ের দুটি ছোট্ট সংশোধনীসহ ২য় সংস্করণের ভূমিকা লিখেছেন ৫ তারিখে। আর আমি কিনেছি ৭ তারিখে ! আল্লায় জানে, এই বইটির আরো কতো সংস্করণ বের হবে। ফেসবুকে এটি নিয়ে কেউ একজন বলেছেন যে, জামায়াত-শিবিরের লোকেরাই এটি নিয়ে মাতামাতি করছেন। বইয়ের দোকানে আমার মতো একদা সক্রিয় বর্তমানে হতাশ-নিষ্ক্রীয় জামায়াত কর্মী দু একটা থাকতে পারে বটে। সত্যি কথা হলো,ঢাকার আজিজ সুপার মার্কেট হতে এই বইটা কেনার যে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে তাতে দেখেছি, সর্বস্তরের পাঠকরা এই বইটা কিনছেন।

বইটার বিষয়বস্তু নিয়ে অনেক বিচার-বিশ্লষণ হচ্ছে, হবে। এই বইটার অভিনবত্ব আমার ধারনায় এই পয়েন্টে – লেখকের মতে, মার্চের ১ তারিখ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য সংখ্যা ছিলো ১ ভিভিশন তথা ১৪ হাজারের মতো। এর বিপরীতে পুলিশ ও আর্মি মিলে সশস্ত্র বাহিনীতে বাংগালী ছিলো সমসংখ্যক বা তারচেয়ে কিছুটা বেশি। খন্দকার সাহেবের তথ্যমোতাবেক মার্চের পূর্বে বা শুরুতে রাজনৈতিক ঘোষণা আসলে অনেক কম সময়ে ও অনেক কম রক্তপাতের মাধ্যমে কোনো বিদেশি সাহায্য ছাড়াই বাধীনতা লাভ করা যেত।

ঘটনার গতিধারা

বর্তমান সরকারের ত্রাতা, শাহবাগের উদগাতা প্রথম আলো কেনো এই সময়ে এমন একটা ব্লো-আউট করলো? আমার দৃষ্টিতে দেশে জাতিয়তাবাদী-ইসলামি শিবির দূর্বল হওয়ার ফলে কম্যুনিষ্ট-আওয়ামী লীগ ঐক্যের ‘কমন এনেমি’ নাই-প্রায় অবস্থায় উপনীত। যার ফলে তাদের মধ্যকার অরিজিনাল কনফ্লিক্ট মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে। এটি তাজউদ্দীন-শেখ মুজিব দ্বন্দ্ব। এটি ‘ডান ও মধ্যপন্থী’ তথা সুবিধাবাদি আওয়ামী লীগের সাথে ‘ঈমানদার’ তথা কট্টর বা তাত্ত্বিক বামপন্থীদের লড়াই। যে আশায় তাজউদ্দীনকে আওয়ামী লীগে ইনফিলট্রেট করা হয়েছিল, মধ্য-ডানপন্থী শেখ মুজিব কম্যুনিষ্টদের সে আশাকে ধূলিস্যাত করে দ্যায়। এখন সময় বুঝে প্রাক্তন ‘একতা’ সম্পাদক আওয়ামী লীগকে এক হাত দেখিয়ে দিলেন।

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে আওয়ামী লীগ কর্তৃক রচিত ও সম্প্রচারিত শেখ মুজিব কেন্দ্রিক ন্যারেটিভের কাউন্টারে এটি বামপন্থীদের কাউন্টার ন্যারেটিভ। যার কেন্দ্রিয় চরিত্র হলো তাজউদ্দীন আহমেদ। তাজউদ্দীন আহমেদের মেয়ের লেখা বই ‘নেতা ও পিতা’ একসূত্রেই গাঁথা। দেখুন, ‘ভেতরে বাইরে’র প্রকাশণা উৎসবে কারা কারা গেছে, বক্তব্য দিয়েছে। ড. আনিসুজ্জামান হতে শুরু করে আলী রিয়াজ। সব অরিজিনাল বাম-তাত্ত্বিকরা একজোট হচ্ছে । অবশ্য উনারা অঘোষিতভাবে unity within diversity-কে ফলো করেন। দেখা যায়, অনেক দল। মনে হয়, ভীষণ কোন্দল। আসলে সব বামেরা আদর্শিকভাবে এক। শুধু দলছুট হলেন ফরহাদ মজহার। তিনি না ঘরকা না ঘাটকা। স্পষ্টত, বর্তমানে তিনি ব্যাকফুটে। উনার [‘সহজিয়া ইসলাম’ + ‘নতুন মার্ক্সবাদ’ = আগামীর বাংলাদেশ] ফর্মূলা যতটা রোমান্টিক ততটাই অবাস্তব।

ফুট নোট: ইসলামপন্থী যদি ‘অচল ব্র্যান্ড’কে জোরকরে গেলানো ব্যর্থ চেষ্টা না করে নির্ভেজাল সুন্নাহভিত্তিক ইসলাম, এ দেশ ও মাটি এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতার আলোকে নিজেদের গঠন করে নিতে পারে, তবে আগামীর বাংলাদেশে তারাই নেতৃত্ব দিবে। আজ যেমন ভেতর থেকেই আওয়ামী ন্যারেটিভ ভেংগে পড়েছে, ঐতিহ্যবাহী ও সমৃদ্ধ এ দেশ ও জনগণ সম্পর্কে ইনটেনশনালি চাপিয়ে দেয়া ‘বাম ন্যারেটিভ’ও ধ্বসে পড়বে। শর্ত হলো, ইসলামিষ্টদেরকে ‘পাকিস্তানি মানসিকতা’ বর্জন করে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগি হিসাবে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে হবে।

all it needs a paradigm shift ….

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *