হতে পারি আমি অধম, তাই বলিয়া আপনি উত্তম হইবেন না কেন?

যা কিছু লিখি তা নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই লিখি, যা কিছু বলি তা নিজের একান্ত ব্যক্তিগত উপলব্ধি হতেই বলি।

একটি তাত্ত্বিক বিষয়ে শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত আছি প্রায় তিন দশক। পাশাপাশি সামাজিক গণমাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে নানা ধরনের মতাদর্শিক ও তাত্ত্বিক বিষয়ে লেখালেখি করি। এ কারণে লোকেরা মনে করে, আমার মটিভেশনাল (একচুয়েলি, ডি-মটিভেশনাল) কথাগুলো এক ধরনের তত্ত্বচর্চার বহিঃপ্রকাশ। অথচ, ব্যাপারটা তা নয়।

জীবনঘনিষ্ট যা কিছু লিখি, তা নিজের জীবন হতে অথবা কাছাকাছি থাকা মানুষের জীবন হতে পাওয়া ভালোমন্দ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই লিখি। বলা যায়, আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলোকেই আমি থিওরাইজ করি। নিছক ব্যক্তি-অভিজ্ঞতাকে সামষ্টিক শিক্ষণীয় বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করি।

আমি যা কিছু হতে পারিনি, অথচ হওয়া উচিত ছিল; চাইলেই পারতাম, অথচ করিনি কোনো কারণে, এমন সব কাজ সংশ্লিষ্ট অন্যরা সম্পন্ন করুক যথাযথভাবে, এটুকু চাই। আমার ভুল থেকে, গাফেলতি থেকে, অসাবধানতা থেকে, বাহুল্য সরলতাসুলভ বোকামি থেকে, অবাঞ্চিত ঔদ্ধত্য ও আগ্রাসী আচরণ থেকে; এগুলোর খারাপ পরিণতি থেকে যেন অন্যরা শিক্ষা নিতে পারে, সতর্ক হতে পারে, এটি চাই।

আমার কোনো সীমাবদ্ধতার কারণে আপনজনদের যে সব প্রাপ্য অধিকার দিতে পারিনি, সে জন্য অনুশোচনা জাগে। ভাবি, অন্যরা যাতে বঞ্চিত না করে এভাবে তাদের আপনজনদের। সে জন্য বলাবলি করি, লেখালেখি করি এসব বিষয়ে। এখন চাইলেও আর ফিরে যেতে পারি না অতীতে। অসম্ভব তাই অতীতের ভুল শোধরানো; শুধুমাত্র পরিতাপ আর ভবিষ্যতের জন্য প্রতিজ্ঞা ছাড়া।

বিনা দোষে যে দণ্ড পেয়েছি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি কাছের ও দূরের মানুষজন হতে নানাভাবে, চাইছি কেউ যেন এমন ক্ষতির সম্মুখীন না হয় আর। তাই আলোচনা করি। পথ বাতলে দেয়ার চেষ্টা করি, পরবর্তী পথিকেরা যাতে এড়াতে পারে এসব বাস্তবতা বিবর্জিত আবেগ নিঃসৃত সম্পর্ক-ফাঁদ। যাতে করে তারা মুক্ত হতে পারে আচরণের অসঙ্গতি হতে, অনাকাঙ্ক্ষিত সব ত্রুটি আর বৈপরিত্য হতে।

নিশ্চিত জানি, কোনো কোনো দিক থেকে আমি অনেক বেশি খারাপ। কিন্তু কেন আমি খারাপ হয়েছি, বা খারাপ আচরণ কেন বা কোন পরিস্থিতিতে আমার থেকে প্রকাশ পেয়েছি, তা আমি বুঝতে চেয়েছি, বোঝাতে চেয়েছি। উৎপাটন করতে চেয়েছি সব মন্দ উপাদান, নিজের জীবন আর অন্যদের জীবন হতে। সম্ভাব্য সর্ব উপায়ে।

যা কিছু ভালো আমি অর্জন করেছি, তা কত কষ্টে আমি পেয়েছি, তা জানিয়ে যেতে চেয়েছি। ‘there is no free meal’ বলে ইংরেজীতে একটা কথা আছে। কষ্ট ছাড়া ভালো কিছু অর্জন করা যায় না। পরিশ্রম ও আন্তরিক সাধনা ছাড়া অর্জিত কিছু কখনো স্থায়ী ফলদায়ক হয় না। আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রীগুলোর আন্তঃসংযোগ বাড়ানোর চাবিকাঠি আপনারই মনের সুপ্ত (অবচেতন অর্থে) অংশে লুকায়িত। সেটি খুঁজে বের করে আমরা জীবন ও জগৎ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বা intentionality-কে কীভাবে পরিবর্তন, ইতিবাচকভাবে বর্ধন ও শক্তিশালী করতে পারি; কীভাবে আমি এটি রপ্ত করেছি, তা অনুজদের বলে যেতে চেয়েছি এবং চাইছি।

আমি যেসব মটিভেশনাল কথাবার্তা বলে থাকি তা সাধারণত এ ধরনের কথা যারা বলে থাকেন তাদের সাথে প্রায়শঃই মিলে না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা হয় উল্টো। অথচ, আমি যা বলি তা নিতান্তই বাস্তবসম্মত। এ জন্য বা এ অর্থে আমি এগুলোকে বলে থাকি ডি-মটিভেশনাল কথাবার্তা।

অকপটতা আমার মজ্জাগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। যেসব দিক থেকে আমি একজন খারাপ মানুষ, সেসব দিকেও আমি একজন খারাপ কিন্তু অকপট সত্যবাদী মানুষ। এটুকু দাবি করতে পারি।

নিজের দোষত্রুটি যথাসম্ভব ঢেকে রাখা উচিত। সাধারণ ভব্যতার দিক থেকে এটি যেমন সঠিক, আমার আচরিত ধর্ম ইসলামের নৈতিক নির্দেশনা অনুসারেও এটি তেমন ধরনের অপরিহার্য কর্তব্য। তা না হলে আমি নির্ঘাত প্রকাশ করে দিতাম আমার সব ভুল, ত্রুটি, অপরাধ ও সীমালংঘনমূলক কর্মকাণ্ড; অনিবার্য দায় ও দণ্ড পাওয়ার ঝুঁকি মেনে নিয়ে। অবশ্য তাতে করে সেসব ভুল, ত্রুটি, অপরাধ ও সীমালংঘনমূলক কর্মকাণ্ডের সূচনা-কারণ বা সহায়ক-কারণ হিসেবে যারা দায়ী, তারাও এক্সপৌজড হয়ে পড়তো। সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সামাজিক শৃঙ্খলা উভয় দিক থেকে এটি হতো ডেমেইজিং।

আমার যা কিছু ভুল তা আমার উপলব্ধির মধ্যে সতত ক্রিয়াশীল থাকে। নিজের ভুল-ত্রুটি অপরাধ প্রকাশ করি না, বা পারতপক্ষে গোপন করি। তাই বলে নিজেকে মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রাখি, এমনটি নয়। আমার মুখটাই সবটুকু। মুখের উপরে নাই কোনো মুখোশ। ওই যে বললাম একটু আগে, অকপটতা আমার মজ্জাগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমি যদি নিজের কাছে নিজে প্রশ্ন করি, ‘আমি কি আমার ব্যক্তিজীবনে আমার কাছ হতে সংশ্লিষ্ট নারীদের প্রাপ্য অধিকার সব আদায় করতে পেরেছি?’, এর উত্তর হবে, ডেফিনিটলি নট। কিন্তু তাই বলে আমি নারী অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারবো না, এমন তো নয়। আমি রিয়েলাইজ করি আমার ভুলগুলো। সাথে এও দাবি করি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমিও শিকার হয়েছি অপ্রাপ্য জুলুমের।

আমার ভুলগুলো, সেগুলোর পরিমাণ ও মাত্রা যা-ই হোক না কেন; আমার প্রতি করা অন্যায় আচরণ, তার জন্য যে বা যারা যেভাবেই দায়ী হোক না কেন; আমার আশপাশের চেনাজানা মানুষদের জীবনে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাসমূহ; এ সব কিছুই আমার ভাবনাচিন্তাগুলোকে শেইপ করেছে। গড়ে তুলেছে আমার মন, মনন ও মানসিকতা। নারী অধিকার বিষয়ক আমার লেখালেখি এর ব্যতিক্রম কিছু নয়। এ কারণে কোনো প্রসঙ্গ আসলে আমি নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করি আমার সুনির্দিষ্ট মতামত। আমি যা কিছু বলি তা নিছকই আমার একান্ত অভিজ্ঞতার ব্যাপার, এমনটা নয়। আবার, আমার কথাগুলোর সাথে আমার ব্যক্তিজীবনের কোনো সম্পর্ক নাই, এমনও নয়।

সে তাই হোক, ভুলকে সংশোধন করার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো, ভুল যে হয়েছে, তা বুঝতে পারা এবং ঐকান্তিকভাবে তা স্বীকার করা। এরপরের কাজ হলো, কোথায় ও কোন কারণে এমনটা হয়েছে তা নির্ণয় করা। ভুলের জায়গাগুলো চিহ্নিত করা। প্রায় সময়ে আমি এই কথাটা বলি, identification of the problem is the half of the solution। তাই, আমি যা কিছু বলি তা আমার জন্য সবার আগে প্রযোজ্য, এমনটাই মনে করি।

উপরে যা বলার চেষ্টা করেছি, তার মূলকথা হলো, মানুষের জীবনবোধ ও ব্যক্তিজীবনের সাথে সম্পর্কিত যেসব তাত্ত্বিক কথা আমি বলে থাকি, তা আমার একান্ত ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি হতে নিঃসৃত। এগুলো নিছক বুদ্ধিজীবীসুলভ তত্ত্বকথা নয়।

আমি যেসব দিকে ভালো, চাইছি অন্যরাও সেসব দিকে ভালো হোক। আমি যেসব দিকে খারাপ, চাইছি এমন কিছু হতে নিজেকে যথাসম্ভব মুক্ত করতে এবং অন্যরা যাতে জীবন চলার পথে এসব মরণ-ফাঁদ হতে যেন যথাসম্ভব সতর্ক থাকে, সে জন্য কিছু কাজ করে যেতে।

এভাবে পরস্পর পরস্পরকে সহায়তা করে একটা সুন্দর সামষ্টিক জীবনের আদলে যাতে আমরা আমাদের ব্যক্তিজীবনকে সুন্দরতর করে গড়ে নিতে পারি। মানুষ শুধু নিজের জীবন যাপন করে এমন নয়। প্রত্যেকটা ব্যক্তি মানুষেরই থাকে একটা প্রজাতিগত তথা সামষ্টিক জীবন।

Rupert Sheldrake-এর তত্ত্ব ‘Morphic Resonance’ অনুসারে আমাদের বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিজীবন ও অভিজ্ঞতাগুলো টেলিপ্যাথিক্যালি বা এ ধরনের অদ্যাবধি অজ্ঞাত অথচ ক্রিয়াশীল কোনো কিছুর মাধ্যমে পরস্পর পরস্পরের সাথে বৈশ্বিকভাবে সংযু্ক্ত।

তাই, চাইলেই আমরা একজন অপরজনকে পথ দেখাতে পারি। নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরে অনুরূপ ক্ষতি হতে অন্যদের বাঁচানোর জন্য সচেষ্ট হতে পারি। নিজে ইনফেক্টেড হওয়ার পরে যদি কোনোমতে সেরে উঠি, তাহলে অন্যদেরকে আমরা দান করতে পারি আমাদের শরীরে তৈরী হওয়া এন্টিবডি। চাইলে আমরা পাারি, ভ্যাকসিন তৈরি করে বাদবাকি লোকদেরকে আগাম সুরক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করতে।

তাই, আমি ভালো কি মন্দ, সেটি বড় কথা নয়। আমার কথাটা কতটুকু বাস্তবসম্মত, কতটুকু দরকারী, সেটাই বড় কথা। হতে পারি আমি অধম, তাই বলিয়া আপনি উত্তম হইবেন না কেন?

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Leave a Reply