নিরবতা ভেঙ্গে এসো হই উচ্চকণ্ঠ

আপনার আমার আশেপাশে বিরাজমান সমস্যাগুলোর ব্যাপারে কথা না বলার সুশীল ধারা হতে বের হয়ে আসতে হবে। অবশ্য এরমানে এই নয় যে, প্রত্যেকে সব বিষয়ে কথা বলা শুরু করবে। বরং যার যার এরিয়াতে প্রত্যেকে সাধ্যমত হবে উচ্চকণ্ঠ। তাহলেই কেবল বিবেকের দাবী ও সামাজিক দায়বদ্ধতার দায় মেটানো সম্ভব।

আমরা যখন কথা বলি তখন সাধারণত অনেক দূর থেকে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে কথা বলি। আমরা প্রায়শ কথা বলি অন্তর্গত মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে কোনো প্রাসঙ্গিক বা সৃষ্ট সমস্যা নিয়ে। আমাদের বরং কথা বলতে হবে এই ৩টা পয়েন্টে:

(১) identification of the problem,

(২) sustainable solution এবং

(৩) how to set a procedure to get to the solution নিয়ে।

এজন্য ইদানীং বৈঠকি আড্ডা হতে শুরু করে সিরিয়াস আলোচনা, সব জায়গাতেই আমি এই ৩টা পয়েন্টকে সামনে নিয়ে কথা বলি। শুধু সমস্যার কথা বলি না।

শুধু সমস্যার কথা সারাক্ষণ যারা বলে তারা ক্রমান্বয়ে সমাজকর্মীর মান হতে অবনমিত হয়ে ‘সমালোচনার জন্য সমালোচনা’র চোরাবালিতে আটকা পড়ে যান। শেষ পর্যন্ত এদের হাতে কেউই নিরাপদ থাকে না। দিনশেষে হতাশা হয় তাদের নিয়তি। কোনো ধরনের সাংগঠনিক বা সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা বা দায়-দায়িত্বের মধ্যে তারা নিজেদের আবদ্ধ করতে চান না। তারা ফ্রি-ল্যান্সার ক্রিটিক হিসেবে মানুষকে কটাক্ষ করতেই বেশি সুখ পান।

যারা রাখঢাক না করে রুট কজ বা মূল সমস্যাটাকে স্বীকার করে নেন; এবং উক্ত সমস্যা সমাধানের জন্য একটা টেকসই সমাধানের কথাও বলেন, তারা যদি সেই সমাধানে কীভাবে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে, সেটার বাস্তব কোনো পদ্ধতির আলোচনা না করেন, তখন তারা অবশেষে হয়ে পড়েন বকোয়াজ নীতিবাগিশ।

হামিশখন তারা ধারণা করেন, ‌‘সব লোকেরা বেকুব ও খারাপ। তাই আমি এত সুন্দর করে বলা সত্ত্বেও তারা হেদায়েত হচ্ছে না।’ এসব অবুঝ আদর্শবাদীরা শেষ পর্যন্ত হয়ে পড়েন চরম অসহিষ্ণু ও প্রতিক্রিয়াশীল। আদর্শের একটা কৃত্রিম আবহের মধ্যে তারা সব সময়ে থাকতে চান। সমাজকর্মীর পরিচয়ে দিনশেষে তারা হয়ে পড়েন গণবিচ্ছিন্ন ও অসামাজিক দলবাজ।

নিজেকে ঠিক রাখার জন্য, কার্যকর পন্থায় সমাজ পরিবর্তন বা বিপ্লবের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য আমাকে, আপনাকে এবং এই কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন এমন সবাইকে হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ পন্থার অনুসারী। সমস্যাটা ঠিক কোন জায়গা হতে শুরু হয়েছে, সমাধানটা কী এবং কীভাবে এই সমাধানের পথে আমরা এগিয়ে যেতে পারি, এই তিনটা পয়েন্টকে একসাথে ভাবতে হবে। সমস্যা থেকে একলাফে বা এলোমেলোভাবে সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হলে, সমস্যা বরং বাড়বে।

আপনি যা বলবেন তা করার ব্যাপারে আপনি নিজে অগ্রণী হবেন, নিদেনপক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন, এটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

বুঝতেই পারছেন, যারা সমস্যার আলোচনা করেন সমাধানের প্রশ্নটাকে উহ্য রেখে, তাদের সযত্নে এড়িয়ে চলি। যারা সমাধানের কথা বলেন ইউটোপিয়ান মেন্টালিটি থেকে তারা পিউরিটানিক। তারা আদর্শগত সূচীবায়ুগ্রস্ততায় ভুগছেন। তাদেরকে এড়িয়ে চলি। সমস্যাকে যারা অকপটে স্বীকার করেন, যারা প্র্যাগমেটিক, যারা নিজেদেরকে শুধু বলনেওয়ালা মনে করেন না, যারা লিডার হোন বা ফলোয়ার হোন, activist first; তাদের সাথে থাকা পছন্দ করি।

এতক্ষণ যা বললাম সংক্ষেপে তা হলো, কাজ করতে হবে। তারচেয়েও বেশি দরকারী বিষয় হলো সঠিক পন্থায় কাজ করতে হবে। কাজের প্রয়োজনে, বিশেষ করে দৃশ্যত অনুরূপ কাজ যারা করছেন তাদের থেকে নিজের স্বাতন্ত্র্যকে সুস্পষ্ট করার জন্য প্রয়োজনে সমালোচনাও করতে হবে। নির্বিবাদী সুশীলপন্থায় সমাজ পরিবর্তন হয় না। এর সাথে সাথে এ কথাটাও খেয়াল রাখতে হবে, যার তার সাথে যখন তখন লেগে পড়াটা কাজের কাজ কিছু নয়।

আমাদের প্রত্যেককে খেয়াল রাখতে হবে, আমরা কনফ্রন্ট করবো, কনফ্লিক্টে এনগেইজ হবো; তবে ঠিক কোন জায়গাতে কার সাথে কেন এবং কতটুকু এনগেইজ হবো, সেটা ভেবেচিন্তে তারপর অগ্রসর হতে হবে। আমাদের লক্ষ্য স্থির করতে হবে। এবং দৃঢ়চিত্তে সেই লক্ষ্যের পানে এগিয়ে যেতে হবে। কোনো অবস্থাতেই কাণ্ডজ্ঞান, সৌজন্যতা, সাহস ও প্রত্যয়কে লস করা যাবে না।

আমাদেরকে অর্থাৎ সমাজ ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট সকল কার্যক্রমকে আপনাদের দোয়ায় সামিল রাখবেন। ভালো থাকেন।

লেখাটির ফেইসবুক  লিংক

একটি মন্তব্য লিখুন

প্লিজ, আপনার মন্তব্য লিখুন!
প্লিজ, এখানে আপনার নাম লিখুন

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকhttps://mozammelhq.com
নিজেকে একজন জীবনবাদী সমাজকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলসফি পড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। গ্রামের বাড়ি ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম। থাকি চবি ক্যাম্পাসে। নিশিদিন এক অনাবিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। তাই, স্বপ্নের ফেরি করে বেড়াই। বর্তমানে বেঁচে থাকা এক ভবিষ্যতের নাগরিক।

সম্প্রতি জনপ্রিয়

আরো পড়ুন

যা নাই, আয়োজন করে তা থাকার প্রমাণ দিতে হয়

love grows, it cannot be made. when it is gone, nothing can back it again. প্রায় তিন দশকের শিক্ষকতা জীবনে কখনো স্টুডেন্টদেরকে ক্লাসে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখানো অ্যালাও করি...

সেলফ ব্র্যান্ডিং: মানবিক পরিচয়ের মূলসূত্র

আমরা মানুষ। যেভাবেই হোক না কেন, আমরা সৃষ্টির সেরা। আমাদের এই শ্রেষ্ঠত্ব বুদ্ধির, জ্ঞানের, প্রযুক্তির, নৈতিকতার এবং বিশেষ করে আধ্যাত্মিকতার। এই বিশেষ মানবিক মর্যাদা...

Paradox of Learning

Learning involves a Paradox. To do the right thing, proper knowledge is a must. On the contrary, improper knowledge makes one a misguided person. So,...