বড় ক্ষতি মৃত্যুর আগেই মরে যাওয়া

মৃত্যু অনিবার্য। হোক। এর চেয়ে বড় ক্ষতি মৃত্যুর আগেই মরে যাওয়া। মৃত্যু একটা সামগ্রিক ঘটনা। এর আছে নানামাত্রা। বিভিন্ন ধরন। মৃত্যু হতে পারে শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, আধ্যাত্মিক, আবেগগত এবং নৈতিক।

দেখা যায়, কেউ এমন হয়ে যায়, ভালো করে বসতে পারে না, শুইতে পারে না, হাঁটতে পারে না, খেতে পারে না, ঘুমাতে পারে না। এমনকি কথা বলতেও রাজ্যের ক্লান্তি।

কারো এমন হয়, সে কাউকে চিনতে পারে না, কোনো কথা মনে রাখতে পারে না। যেন একেবারে নির্বিকার। অথবা, অকারণে প্রচন্ড দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। শূন্যতা কিংবা হতাশায় নিমগ্ন নিশিদিন। এটি একধরনের ভেজিটেটিভ স্টেইজ। মৃত্যুর আগেই শারীরিক মৃত্যু।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে গত চার দশকে দেখেছি অনেক জ্ঞানীগুণী শিক্ষক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবীকে। শেষ বয়সে এসে তাদের অবস্থা এমন হয়েছে প্রায় সবার, এমনকি তাদেরই কাছ থেকে শেখা কোনো কিছুর কথা বললে সেটাও তারা ঠিকমতো স্মরণ করতে পারেন না। কথাটা যদিওবা মনে পড়ে, সেগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে তাদের কারো মধ্যে দেখা যায় না কোনোপ্রকারের উৎসাহ এবং আগ্রহ।

সারাক্ষণ উনাদের চিন্তায় থাকে যত বৈষয়িক এস্টাবলিশমেন্ট বিগত জীবনে পেয়েছেন সেগুলোর নানা প্রসঙ্গ। বুদ্ধিজীবীদের এমন বুদ্ধিবৃত্তিক মৃত্যু আমাকে সাংঘাতিকভাবে ভীত করে তোলে।

পরিণত বয়সে এসে কারো কারো হয় আধ্যাত্মিক মৃত্যু। আল্লাহতায়ালা আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে সূরা আলে ইমরানের ১৯১ নং আয়াতে বলেছেন,

الَّذِیۡنَ یَذۡکُرُوۡنَ اللّٰهَ قِیٰمًا وَّ قُعُوۡدًا وَّ عَلٰی جُنُوۡبِهِمۡ وَ یَتَفَکَّرُوۡنَ فِیۡ خَلۡقِ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ۚ

‘(ঈমানদার ব্যক্তিরা এমন) তারা আল্লাহকে স্মরণ করে দাঁড়ানো অবস্থায়, বসা অবস্থায় এবং শায়িত অবস্থায়।’ অর্থাৎ জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রমের প্রতিটি মুহূর্তে খোদাতালাকে স্মরণ করা। তাঁর অনুগত থাকার চেষ্টা করা।

স্পিরিচুয়ালিটির প্রয়োজনে কিছু রিচুয়ালকে ধর্মীয় বিধান হিসেবে অবশ্য করণীয় করা হলেও নিছক রিচুয়ালিস্টিক প্র্যাকটিস কোনো মানুষকে স্পিরিচুয়াল করে তোলে না। Rituals are tools of spirituality. not identical with spirituality. আইডেন্টিকাল হওয়া তো দূরের কথা, রিচুয়াল প্র্যাকটিস এবং স্পিরিচুয়ালিটির সম্পর্ক নেসেসারিও নয়। জাস্ট অকেশনাল।

নামাজ, রোজা ইত্যাদি খুব নিয়ম মতো করা সত্ত্বেও নরমাল লাইফস্টাইল, সোশ্যাল রিলেশনস এন্ড কন্ট্রিবিউশনস থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়াটা আমার দৃষ্টিতে ব্যক্তির কাইন্ড অব স্পিরিচুয়াল ডেথ।

নতুন কোনো কিছুকে গ্রহণ করা, নতুন কোনো সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করা, বিনোদনের নানা উপাদানের পরিমিত ব্যবহারের মাধ্যমে জীবনকে উপভোগ করা, এগুলো কোনো ব্যক্তির মানসিক সুস্থতা তথা তার আবেগগত ভারসাম্যের পরিচায়ক।

অধিকাংশ বয়স্ক লোককে দেখা যায়, তারা নতুন কিছু নিতে পারে না। তাদের আবেগের সকল কন্টেন্ট নিজের লং টার্ম পার্সোনাল মেমোরিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ক্রিটিকাল থিংকিং তাদের কাছে নিছকই ক্রিটিকাল সামথিং। এটি ব্যক্তির আবেগগত মৃত্যুর লক্ষণ।

এমনকি সারা জীবন নীতি-নৈতিকতার কথা বলেছে, নিজেও মেনে চলেছে যথাসাধ্য, এমন ব্যক্তিকেও দেখা যায় জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তুচ্ছ স্বার্থে নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দিতে। ভালো মানুষদের এমন নৈতিক-মৃত্যু আমাকে রীতিমতো আতঙ্কিত করে তোলে।

তাই এই নিশীথকালে মনের এই আঁকুতি তোমার কাছে
যে তুমি অতি আপন,
একই সাথে প্রকাশ্য এবং গোপন,
হে প্রভু,
মৃত্যুর আগে দিও না মৃত্যু …!

রাত ১:৩০ || ১৫/০৪/২০২৪ || চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Eyasen Arafat: স্প্রিচুয়ালিটির মৃত্যু কি খুব সহজেই হয়?

Mohammad Mozammel Hoque: হ্যাঁ, সেজন্যই তো সব সময় দোয়া করতে হয়, ‘হে আল্লাহ আমাদের অন্তরকে বাঁকা করে দিও না, হেদায়েত দেয়ার পরে!’

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *