অস্বাভাবিকতার সামাজিকীকরণ

দাম্পত্যজীবনের যত অনুষঙ্গ তার প্রত্যেকটির বিকল্প দিয়েছে আধুনিক সমাজ। নারী এবং পুরুষ উভয়কে। বিশেষকরে নারীদেরকে।

সেক্স

দাম্পত্য সম্পর্কের মাধ্যমে আমরা পাই সেক্স করার সুবিধা। আধুনিক জীবনযাপন প্রণালীতে এর বিকল্প হলো রিলেশন। এফেয়ার। সিচুয়েশনশীপ। ডেইটিং। ক্যাজুয়েল সেক্স। ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড। মেইক-আউট। মাস্টারবেশন। সেক্স টয়। হোমোসেক্স। গ্রুপসেক্স। সেক্স/বডি পজিটিভিটি। আল্লাহ মা’লুম, পারভার্শানের হতে পারে আরো যত প্যাটার্ন!

বাচ্চাকাচ্চা বনাম প্যাট-কিডস

বিয়ে করে আমরা বাচ্চার বাবা-মা হই। আধুনিক জীবনে বাচ্চার বাবা-মা হওয়ার জন্য বিয়ে করা লাগে না। নারী স্বাধীনতার মডেল হিসেবে আমরা যাদেরকে অনুসরণ করছি সেই পাশ্চাত্যে অর্ধেকেরও বেশি বাচ্চার বাবার পরিচয় নাই। পিতৃপরিচয়হীন এসব বাচ্চারা সিঙ্গেল মাদারের তত্ত্বাবধানে বড় হয়।

আমাদের এখানেও বাবার পরিচয়কে মুছে ফেলার চেষ্টা শুরু হয়েছে। সব জায়গায় বাবার নামের সাথে মায়ের নাম সংযোজন টেস্ট কেইস। প্রাথমিক পদক্ষেপ। আমি মরার আগেই হয়তো এই আধুনিকায়ন সম্পন্ন হয়ে যাবে। অপেক্ষা করুন। দেখবেন (আল্লাহ মাফ করুন) ।

বাচ্চা না থাকলে কিম্বা দু’একটা হওয়ার পরে প্রডাকশান বন্ধ করে দিলেও সমস্যা নাই। বাচ্চার বিকল্প হিসেবে ঘরে ঘরে তারা বিড়াল পালতেছে। ক্ষেত্রবিশেষে পাখি। এ’সব অবলা প্রাণীদের নিয়ে তারা রীতিমতো অবসেসড। ইসলামিক শরীয়াহ’র কঠোর রেস্ট্রিকশানের জন্য এখানে শয়ন কক্ষে কুকুরের বিছানা এখনো দেখা যাচ্ছে না। নট ইম্পিসিবল ইন দ্যা ফিউচার।

বাচ্চাদের ডে কেয়ারের মতো কুকুর বিড়ালের জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটে আছে হোস্টেল তথা ফস্টার হোমের ব্যবস্থা। গলির মোড়ের মুদি দোকানগুলোতে না আসলেও সুপারস্টোরগুলোতে অলরেডি এসে গেছে ক্যাট ফুডের দামী প্যাকেট।

আমি গতবছর রাজশাহী শহরেও দেখেছি সুপারস্টোরে ক্যাটফুডের প্যাকেট সাজানো। একটা বিড়ালের জন্য যা খরচ হয় তা দিয়ে নিম্নমধ্যবিত্ত পর্যায়ের দু’জন মানুষের খাওয়াপরা খুব ভালভাবে চলতে পারে। এবার বোঝেন।

ডিভোর্স বনাম ব্রেকআপ

দাম্পত্যজীবনে আসে সংকট। হতে পারে ডিভোর্স। আধুনিক জীবনে এর বিকল্প হলো ব্রেক-আপ। তারা মনে করে, বিয়ে জীবনে একবারই হবে। দেখে শুনে ‘যাচাই করে’ তবে বিয়ের পিড়িতে বসবে। বিয়েকে মহান বানিয়ে শিঁকেয় তুলে রেখে বিয়ের বিকল্প হিসেবে তারা করছে অবাধ সম্পর্কচর্চা।

এ’সব সম্পর্ক স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠে। তুচ্ছ কারণে ভেঙ্গে যায়। পাঁচবার ব্রেকআপেও লজ্জার কিছু নাই। জাস্ট মুভ অন। ডিভোর্সে যত আপত্তি। বিয়ের পরে ডিভোর্স যদি হয়, কারণ যা-ই হোক না কেন, এজন্য আলটিমেইটলি পুরুষটাই দায়ী।

কগনিটিভ ব্লাইন্ডনেস

সোশ্যাল ওয়ার্কের অংশ হিসেবে আমি বহু নারীর সাথে এসব বিষয়ে কথা বলেছি। তাদের সবার মধ্যে আমি দেখেছি সিলেকটিভ কগনিটিভ ব্লাইন্ডনেস। আসলে আমি অন্য শব্দ/টার্ম ব্যবহার করতে চেয়েছি। নারীবাদবিরোধী হওয়া সত্ত্বেও অনেক নারী আমার লেখা পড়েন। তাদের ভয়ে এই সেল্ফ-রেস্ট্রিকশান।

নারীদের সিলেকটিভ কগনিটিভ ব্লাইন্ডনেসের উদাহরণ হিসেবে বলছি- 

মেয়েদের সব সমস্যার জন্য শেষ পর্যন্ত পুরুষরাই দায়ী।

নারীরা চায় সংসার করতে। সংসার টিকিয়ে রাখতে। অথচ, তিন-চতুর্থাংশ ডিভোর্স তারাই দেয়। এবং এতে নারীদের কোনো দায় নাই। পারিবারিক সমস্যাগুলোকে প্রপার ওয়েতে ম্যানেইজ করতে না পারার জন্য পুরুষটাই দায়ী। সমাজ ও সংস্কৃতি দায়ী। নারীদের সমস্যার জন্য সংশ্লিষ্ট নারীর সাথে সম্পর্কিত অন্যরাই দায়ী। নারীরা কেবলি ভিকটিম।

পেশাগতভাবে একজন তত্ত্ববিদ হিসেবে জীবনে বহু জটিল তত্ত্ব পড়েছি। বুঝেছি। কিন্তু আধুনিক নারীদের এহেন দাবীর হাকিকত আজ পর্যন্ত আমি বুঝতে পারিনি। সো স্যাড!

অর্থনৈতিক নিরাপত্তা

বিয়ের মাধ্যমে একজন নারী অর্থনৈতিক নিরাপত্তা লাভ করে। আধুনিকতার অবয়বে নারীদেরকে নাগরিক জীবনে পূর্ণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। যেসব নারী, পুরুষের সম-যোগ্যতার টেকনিক্যাল জবগুলো করতে পারে না তাদেরকেও অফিস/কোম্পানীর পে-রোলে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।

তারা ঘরে যা করতো সেগুলোই তারা অফিসে করে পয়সার বিনিময়ে। কাজ যা-ই হোক, গৃহিণী হওয়াটা অগৌরবের। চাকুরী করাটা ডিগনিফায়েড।

ইমোশনাল বন্ডিং

বিয়ের মাধ্যমে একজন নারী, মেইল ইমোশনাল সাপোর্ট পেয়ে থাকে। ইমোশনাল এ্যাফেয়ারের মাধ্যমে, ব্যাক বার্নার হিসেবে ভাই/বন্ধু পরিচয়ে কাউকে রেখে সে ইমোশনাল সাপোর্টের এই চাহিদা সহজেই মেটাতে পারে।

এ’ধরনের ইমোশনাল বন্ডিং সে একইসাথে বেশ কয়েকজনের সাথেও করতে পারে। প্রমিসকিউয়াস রিলেশন, হোয়াটএভার দ্যা ফরমেট, ইজ নট আ প্রবলেম।

আত্মীয়তা বনাম বন্ধুত্বের সম্পর্ক

বিয়ের মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠে। আধুনিক জীবনে ফ্রেন্ডসার্কেলের মধ্যে রিলেশন এন্ড ইন্টিমেসি আত্মীয়তার সম্পর্ক থেকেও অধিকতর আকর্ষণীয় ও শক্তিশালী। ফেন্ডদের মধ্যে নিয়মিত পার্টি হবে। মৌজ মাস্তি হবে। নো হার্ম প্রিন্সিপাল মানা সাপেক্ষে কোনো চি-লে কারো বাগড়া দেয়ার সুযোগ নাই।

ফ্যামিলি ট্যুর এন্ড ট্রাভেল

সনাতনী জীবনপদ্ধতিতে নারীরা বিয়ের আগে ঘুরতে যায় বাবা, চাচা, মামা কিম্বা ভাইদের সাথে। বিয়ের পরে জামাইয়ের সাথে। এসব ফ্যামিলি মেম্বারদের সাথে ঘুরতে যাওয়াটা আধুনিক নারীদের কাছে বরিং। এর বিকল্প হিসেবে তাদের আছে স্টাডি ট্যূর, অফিস ট্যূর, সোলো ট্রিপ, হাইকিং এক্সপিডিশান ইত্যাদি।

আধুনিক উচ্চশিক্ষিত নারীরা পারিবারিক জীবনের বন্ধন হতে মুক্ত। অথচ তারা চায় বিয়ে করতে। একজন আদর্শ বর পেতে। আদর্শ সব ইন লজ, আত্মীয়স্বজন আর ফ্যামিলি পেতে। মুক্তি এবং বন্ধন, এই দুইটা যে আলাদা জিনিস, মিউচুয়েলি এক্সক্লুসিভ, এইটা তাদেরকে বোঝাবে কে?

মানব ইতিহাসে এহেন নারীস্বাধীনতা আনপ্রিসিডেন্টেড ঘটনা। যারা মানবসভ্যতার ধারাবাহিক উন্নয়ন তথা হিউম্যান হিস্ট্রিতে বিশ্বাসী, তারা আধুনিক নারীস্বাধীনতাকে দেখবে অস্বাভাবিক বিকৃতি হিসেবে।

এই ধাঁচের অস্বাভাবিক বিকৃতি নানা মাত্রায় সব সমাজে সব সময়েই ছিল। ছিল না শুধু অস্বাভাবিকতা ও বিকৃতির সামাজিকীকরণ। যা এখন হচ্ছে।

সমস্যা ঠিক এই জায়গাতে।

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Tahseen Ali Zishan: সামাজিকীকরণ শুরু হয় পরিবার থেকে। এখন নারীরা আদর্শ পরিবার বলতে কী বুঝে আমি এখনো ঠিক ধরতে পারিনি। তারা পরিবারের যে কোনো দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিতে চায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে তারা পালনও করতে চায় না।

পেশাদার নারীরা চায় পরিবারের একচ্ছত্র আধিপত্য টাইপ ব্যাপার উপভোগ করতে। যেহেতু তারা পরিবারে অর্থ দিচ্ছে তাই তারা সুপেরিয়র, এবং তাদের সবকিছুই তারা গ্লোরিফাই করে। এটা কি অস্বাভাবিক না? নিজের পর্যবেক্ষণ থেকে বললাম। ভুল হলে ক্ষমাপ্রার্থী।

Towhidul Hassan: আমরা প্রত্যেকেই নিজের ভুবনে বিরাজ করি – পারিপার্শ্বিকতাকে যিনি যেমন বুঝেন, জানেন, তেমনই প্রকাশে সচেষ্ট হই। এখানেই সৃষ্টি হয় ভিন্নমত ও পথে’র। আর যত মত, তত পথ। আপনার এই সমাজ নিরীক্ষাতেও আছে স্বকীয়তা ও ভিন্নতা – সবাই তাতে ঐক্যমত পোষণ করবে না। তারপরও আপনার দার্শনিকতাকে স্যালূট জানাই প্রিয় বড়দা।

Mohammad Tausif Rafi: স্যার, আমার ধারণা ফেমিনিজম নারীর ইকোয়ালিটির কথা বলে সুপেরিয়রিটির জন্য কাজ করে। অন্তত যদি সুযোগ পায়। যেমন, যেখানে ইকোয়ালিটি অর্জিত হয়ে গেছে সেখানে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠে, যেখানে হয় নাই সেখানেও চেষ্টা চলতে থাকে, যেভাবে যতটা সম্ভব।

সব ইজমই ভণ্ডামি। ফেমিনিস্টরা নারী নির্যাতন বন্ধের উপায় হিসাবে নারীকে প্রিভিলেজ দেয়, নারী অভিযোগ করলেই সেইটা সত্যি বলে ধরে নেয়। স্বাভাবিকভাবেই এই প্রিভিলেজের প্রচুর অপব্যবহার হয়, এবং নির্যাতন বন্ধের ব্যাপারে বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়। প্রিভিলেজ বা সুপেরিয়রিটি কখনোই নির্যাতন রোধের ন্যায্য উপায় নয়। বরং এটিই প্রতারণার পথ তৈরি করে।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *