সাধারণত সকাল আটটার ভিতরে নাস্তা করে ফেলি। সেদিনও নাস্তা শেষ করেছি। নাস্তার পরে প্রায়দিন বাসার গাড়িবারান্দার রাস্তায়, বাগানের লনে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করি। এরপর টেবিলে বসি। লেখাপড়া, ক্লাসের প্রস্তুতি ইত্যাদি কাজে।
সেদিন বেডরুমের সিঙ্গেল সোফাটাতে সেই যে বসলাম, একটানা দুই থেকে আড়াই ঘন্টা। অনবরত কেঁদেছি। এ’রকম প্রথম কেঁদেছিলাম ১৯৯০ সালে। বাবার মৃত্যুর পরে। এরপর ২০০৯ সালে। আম্মা মারা যাওয়ার পরে।
সাড়ে দশটার দিকে আমার ব্যক্তিগত অধ্যয়ন সহকারী ফয়সালকে নিয়ে গেলাম আরেক সহকারী সৌরভের বাসায়। সেখানে কিছুক্ষণ পরপর ডুকরে কেঁদে উঠছিলাম। কাদের ভাই, মানে সৌরভের বাবা, এক পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, আপনার কোনো সমস্যা হয়েছে?’
বললাম, ‘না, তেমন কিছু নয়। ঢাকায় শেখ হাসিনার কার্যালয় ঘেরাও করতে যাওয়া লোকজনের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে। না জানি কী হয় …!’
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলস্টেশনের পাশে পাহাড়িকা আবাসিক এলাকায় সৌরভ থাকে ওর বাবা-মা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছোট বোন মমতাকে নিয়ে। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার, বিশেষ করে আমি, তেমন ‘আনরেডি’ অবস্থায় কখনো জিরো পয়েন্ট, রেলস্টেশন, এ’ধরনের পাবলিক প্লেসে যাই না।
সেদিন গিয়েছি। সৌরভের বাসা থেকে সৌরভ, আমি আর ফয়সাল উদ্দেশ্যহীনভাবে উদ্ভ্রান্তের মত হাঁটাহাঁটি করতে করতে এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে রেলগেট এর কাছে এটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসি। সেখান থেকে বাসায় ফিরে কিছুক্ষণের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছি। কেউ একজন ফোন করলো। ঘুম ঘুম চোখে ফোন ধরলাম। ওপাশ থেকে বললো, ‘স্যার, শুনেছেন? আর্মি ক্ষমতা নিচ্ছে।’
আমার বড় ভাই নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তরের প্রাক্তন পরিচালক। বাংলাদেশ সরকারের অবসরপ্রাপ্ত সচিব। খুব সম্ভবত বেলা ১২:৩০ টার দিকে ফোন করে বললেন, ‘শুনছোস, শেখ হাসিনা পালায় গেছে!’
এরপর যা হবার …! কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছি। কোনো কথা বলতে পারি নাই। অনবরত কেঁদেছি। এরপর থেকে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গী যাকেই দেখেছি জড়িয়ে ধরে কেঁদেছি। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত এই দুই চোখ থেকে অশ্রু ঝরেছে অবিরত। সুখের। আনন্দের। বিজয়ের। একই সাথে কষ্টের। হারানোর বেদনায়।
৫ আগস্ট ২০২৪। ইতিহাসে যা ‘৩৬শে জুলাই’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সেদিন বেলা তিনটায় ছিল চবি শহীদ মিনারে স্বৈরাচারের পতন উপলক্ষে বিজয় সমাবেশ ও মিছিল। সমাবেশ শেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আবারো স্লোগান দিয়েছি ‘নারায়ে তাকরির, আল্লাহ আকবর। বাংলাদেশ বাংলাদেশ, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।’ ৩২ বছর পর।
৩০-৪০ জন নিয়ে শুরু করা সেই মিছিল শেষ হয়েছে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে। শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, গৃহবঁধূ, ছোট ছোট বাচ্চারা, রিকশাওয়ালা, দোকানদার, এলাকাবাসী, কর্মচারী …! কে ছিল না সেই মিছিলে?
জুলাই গণঅভ্যুত্থান, আমাদের পুনর্জীবন। পুনর্জাগরণ। লাইফটাইম এচিভমেন্ট। আলহামদুলিল্লাহ!

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য
Khan Talat Mahmud Rafy: আলহামদুলিল্লাহ স্যার। আপনার অবদান এ জাতি স্মরণ রাখবে।
Mohammad Mozammel Hoque: তোমার মত যারা জুলাই বিপ্লবের অন্যতম নায়ক, তোমরা হচ্ছো বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের মতো। তোমাদের ভুল থাকতে পারে, কিন্তু সেগুলো সবই ক্ষমার যোগ্য। তোমরা আমাদের শ্রেষ্ঠতম সন্তান। কলিজার টুকরা। বিশেষ করে তুমি যেন এক জীবন্ত আবু সাঈদ!
