ইখওয়ান সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেও কেন মার খেলো?

“কিন্তু ইখওয়ান সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেও কেনো মার খেলো? তারাও তো অনেক সেক্টরভিত্তিক লোক গড়ে তুলেছিলো?”

অপসংস্কৃতি কিংবা যে কোনো অপব্যবস্থাকে কীভাবে রুখবেন? এড-আপ পলিসি হতে পারে সর্বোত্তম উপায়’ শিরোনামে আমার একটি লেখায় একজন পাঠক এই প্রশ্ন করেছেন।

সেখানে আমি বলেছি,

রাস্তায় গাড়ি চলে। ড্রাইভার আনাড়ি হলে কিংবা ‘কপাল খারাপ’ হলে মাঝে মাঝে গাড়ি এক্সিডেন্ট করে। তো, এই ধরনের এক্সিডেন্ট করা একটা গাড়িকে দেখিয়ে কেউ বলতে পারে, ‘দেখো, সেও তো একজন ড্রাইভার ছিল। এখন বলো, সে কেন এক্সিডেন্ট করেছে? গাড়ি যখন এক্সিডেন্ট করে, যেমন এই গাড়িটা করেছে, তাহলে বা এমতাবস্থায় রাস্তায় কি গাড়ি চালানো উচিত?’

মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

আমরা জানি, চলতে হলে আপনাকে রাস্তায় চলতে হবে, না হলে আকাশে উড়তে হবে, অথবা পানির উপরে ভাসতে হবে। চলাচলের জন্য এই বিদ্যমান বিকল্পগুলোর বাইরে গিয়ে আপনি কোথাও যেতে পারবেন না। রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলোও হচ্ছে তেমন। এর প্রত্যেকটির মধ্যে ঝুঁকি আছে। অসুবিধা আছে। তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় দিক থেকে। ঝুঁকিমুক্ত ও নিরাপদ কোনো সার্বজনীন বা স্থায়ী রাজনৈতিক ব্যবস্থা নাই বা হতে পারে না।

এই পয়েন্টটি বোঝার জন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূলনীতির সাথে প্রায়োগিক রাজনৈতিক কাঠামোর যে পার্থক্য সেটা স্মরণ রাখতে হবে।

গাড়ি চালানোর সময় যেমন করে ড্রাইভাররা বিদ্যমান পরিস্থিতি অনুসারে আপাতদৃষ্টিতে ইনকন্সিসটেন্ট কিন্তু তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়, তেমনি করে পারিপার্শ্বিকতা, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে, নিজস্ব জীবনবোধ ও মূলনীতি বা নৈতিকতার আলোকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। একজন সত্যিকারের রাজনীতিবিদকে খেলার মাঠে অনির্ধারিত পরিস্থিতিতে একজন পাকা খেলোয়ারের মতো এভাবেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

মিশরে কী হয়েছে না হয়েছে সে নিয়ে আমি খুব বেশি কিছু একটা জানি না। আপনি যদি মনে করেন, মিশরে ইখওয়ানের কোনো ভুল ছিল না, সেটা আপনি বলতে পারেন, যদি সেখানকার ঘটনাবলী নিয়ে আপনার খুব ভালো জানা থাকে এবং আপনি তেমন এক্সপার্ট হয়ে থাকেন।

তবে আমার ধারণা হলো, তারা সেখানে অপরিপক্ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। বলতে পারেন, তারা ছিলেন অপরিণামদর্শী। এত সেক্টরে সেক্টরে লোক তৈরি করার পরেও তাদের এই অপরিপক্কতা কেন, সেটি নির্ণয় করা খুব একটা কঠিন কিছু নয়। কেউ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন, তারমানে তিনি সফল হবেনই, রাজনীতির ব্যাপারে অন্তত আমরা এই কথা বলতে পারি না। রাজনীতির অন্যতম মূলনীতি হলো যথাসময়ে যথা কাজ।

একটু আগেই বলেছি, রাজনীতি হলো খেলার মতো। এখানে আদর্শ ও নৈতিকতা থাকবে প্রেরণা ও দিকনির্দেশনা হিসেবে। কিন্তু নিছক আন্তরিকতা, মতাদর্শগত সুপেরিয়রিটি ও নৈতিক মান দিয়ে রাজনীতির ময়দানে জয় লাভ করা যাবে না। প্রয়োজন হবে সাহসিকতা, দক্ষতা ও উপযুক্ত কৌশলের।

নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন কাজ করার পরও কেন মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিনের এই দূরবস্থা সেটি সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়ার জন্য আমরা গেম থিওরির সাহায্য নিতে পারি; অথবা এই যে আমি রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির উদাহরণ বললাম সেটা নিয়েও আপনি ভাবতে পারেন।

মজবুত গাড়ি স্বয়ং আপনাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিবে না। মজবুত গাড়ি তৈরি করার পরে রাস্তার মধ্যে সেই গাড়ি ঠিকমত চালাতে না পারলে, ব্রেক করার সময় স্পিড চাপলে, স্পিড দেয়ার সময় ব্রেক চাপলে, ডানে যাওয়ার সময় দ্বিধা করলে, বায়ে যাওয়ার সময় আগে ডাইনে গেছি এখন কীভাবে বামে যাবো– এই ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগলে, সেই গাড়ি এক্সিডেন্ট হওয়াই স্বাভাবিক।

মাঝে মাঝে যে পিছিয়ে আসতে হয়, আপাতত পরাজয়কে মেনে নিতে হয়, বাতিল হিসেবে জানার পরেও সন্ধি সমঝোতা করে চলতে হয়, সত্য ও সঠিক জানার পরেও কল্যাণকর কাজকে বাস্তবায়নের জন্য যে একটা টেকসই ক্রমধারা অবলম্বন করতে হয় সেটার উদাহরণ তো আমরা সুন্নাহ থেকেই পাই।

মিশরে ওভার-স্টেপ করে ঝামেলায় পড়ার উদাহরণের পাশাপাশি আপনি সাম্প্রতিক তিউনিসিয়ায় ইসলামপন্থীদের রিট্রিটমেন্টের উদাহরণকেও সামনে রাখতে পারেন।

আদর্শ আপনার যা-ই থাকুক না কেন, রাজনীতির সূত্র অনুসারেই আপনাকে রাজনীতি করতে হবে। যেভাবে রসায়নবিদ্যার সূত্র অনুসারে আপনাকে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাতে হবে। আদর্শবাদ দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে রাজনীতি যারা করেন, তারা প্রায়শই আদর্শের সাথে রাজনীতির যে আন্তঃসম্পর্ক সেটাকে যথাযথ অবস্থানে বিবেচনা না করে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত ব্লেম গেম ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বে আত্মসমর্পণ করেন।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলা জরুরি।

ইসলামপন্থীরা বিশ্বাস করে, সফলতা ও ব্যর্থতা আল্লাহর কাছ থেকে আসে। অথচ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় কোনো বিশেষ অঞ্চলে কোনো বিশেষ ব্যক্তিবর্গ যখন দৃশ্যত ক্ষতি ও ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়, তখন তারা সেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটাকেই এর জন্য দায়ী করে। এটি তাদের অন্তর্গত স্ববিরোধ নয় কি?

লেখাটির ফেসবুক লিংক

Leave a Reply