ব্যক্তি বনাম সমাজের দ্বন্দ্ব ও জামায়াতে ইসলামী করা না করা প্রসঙ্গ

ব্যক্তির দায়িত্ব নিয়ে শায়খ মতিউর রহমান মাদানীর কথা আমিও শুনেছি। শাসন-ক্ষমতা অর্জন ও প্রয়োগ তথা প্রচলিত অর্থে একামতে দ্বীন সম্পর্কে সালাফীদের স্ট্যান্ডার্ড পজিশন হলো, ‘এটা শাসকের দায়িত্ব। আমার দায়িত্ব নয়। আমার দায়িত্ব হচ্ছে বলা।’

এটার একটা রিফ্লেকশন সম্ভবত এখানে (জাভেদ আহমেদ গামেদির লেখায়) হয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে, খলিফা হিসেবে, কোনো দায়িত্ব থেকেই আমি মুক্ত নই। আমার সম্ভাব্য অপারগতার জন্য আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন। তিনি বলেছেন। কিন্তু, ক্ষমা করা মানে বেসিক্যালি এটি তোমার দায়িত্ব। দায়-দায়িত্ব যদি না-ই থাকে, তাহলে ক্ষমা করার প্রসঙ্গ কেন আসে?

দেখা যাচ্ছে, শাসক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যখন ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে না, অন্যায়ের প্রতিরোধ করবে না, তখন তাকে বাধ্য করাই হচ্ছে হাদীসে বর্ণিত তিন স্তরের প্রতিরোধের আদেশ অনুসারে আমার দায়িত্ব। আমি যদি প্রথমটা না পারি, অর্থাৎ বলপ্রয়োগ করতে না পারি; তাহলে দ্বিতীয় পন্থায় অন্যায়ের প্রতিরোধ করতে হবে। সেটি হচ্ছে মুখে বলা। এটাও না পারলে তৃতীয়টা করা। অর্থাৎ অন্তরে ঘৃণা করা।

অন্যায় প্রতিরোধে স্ট্যান্ডার্ড সালাফী পজিশন অনুসারে দুর্বলতর পজিশনকে গ্লোরিফাই করা হচ্ছে। হাতে প্রতিরোধের উত্তম পন্থাকে কার্যত অস্বীকার করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এর বিপরীতে, ইসলামিক মুভমেন্টের কথা যারা বলে তারা প্রথম অপশনটার উপর এতটাই গুরুত্বারোপ করছে যে, স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূলের (সা) মাধ্যমে অপরাপর যে অবকাশগুলো দিয়েছেন, যেমন প্রতিবাদ করা ও ঘৃণা করা, সেগুলোকে তারা কার্যত অস্বীকার করার চেষ্টা করছেন। ইসলামী আন্দোলনপন্থীদের ভাবখানা এমন, তুমি যদি অন্যায় প্রতিরোধ করতে না পারো তাহলে তোমার ঈমান অপূর্ণ থেকে যাবে।

কাজের কথা হলো, অন্যায়ের প্রতিরোধ তথা ন্যায় যদি প্রতিষ্ঠা করতে হয় তাহলে আমাকে সিস্টেমেটিক্যালি এনগেইজ হতে হবে। ক্ষমতা অর্জন ও তা সংহত করতে হবে। বলাবাহুল্য, কালেক্টিভ পাওয়ার যদি অর্জন করতে যাই তাহলে আমাকে পলিটিক্সে এনগেইজ হতে হবে। অর্থনীতি থেকে সামরিক সুরক্ষা, নানাভাবে এনগেইজ হতে হবে। আমি যখন এনগেইজ হতে যাবো তখন সমাজের প্রসঙ্গ আসবে, রাষ্ট্রের প্রসঙ্গ আসবে, রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রসঙ্গ আসবে।

কয়েকদিন আগে আমার কাছে এক গাড়ি ভর্তি হুজুর এসেছিলেন। ইঞ্জিনিয়ার প্রফেসর আব্দুল মান্নান স্যারের নেতৃত্বে। উনাদের সাথে প্রসঙ্গক্রমে বাতিল আকীদার কথা উঠলো। উনাদের মধ্যে একজন বললেন, আমরা ঐক্য করবো বাতিল আকীদাপন্থীদের বাদ দিয়ে।

ঐক্যের কথা যিনি বলছিলেন, তিনি ঢাকার একটা মাদ্রাসার মোহতামিম। আমি উনাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, আপনাদের আকীদার কিতাবে জামায়াতে ইসলামী তো বাতিল ফিরকাভুক্ত। আমি ছাত্রশিবির করেছি। জামায়াত করেছি। জামায়াতকে ভুল মনে করে আমি জামায়াত ছেড়েছি, এমনটা নয়। বরং আমি মনে করেছি, জামায়াতে ইসলামী যেভাবে কাজ করছে সেভাবে সমাজ পরিবর্তনের কাজ হবে না। জামায়াত করা হলো চট্টগ্রাম থেকে লোকাল বাস দিয়ে ঢাকায় যাওয়ার মতো। আপনারা যে আমার কাছে এসেছেন… (আমার থেকে শুরু করে) বাংলাদেশের লিডিং ইসলামিক স্কলারগণ— সবাই তো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জামায়াত অফশ্যুট। অথচ, আপনারা কিতাবের মধ্যে লিখে রেখেছেন, জামায়াত হচ্ছে বাতিল!

তখন তিনি বললেন, না, জামায়াতকে আপাতত আলাদা রাখেন, অন্যগুলো নিয়ে আমরা কথা বলি।

আমি বলতে থাকলাম, এখানে যেমন ঐক্যের কথা বলা হচ্ছে, সেই কথাগুলোকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য যত কথাবার্তা, ন্যারেটিভ আছে, সেগুলো কিন্তু আলেম-ওলামাদের নেতৃত্বেই হচ্ছে।

আপনারা সুদের বিরুদ্ধে খুব জিহাদ করছেন, অথচ (আমি পকেট থেকে একটা কাগুজে নোট বের করে জিজ্ঞেস করলাম), এই যে মুদ্রাটা, এটার ব্যাকআপ কী? এটার পিছনে কোনো স্বর্ণ আছে, নাকি রৌপ্য আছে? এগুলো তো সব ইউএস ডলারের ব্যাকআপে ছাপানো। আপনার মুদ্রাটাই হচ্ছে স্বয়ং ‘সুদ’, আপনি সেখানে সুদ তাড়ানোর চেষ্টা করছেন ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে!

ধরেন, আপনার কাছ থেকে আমি পঞ্চাশ হাজার টাকা নিলাম। পরের বছর আমি যদি আপনাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ফেরত দিই, তাহলে ইনফ্লেইশন অনুসারে আপনাকে তো আমি কম দিয়ে ঠকাইলাম। কারণ ইতোমধ্যে তো মুদ্রার ক্রয়-ক্ষমতা কমে গেছে। ৬% মিনিমাম ইনফ্লেইশন আমাদের দেশে বলা হচ্ছে, ১০%ও হয়, মাঝে মাঝে ৮%ও হয়। তাহলে?

এই বিষয়গুলো না জেনে আপনারা কম্পিটেন্সির কথা কীভাবে বলেন?

অতএব, ‘আমি’ যখন ‘আমরা’ হয়ে উঠবো, মূল আলোচনায় যেটা বলছিলাম, তখন কিন্তু নানা ধরনের ফোরাম, পরিষদ, সংস্থা, সংগঠন ইত্যাদির প্রসংগ চলে আসে। এগুলোর সাথে আমার কী সম্পর্ক, সেটা চলে আসে।

ফিলসফিতে অস্তিত্ববাদ নিয়ে আলোচনা আছে। আমি দেখি, ইসলাম হচ্ছে চরম অস্তিত্ববাদী একটা জিনিস। কোরআন শরীফে বলা আছে, সেদিন মানুষ পালিয়ে যাবে, তার ভাই থেকে, মা থেকে, বাবা থেকে, স্বামী বা স্ত্রী থেকে। … অন্য কারো অবস্থা নিয়ে চিন্তা করার অবস্থা কারো থাকবে না।

অ্যাকাউন্টিবিলিটি বা দায়-দায়িত্ব চূড়ান্তভাবে নিজের। আমার লেখা আছে, পপুলার লেখা— নিজের স্বার্থকে দেখো, নিজের জন্য করো। এটা স্বার্থপরতা নয়। আমি সেটা ব্যাখ্যা করেছি।

আমি যখন আমার জন্য করবো, উনি আমার ভাই, উনার জন্য কি আমি করবো না? উনি আমার মা, উনি আমার দেশের নাগরিক, উনি আমার ধর্মের ভাই, আমি কি আমার লোকদের জন্য করবো না? আমি ‘আমি’ হয়ে উঠবো পরিপূর্ণভাবে নানা ধরনের ‘আমরা’ গঠন করার মাধ্যমে; ঐক্যবদ্ধ ‘আমরা’ গঠন করার মাধ্যমে। এটাই ‘বি উইথ’ যেটা আপনি বলছেন জেস্পার্সের রেফারেন্সে। তাহলে, বিয়িং ইজ অলওয়েজ ‘বিয়িং উইথ’।

দেখা যাচ্ছে, ইসলাম বা ফিলসফি— যে দিক থেকেই বলি না কেন, এই যে বাইনারিগুলো (যেমন— ব্যক্তি বনাম সমাজের দ্বন্দ্ব) করা হচ্ছে, এগুলো মূলত কমিউনিস্টদের প্রচারণা। তারা সমাজ তথা সামষ্টিকতাকে প্রাধান্য দিতে চায়। এর বিপরীতে আছে পুঁজিবাদী সমাজের ইন্ডিভিজুয়ালিজম বা ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাবাদ। অথচ, ইন্ডিভিজুয়াল এবং কালেক্টিভ, দুইটা মিলিয়েই হচ্ছে বাস্তবতা। একই চুম্বকের উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরুর মত। পরস্পর পরস্পরের সাথে বিপরীত বটে, কিন্তু এই বৈপরীত্য নিয়েই হচ্ছে সমন্বয়।

‍“(প্রশ্ন-উত্তর-৩) গামেদীর ইসলাম ও রাষ্ট্র ধারণার পর্যালোচনা” শীর্ষক আলোচনার ১৬ মিনিট হতে ২২ মিনিট পর্যন্ত বক্তব্যের অনুলিখন।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Leave a Reply