অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি বনাম আদর্শ প্রতিষ্ঠার রাজনীতি

যারা বলছেন, ‘আমরা আদর্শ প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করবো না। বরং অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করবো’ তাদেরকে অহেতুক ভুল বোঝা হচ্ছে। অধিকার বনাম রাজনীতির যে বাইনারি করা হচ্ছে আমার দৃষ্টিতে তা ফলস বাইনারি।

কেননা, অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া আদর্শের রাজনীতি হতে পারে না। আবার, অন্তর্নিহিত কোনো আদর্শবোধ না থাকলে অধিকারের দাবি তোলা বা অধিকার প্রতিষ্ঠা করা কখনও সম্ভব হতে পারে না।

আমার দৃষ্টিতে, যারা আদর্শ প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলছে তারা আসলে আদর্শের যে প্রায়োগিক দিক তথা অধিকার প্রতিষ্ঠার যেই বাস্তব উদ্যোগ, সেটির উপর কার্যত ফোকাস করতে চাচ্ছেন, বা সেটি তারা করছেন।

বিংশ শতাব্দীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী ইসলামী চিন্তাবিদ ও সংগঠক মাওলানা মওদূদী তাঁর অন্যতম মৌলিক গ্রন্থ ‘ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি’র মধ্যে বলেছেন, মানবিক নৈতিকতার উপরে ইসলামী নৈতিকতার স্থান। সাধারণ মানবিক নৈতিকতা হলো ইসলামী নৈতিকতার ভিত্তি। মৌলিক মানবিক যোগ্যতা না থাকলে কারো পক্ষে ইসলামী নৈতিকতা অর্জন করা সম্ভবপর হওয়ার কথা নয়। যেখানে মৌলিক মানবীয় গুণাবলীর ঘাটতি রয়েছে সেখানে ইসলামী নৈতিকতা টেকসই হওয়াটা অসম্ভব।

এর মানে হলো, নৈতিকতার ধারণা একটি ক্রমসোপানমূলক ব্যাপার বা hierarchical phenomena। এই দৃষ্টিতে দেখলে আমরা বুঝতে পারি, যারা মানুষের মানবিক অধিকারের কথা বলছেন তারা মানবিক গুণাবলীর উপর যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করার কারণেই তা বলছেন।

বিষয়টাকে এভাবে দেখলে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন, মানবিক অধিকারের কথা বলা মানেই হলো মানুষের মৌলিক মানবিক নৈতিকতা ও আদর্শের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা।

হ্যাঁ, মানবিক মৌলিক নীতি নৈতিকতার সাথে সাথে কেউ যদি অধিকতর মৌলিক কিম্বা পরিপূর্ণতা দানকারী কোনো নৈতিক মান অর্জন করতে পারেন সেটা খুবই ভালো। এ ধরনের উত্তম ব্যক্তিরাই নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হবেন। মাওলানা মওদূদীর মতে এটাই জগতের নিয়ম।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি একক উদ্যোগের মাধ্যমে বা একটি একক সংগঠনের মধ্যে প্রয়োজনীয় সব কিছু একোমোডেইট করা প্রায়োগিক দিক থেকে একটি অবাস্তব ধারণা। বর্তমানে প্রচলিত কোনো ইসলামী সংগঠনই ইসলামের সবগুলো মৌলিক দিককে ধারণ করে গড়ে ওঠেনি কিংবা সেভাবে চলছেও না। অভিজ্ঞতা আমাদেরকে তা-ই বলে।

কেউ যখন জীবনের কোনো একটা দিকে একটা বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে বা কোনো একটা উদ্যোগে শামিল হয়, তখন এটাই তার একমাত্র পরিচয় হয়ে ওঠে না। জীবনের কোনো একটি দিকে বিশেষ কোনো দলের সাথে কারো সম্পৃক্ততা দিয়েই তাকে বিচার করা অনুচিত।

অতএব, যারা গণমানুষের মৌলিক মানবিক অধিকারের পক্ষে রাজনীতি করার কথা বলছেন, জীবনের বৃহত্তর অঙ্গনে তারা মানবিক অধিকারের যে মৌলিক ভিত্তি, সেটির সাথে সাথে উপরিকাঠামো হিসেবে বৃহত্তর যে নৈতিকতা, সেটির সাথেও সংশ্লিষ্ট আছেন বা থাকতে পারেন, এটা আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি।

যেমন, আমি একটি সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। এর মানে এই নয়, ব্যক্তিজীবনেও আমি সেক্যুলার। আমি একটি ‘সেক্যুলার’ দোকান থেকে কোনো কিছু কিনতে পারি। এর মানে এই নয়, আমি একজন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী। আমি নাস্তিক কারো সাথে ব্যবসা করতে পারি। এর মানে এই নয় যে আমিও একজন নাস্তিক। রাজনীতির ব্যাপারটাও তেমন।

যারা অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতিকে অসম্পূর্ণ বা ক্ষতিকর মনে করে বৃহত্তর পরিমণ্ডলে আদর্শ প্রতিষ্ঠা এবং এর সহায়ক রাজনীতি করার কথা বলছেন তাদেরকে বলছি, আপনাদের আদর্শে কি শুধুমাত্র রাজনীতি আছে? অথবা, আপনাদের আদর্শ কি রাজনীতিনির্ভর?

রাজনীতিকে যেভাবে আপনারা ফোকাস করছেন তাতে করে আপনাদের আদর্শবাদিতা নিয়েই কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে।

আদর্শবাদী রাজনীতি যদি নিছক রাজনীতি না হয়ে থাকে, আদর্শবাদী রাজনীতিতে আদর্শটা যদি মূল বিষয় বা মুখ্য পরিচয় হয়ে থাকে তাহলে আপনাদের আদর্শে সংস্কৃতি কোথায়? বুদ্ধিবৃত্তি কোথায়? আধ্যাত্মিকতা কোথায়? অর্থনীতি কোথায়? নিরাপত্তা তথা সামরিক সুরক্ষা কোথায়? এগুলো তো খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনায়-কানায়, চিপায়-চুপায়, দলীয় সাহিত্য ও কার্যক্রমে, তালিকায় পরিশিষ্ট হিসেবে থাকলে তো হবে না। স্বতন্ত্রভাবে এগুলোর প্রত্যেকটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মানব জীবনের কথা বলেন কিংবা সামগ্রিক আদর্শ হিসেবে ইসলামের কথা বলেন, এর কোনোটাই তো নিছক রাজনীতি নয়। বা রাজনীতিনির্ভর নয়। বরং এই বিষয়গুলোর প্রত্যেকটিই এমন যে এগুলোর একটি অপর সব কয়টিকে প্রভাবিত করে। কোনোটির প্রভাব থেকে কোনোটি মুক্ত থাকতে পারে না।

এরপর আসেন সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা প্রসঙ্গে।

অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতির কথাবার্তা যারা বলছেন তাদের এই উদ্যোগ হয়তো সফল হবে অথবা ব্যর্থ হবে। কিন্তু, ‘সফলতা-ব্যর্থতা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে’ এটি যাদের কনভিকশন, তারা কীভাবে একটি নতুন উদ্যোগকে গুরুত্বহীন মনে করছেন, সফল হবে না বলে মনে করছেন, উপহাস করছেন, তা আমার বুঝে আসছে না।

প্রতিটা সফল উদ্যোগের পেছনে থাকে অনেক অনেক অনেক ব্যর্থ উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাব। negation of negation বলতে দ্বান্দ্বিকতার তৃতীয় সূত্রে যা বোঝানো হয়। হোক সেটি সফল কিংবা ব্যর্থ, প্রতিটি উদ্যোগ আমাদেরকে নতুন উদ্যোগ ও সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়। ইতিহাস তো তা-ই বলে।

নতুন উদ্যোক্তাদের আমি স্বাগত জানাই। এ  রকম আরো নতুন নতুন উদ্যোগ গড়ে উঠুক। প্রতিষ্ঠত সংগঠনে ভাঙ্গনের মাধ্যমে অথবা/এবং তাদের নিজেদের মধ্যে ভাঙ্গনের মাধ্যমে; কিংবা অন্য যে কোনো উপায়ে। আমাদের দেহের কোষ বিভাজনের মাধ্যমে যেভাবে আমাদের শরীরের গ্রোথ হয়ে থাকে।

রক্ষণশীলদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের সংস্কারবাদী এই আধুনিক ধারাটি ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়ে অচিরেই মূলধারা হয়ে উঠবে, ইনশাআল্লাহ! আপনি এই নবজাগরণের জোয়ারে শামিল হবেন, নাকি অচলায়তনের অনুর্বর ডিফেন্ডার হিসেবে জীবন কাটিয়ে দিবেন, সেটা আপনার নিজস্ব ব্যাপার।

আল্লাহ আমাদের সহায় হোন, আমীন!

এ সংক্রান্ত আলোচনাটির ভিডিও লিংক:

পোস্টটির ফেসবুক লিংক

Leave a Reply