পঁয়ত্রিশ বছর পর গ্রামে গেলাম। নিচে পাকা, উপরে টিন, তিন রুমের একটি ঘর। ১৯৭৫ সালে শহরে চলে আসার পর হতে যত বারই গ্রামে গিয়েছি চাচাদের ঘরে উঠেছি, বেশির বেশি এক বেলা থেকেছি। আমরা নয় ভাই-বোনদের কেউই গ্রামের থাকে না। কোনো খবরও রাখে না। মাঝে মাঝে, বিশেষ করে ঈদের দিন বা পরের দিন বাবার কবর যেয়ারত করার জন্য গাড়িতে করে যেয়ে আবার গাড়িতে করে ফিরে আসে। আমাদের জমি যারা চাষ করে, তাদেরকে আমরা কেউই চিনি না। এমনকি আমাদের পৈতৃক জমিগুলোর অবস্থান কোথায়, আমাদের ভাই-বোনেরা বলতে পারবে না। আমিও না। গ্রামের বাড়ি হতে মাত্র চৌদ্দ মাইলের মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় থাকি। ভাবলাম গ্রামে যাবো।

গেলাম। কারো ঘরে উঠলাম না। সংগে দুপুরের খাবার নিয়ে গিয়েছিলাম। সারাদিন ঘরে ছিলাম। জুমার পর আব্বার কবর জিয়ারত করে সোজা ঘরে চলে আসলাম। মজার ব্যাপার হলো, ঘরে কাঠের জিনিসের প্রায় সবই ঘুণে ধরে বরবাদ হয়ে গেছে। অনেক কষ্টে জানালা খুললাম। খুলতে গিয়ে কয়েকটি পড়ে যাবার উপক্রম হলো। আসার সময় দেখি আর বন্ধ করা যাচ্ছে না। খাট-চৌকিগুলো নাড়াতে গেলেই ভেঙ্গে পড়ে যাবার অবস্থা। আলমারিগুলোর তাকগুলো সব ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। বৃষ্টি শুরু হতেই দেখা গেল এখানে সেখানে বৃষ্টি চুইয়ে পড়ছে। এক জায়গায় টিনের ফাঁকে আকাশ দেখা যাচ্ছে। মাত্র দুটি হোল্ডারে বাল্ব লাগানো গেলো। ফ্যান নাই একটিও। বৃষ্টির মধ্যেও ভ্যাপসা গরম। দুটি মশারি দেখলাম ইঁদুর-তেলাপোকায় কেটে কিচ্ছু রাখে নাই। একমাত্র টয়লেটের তালাটি অনেক কষ্টে খুললেও দরজা খুলছে না। কতটুকু খোলার পরে দেখা গেল আর বন্ধ করা যাচ্ছে না। কিছু ক্রোকারিজ আছে। একটি পিতলের বদনা কেউ জানি দরাপরবশ হয়ে চুরি না করে রেখে দিয়েছে। সেগুলো দেখে ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়ে গেল।

আমরা ভাইবোনেরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, তথাকথিত এলিট। এই হলো আমাদের গ্রামের বাড়ির অবস্থা। অবশ্য শহরে আমাদের বিল্ডিং আছে। সেখানে আমরা একসাথে ঈদ করি।

ভাবছি প্রতি সপ্তাহে বাড়ি যাবো। ক্রমে ক্রমে সব ঠিকঠাক করে অধ্যাপিকা স্ত্রীসহ সন্তানদেরকে নিয়ে থাকব। যাতে তারা গ্রামের আত্মীয়-প্রতিবেশীদের সাথে পরিচিত ও ঘনিষ্ট হওয়ার সুযোগ পায়।

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

শিক কাবাব: আপনারা কি হাটহাজারীর? কারণ, চৌদ্দ মাইল। নাকি অন্য থানা? আমরা মিরশ্বরাই থানার। ৯ ভাই বোনই প্রতিষ্ঠিত, মাশাল্লাহ। আপনার সাথে আমার কিছুটা মিলে। আপনার সিবলিং থেকে ২ জন মাইনাস আমাদের। ঈদে-চান্দে ঢাকা থেকে গ্রামে যেতাম। ১৯৭৫ সালে ঢাকা আসি।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: হ্যাঁ ভাই, আমার গ্রামের বাড়ি নাজিরহাটের কাছে।

যুধিষ্ঠির: গ্রামের বাড়ি না যাওয়ার জন্য মাইনাস!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ভাবছি এখন থেকে নিয়মিত যাব। সুযোগ-সুবিধা যা-ই থাকুক না কেন। শেকড় তো আর অস্বীকার করা যায় না। কী বলেন? অ্যালেক্স হ্যালির ‘দি রুটস’ দেখেছেন? তিনটা ডিভিডির একসেট। চমৎকার। শেকড়েই সম্মান। এস্টাবলিশমেন্টের কল্যাণে প্রাপ্ত শহুরে সম্মান এখন বাসি লাগে। মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

সুরঞ্জনা: অবশেষে শেকড়ের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছেন জেনে ভালো লাগলো।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: শেকড় হলো অনুভবের বিষয়। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে অনুভবের স্থান কম। প্রকাশের বাহুল্য বেশি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে শেকড়ের স্বীকৃতি যথাযথ হওয়া উচিত।

পোস্টটির সামহোয়্যারইন লিংক

Similar Posts

০ Comments

  1. দৃশ্যের জীবনে অলৌকিক প্রেরণা কে যেন এসে অদৃশ্য বিধান রেখে গেলো দৃশ্যের জীবনেআমার হাতের ভাঁজে তেল নুনের গন্ধকখন যে বদলে গিয়ে ভিনদেশী লোবানে।আমি কখনো তাকে ডাকেনি,সে নিত্য আমার খাইয়েসের তজ্জ্বলীতে একটু একটু করে আমার হয়ে গেছে।আমি অচীন হয়ে গেছিকাঠাল চাপার গন্ধে নিশ্বাস ভারী হয়ে আসেচন্দ্র মল্লিকার বনে আর কোকিল ডাকে না।আমার কাছে নাই হয়ে গেছে স্বর্গীয় অনুপ্রেরণানাই পিতামহের অস্তিত্ত্বের ইতিহাস।কেউ আমার জন্য একটুকরো মেঘ রেখে যায়নি-এই যেন ইতিহাসবিহীন নিস্তরঙ্গ পাথর শহর।আমার অদৃশ্য শাশ্বত শহর অন্ধ মানুষে ভরে গেছে।এখন আর মায়ের হাতের ঝাঁঝ লাগে না নাকে-আমি নতুন করে গন্ধবণিকের বাড়ী খুঁজি,এ গলি ও গলি, অন্ধ কাঠঠোকরা এক।কেউ সে ঠিকানা জানে না। আমি নিজের একাকীত্বে কখনো কখনো শুনতে পাই দৃশ্যের অতীত অলৌকিক বাণী।সে যেন আমার নিজের মাঝে নিজেকে খুড়তে থাকে -আমি চোখ মুদি, কানে হাত চাপা দিই।কিছুই তার গোপন থাকে না-ক্ষণে ক্ষণে যেন নিজেকে অতিক্রম করে আরশের ছায়ায় আশ্রয় নেয়।

Leave a Reply to philosophy-in-thought Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *