নিভে গেলো আরো একটি নক্ষত্র, চবি লোকপ্রশাসন বিভাগের প্রফেসর, ড. আব্দুল ওয়াহহাব

আমাদের শরীরের যেমন হাত পা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আছে, তেমনি করে আমাদের আবেগেরও শরীর আছে। আছে আবেগের হাত পা ফুসফুস হৃদপিণ্ড মস্তিষ্কসহ নানা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ।

অঙ্গহানি যেভাবে আমাদেরকে কষ্ট দেয়, পঙ্গু করে দেয়, তেমনি করে আমাদের আবেগের শরীরে যখন আমরা আঘাতপ্রাপ্ত হই, তখনো আমরা অনুভব করি অঙ্গহানিসম কষ্ট। দুঃসহ যাতনা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন প্রথম আসি, সেই আশির দশকের শুরুতে, তখন সিনিয়র শিক্ষকদের মধ্যে যাদেরকে পেয়েছি ইসলামী আন্দোলনের পরিচিত মুখ, শীর্ষ দায়িত্বশীল হিসেবে, তাদের মধ্যে শুধুমাত্র একজন এখন কোনোমতে বেঁচে আছেন, কাছের মানুষদের থেকে পাওয়া একরাশ অবহেলা এবং হতাশা বুকে নিয়ে।

একে একে চলে গেছেন মার্কেটিং এর সিরাজউদ্দৌলা শাহীন স্যার, ম্যানেজমেন্টের নুরুল করিম স্যার, ইংলিশের সিরাজ স্যার, একাউন্টিং এর লোকমান স্যার, ইসলামিক হিস্ট্রির শামসুদ্দিন স্যার। গতরাতে গেলেন পাব্লিকএডের ওয়াহহাব স্যার।

আজ সকালে শামীম ভাইয়ের স্ট্যাটাস থেকে ওহাব স্যারের নিউজটা পাওয়ার পরে এমন কাউকে ক্যাম্পাসে পেলাম না, যার কাছে গিয়ে ক’ফোটা অশ্রু বিসর্জন করতে পারি! যার চোখমোছা ভেজা হাত ছুঁয়ে যাবে আমার অশ্রুভেজা হাত। যার কাঁধে ঝরে পড়বে আমার স্বজন হারানো বেদনা-বারি। আমার কাঁধ সিক্ত হবে যার চোখের পানিতে। আমাদের কাছের লোকেরা এখন তেমন কেউ আর নাই এই ক্যাম্পাসে।

ওহাব স্যার তখন তেভাগা খামারের কাছাকাছি ‘সহোদরা নিবাস’ থেকে ডাকাতের কবলে পড়ে জরুরিভাবে উঠেছেন এক নম্বর বিল্ডিং এর নিচের তলার পূর্ব দিকের ফ্ল্যাটে। বাসাটা বরাদ্দ ছিল ফরেস্ট্রির মকবুল স্যারের নামে। মকবুল স্যার ছিলেন স্যারের এলাকা বৃহত্তর রংপুরের মানুষ।

ওহাব স্যারের বাসায় ইউনিভার্সিটি পিএবিএক্স এর টেলিফোনটা ছিল ড্রয়িংরুম এবং ডাইনিংস্পেস এর মাঝামাঝিতে। অন্যান্য সিনিয়র স্যারদের বাসায় টেলিফোন থাকত বেডরুমে। বেডরুমে না রেখে টেলিফোন সেটটাকে ড্রয়িং রুমের সাথে রাখার কারণ আমি আর নেছার ভাই। আমরা যখন তখন স্যারের বাসায় গিয়ে এখানে ওখানে নানা সাংগঠনিক কাজে প্রচুর ফোন করতাম।

ভালো ভালো খাবারগুলো নিজেরা না খেয়ে উনারা রেফ্রিজারেটরে রেখে দিতেন। নেছার ভাই, আমি কিংবা অন্য কেউ কোনো কাজে উনাদের বাসায় গেলে যাতে করে ভালোভাবে আপ্যায়ন করা যায়।

স্যারের তিন ছেলে এক মেয়ে। প্রত্যেকে সুপ্রতিষ্ঠিত। কর্মচারী ভাইদের মতো আর্লি লাইফে ৬ মাস পরপর প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে লোন নিতেন ওহাব স্যার। খুব সম্ভবত ছেলেদের ক্যাডেট কলেজের বেতন দেয়ার জন্যে। ছেলে-মেয়েদের ক্যারিয়ার গড়ে তোলা ছাড়া স্যার আসলে তেমন অর্থবিত্ত সম্পদ কিছু করেননি।

শেষের দিকে স্যার দক্ষিণ ক্যাম্পাস মসজিদের পাশে ১০ নম্বর ডুপ্লেক্স বাসায় শিফট হোন। মসজিদ থেকে বের হলেই স্যার কোনো দ্বীনি এলমের কথা বলতেন। মাওলানা মামুন ভাইকে বাসায় ডেকে নিয়ে মাঝে মাঝে উনার কাছ থেকে হাদিসের এবারত শুনতেন।

স্যারের কথাবার্তা আচার-আচরণ ছিল শিক্ষকসুলভ, যা এখনকার অধিকাংশ শিক্ষকের মধ্যে দেখা যায় না।

একবার নামাজের পরে কাঁঠাল খাওয়ার জন্য স্যার আমাদেরকে উনার বাসায় ডাকলেন। পুরো কাঁঠাল খাওয়ার পরে জিওগ্রাফির মহিবুল্লাহ, স্যারকে বললেন, ‘স্যার, কাঁঠাল তো খুব একটা খাই না। আমটা পাইলে একটু খাই…!’

ক্যাম্পাসে তখন খানেওয়ালা ছিল ফিলসফির তৌহিদুল হাসান ভাই, জিওগ্রাফির মহিবুল্লাহ, আর আমি। অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত মহিবুল্লাহ বেশ খেতে পারতেন। আমিও যে অনেক খাইতে পারি, এইটা অবশ্য লোকেরা তেমন জানতো না।

রিটায়ারমেন্ট এর পরে একমাত্র ওহাব স্যারকে আমরা আয়োজন করে সাংগঠনিকভাবে বিদায় জানিয়েছিলাম। আমার রুম, পুরাতন কলা ভবন ১০২-এ অনুষ্ঠিত হওয়া সেই বিদায় অনুষ্ঠানে কঠিন হৃদয়ের নেছার ভাইকেও দেখেছি, শিশুর মত কাঁদতে।

একবার স্যার এসেছেন উনার মেয়ের বাসায়। স্যারের মেয়ে সুমি চবি’র প্রফেসর, মাইক্রোবায়োলজি ডিপার্টমেন্টে। ওর জামাই আকতার ভাই ফরেস্ট্রির প্রফেসর।

আমি ফুলটাইম সামাজিক আন্দোলনে সময় দেই। সংগঠনের সাথে নাই। আমার সম্পর্কে এমন কিছু শোনার পরে চবি ক্যাম্পাসে যারা সে সময়ে দায়িত্বশীল ছিলেন তাদেরকে ডেকে স্যার বললেন, ‘মোজাম্মেল যাই করুক না কেন, তোমরা তার সাথে এমন কোনো আচরণ করবে না, যাতে করে সে মনে কষ্ট পায়….!’ শুনেছি পরবর্তীতে।

অথচ স্যারের চাকরি জীবনের শেষের দিকে একটা সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের সাথে স্যার একমত হননি, এই ‘অভিযোগে’ স্যারের সাথে আমি অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করেছিলাম সবচেয়ে বেশি। Later, I regretted it. অন্য কেউ হলে জীবনে আমার সাথে কথাই বলতেন না।

ওয়াহাব স্যার ছিলেন উদার মনের মানুষ। ক্ষমাশীল।

যেসব ডিপার্টমেন্টে জামাতের টিচাররা একটা পজিশনে আসতে পেরেছেন তারা পরবর্তীকালে তাদের ডিপার্টমেন্টের লাইক মাইন্ডেড সহকর্মীদের সাথে নানা ধরনের ঝামেলায় জড়িয়েছেন। ব্যতিক্রম ছিলেন ওহাব স্যার।

সামনে তো নয়ই, প্রফেসর আব্দুন নূর স্যার সম্পর্কে ওহাব স্যার পিছনেও কখনো অশ্রদ্ধাপূর্ণ কোনো কথা বলেছেন, এমনটা শুনি নাই। বরং, ‘নূর ভাই …’ এই কথাটা উনি খুব শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করতেন।

কতদিন আগের কথা, অথচ মনে হচ্ছে এই তো সেদিন, ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের ডঃ বদিউল আলম স্যারকে দাফন করে যখন আমরা ফটিকছড়ি থেকে ফিরে আসতেছি। গাড়ির মধ্যে ঢুকরে কেঁদে উঠে ওহাব স্যার বললেন, ‘মোজাম্মেল, আমরা বদিউল আলম ভাইকে দাফন করে আসতেছি …!’

মিতুলকে স্যার আর স্যারের ওয়াইফ মেয়ে হিসেবে মনে করতেন। সে হিসেবে আমি উনাদের বাসায় জামাই আদর পেতাম। সুমির জন্য আকতার ভাইয়ের পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসার পরে স্যার আমাকে জরুরিভাবে ডাকলেন একদিন দুপুর বেলায়। সুমির সাথে কথা বলে আমি মত দিলাম। এরপর বিয়ে ফাইনাল হলো। আমি ছিলাম উনাদের ফ্যামিলি মেম্বারের মত।

ওয়াহাব স্যারের হক আমরা আদায় করতে পারি নাই। কিন্তু আমাদের হক তিনি আদায় করেছেন উনার সাধ্য মোতাবেক।

আল্লাহ তায়ালা স্যারের সকল ভালো আমল কবুল করুন! সকল ভুল ত্রুটি গুনাহ ক্ষমা করুন! উনাকে রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দান করুন! আ-মীন!

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Badra Alam Didar: Sir was a person of amiable disposition, gentleman with humble body language and a practicing Muslim. He used to be a mentor for us back in those days.

I don’t think he was appropriately valued & cared in his CU time. May Allah forgive his shortcomings as human being & place high rank in Jannah. Ameen.

Mohammad Mozammel Hoque: At our early professional life, to my personal consideration, there were only 2 persons, who were core Jamaat and who had top most level of sincerity, and who were totally men of integrity. One was professor MA Saleh, another was professor Abdul Wahab.

Shahadat Hossain: “যেসব ডিপার্টমেন্টে জামাতের টিচাররা একটা পজিশনে এসছেন তারা পরবর্তীকালে তাদের ডিপার্টমেন্টের লাইক মাইন্ডেড সহকর্মীদের সাথে নানা ধরনের ঝামেলা করেছেন।”

আপনার এই মুল্যায়নটি খুবই পীড়াদায়ক মনে হলো। এই পর্যায়ের লোকজনের চরিত্রে এই প্রবণতা কেমনে থেকে যেতে পারছে তা ভেবে শংকিত হই।

Mohammad Mozammel Hoque: অনাকাঙ্খিত ও অপ্রত্যাশিত হলেও আমার অভিজ্ঞতায় এটি একটা অনস্বীকার্য কিন্তু অপ্রিয় বাস্তবতা।

আমার সরাসরি শিক্ষক এবং সাদা দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর ডঃ ওয়াহিদুর রহমান স্যার কোনোদিনও সাদা দলের স্টিয়ারিং কমিটিতে নির্বাচিত হন নাই। অথচ আমি বরাবরই ছিলাম সাদা দলের স্টিয়ারিং কমিটির নির্বাচিত মেম্বার। এটা ভাবলে এখন আমার সাংঘাতিক রকমের গিল্ট ফিলিং হয়!

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *