জীবনবোধসম্পন্ন মানুষ আর বৈষয়িক জনগণ

তারা দুজন বন্ধু। একজন সংসারী। তার আছে গাড়ি-বাড়ি সবকিছু। আরেকজন ভবঘুরে। তেমন কোনো স্টাবলিশমেন্ট নেই তার জীবনে। তো, কথাবার্তা আর তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে তারা দুজনে একটা বিষয়ে বাজি ধরল। উড়নচণ্ডী স্বভাবের বন্ধুটির মতে– কারো সাথে যোগাযোগ না করে, কোথাও না গিয়ে, কোনো কথাবার্তা না বলে কোনো একজন ব্যক্তি সুদীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিতে পারে। তার এই দাবির সাথে তীব্র দ্বিমত পোষণ করলো সংসারী বন্ধুটি। এমনকি এক পর্যায়ে তারা একটা বেইট ধরলো। বাজির শর্ত অনুসারে তার বন্ধুটি কোনো কথাবার্তা না বলে ১০ বছর এই বাড়ির একটি ঘরে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখতে পারলে সে এই বাড়ির মালিক হয়ে যাবে। তাদের দুজনের মধ্যে স্বাক্ষী-সাবুদ সহকারে লিখিত চুক্তিও সম্পাদিত হলো।

এক নির্দিষ্ট দিনে ভোর পাঁচটা হতে শুরু হলো কথা না বলে থাকার এই অদ্ভূত প্রতিযোগিতা। ও হ্যাঁ, এই প্রতিযোগিতায় ওই বাড়ির কাজের লোকটিও অংশগ্রহণ করলো। কোনো কাজ না করে বসে বসে খাওয়া-দাওয়া করে আর ঘুমিয়ে ১০ বছর কাটিয়ে একটা বাড়ির মালিক হওয়া যাওয়ার লোভে সম্ভবত সে এতে অংশগ্রহণ করার জন্য আগ্রহী হয়েছে।

কথা না বলে থাকতে থাকতে লেখাপড়া না জানা সেই কাজের লোকটি কয়েক মাসের মধ্যেই প্রচণ্ড মানসিক চাপের সম্মুখীন হলো। একদিকে বাড়ির মালিক হওয়ার লোভ অন্যদিকে কোনো কাজ না থাকার যন্ত্রণা, এই অস্বাভাবিক দোটানায় পড়ে লোকটি শেষ পর্যন্ত বছর না ঘুরতেই পাগল হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে গেল। প্রতিযোগিতায় রয়ে গেল বাউণ্ডুলে স্বভাবের সেই বন্ধুটি।

দার্শনিক স্বভাবের ওই লোকটি বিভিন্ন বিষয়ে বইপত্র দেয়ার জন্য চিরকুট লিখে দেয়। সরবরাহ করা বইগুলো সে পড়ে। সেগুলোর ওপর নোট করে। আবার সেগুলোর রেফারেন্সে নতুন বই আনার জন্য অর্ডার দেয়। খাওয়া-দাওয়া করে। হাঁটাহাঁটি করে। নিয়মিত নামাজ পড়ে। এভাবে তার দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। যেদিন ভোর পাঁচটায় দশ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা, সেদিন পুরো বাড়িতে লোকজন এসেছে। মিডিয়ার লোকজন এসেছে। ঘড়ির কাঁটা পাঁচটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পিনপতন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে চারিদিকে। প্রবল উত্তেজনা। এদিকে মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম সেই বাড়ির মালিক বন্ধুটির।

এমনি সময়ে পাঁচটা বাজার কয়েক সেকেন্ড আগে কথা বলে উঠল ১০ বছর কথা না বলে থাকা সেই ভদ্রলোক। আনন্দের আতিশয্যে চিৎকার করে উঠল বাড়ির মালিক সেই বন্ধুটি। আর উপস্থিত সবাই হায় হায় করে উঠল। হতচকিত হয়ে তারা সেই বাজি ধরা ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলো, কেন সে এমন কাজটি করলো। নির্বিকারভাবে সেই লোকটা বললো,

“দেখো এই ১০ বছর আমি এই ঘরের মধ্যে আবদ্ধ ছিলাম। তোমরা ভাবছ, আমি কেন বন্দি ছিলাম। না, এই ১০ বছর আমি পুরো দুনিয়া ঘুরে বেরিয়েছি। জেনেছি মানুষের ইতিহাস। পড়েছি সাহিত্য, দর্শন, মানুষের যত জ্ঞান-বিজ্ঞান আর সভ্যতার অর্জন। ভেবেছি নিজের সম্পর্কে, জগত সম্পর্কে, সবকিছু সম্পর্কে, একেবারে নির্মোহভাবে। একাকিত্ব আর নির্জনতার উপলব্ধি আমাকে আমূল বদলে দিয়েছে। আমার অন্তরের চোখ খুলে গেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, জীবনের সফলতা বলতে যা কিছু তোমরা ঠিক করেছ, সেটা ভুল। জীবনের তাৎপর্য ও সফলতার মাপকাঠি আমার কাছে ভিন্নতর বলে মনে হয়েছে। জীবনের সেই সঠিক বোধ আমার মধ্যে জাগ্রত হয়েছে পূর্ণমাত্রায়।

সেজন্য আমি ভেবেছি, আমার উচিত হবে না এ রকম কোনো সহায় সম্পত্তির মালিক হওয়া। সেজন্য আমি ইচ্ছে করেই হেরে গেলাম। পরাজয় মেনে নিলাম। এসব বাড়ি-গাড়ির কিছুই আমার দরকার নাই। তোমরা থাকো। আমি বরং চললাম।”

এই বলে সে কাঁধে ঝোলানো একটা ব্যাগের মধ্যে কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নিয়ে বাইরের দিকে পা বাড়ালো। লোকেরা তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়া পথের দিকে। আর পেছনের আবহে ভেসে উঠলো ভোরের আজানের ধ্বনি– হাইয়া আলাস সালা-হ, হাইয়া আলাল ফালা-হ (শান্তির দিকে আসো, কল্যাণের দিকে আসো…)!

না। যেমনটা ভাবছেন তেমনটা নয়। আমি গল্প লিখতে জানি না। এটি হলো ছাত্রজীবনে বাসায় গিয়ে দেখা তখনকার সময়কার একটা নাটকের থিম। নাটকটির নাম মনে নাই। বিটিভিতে দেখেছিলাম।। পাগল হয়ে যাওয়া সেই কাজের লোকটির মতো লোকদের দেখেছি অনেক। যারা কোনো আদর্শ অনুসরণের দাবি করে। কিন্তু অন্তর থেকে সেটাকে own করে না। যাদের গভীর জীবনবোধ ও ঐকান্তিক কোনো আদর্শ নাই। তাদের অবস্থা এক পর্যায়ে মানসিক চাপে পাগল হয়ে যাওয়া লোকটির মতো হয়ে পড়ে, যদিও তারা রাস্তায় বের হয়ে যায় না।

এমনকি তাদের মত জীবনবোধশূন্য দুনিয়াদার লোকদের দৃষ্টিতে, জীবনে তারা সফল (?)। আসলে তারা ভেড়ার পালের মতো শুধুই সংখ্যা। নিছকই গোবেচারা জনগণ। মানুষ মাত্র অল্প কয়েকজন। সবসময় চেয়েছি তেমনি একজন জীবনবোধসম্পন্ন মানুষ হতে। গল্পের সেই বাউণ্ডুলে লোকটির মতো।

ফেইসবুক থেকে নির্বাচিত মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

মাসুম হাফিয: এখন আবার জীবনবোধসম্পন্ন হওয়ার ট্রেন্ড চলতেছে। সবাই জীবনবোধসম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে। অথচ যখন ‘জীবনবোধসম্পন্ন’ শব্দটার অর্থ মানুষ খুব একটা জানতো না তখন তাদের মধ্যে বহু মানুষ সত্যিকারের জীবনবোধসম্পন্ন ছিলো। এখন দুনিয়াবিমুখতা, মানবতা, বিপ্লব, জীবনবোধ এসব ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এগুলো এখন মানুষের পার্টটাইম জব, আর জীবনের বৃহত্তর বাস্তবিক অংশে তারা ভোগবাদী!

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: কী জানি! আমার তো এরকম মনে হচ্ছে না। জীবনবোধসম্পন্ন হওয়া তো অনুভবের ব্যাপার। মুখে বললেই তো আর হয় না। জীবনকে কারা অনুভব করে সত্যিকারভাবে এবং কারা জীবনকে শুধুমাত্র ভোগ করতে চায় সেটা কাজেই বুঝা যায়।

মাসুম হাফিয: যে নিরবে নিঃশব্দে ভোগবাদিতাকে এড়িয়ে চলে সেই জীবনবোধসম্পন্ন।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: ১। জীবনাদর্শের দিক থেকে কেউ কেউ মানুষ, বাদবাকি সব জনগণ

২। মানুষ আর জনগণের মধ্যে জীবনাদর্শগত পার্থক্য

শামীম সৈকত: অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টা এরকম, “ধোঁয়াটে কথায় অনেক বড় বড় তথ্য, তত্ত্ব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা যায় কিন্তু হৃদয়ে অনুভব করি না ছিঁটেফোঁটাও “।

Jubairul Hasan Arif: আন্তন চেখবের ‘দ্যা বেট’র নাট্যরূপ মে বি, স্যার।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: গল্পটা কি এরকম?

Jubairul Hasan Arif: মৃত্যুদণ্ড আর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড উভয়েই অনৈতিক, কিন্তু আমাকে যদি এদের মধ্যে থেকে কোনোটিকে বেছে নিতে বলা হয় তবে আমি দ্বিতীয়টিকেই বেছে নেব। একেবারে মরে যাবার চেয়ে কোনোভাবে বেঁচে থাকা অনেক ভালো।

এই টপিকের উপর পয়সাঅলা ব্যাংকার আর এক আইনজীবী বাজি ধরে এক আড্ডায়। প্রতীক্ষিত ১৫ বছর সময়ের পর ব্যাংকার আইনজীবীরে খুন করতে আসলেন তার অনমনীয় ধৈর্য দেখে। চেয়ারে ঘুমন্ত আইনজীবীরে মারার আগে দেখলেন একটা চিরকুট। চিরকুটটা তুইলা নিলেন আর পড়তে লাগলেন:

“আগামীকাল বারোটায় আমি আবার আমার স্বাধীনতা ফিরে পাব, ফিরে পাব অন্য সব মানুষের সাথে চলাফেরার অধিকার। কিন্তু এই ঘর থেকে বেরোনোর আগে, সূর্যোদয়ের আগে, আমার মনে হয় কিছু কথা বলা দরকার। একদম ঠাণ্ডা মাথায় আজ আমি তোমাদের সবার কাছে, আমার ঈশ্বরের কাছে, অস্বীকার করলাম এই স্বাধীনতা, জীবন, সুস্বাস্থ্য… আর তোমাদের বইয়ে লেখা জাগতিক যত মঙ্গলময় বস্তুকে।

পনের বছর ধরে আমি মনোযোগ দিয়ে গবেষণা করছিলাম জাগতিক যাপিত জীবন নিয়ে। এটা সত্য যে এই সময়ে আমি এই জগৎ বা মানুষ কারোই সংস্পর্শে আসিনি, কিন্তু তোমাদের দেয়া বইয়ে আমি পান করেছি যত রাজসিক মদ, গেয়েছি কত গান, জঙ্গলে গিয়ে করেছি হরিণ আর বুনো শুয়োর শিকার। আমি নারীর প্রেমে পড়েছি। তোমাদের কবি আর প্রতিভাবান যত মানুষের তৈরি মেঘের মতো বাষ্পীভূত সূক্ষ্ম সৌন্দর্য্যরা দেখা দিয়েছে আমায় এসে, আমার নিঃসঙ্গ রাতগুলোতে। কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলা সেই অবাক অদ্ভুত গল্পগুলো মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে আমার। আমি বইয়ে বইয়ে আরোহণ করেছি এল্বার্জ, মাউন্ট ব্ল’র শিখরে, দেখেছি সূর্যোদয় আর সন্ধ্যায় দেখেছি তার সেই সোনালী বান, কীভাবে আকাশ, সাগর ছুঁয়ে যায়, গিয়ে জমে সিঁদুরসোনা ওই পর্বত শিখরে। আমি সেখান থেকে দেখতাম আকাশ জোড়া বজ্রমালার ঝলকানি, তোলপাড় তোলে যারা যত ঝড়ো মেঘে।

আমি দেখতাম চিরহরিৎ বনানী, শস্যক্ষেত্র, নদী, হ্রদ, শহর। আমি শুনেছি সাইরেনদের গান, মেষপালকের বাজানো বাঁশি, ছুঁয়েছি শান্ত সেই শয়তানের পাখা, যে উড়ে কথা বলতে এসেছিল আমার সাথে, ঈশ্বরের হয়ে…। তোমাদের বইয়ে আমি নিজেকে ছুঁড়ে ফেলেছি অতল যত গুপ্তকূপে, জন্ম দিয়েছি অলৌকিকের, হত্যা করেছি, প্রচারণা করেছি নতুন ধর্মের, জয় করেছি গোটা কোনো মুল্লুক।

তোমাদের বই আমাকে দিয়েছে জ্ঞান। মানুষের অস্থিতিশীল যত চিন্তা, জন্ম নিয়েছে যুগে যুগে, তারা সব যেন মিলেমিশে আমার মস্তিষ্ককে পরিণত করেছে একটা দিকযন্ত্রে। আমি জানি আমি তোমাদের সবার থেকে জ্ঞানী।

আর আজ আমি ত্যাগ করলাম তোমাদের যত বই, অস্বীকার করলাম তোমাদের যত জ্ঞান, জাগতিক যত আশীর্বাদ। এসবই অর্থহীন… দ্রুত ধাবমান মায়া, আলেয়ার মত যত ছল। তোমাদের হয়ত অনেক গর্ব, তোমরা হয়ত অনেক জ্ঞানী আর সুখী। কিন্তু একদিন মৃত্যু তোমাদের এই পৃথিবীর বুক থেকে মুছে দেবে, যেমন করে কেউ সমূলে বিনাশ করে মাটির নিচে গর্ত খুঁড়তে থাকা ইঁদুরদের। আর সেদিন তোমাদের যত উন্নতি, গরিমা, ইতিহাস, অমর যত প্রতিভাধরেরা সবাই হয়ত পুড়বে অথবা একসাথে জমে তুষারবৎ হয়ে পড়ে থাকবে সব, এই পৃথিবীরই সাথে।

তোমরা তোমাদের কার্যকারণ বিস্মৃত হয়েছ আর বেছে নিয়েছ ভুল যত পথ। তোমরা মিথ্যাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছ, ভয়ংকরের নাম দিয়েছ সুন্দর। তোমরা অবাক হও আপেল বা কমলা গাছে ফলের বদলে টিকটিকি, ব্যাঙ গজানোর মত, গোলাপ ফুল থেকে ঘোড়ার ঘামের কটুগন্ধের নিঃসরণের মত যত অভূতপূর্বে। আর আমি অবাক হই তোমাদের দেখে, তোমরা যারা স্বর্গের বদলে বেছে নাও এই মর্ত্যরে। আমি তোমাদের বুঝতে চাই না।

তোমাদের জীবনধারণের এই সকল জাগতিক যত বস্তুকে ত্যাগ করতে আজ আমি তাই অস্বীকার করলাম আমার প্রাপ্য সেই দুই মিলিয়ন টাকা, যার স্বপ্নে একসময় আমি গড়ে তুলেছিলাম আমার সাজানো স্বর্গ, সবই অস্বীকার করলাম আমি আজ। এই অবস্থা হতে নিজেকে সরিয়ে নিতে তাই আমি এই ঘর থেকে নির্ধারিত সময়ের পাঁচ ঘন্টা আগেই বেরিয়ে যাবো, ভেঙ্গে দেব সেই চুক্তির শর্ত।”

ব্যাঙ্কার পইড়া কাগজটা রাইখা দিলেন টেবিলে। আর সন্তর্পণে বন্দীর মাথায় চুমু দিয়ে বেরিয়ে এলেন সেই ঘর থেকে। তিনি কাঁদছিলেন। তার নিজেকে কখনো, এমনকি স্টক একচেঞ্জে বড় কোনো ক্ষতির পরও এমন নিঃস্ব, ক্ষুদ্র মনে হয়নি। তিনি নিজের বাড়িতে আসলেন, শুয়ে পড়লেন বিছানায়। কিন্তু তার কান্না আর অনুভূতিরা তাকে জাগিয়ে রেখেছিল অনেকক্ষণ।

পরদিন দারোয়ান দৌড়ে এসে খবর দিল– তারা দেখেছে সেই বাগানবাড়ির লোকটাকে বেরিয়ে আসতে।

পোস্টটির ফেইসবুক লিংক

Leave a Reply