নিয়ম আর নীতির গোড়া হচ্ছে ভালোবাসা, যার শিকড় আবেগের গভীরে প্রোথিত

[প্রায় প্রতিটা বাক্যই উদ্ধৃতিযোগ্য, আমার এমন আবেগমথিত একটা লেখা থেকে আমার এক স্নেহভাজন ছাত্র এই উদ্ধৃতিটা দিয়ে আমাকে ট্যাগ করে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছে,

ভালোবাসা আর আবেগের অন্তর্গত জোয়ার যদি না থাকে তাহলে তৈরি হয় না নীতিবোধ আর আদর্শের প্রত্যয়।”

সেই সুবাদে ভাবলাম, নিয়ম আর নীতির সম্পর্ক নিয়ে একটুখানি বলি।]

নিয়ম আর নীতির সাথে আবেগ আর ভালোবাসার আপাতদৃষ্টিতে কোনো সম্পর্ক নাই।

নিয়ম তথা law অথবা rule আসে নীতিবোধ তথা ঔচিত্যবোধ হতে। যা উচিত তা করার জন্য একমত হলে বা তা করার জন্য বাধ্যবাধকতার ব্যবস্থা করা হলে তখন আইন বা নিয়ম গড়ে উঠে। মূল্যবোধ আর আইনের মধ্যে তুলনা করলে আমরা দেখতে পাই, নিয়ম বা আইন তুলনামূলকভাবে অধিকতর objective বা বস্তুনিষ্ঠ; এবং নীতি বা মূল্যবোধ তুলনামূলকভাবে অধিকতর ব্যক্তিনিষ্ঠ বা subjective।

এই যে নীতিবোধ বা মূল্যবোধ, এটি গড়ে উঠে ভালো কিছুর প্রতি ভালোবাসা আর খারাপ কিছুর প্রতি ঘৃণা হতে। এই ভালোবাসা বা ঘৃণাবোধ, এগুলো গড়ে উঠে আবেগ থেকে। এটি স্বজ্ঞাত বা intuitive।

তারমানে, কেন আমাদের কোনো কিছু ভালো লাগে, কোনো কিছু খারাপ লাগে তা আমরা ঠিক জানি না। ব্যাপারগুলো আমাদের অবচেতনের গভীরে গড়ে উঠার পরে যখন আমাদরে চেতন স্তরে ভেসে উঠে তখনই আমরা তা জানতে পারি।

কেউ কেউ বলে, যা আসলেই ভালো তা-ই আমাদের সাধারণত ভালো লাগে। যা আসলেই খারাপ তা-ই আমাদের খারাপ লাগে। এই দৃষ্টিতে, ভালো হলো অবজেক্টিভ। আবার কেউ সমান যুক্তি দিয়ে পাল্টা বলতে পারে, আমাদের ভালো মনে হয় বলেই কোনো কিছুকে আমাদের ‘আসলেই ভালো’ বলে মনে হয়। এবং কোনো কোনো বিষয়কে আমরা খারাপ মনে করি বলেই আমাদের মনে হয় সেটি ‘আসলেই খারাপ’। এই দৃষ্টিতে ভালো-মন্দ হলো সাবজেক্টিভ।

অতএব, দেখা যাচ্ছে, আমাদের ভালো-মন্দবোধকে আমরা একইসাথে ব্যক্তিনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ হিসেবে ভাবতে পারি। অথচ, এটি ভুল।

কেননা, একই সাথে কোনো কিছু ব্যক্তিনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ হবে না, যেমন করে একইসাথে কোনো কিছু সঠিক ও ভুল হবে না। এখানে ‘একইসাথে’ কথাটাকে খুব সতর্কভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে। মানে, কোনো শর্ত বা প্রেক্ষাপট পরিবর্তন ব্যতিরেকে কোনো কিছুর আইডেন্টিটি চেঞ্জ হবে না।

সত্য-মিথ্যাকে গুলিয়ে না ফেলার এই বেসিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা অন্টলজিকে যদি আমরা এভাবে স্মরণে রাখি তাহলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, সত্যের প্রতি আমাদের অনুরাগ ও আবেগ এবং মিথ্যার প্রতি আমাদের যে নেতিবাচক মনোভাব, তা অ-ব্যাখ্যাত।

এবার শরীরী আবেগের সাথে বিশুদ্ধ মানসিক আবেগের যে পার্থক্য সে প্রসঙ্গে একটু বলে নেই।

আমাদের শরীরী আবেগসমূহের শারীরিক তথা বস্তুগত কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। সে নিয়ে আর কথা বাড়াচ্ছি না। কিন্তু জীবন ও জগত সম্পর্কে আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাবের কি কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ আমরা খুঁজে পাই? কথার কথা, কোন বস্তুগত কারণে মানুষ নাস্তিক হয়? তর্কের খাতিরে আপাতত ধরে নিতে পারি, আস্তিকরা হয়তো খোদার কাছ হতে কিছু পাওয়ার লোভে আস্তিক হয়।

কেন নির্দিষ্ট মানুষ নীতি আর আদর্শকে পছন্দ করে, এগুলোর জন্য এভাবে এতটা সিরিয়াস হয়ে পড়ে, সেইটা জানতে গেলে আপনি বস্তুগত সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে মানুষের এই মতবাদবাদিতার ব্যাখ্যা তো দূরের কথা, এই নিতান্তই humane বিষয়গুলোকে ঠিকমতো বুঝতেও পারবেন না।

আমার দৃষ্টিতে, এগুলো ‌‘প্রকৃতি’ বা খোদাপ্রদত্ত বিশেষ একটা কিছু। এগুলো আমাদের ভিতরকার কিছু inexplicable বা unexplainable ফেনোমেনা। এই ‌‘একটা কিছুকে’ আমি বলছি আবেগ। এখানে আবেগ বলতে আমি অ-জৈবিক তথা মানুষের মূল্যবোধজনিত আবেগকে বুঝাচ্ছি।

এই ধরনের আবেগ থেকে গড়ে উঠে মানবিক ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসা আর আবেগের অন্তর্গত জোয়ারে গড়ে উঠে নীতি আর মূল্যবোধের ভিত্তিভূমি। এক পর্যায়ে এর ওপরে আমরা গড়ে তুলি আইনী কাঠামো। একই কথাকে উল্টো করে বললে, আইনের ভিত্তি হচ্ছে মূল্যবোধ, নীতিবোধ আর আদর্শ। আর এসব কিছুরই ভিত্তি তথা spawning ground হচ্ছে আবেগ আর ভালোবাসা।

লেখাটির ফেইসবুক লিংক

Leave a Reply