পরিবারের সদস্য হিসেবে নারীর উপার্জনের অর্থ কি শুধুই তার?

আগের আলোচনাটির ধারাবাহিকতায় একান্তই ঘরোয়া মুক্ত আলোচনা—

মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য

Hasan Ibn Faruk Khan: সূরা নিসার ৭ নং আয়াতে বলা আছে— ‍“নারীদের জন্যও অংশ রয়েছে তার পিতা-মাতার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে।” এমনটা যদি হয়, তাহলে নারীর ব্যক্তিগত ইনকাম সেটা urban কিংবা rural যে এরিয়াতেই হোক; সেটা তারই থাকবে। এখন যদি তার ইচ্ছা হয় তাহলে সে পরিবারে অংশগ্রহণ করতে পারে। না করলে সমস্যা হবে না। এটা শরীয়তের দৃষ্টিকোণ বললাম। এ বিষয়টা যদি একটু পরিষ্কার করে বলতেন। ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: উত্তরাধিকার সম্পত্তি এবং মোহরানার সম্পত্তি কিংবা উপহার হিসেবে প্রাপ্ত নারীদের সম্পত্তি, আর, বৈবাহিক সম্পর্কের অধীনে থেকে নারীদের বৈধ উপার্জনের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ, এই দুই ধরনের অর্থ-সম্পদের ব্যাপারটা ঠিক এক নয়। প্রথম ধরনের অর্থ-সম্পদ তার যতটা এক্সক্লুসিভ, দ্বিতীয় ধরনের অর্থ-সম্পদ তার ততটা এক্সক্লুসিভ নয়।

এর মানে, বিবাহিত নারীদের চাকরি ও ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের মালিকানা তার স্বামীর, ব্যাপারটা এমনও নয়।

পারিবারিক ব্যয় নির্বাহের দায়িত্ব একান্তই স্বামীর হওয়ার কারণে, বিবাহিত নারী যখন, কথার কথা, চাকরির মাধ্যমে কিছু উপার্জন করে তখন সেটা পরিবারের একটা বাড়তি উপার্জন হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা। তার এই (বাড়তি) উপার্জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হক রয়ে গেছে তার পরিবারের সদস্যগণ তথা তার স্বামী এবং সন্তানদের। এটির পরিমাণ অনির্ধারিত। কিন্তু এটি অবধারিত।

মসজিদে যেতে চাইলে নারীদেরকে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দিতে একভাবে স্বামীরা যেমন বাধ্য, তেমনি স্ত্রীদেরকে উপার্জন করতে চাইলে তাদেরকে উপার্জন করতে দেওয়ার জন্য স্বামীরা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনোক্রমেই বাধ্য নয়।

এমতাবস্থায় যখন স্ত্রীরা বাড়তি উপার্জনের জন্য, কথার কথা, চাকরি করতে চাইবে তখন স্বামীরা তাদেরকে অনুমতি দিবে একটা পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে। স্বাভাবিকভাবেই আমরা বুঝতে পারি এই বোঝাপড়াটা হলো, স্ত্রীর ইনকাম তার পরিবারে একটা বাড়তি স্বচ্ছলতা এনে দিবে, এই প্রত্যাশা।

পুরো ব্যাপারটিকে এভাবেই ভাবতে হবে, যদি আমরা এটাকে ইসলামী ফ্রেমওয়ার্কের আলোকে চিন্তা করি। আমার এই ধরনের কথাগুলোকে পাশ্চাত্য নারীবাদী ধ্যান-ধারণা তথা ফেমিনিস্ট প্যারাডাইমের আলোকে বিবেচনা করলে ভুল হবে। আশা করি ভুল বুঝবেন না।

Nahid Uz Zaman: এখানে যে জিনিসটা বড় ভুল করা হয়েছে সেটা হলো, একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিংকেই ইসলামের বুঝ বলে ফেলা হয়েছে!

যা হোক, বর্ণনায় কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। যেমন, স্ত্রীকে বা কন্যাকে যথাক্রমে স্বামী বা পিতা চাকরি করতে দিতে বাধ্য নয়। কিন্তু কেউ যদি অনুমতি লঙ্ঘন করেই চাকরি করে তাহলে তার একটু গুনাহ হবে বটে কিন্তু ইনকাম হারাম হবে না।

এখন অনুমতি সাপেক্ষে হোক আর অবাধ্য হয়ে হোক, কোনো নারী যদি রোজগার করে তাহলে তার ঐ ইনকামের উপর তার অভিভাবকের আসলে কোনো অধিকার নেই। তার উপর ফরজ বা ওয়াজিব নয় তার পরিবারের জন্য খরচ করা। হ্যাঁ, যদি অনুমতির সময় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঘটা করে চুক্তি হয় তাহলে ভিন্ন কথা।

কিন্তু বাই ডিফল্ট, নারীর কোনো অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা নেই। তার ইচ্ছা হলে আয় করবে, ইচ্ছা হলে পরিবারের জন্য খরচ করবে। ইচ্ছা না হলে করবে না।

এখন, এ তো গেলো থিওরিটিক্যাল কথা। বাস্তবতায় নারীকে পরিবারের পিছনে ব্যয় করানোর জন্যই আর নিও সামাজিক স্ট্যাটাসের জন্যই মূলত স্ত্রীদের চাকরি করানো হয়, বা চাকরিজীবী নারীদের বিয়ে করার জন্য মুখিয়ে থাকা হয়। নারীকে নিজের রোজগার ব্যতিরেকেই তার সকল ভ্যালিড প্রয়োজন স্বামী বা পিতার অর্থ থেকে মেটানোর স্বাধীনতা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করতেই পুরুষেরা নারীদের ইনকাম করতে পাঠায়। আর নারীরাও ফেমিনিজমের প্রভাবে মনের আনন্দে গর্বভরে স্বেচ্ছায় ইনকাম করতে যায়, আগ বাড়িয়ে কষ্ট করতে মুখিয়ে থাকে বোকার মত।

নারীর জন্য পরিবারের সদস্যদের জন্য খরচ করা আবশ্যক হওয়া তো দূরের কথা, নারীর নিজের পকেট মানি নিজে রোজগার করাও আবশ্যক নয়। তার সকল ভ্যালিড অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর আবশ্যিক দায়িত্ব তার অভিভাবকের। বিয়ের আগে বাবার, বিয়ের পর স্বামীর।

কোনো নারীকে রোজগার করতে বাধ্য করা অভিভাবকের জন্য নিষিদ্ধ। আর বিনা প্রয়োজনেও কোনো নারী স্বেচ্ছায় যদি রোজগার করতে চায়, তার অভিভাবক যদি এ্যালাও করে তাহলে তবুও তার জন্য কোনোভাবেই পরিবারের জন্য খরচ করা আবশ্যক হবে না। তখনও তার সকল ভ্যালিড প্রয়োজন মেটানোর আবশ্যিক দায়িত্ব অভিভাবকেরই থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ঐ নারী স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের জন্য খরচ করবে। এটা তার জন্য আবশ্যক নয়, কিন্তু জায়েজ। বরং স্বামীর জন্য জায়েজ নয় স্ত্রীকে পরিবারের জন্য খরচ করতে বাধ্য করা। বিধায় কোনো নারী স্বেচ্ছায় যদি খরচ করে, তাহলে স্বামী সানন্দে তা ভোগ করতে পারবে। যদিও এটা অপরের ইহসান গ্রহণ করা।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক: কোরআন-হাদিস অধ্যয়ন সাপেক্ষে করণীয় নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির আন্ডারস্ট্যান্ডিং মাত্রকেই ‌‘ইসলামের বুঝ’ বলার সমস্যাটা তো আমরা বুঝি। এর পাশাপাশি, এ ধরনের আন্ডারস্ট্যান্ডিং মাত্রকেই যদি আপনি নিছক ব্যক্তিগত আন্ডারস্ট্যান্ডিং হিসেবে নাকচ করে দেন, তাহলে স্বতন্ত্রভাবে ‌‘ইসলামের বুঝ’ বলে আর কোনো কিছু থাকে না।

আর হ্যাঁ, অনুমতি লঙ্ঘন করে কেউ যদি চাকরি করে তাহলে তার ইনকাম হারাম হবে না। যেমন করে অনুমতি লঙ্ঘন করে কোন নারী যদি বাহিরে যায় এবং সেখানে কোনো কাজ করে, সেই কাজটি স্বয়ং নিষিদ্ধ না হলে, অনুমতি ছাড়া বাহিরে গিয়ে করার কারণেই সে কাজটি নিষিদ্ধ হয়ে যাবে না। কিন্তু স্বামী যদি এ ধরনের কাজে তালাক প্রযোজ্য হবে, এমন কথা বলে থাকে, তাহলে স্ত্রীর এমন অনুমতিবিহীন কাজের মাধ্যমে তালাক কার্যকর হয়ে যাবে। আমি সঠিক বলছি কিনা আপনি অনুসন্ধান করে দেখতে পারেন।

নারীদেরকে উপার্জন করতে বাধ্য করার প্রসঙ্গটি আমার আলোচনাতে আসে নাই। আপনি কেন এই পয়েন্টে কথা বললেন সেটা আমার বুঝে আসছে না। সে যাই হোক, ‍“….কোনো নারী যদি রোজগার করে তাহলে তার ওই ইনকামের উপর তার অভিভাবকের আসলে কোনো অধিকার নেই” — আপনার এই ধারণাটি ভুল। অতিসরলীকরণ করার কারণে আপনার এই ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে।

নারী বা পুরুষ যখন স্ত্রী বা স্বামী হিসেবে একটা পারিবারিক বন্ধনের মধ্যে আসে তখন তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাগত দিক থেকে একটা সামাজিক চুক্তি কার্যকর হয়। তা হলো, পুরুষ উপার্জন করবে এবং নারী পুরুষের এই উপার্জন প্রক্রিয়াতে সম্ভাব্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করবে। আপনি এই পয়েন্টটা বুঝতে পারবেন না হয়তোবা, সেজন্য উদাহরণ হিসেবে বলছি। থাকার জন্য বাসস্থানটা কোথায় হবে, সেটার মান কী ধরনের হবে, এমনকি এ ধরনের তুচ্ছ বিষয়াদিও কিন্তু পারিবারিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সাথে নানামাত্রায় সম্পর্কিত।

একজন বিবাহিত পুরুষের ইনকাম যেমন শুধুমাত্র তার একান্ত ব্যক্তিগত নয়, এক অর্থে বরং তা উক্ত পরিবারের পারিবারিক উপার্জন। তেমনি করে একজন বিবাহিত নারীর ইনকামও তার একান্ত ব্যক্তিগত উপার্জন নয়। বরং তা উক্ত পরিবারের পারিবারিক উপার্জন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। যেমনটা করে আমি বুঝেছি।

এ নিয়ে আমি আর আপনার সাথে কথা বাড়াতে চাচ্ছি না। ভালো থাকবেন। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

ফেইসবুক লিংক

Leave a Reply